ধরুন আপনার প্রচন্ড বুকে ব্যাথা হলো । সেক্ষেত্রে অবশ্যই আপনি একজন ডাক্তারের কাছে যাবেন। আপনার ব্যাথা নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, হৃদরোগ নাকি অন্য কোন কারনে হয়েছে তা জানার জন্য ডাক্তার সাহেব একগাদা টেস্ট দিবেন। ফলে আপনার রোগটি শুধু সুনির্দিষ্ট ভাবে নির্ণয় করা যাবে তাই নয়, বরং এটি আপনে যেন যথাযথ ও সুচিকিৎসা পান এটাও নিশ্চিত করবে।

অন্যদিকে ধরুন আপনি কোন মানসিক জটিলতার মধ্যে দিয়ে গেলেন। এক্ষেত্রে আপনার রোগটি সঠিকভাবে নির্ণয় করার কৌশলটি অনেকটাই অন্যরকম হবে। এমনকী আপনার কাছে সেরকম ভালো কোন অপশন নাও থাকতে পারে।

i1

মানসিক রোগে ভোগা বেশিরভাগ মানুষকে হয় স্রিজোফেনিয়া নয়তো বাইপোলার ডিজর্ডারের রোগীর কাতারে ফেলা হয়। টেস্কট বইয়ে এই দুইটা রোগের পার্থক্য শতাব্দীকাল ধরে একই রকম আছে। স্রিজোফেনিয়ার সবচেয়ে সাধারন লক্ষন হলো ভূলে যাওয়া, হ্যালুসিনেশন এবং দীর্ঘসময় ধরে চলা একটা রোগ- সবমিলিয়ে একটা নাজেহাল অবস্থা। বাইপোলার ডিজর্ডারের ক্ষেত্রেও ভুলে যাওয়া ও হ্যালুসিনেশন দেখা যায়। আরো আছে মানসিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন। কখনো হাসিমুখ আবার কখনো গোমরামুখ আর কি।

তো এইসব মানসিক রোগগুলো আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত হয়। সেসব কারনে টেক্সটবইয়ের বাইরে বাস্তবে ইমার্জেন্সি রুম বা ক্লিনিকে এই পার্থক্যটা অতটা স্পষ্ট নয়। কারন অনেক রোগীর ক্ষেত্রে টেক্সট বইতে বর্ণিত লক্ষনগুলো মেলে না। দুঃখের বিষয় হলো সিজোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার ডিজর্ডার থেকে আলাদা করার জন্য কোন ব্লাড টেস্ট বা স্ক্যানের ব্যবস্থা নাই।

যদিও মনোরোগ বিশেষজ্ঞগন লক্ষন থেকেই রোগ নির্নয় করতে খুবই দক্ষ হয়ে থাকেন, তারপরও এই ধরনের সুনির্দিষ্ট কোন ব্যবস্থা না থাকায় সাইক্রিয়াট্রিতে ব্যপক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত সব রোগীরাই কি আসলে সিজোফ্রেনিয়াতেই ভুগছে? বিশাল একটা শ্রেণির লোকদের যে সিজোফ্রনিয়া এবং বাইপোলার ডিসওর্ডার দুটোতেই ভোগার সম্ভাবনা আছে এই ব্যাপারে তারা কি বলবেন? সম্পূর্ণ রোগলক্ষণের ভিত্তিতে শনাক্ত করা এইসব রোগ কি স্বতন্ত্র জৈবিকসত্ত্বার উপস্থিতিকে নির্দেশক করে নাকি মনোরোগের সিরিজএই লক্ষণসমূহ অনেকগুলো রোগের সম্ভাবনাকে উসকে দেয়।

বুকে ব্যথার মতো এক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্টভাবে রোগটি নির্ণয় করতে পারা সর্বোত্তম চিকিৎসার পূর্বশর্ত। সাইকিয়াট্রিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে জৈবিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মনেরোগ নির্ণয় ছিল একটি দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মেন্টাল হেলথ এটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে বাধা অনেক কিন্তু ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা ছিল আশা জাগানিয়া।

i2

চিত্রঃ বায়োটাইপ নির্ধারন

বায়োটাইপ নির্ধারণ:
জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী ব্রেট ক্লেমেজের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় টেক্সাস ইউনিভার্সিটির ক্যারন ট্যামিঙ্গা ডালাসের সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল স্টোরে এবং তাদের ইয়েল ও হার্ভাড ইউনিভার্সিটির সহকরমীরা মনোরোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বায়োটাইপ ( একই রকম জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিসমষ্টি) খুঁজে পান।এটি পরিমাণগত বায়োমার্কার( যে বস্তু কোন রোগের উপস্থিতি বা তীব্রতা নির্দেশ করে) দ্বারা এটি নির্ধারণ করা হয়।

