আমাদের দেহে প্রতিটা অংগেরই নির্দিষ্ট কিছু কাজ আছে। পা দিয়ে হাটি, হাত দিয়ে লেখি, পেট দিয়ে খাবার হজম করি। যেসব অংগের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে ধারনা নেই তাদের বলি ইন্দ্রিয়। আমরা চোখ দিয়ে দেখি, চোখ আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়। কান দিয়ে শুনি, কান আমাদের শ্রবনেন্দ্রিয় ইত্যাদি। আমরা কিন্তু চামড়া দিয়ে ঘ্রাণ নেয়া, কিংবা পাকস্থলি দিয়ে স্বাদ নেয়ার কথা ভাবিনা। ভাবার দরকারও পড়েনা। তবে আশ্চর্যের বিষয় এটাই, এক ইন্দ্রিয়ের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ অন্য অংগেও থাকে। আমরা তাদের ইচ্ছা করলেই ব্যবহা করতে পারিনা, কিন্ত তারা কাজ করে যাচ্ছে আমাদের অজান্তেই। এইরকম কয়েকটি ব্যাপার নিয়েই এই লেখাটি।

smell

ঘ্রানগ্রাহী ছড়িয়ে আছে সারা দেহে…

গন্ধ শুকে চলো…
আমরা নাক দিয়ে ঘ্রাণ নেই। ঘ্রাণ নিতে পারার ক্ষমতার সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন সংগ্রাহী(receptor)। এদের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে যেসব জিন জড়িত তার প্রথম বর্ণনা দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড অ্যাক্সেল এবং লিন্ডা বাক। তা প্রায় আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯১ সালে। স্বাভাবিক ভাবেই সে সময়ে ধারণ ছিলো এই ঘ্রাণজ সংগ্রাহী(olfactory receptor) শুধুমাত্র নাকের মধ্যে থাকে। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্যান্য বিভিন্ন টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী(Olfactory receptor) এর খোঁজ পাওয়া যেতে থাকে। উদাহরন হিসেবে বলা যায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রের কথা, তাতে ব্রাসেলস এর একটি ইউনিভার্সিটির গবেষকরা কুকুরের শুক্রাণুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। তবে তা শুধু তৈরি হয়েই বসে আছে, নাকি কোন কাজ করছে সেটা তখনো অজানা ছিলো।

এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে জার্মানির রাহর ইউনিভার্সিটির হ্যান্স হ্যাটস সিদ্ধান্ত নেন তিনি মানুষের শুক্রাণুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী আছে কি না তা দেখবেন। অনেক পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তিনি সফল হন এমনকি এটাও দেখতে পান ঘ্রাণ অণুর(smell molecule) উপস্থিতিতে এরা ঠিক নাকের মতই সক্রিয় হয়। তবে প্রথমদিকে অন্যান্য বিজ্ঞাণীদের এটা বিশ্বাস করানো বেশ কষ্টকর ছিলো যে নাক ছাড়াও অন্য টিস্যুতে ঘাণজ সংগ্রাহী থাকতে পারে। পরের দশকে হ্যাটসের দল এবং অন্যান্য অনেকে বিভিন্ন টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। যেমনঃ ফুসফুস, লিভার, চামড়া, হৃদপিন্ড ও অন্ত্র। এমনকি কিছু কিছু টিস্যুতে ঘ্রানজ সংগ্রাহী গুলোই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্রকাশিত জিন।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, বিভিন্ন টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলো কি করছে? সমস্যা হলো এদের কাজ বুঝতে হলে আগে বের করতে হবে কিসের মাধ্যমে এরা সক্রিয় হয়। মানুষের রয়েছ ৩৫০ ধরনের ঘ্রাণজ সংগ্রাহী, অন্যদিকে ইদুরে এর সংখ্যা প্রায় ১০০০। এখন পর্যন্ত গবেষকরা এদের মাত্র ১০-২০ শতাংশের জন্য সক্রিয়ক ঘ্রাণ অণু খুজে পেয়েছেন। হ্যাটস তার পরীক্ষায়, জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে মানুষের পরীক্ষামূলক কোষে বিকাশিত ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলোকে হাজার রকমের ঘ্রাণ অণুর সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। বেশিরভাগই বানিজ্যিক কৃত্রিম সুগন্ধী যেগুলো পারফিউম এবং কসমেটিক্স এ ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে তিনি একটা ঘ্রাণ অণু পেয়েছেন যেটা শুক্রাণুর ঘ্রাণজ সংগ্রাহী কে সক্রিয় করতে পারে। এই গন্ধ Lily of Valley ফুলের মত। দেখা গেছে শুক্রাণু এই গন্ধের দিকে সাঁতার কেটে যায় এবং মাত্রা বাড়ালে গতিও বাড়ে। হ্যাট অনুমান করেন, এই বৈশিষ্ট্য শুক্রাণুকে ডিম্বানুর দিকে ধাবিত হতে প্রভাবিত করে, তবে গবেষকরা এখনো এই অণুকল্প প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন এবং মানবদেহে এই সুগন্ধির প্রাকৃতিক প্রতিরূপ খুজে চলেছেন।

