একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর প্রধান কয়েকটি সংকটের একটা হল বৈশ্বিক উষ্ণতা। যার জন্য মূলত দায়ী করা হয় কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসকে। নগরায়নের ফলে বিশ্বজুড়ে কলকারখানার সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে সেসব কারখানা থেকে বর্জ্য হিসেবে নির্গত গ্যাসের পরিমান ও বেড়ে চলেছে দিনে দিনে। গত বছরই তেল ও কয়লার মতন জ্বীবাশ্ম জ্বালানী পুড়িয়ে বিশ্বে ৩৮.২ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করা হয়েছে। এর পরিমান যে প্রতি বছর বছর বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নাই।

15152874_10210880400626297_663980813_o

চিত্র ১ : কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে ইথানল প্রস্তুত প্রণালী

তাই অনেক বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে একটা যুগোপযোগি জ্বালানী বানানোর, যার ফলে এই গ্রীন হাউস গ্যাসটা পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ানোর পরিবর্তে নিজেই ব্যবহার হতে পারে জ্বালানী হিসেবে। সেই উদ্দেশ্যেই আমেরিকার ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা কার্বন ডাই অক্সাইড কে মিথানলে রুপান্তরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে বিজ্ঞানীরা কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসকে ইথানলে রুপান্তরের একটা সহজ ও সাশ্রয়ী তড়িৎ রাসায়নিক প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন সম্প্রতি।

15129772_10210880402546345_1042436239_n-1
চিত্র ২: গোলাকার কপার এবং সুচাকৃতির কার্বন সমৃদ্ধ প্রভাবক

এই রাসায়নিক রুপান্তরে বিজ্ঞানী দল কপার ন্যনোপার্টিক্যাল যুক্ত নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ সুচাকৃতির কার্বন(কার্বন স্পাইক) প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করেন। আর এই বিক্রিয়ার রহস্যটা ও লুকিয়ে আছে এই প্রভাবকের মধ্যে। বিজ্ঞানী দল আসলে শুরু থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন গ্রাফিন সমৃদ্ধ একটা প্রভাবক বানানোর, কিন্তু তাদের হাতে যে যন্ত্রপাতি ছিল তা দিয়ে গ্রাফিনের ন্যানো ক্যাটালিস্ট বানাতে তারা ব্যর্থ হলেও গোলাকার কপার এবং সূচাকৃতির কার্বন সমৃদ্ধ প্রভাবকটা (উপরের চিত্র ২) দুর্ঘটনাক্রমে বানিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে এই প্রভাবক দিয়ে বিজ্ঞানীদল চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন কার্বন ডাই অক্সাইডকে মিথানলে রুপান্তরের। কারন কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মিথানলে সমান সংখ্যক কার্বন থাকায়, এই রুপান্তরটা ছিল বেশ যৌক্তিক এবং এর আগে ও ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী কার্বন ডাই অক্সাইডকে মিথানলে রুপান্তর করায় এইটা ছিল বেশ প্রত্যাশিত। কিন্তু বিক্রিয়াটি করতে গিয়ে বিজ্ঞানীদল মিথানলের পরিবর্তে ইথানল পেয়ে যান তাদের ল্যাবরেটরীতে। কার্বন ডাই অক্সাইড কে ইথানলে রুপান্তরের এটাই প্রথম সফল প্রচেষ্টা।

কেন এবং কিভাবে মিথানল না হয়ে ইথানল হল সেটা নিয়েই গত এক বছর ধরে গবেষনা করে গেলেন ড রোনডিনোনি ও তাঁর দল। গবেষনা করে বের করলেন , কার্বন ডাই অক্সাইড প্রথমে কপার ন্যানো পার্টিক্যালের সংস্পর্শে নিজে বিজারিত হয়ে কার্বন মনোক্সাইডে (CO) পরিনত হয়, যা তড়িৎ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ডাইমার (OC=CO) গঠন করে এবং হাইড্রোজেনের সাথে বিক্রিয়ায় ইথানলে রুপান্তরিত হয়। [চিত্র ১]। ডাইমার গঠন সাধারনত অনেক উচ্চ তাপমাত্রায় হলেও এই বিক্রিয়ায় ব্যবহৃত প্রভাবকে থাকা কার্বন ন্যানোস্পাইক গুলো লাইটেনিং রড হিসেবে আচরন করে, যার শীর্ষভাগগুলো আস্তে আস্তে সুঁচালো হয়ে যায় বলে অল্প জায়গায় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে সেটা অতি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। তাই এই প্রক্রিয়ায় সামান্য পরিমানের বিদ্যুৎ কক্ষ তাপমাত্রায় পরিচালনা করেই কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে ইথানল পাওয়া যায়।

আমাদের সবার পরিচিত পানীয় “ইথানল” জ্বালানী হিসেবে ইতোমধ্যেই বেশ সুপরিচিত । ব্রাজিলে ব্যবহৃত গ্যাসোলিন বা পেট্রোলের ২৫% শতাংশই হল ইথানল। এই প্রক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন ইথানল কোন রকম প্রক্রিয়াজাত ছাড়ায় সরাসরি গাড়ির জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বলেই ধারনা গবেষনা দলের প্রধান ড রোনডিনোনির।

রেফারেন্সঃ http://onlinelibrary.wiley.com/doi/10.1002/slct.201601169/abstract

লিখেছেন প্রসূন ঘোষ রায়

প্রসূন ঘোষ রায়, পি এইচ ডি গবেষক (রসায়ন), সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক।

প্রসূন ঘোষ রায় বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 2 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. রুহশান আহমেদ Reply

    বুঝতে পারছি পদ্ধতিটা এখনো পরীক্ষামূলক,
    তবে ব্যাপারটা যদি আর্থিকভাবে ফিজিবল হয়ে যায় তাহলে প্রভাব কেমন হতে পারে তা ই ভাবছি… এখন তো গ্রিন হাউজ ইফেক্টের কথা চিন্তা করে মানুষ গাছ টাছ লাগায়, তখন কি ভাববে তারা?

    ধন্যবাদ লেখাটির জন্য।

আপনার মতামত