যাদু শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। অলৌকিক যাদু, মঞ্চে দেখানো যাদুকরের যাদু কিংবা কাব্যিক যাদু। অলৌকিক যাদুগুলো পাওয়া যায় পৌরাণিক ও রূপকথার গল্পে। সিন্ডারেলার রূপকথায় যাদুর বুড়ি তার হাতের কাঠির সাহায্যে কুমড়াকে ঘোড়ার গাড়ি, ইঁদুরকে ঘোড়া এবং গিরগিটিকে গাড়ি চালক বানিয়ে ফেলেন।  আলাদীনের গল্পে যাদুর বাতিতে ঘষা দিলে মনিবের যেকোনো ইচ্ছা পূরণ করতে হাজির হয় এক দৈত্য। কিংবা আলী-বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পে বিশেষ পাহারের সামনে ‘খুলে যা সিমসিম’ বললে পাহার দুই দিকে সরে গিয়ে গুপ্তধনের রাস্তা খুলে দেয়। এগুলো যাদুর গল্প এবং নিঃসন্দেহে চিত্তাকর্ষক। ছোটবেলায় সবাই-ই এই গল্পগুলো শুনে আনন্দ পেয়েছে। মঞ্চে দেখানো যাদুকরের যাদুও চিত্তাকর্ষক। যাদুকর নানা রকম ভেলকিবাজি ও কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে দর্শকদের চোখকে ধোঁকা দিয়ে অসাধ্য জিনিস সাধন করেন। দর্শকের চোখে দেখতে অসাধ্য হলেও এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার নানা কৌশল। যাদুকর একটি রুমাল থেকে ছুমন্তর-ছু বলে একটি খরগোশ তৈরি করে দেখাল। কাপড়ের টুকরা রুমাল কখনো একটি খরগোশ হতে পারে না। এটা এক ধরনের ‘ট্রিক’ অবলম্বনের মাধ্যমে করা হয়েছে। তাদের এমন ধরনের ভেলকিবাজি খুব মজাদার বলে দর্শকেরা টাকা দিয়ে টিকিট কিনে যাদু দেখে।

আরেক ধরনের যাদু হচ্ছে ‘কাব্যিক যাদু’। অনিন্দ্য সুন্দর কোনো সুর বা ছন্দ শুনে মাঝে মাঝে আমরা আবেগতাড়িত হয়ে যাই এবং বলি- সুরটা অনেক যাদুময়। কিংবা মন ভালো করে দেয়া কোনো পাহার-পর্বতের দৃশ্য দেখে মনে মনে বলে উঠি- এখানকার প্রকৃতিটা খুব যাদুময়। বর্ষার রাতে পানিতে নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে নৌকার পাটাতনে আকাশমুখী হয়ে শুয়ে পরিষ্কার ও চাঁদবিহীন আকাশে তারাদের আনাগোনা পর্যবেক্ষণ করলে যে কেউ-ই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যাবে। এমন ধরনের দৃশ্যের কেমন যেন একটা যাদু আছে। অন্তর ভরিয়ে দেয়া এমন ঘটনাগুলোই হচ্ছে যাদুময় ঘটনা। এই যাদুগুলোই কাব্যিক যাদু। এই ধরনের যাদুর উপস্থিতি আছে বলেই মনে হবে বেঁচে থেকে জীবনটা সার্থক। এমন ধরনের চমৎকার কিছু ঘটনা বা তথ্যের মুখোমুখি হলে মনে হবে এই জীবন-জগৎ কত রঙিন!