এই গবেষণায় বাইপোলার -সিজোফ্রেনিয়া নেটওয়ার্কের অন্তবর্তী বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহের(Bipolar and schizophrenia network on intermediate phenotype(BSNIP)) সাহায্যে সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং সিজিওএফেক্টিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত( সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার দুটোই থাকে) ৭১১ জন লোককে বিভিন্ন রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেয়া হয়। এ থেকে মনোরোগের সাথে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ কর্মকান্ডেকে মূল্যায়ন করা হয়। পরীক্ষাগুলোর মধ্যে ছিল – বুদ্দিবৃত্তিক পরীক্ষা (cognitive test),শ্রবণশক্তি মূল্যায়ন, বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণের মূল্যায়ন, EES এবং চোখের নড়াচড়ার পরীক্ষা। আরো ছিল তাদের মস্তিষ্কের MRI স্ক্যান ।
সম্ভবত এতে আশ্চর্যের কিছু নাই যে অনেক লোকজনের উপর তিন ধরনের রোগ নির্ণয় কৌশন ব্যবহারের ফলে তিন ধরনের বায়োটাইপ পাওয়া যাবে। কিন্তু এই তিন ধরনের বায়োটাইপের- প্রথাগত তিন প্রকার রোগ নির্ণয়ের কৌশলের সাথে খুব কমই পার্থক্য আছে।

প্রকৃতপক্ষে বায়োটাইপগুলো সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসর্ডার এবং সিজিওএফেক্টিভ ডিসর্ডার এই তিন প্রকৃতির মাঝেই পড়ে। এবং এই বায়োটাইপগুলোতে রোগলক্ষনের তীব্রতা বা ম্যানিয়া সম্পর্কিত লক্ষনের সাথে তেমন পার্থক্য দেখা যায়নি।

তাহলে এরকম ভাবার তেমন কোন কারন নাই যে বায়োটাইপ থেকে রোগনির্ণয় প্রথাগত রোগলক্ষন থেকে রোগ নির্ণয়ের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। তারপরো কিছু পর্যবেক্ষন থেকে দেখা যায় B-SNIP অনুসন্ধানীগন কিছুটা এগিয়ে আছেন। প্রথমত এই বায়োটাইপের পার্থক্যগুলো প্রথম ডিগ্রি(আমরা সরাসরি চিনি) পরিবারের সদস্যদের মাঝেও দেখা গেছে। কারন তাদের থেকেও জেনেটিক ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিলো। দ্বিতীয়ত বিভিন্ন বায়োটাইপের রোগীদের মধ্যে সামাজিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা গেছে। অন্যান্য বায়োটাইপের চেয়ে বায়োটাইপ-১ এর মধ্যে পড়া লোকজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশী বৈকল্য দেখা গেছে।

অধিকতর সঠিক চিকিৎসাঃ
ক্যান্সার এবং অন্যান্য রোগনির্ণয়ের বিপ্লব সাধনের সাথে সাথে সঠিক চিকিৎসা একটি বহুল প্রচলিত শব্দে পরিনত হয়েছে। ব্যপারটা আসলে এরকম- জেনেটিক্স, ইমেজিং এবং আধুনিক জীববিজ্ঞানের অন্যান্য সুবিধার ফলে প্রচলিত রোগনির্ণয় পন্থাকে ভেঙ্গেচুড়ে নতুন রোগনির্ণয় পন্থা তৈরি হবে। এটা হবে আরো সঠিক এবং জেনেটিক প্রকরন নির্ণয় করা যাবে এমন পর্যায়ের। এর ফলে কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টিকে নির্দিষ্ট রোগের জন্য আরো সঠিক চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে।

তৃতীয়ত, মস্তিষ্কের ছবি নিয়ে গবেষনা। এটা থেকে মস্তিষ্কের ধূসর কোষগুলোতে সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। বিশেষ করে ফ্রন্টা, সিংলেট, টেম্পোরাল এবং প্যারাইটাল কর্টেক্সে। যদিও এসব কোন পর্যবেক্ষন থেকেই প্রমাণিত হয়না যে রোগলক্ষন থেকে রোগনির্ণয়ে বায়োটাইপ বেশি কাজের। তারপরও এইসব গবেষনা মনোরোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একটি নতুন পথের সূচনা করতে পারে। ভবিষ্যতে হয়তো এটা জানা যাবে জিনগত বৈচিত্র্য, মস্তিষ্কের কর্মকান্ডের রূপরেখা নাকি আচরনগত কারন বায়োটাইপকে বুঝতে সাহায্য করে যা পরবর্তিতে কৌশলটিকে নির্ভরযোগ্য করে তুলবে। মনোরোগের ক্ষেত্রে যেহেতু ক্লিনিকে পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা নাই তাই এক্ষেত্রে সঠিক ওষুধ হতে পারে একটি সংহতিনাশক নতুনত্ব। এর ফলে দেখা যাবে বর্তমানে প্রচলিত সর্বপ্রকার রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা ভুল এবং জৈবিক দিকের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ন।

আমরা অটিজম, অ্যাটেনশন ডিফিসিট হাইপার একটিভিটি ডিজর্ডার, ডিপ্রেশন এবং উদ্বেগজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ দেখতে পাচ্ছি। যেমন, অটিজমের ক্ষেত্রে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় অনেক রকমের অটিজম আছে। দুর্বল রোগনির্ণয় ব্যবস্থায় সব ধরনের অটিজমকে মোটামুটি একই রকমের মনে হয়। কিন্তু এগুলো জিনগত ভাবে বৈচিত্র্যপূর্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

