সে অনেকদিন আগের কথা। আমাদের পৃথিবী নামের গ্রহটি তখনও টগবগে তরুণ। ক্যালেন্ডারের পাতা ধরে পিছিয়ে গেলে আমরা আজ সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগের গল্প বলছি। সাড়ে চার বিলিয়ন মানে ৪,৫০০,০০০,০০০ বছর ! সবচেয়ে পুরানো যে ক্রিস্টালটি পাওয়া গিয়েছে অদ্যবধি তার বয়স কম করে হলেও ৪.৩ বিলিয়ন বছর যা হচ্ছে আসলে এক ধরনের জিরকন ক্রিস্টাল (ZrSiO4 )। শুরুর সময়টায় পৃথিবী অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল আর প্রায়শই নানা গ্রহানু এসে আঘাত করত একে। ধীরে ধীরে এক সময় পৃথিবী ঠান্ডা আর সুস্থির হতে থাকে, আর প্রাণ সঞ্চারের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী হতে থাকে।

আদি পৃথিবী

ছবিঃ আদি পৃথিবী

 

আজ হতে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে প্রথম আদিকোষীয় প্রাণের প্রমান পাওয়া যায় যা কিনা ছিল মূলত ব্যাকটেরিয়া আর আর্কিয়া। বলে রাখা ভালো তখনও কিন্তু পৃথিবীতে তেমন অক্সিজেনের উপস্থিতি ছিল না। প্রায় ২.৫ বিলিয়ন বছর আগে অক্সিজেন উৎপাদনের সূচনা হয় পৃথিবীতে। আর এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে সায়ানো ব্যাকটেরিয়া(এগুলো আসলে আলোকসংবেদী বিক্রিয়ায় সক্ষম অনুজীব, আর আমরা জানি এই বিক্রিয়ায় উৎপাদ হল অক্সিজেন আর পানি)। তাই শুরুর দিকের (৩.৮-২.৫ বিলিয়ন বছর পূর্বের) আদিকোষীয় অনুজীব গুলো ছিল তারা যারা কিনা কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার, মিথেন ইত্যাদিকে ব্যাবহার করে তাদের শারীরবৃত্তিয় কার্য সম্পাদন করত। এদেরকে সাধারনত মিথেনোজেন বা সালফার অক্সিডাইজিং ব্যাক্টেরিয়াও বলে। মোটা দাগে এদের এনারবিক ব্যাক্টেরিয়াও বলা চলে(যারা অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে বাঁচতে পারে)। চলুন চট করে এক নজরে ইতিহাস টা দেখে নেই নিচের ছবিতে।

 

৪ বিলিয়ন বছরের প্রাণের ইতিহাস

ছবিঃ ৪ বিলিয়ন বছরের প্রাণের ইতিহাস

 

ছবিঃ স্ট্রোমাটোলাইট

আদি পৃথিবীর বুকে অনুজীবের রাজত্বের প্রমাণ মেলে প্রাচীন পাথরের ফসিলে। সেই মাইক্রোফসিল গুলো দেখতে অনেকটা আজকের ব্যাকটেরিয়ায় আকারের( রড বা লম্বাকৃতির, কক্কাই বা গোলাকার)। সেই অনুজীব ফসিল গুলোকে বলা হয় স্ট্রোমাটোলাইট। যা কালের আবর্তে গঠিত হয়েছিল আদিকোষীয় কোষ(ব্যাক্টেরিয়া) এর ফিল্ম আর মাটির স্তর জমে।

 

 

 

প্রাণের সুচনাঃ

অদ্যবধি আদিকোষের সূচনার দুইটি সর্বজন গৃহীত তত্ত রয়েছে যার একটিতে বলা হয়েছে যে পৃথিবী পৃষ্ঠে আদিকোষের সূচনা হয়। উল্লেখ্য যে তখন পৃথিবীর আবহাওয়া ছিল বৈরী। কোন এক বিক্রিয়ার ঝিল্লি দ্বারা আবৃত স্ব-অনুলিপি তৈরিতে সক্ষম কোষের সূচনা হয়। আরেকটি তত্ত্বে বলা হয় পৃথিবী পৃষ্ঠের নিচে সমুদ্রে নিমজ্জিত ফাটল আর আগ্নেয়গিরি হতে প্রাপ্ত রাসায়নিক পদার্থের নানা বিক্রিয়ার ধাপে ধাপে আদিকোষের সূচনা ঘটে। ধারনা করা হয় স্ব-অনুলিপি তৈরিতে সক্ষম নিউক্লিক এসিড ছিল রাইবো নিউক্লিক এসিড বা সংক্ষেপে RNA. অস্ট্রেলিয়ার এডিকারান পাহাড় থেকে প্রাপ্ত মাইক্রোফসিল এই ধারণাকে আরও জোরালো করে ।