 

এমন ধরনের যাদুর উপাদান হচ্ছে বিজ্ঞান। প্রচলিত রূপকথা যেমন চিত্তাকর্ষক এবং যাদুকরের ট্রিক যেমন চিত্তাকর্ষক তেমনই রূপকথা ও যাদুর মাঝে থাকা সত্যিকারের বিজ্ঞানটাও তেমনই চিত্তাকর্ষক। ইঁদুর কখনো ঘোড়া হতে পারবে কিনা, পারলেও কীভাবে কিংবা রুমাল থেকে খরগোশ কীভাবে আসবে এর পেছনের কারণ ও কৌশলগুলোও কম চিত্তাকর্ষক নয়। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সৌন্দর্য রূপকথার যাদু কিংবা যাদুকরের পারফরমেন্সকেও হার মানায়। ‘বাস্তবতার যাদু’ (The Magic of Reality) বইটিতে এমন ধরনের বিষয়গুলোকেই বেছে বেছে নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে।

একটা সময় ছিল যখন বিজ্ঞান আজকের মতো ভালো অবস্থানে ছিল না। প্রকৃতির অনেক জিনিসেরই কোনো বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা ছিল না। এসব ক্ষেত্রে আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের ব্যাখ্যা করতে অলৌকিক কল্পনার আশ্রয় নিতো। তাসমানিয়া অঞ্চলের লোকেরা মনে করতো কোনো একজন দেবতা নক্ষত্রলোকের একটি যুদ্ধে হেরে যাবার পর ভালো কিছু তৈরি করার উদ্দেশ্যে কাঠ দিয়ে প্রথম মানুষকে তৈরি করেছিল। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার লোকেরা মনে করতো গাছ থেকে উৎপত্তি হয়েছে মানুষের। অস্ট্রেলিয়ার লোকেরা মনে করতো রাগান্বিত দুটি টিকটিকি বুমেরাংয়ের মাধ্যমে পশ্চিম দিক থেকে সূর্যকে সরিয়ে ফেলেছিল। এতে সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাওয়াতে উপায় না দেখে সূর্যকে পূর্বদিকে বসিয়ে দেয়। পশ্চিম দিক থেকে ছিটকে পূর্ব দিকে বসিয়েছে বলে তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মাঝের এই সময়টাতে সূর্য অনুপস্থিত থাকে। এর ফলে জন্ম হয় রাতের। মিশরীয়রা ব্যাখ্যা দিয়েছিল দেবী নাট প্রতিদিন সন্ধ্যায় সূর্যকে গিলে ফেলে, ফলে রাত নেমে আসে এবং সকালে সূর্যকে আবার জন্মদান করে ফলে ফিরে আসে দিনের আলো। রাতের তারাখচিত আকাশ হচ্ছে দেবী নাটের সুন্দর দেহের আবরণ। ম্যাক্সিকোর একটি জাতি বিশ্বাস করতো প্রতিদিন মানুষকে বলি না দিলে সূর্য উঠবে না পৃথিবীতে। তাই তারা বছরের পর বছর হাজার হাজার মানুষকে বলি দিয়ে এসেছে। ভেবে দেখেনি একদিন বলি না দিয়ে দেখি সূর্য আসলেই উঠে কিনা।

 

ভাইকিংরা বিশ্বাস করতো রঙধনু হচ্ছে আকাশলোক থেকে দেবতাদের পৃথিবীতে আসার রাজকীয় বর্ণিল রাস্তা। জাপানীরা ভূমিকম্পকে ব্যাখ্যা করেছিল মাগুর মাছের নড়াচড়া দিয়ে। বিশাল বড় এক মাগুর মাছ পৃথিবীকে তার পিঠে নিয়ে আছে, চলাফেরার সময় যখন লেজ নাড়ে তখন লেজের কম্পনের কারণে পৃথিবীতে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