NIMH মনোরোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একটি নতুন কৌশল প্রস্তাব করেছে যা রোগলক্ষণ থেকে রোগনির্ণয়ের সাথে সাথে জৈবিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আচরণগত এবং সামাজিক তথ্যের সমন্বয়ের কথা বলে। যাকে বলা হচ্ছে Research Domain Criteria বা RdoC. এটা বিতর্কিতও হতে পারে। কার এটা প্রথাগত সাইকিয়াট্রির সাথে বিশাল একটা ভাঙ্গন তৈরি করবে। আবার টিকেও যেতে পারে।
B-SNIP গবেষনা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল RDOC কৈশলের পক্ষে প্রমাণ দেয়। অবশ্যই B-SNIP, বায়োটাইপ বা অন্য কোন নতুন রোগনির্ণয় কৌশল ব্যাবহার করে চিকিৎসা প্রদান, ফলাফল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কতটা কাজে আসবে তার জন্য গবেষনা প্রয়োজন

যুক্তরাষ্ট্রে সিজফ্রেনিয়া আক্রান্ত রোগীদের সাধারনত মানসিক অবস্থার উন্নতিসাধনকারী ওষুধ, মানসিক সাহায় যেমন- কাউন্সেলিং, কারিগরী প্রশিক্ষন এবং অন্যান্য ধরনের সাহায্য দেয়া হয়ে থাকে। অন্যদিকে বাইপোলার ডিজর্ডারের ক্ষেত্রে স্ট্যাবিলাইজার, অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ, কখনো কখনো অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট এবং মানসিক সাহায্য দেয়া হয়। চিকিৎসাব্যবস্থা এখনো ততটা ভালো না। এই সুবিধাগুলো পাওয়া সব রোগী সাড়া নাও দিতে পারে।

আশার কথা হলো, সাইকিয়াট্রিতে সঠিক ওষুধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বায়োমার্কার কার্যকর অবদান রাখতে পারে। এর ফলে চিকিৎসক এবং রোগীগন মনোরোগ সম্পর্কে আরো বেশি জানতে পারবেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। মানসিক রোগগুলো সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থার সৃষ্টি করে- প্রচুর খরচ হয় এবং রোগী আর তাদের পরিবারকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। নতুন ধরনের রোগনির্ণয় কৌশল এবং তা ব্যবহার করে চিকিৎসা প্রদান করার জন্য আরো অনেক দূর যেতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ
Is There a Better Way to Diagnose Psychosis? By Thomas R. Insel, Scientific American, March, 2016

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন সাবরিনা সুমাইয়া

অলস, উদাসীন । অলসতা থেকে রেহাই পাওয়ার অবিরত চেষ্টার অংশ হিসেবে বিজ্ঞান লেখা ও ভাবার চেষ্টা করা।

সাবরিনা সুমাইয়া বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 8 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    বেশিরভাগই মাথার উপর দিয়ে গেলো — সাম্প্রতিক গবেষণা নিয়ে লেখা তো।
    ১) বায়োটাইপ কি ডিএনএ সিকোয়েন্স থেকে বের করা হচ্ছে?
    ২) যদি তাই হয় তাহলে কিভাবে বের করা হলো সুনির্দিষ্ট সিকোয়েন্সই বায়োটাইপের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।
    এ ধরণের আরো লেখার প্রত্যাশা করছি।

    • সাবরিনা সুমাইয়া Reply

      ধন্যবাদ, খুবই গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন করেছেন। না এখানে সিকোয়েন্স করা হয়নি। এখানে বিভিন্ন নিউরোসাইকোলজিকাল টেস্ট এর ফলাফলকে বায়োমার্কার ধরা হয়েছে। এবং ৭১১ জন্য ইন্ডিভিজুয়ালের বায়োমার্কারের তথ্যগুলো নিয়ে স্টাটিস্টিকাল এনালাইসিস করে বায়োটাইপগুলো নির্ধারন করা হয়েছে।
      তবে আমিও মনে করি এবার সিকোয়েন্সিং করে কো-রিলেশন খুজে দেখলে মন্ধ হয়না।

    • সাবরিনা সুমাইয়া Reply

      ধন্যবাদ আপনাকে। চেষ্টা করবো নিয়মিত লেখার।

  2. সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

    আপু, লেখাটা মাথার উপর দিয়ে গিয়েছিল। জিরোর জন্য কাজ করার সময় তথ্যসূত্রের সূত্র ধরে সায়েন্টিফিক আমেরিকান মাইন্ড নামিয়ে মূল লেখাটা পড়েছিলাম। এরপর দেখলাম এই অনুবাদটা বেশি কঠিন হয়ে গিয়েছে। আরো সরলভাবে উপস্থাপন করা চাই। 🙂

    • সাবরিনা সুমাইয়া Reply

      ধন্যবাদ মূল্যবান মতামতের জন্য।

আপনার মতামত