ছবিঃ স্ট্যানলির প্রাণের সৃষ্টির পরীক্ষা


নানান বৈজ্ঞানিক পরিক্ষা-নিরিক্ষার পর আদিকোষের সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে মোট চারটি ধাপে ভাগ করা হয়েছেঃ
১) সাগর-মহাসাগর এবং বায়ুমন্ডলে অবস্থানরত অজৈব অনুর মধ্যকার বিক্রিয়াঃ
২) একক জৈব অনুর সৃষ্টি
৩) জৈব অনুর পলিমার গঠন
৪) বিপাক এবং স্ব-অনুলিপি তৈরিতে সক্ষম ঝিল্লী দ্বারা আবৃত জৈব অনুর সমষ্টি

১৯৫৩ সালে স্টানলি মিলার আর হেরল্ড ইউরে এই তত্ত্বটি পরীক্ষা করে কিছু দিনের মধ্যেই ২০ টি মূল এমাইনো এসিড(প্রাণের মূল ভিত্তি) উৎপাদনে সক্ষম হন। মনে করা হয় গভীর সাগরের পৃষ্ঠদেশের ফাটল কিংবা সাগরে নিমজ্জিত আগ্নেয়গিরি হল সেই রসায়নিক উপাদান গুলোর যোগানদাতা যা প্রাণের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিল। স্টানলি তার পরীক্ষায় পানি, হাইড্রোজেন, মিথেন আর এমোনিয়ার কৃত্তিম মিশ্রণ ব্যাবহার করেন।

 

 

আগেই বলেছিলাম আজ থেকে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা হয়েছিল। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত প্রাণের বিবর্তনের মিছিল চলে আসছে যার ফসল আমরা দেখছি আজকের এই পৃথিবীর এত প্রাণের বৈচিত্রে। প্রাণের সবচাইতে আদি রূপ ছিল এক কোষী ব্যাক্টেরয়া আর আর্কিয়া। ফসিল রেকর্ড হতে আমরা আদি পৃথিবীর বুকে ব্যাক্টেরিয়ার রাজত্বের ব্যাপারে জানতে পারি। তাদের কেউ কেউ সেই বৈরী পৃথিবীতে কার্বন ডাই অক্সাইড হতে তাদের খাদ্য সংগ্রহ করত আর শক্তির উৎস হিসেবে ব্যাবহার করতো সূর্যের আলোকে। এ প্রক্রিয়াটি আসলে ছিল এই পৃথিবীর বুকে প্রথম আলোক সংবেদী বিক্রিয়া যার মাধ্যমে উৎপাদন হতে শুরু হয় অক্সিজেনের। আর এর মাধ্যমেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে যা পরবর্তিতে বহুকোষী জীব এর বিবর্তনে মূল ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে বাড়তে থাকে অক্সিজেনের পরিমাণ।

খুব দ্রুতই বায়ুজীবী ( শ্বসন অক্সিজেন নির্ভর) এক কোষীরা জায়গা করে নেয় প্রকৃতিতে। ক্রমবর্ধমান বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যাক্টেরিয়ার সেই রাজত্ব আসলে নতুন এক ধরনের জীবনের রূপের এক সূচনা ছিল। তা ছিল বহুকোষী প্রাণ। নানা গবেষণা থেকে এটা প্রমাণীত যে বহুকোষী প্রাণে প্রাপ্ত মাইটকন্ড্রিয়া আর ক্লোরপ্লাস্ট আসলে ছিল আদি ব্যাক্টেরিয়া কোষ। এই এককোষী প্রাণ কি করে বহুকোষী প্রাণের অঙ্গাণুতে পরিনত হল তা এন্ডোসিম্বায়োটিক তত্ত্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পরবর্তি পর্বে এই এন্ডোসিম্বায়োটিক তত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সিমবায়োসিস তখনই ঘটে যখন দুটো আলাদা প্রজাতি এক সাথে বাস করলে একে অপরকে সাহায্য করতে পারে। যখন একটা প্রাণ আরেকটি প্রাণের ভেতর বাস করে আর একে অপরের উপর নির্ভরশীল থাকে তখন তাকে বলে এন্ডোসিম্বায়োসিস।

মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের বিবর্তনে মাইটোকন্ড্রিয়া আর ক্লোরপ্লাস্ট আরও বিশেষায়িত অঙ্গাণুতে পরিণত হয় এবং কোষের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। সেই সাথে হারায় এক কোষী হিসেবে তাদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। মাইটোকন্ড্রিয়া আর ক্লোরপ্লাস্ট এর সাথে ব্যাকটেরিয়ার আসাধারণ কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ঠিক ব্যাক্টেরিয়ার মতই তাদের নিজস্ব ডিএনএ থাকে যা কিনা কোষের নিউক্লিয়াসের ডিএনএ থেকে আলাদা। এই দুই অঙ্গাণু তাদের নিজের ডিএনএ ব্যাবহার করে প্রয়োজনীয় প্রোটিন এবং এনজাইম তৈরি করে। মাইটোকন্ড্রিয়া আর ক্লোরপ্লাস্ট এর চারপাশের দ্বিস্তর বিশিষ্ট পর্দা আরও একটি প্রমাণ যে এরা অতীতে কোন এক সময় এরা কোন আদি কোষ দ্বারা আতঃস্থ হয়েছিল। এই দুই অংগানু এছাড়াও ব্যাকটেরিয়া মত করে তাদের নিজেদের ডিএনএ প্রতিলিপি তৈরির মাধ্যমে তাদের নিজস্ব বিভাজন ঘটায়।

 

 

৪ বিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবীর অবস্থা আজ থেকে অনেক আলাদা ছিল। বায়ুমন্ডলে অক্সিজেনের ঘাটতি ছিল এমনকি ওজোন গ্যাসের স্তরও তখন পৃথিবীকে ক্ষতিকর বিকিরণ হতে রক্ষা করত না। প্রচন্ড বৃষ্টি, বিজলী আর অগ্ন্যুৎপাত ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তবুই সব প্রতিকুলতাকে ডিঙ্গিয়ে সেই চরম পরিবেশেই সূচনা হয় প্রথম প্রাণের। এক্সট্রিমোফাইল আর্কিয়া আজও প্রতিকূল পরিবেশেই বাস করে। এস্ট্রোবায়োলজিস্টরা এখন আর্কিয়া কে মডেল হিসেবে ব্যাবহার করছেন পৃথিবী আর অন্য গ্রহে প্রাণের সূচনা গবেষণায়। আর্কিয়ার প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার বৈশিষ্টের জন্যই একে ব্যাবহার করা হচ্ছে গ্রহ গ্রহান্তররে প্রাণের স্পন্দন খুঁজতে। সবচাইতে মজার ব্যাপার হল , সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে আর্কিয়া উল্কাপিন্ডে করে মহাকাশ ভ্রমণেও হয়তো সক্ষম। এভাবে ভ্রমণ কে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় প্যান্সপার্মিয়া। ধারণা করা হয় হয়তো এই প্রক্রিয়াতেও প্রাণের বীজ বপন করা হয় পৃথিবীর বুকে।

 

 

রেফারেন্সঃ
১) History of life on earth- BBC nature
২) Microbes and origin of life on earth- Boundless.com
৩) The Origin and Evolution of Microbial Life: Prokaryotes and Protists- Lectures by Chris Romero
৪) Chapter 11- Microbial Evolution and Systematic: Brock Biology of Microorganisms

 

 

 

লিখেছেন SHPrince

Currently doing undergrad in Microbiology at Noakhali Science and Technology University

SHPrince বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 4 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    এটাই প্রচলিত ধারণা। তবে প্রাণের উদ্ভব কিভাবে হলো সে চিন্তাধারায় সম্প্রতি কিছু পরিবর্তন এসেছে। লেখাটা সহজপাঠ্য হয়েছে। বানানে সতর্ক থাকতে হবে। অনুজীব> অণুজীব, অনু > অণু ইত্যাদি।

আপনার মতামত