এদের সবগুলোই অলৌকিক ব্যাখ্যা। অলৌকিক যাদু। কিন্তু এসব ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য আরো এক ধরনের যাদু আছে। এর নাম বিজ্ঞান। দেব দেবতা দিয়ে করা যেসব জিনিসের ব্যাখ্যা অবাস্তব সেসব জিনিসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আক্ষরিক অর্থেই চমৎকার ও নিখাদ বাস্তব। মানুষের উৎপত্তি হয়েছিল বিবর্তনের ধীর গতির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, কাঠ থেকে নয়। দিন ও রাতের সৃষ্টি হয় পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে, সূর্যকে সরিয়ে ফেলা কিংবা গিলে ফেলার জন্য নয়। আকাশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তারারা আসলে অনেক দূরের বড় বড় নক্ষত্র, কোনো দেবীর ত্বক নয়। সাদা রঙের আলোক তরঙ্গ সাতটি ভিন্ন ভিন্ন রঙে বিশ্লিষ্ট হবার কারণে তৈরি হয় রঙধনু, দেবতাদের হাঁটার রাস্তার জন্য নয়। পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের স্থানচ্যুতির ফলে তৈরি হয় ভূমিকম্প, মাগুর মাছের লেজের ঝাপটায় নয়। ইত্যাদি অনেক প্রচলিত বিশ্বাস আছে যাদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তথা বাস্তবতা মূল বিশ্বাস থেকে একদমই ভিন্ন। এমন ধরনের ব্যাপারগুলো নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে ‘বাস্তবতার যাদু’ (The Magic of Reality) বইটিতে।

 

বইটির বেশিরভাগ অধ্যায়ই শুরু হয়েছে কোনো ঘটনার প্রচলিত রূপকথা বা পৌরাণিক গল্প দিয়ে। এরপর সমস্ত অধ্যায় জুড়ে ঐসব ঘটনার প্রচলিত বিশ্বাস খণ্ডন ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। একদম শুরুতে যাদু ও বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাস্তবতার সত্যিকার স্বরূপটা পরিষ্কার করে নিয়েছেন এখানে।

বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী ও জীববিজ্ঞান লেখক রিচার্ড ডকিন্স অনেকদিন ধরে বিজ্ঞানের চমকপ্রদ বিষয়গুলো নিয়ে চমকপ্রদ কিছু বই লিখেছেন। তার বিশ্ববিখ্যাত বেস্টসেলার অনেকগুলো বইয়ের মাঝে একটি হচ্ছে The Magic of Reality: How we know what’s really true। বইয়ের চমৎকার অলংকরণ জুড়ে দিয়েছেন আরেক বিখ্যাত ইলাস্ট্রেটর Dave McKean, যার বইয়ের সৌন্দর্য বেড়ে গিয়েছে অনেকগুণ। চমৎকার অলংকরণের কারণে বইটি কিশোর-তরুণদের আদর কেড়ে নিতে পেরেছে সহজে। ‘দ্যা গার্ডিয়ানে’ প্রকাশিত এক রিভিউতে বলা হয়েছে “রিচার্ড ডকিন্স সেই সত্তরের দশক থেকে সমাজে প্রচলিত নানা ধরনের কুসংস্কার ও ভুল ধারণার বিরুদ্ধে লেখালেখি করে যাচ্ছেন। তার এতদিনের সংগ্রামের সরলীকৃত ও সমন্বিত একটা রূপ বলা যেতে পারে এই বইটিকে।”

চিত্রঃ অলংকরণের নমুনা

আমাদের বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ধরনের বিশ্বাস-অন্ধবিশ্বাস-কুসংস্কার ও এদের সত্যিকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়ে এই বই। বাংলাদেশের সমাজে প্রচলিত নানা ধরনের কুসংস্কারের প্রেক্ষিতে এই বইটি দেশের সকল স্তরের মানুষেরই পড়া উচিৎ।  বাংলাদেশে এই বইটির প্রয়োজনের তাগিদ থেকেই বইটির অনুবাদ কাজে হাত দিয়েছি। আশা করি ভালো মানের একটা অনুবাদ উপহার দিতে পারবো।

 

তথ্য

The Magic of Reality (বাস্তবতার যাদু)
মূলঃ রিচার্ড ডকিন্স
অনুবাদঃ সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

গুডরিডস রেটিংঃ 4.04 out of 5

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    চমৎকার অনুবাদ হবে। অলঙ্করণ করাটাই হবে বড়ো চ্যালেঞ্জ। কবের মধ্যে বইটার কাজ শেষ করছো?

আপনার মতামত