হ্যাটস এবং তার দল স্যান্ডালোর নামের আরেকটি কৃত্রিম সুগন্ধী পেয়েছেন যার প্রভাবে চামড়াতে যেসব ঘ্রানজ সংগ্রাহী রয়েছে সেগুলো সক্রিয় হয়। এদের সক্রিয়করণের ফলে ধারণকারী কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি এবং ক্ষত পূরনে নিযুক্ত হয়। এটার ক্ষেত্রেও মানবদেহে এর প্রাকৃতিক প্রতিরূপ এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।

অন্যান্য টিস্যুতে পাওয়া কিছু কিছু ঘ্রানজ সংগ্রাহীও প্রায় একই রকম কাজ করে। এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেস পাভলাথ গবেষনা করছিলেন কিভাবে একাধিক পেশীতন্তু একীভূত হয়ে বহুনিউক্রিয়াস সমৃদ্ধ কোষ তৈরি করে। সেসময় তিনি দেখতে পান পেশীতে একটি ঘ্রানজ সংগ্রাহী বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে যেটা হ্যাটস শুক্রাণুতে পেয়েছিলেন। গ্রেস বর্ণনা দেন এই সংগ্রাহীগুলোর কারনে পেশীতন্তুগুলো একটি বিশেষ ঘ্রাণের দিকে স্থানান্তরিত হয় এবং পুনর্যোজনে(regeneration) অংশ নেয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে , এই সংগ্রাহী ছাড়া ইদুরে পেশীতন্তুগুলো ক্ষয়প্রবন হয় এবং দূর্বল পুনর্যোজন দেখায়। এই গ্রাহকের সক্রিয়ক প্রাকৃতিক প্রতিরূপ খুজে পেলে পেশী পুনর্যোজনের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষকরা বিভিন্ন ঘ্রানজ সংগ্রাহীর জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরূপ পেয়ে গেছেন। যেমনঃ কিডনিতে Olfr78 নামক ঘ্রানজ সংগ্রাহী সক্রিয় হয় অন্ত্রে বসবাসরত ব্যাক্টেরিয়ার নিঃসৃত বিশেষ ধরনের ফ্যাটি এসিডের প্রভাবে। এই সংগ্রাহী নির্দিষ্ট কিছু শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিডের উপস্থিতিতে সক্রিয় হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্য সংকেত পাঠায়। অন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়াগুলো শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড তৈরি করে যখন তারা আঁশ জাতীয় খাবার হজম করে। তাই একসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে আঁশ জাতীয় খাবারের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠতে পারে।

হ্যান্স হ্যাটস তার গবেষনায় এমন কিছু ঘ্রাণ সংগ্রাহীও পেয়েছেন যেগুলো ক্যান্সার কোষে থাকে এবং তাদের সক্রিয় করার ফলে ক্যান্সার টিস্যুর সংকুচিত হয়ে যায়। যদিও সত্যিকারের ক্যান্সার থেরাপীতে এদের নিয়ে আসার জন্য আরো বহু গবেষনা প্রয়োজন। সুদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো সুগন্ধি মেখেই ক্যান্সার দূর করতে, কেটে যাওয়া ক্ষত পূরন কিংবা প্রজনন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হতে পারি। তবে আপাতত এই তথ্যগুলো পারফিউম কোম্পানিগুলো না জানলেই ভালো।

আলোয় উপশম…
আমাদের চোখে অনেক রকম আলোকসংবেদী কোষ থাকে। এরা হচ্ছে অপসিন, রোডপসিন, মেলানোপসিন। এদের আবিষ্কার কিন্তু ধাপে ধাপে হয়েছে। যেমন ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইগনাসিও প্রভেন্সিও স্তন্যপায়ী প্রাণীতে মেলানোপসিন খোজা শুরু করেন। তখন পর্যন্ত ধারনা ছিলো যে মেলানোপসিন সাধারনত উভচরের চোখে পাওয়া যায়, তাই সেসময় দৃষ্টি নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের দৃষ্টিতে ইগনাসিওর কাজ ছিলো নিতান্তই দূরদৃষ্টির অভাব। তবে ১০ বছর পর তিনি মানুষের রেটিনাতেও রড এবং কোন কোষে অপসিনের পাশাপাশি মেলানোপসিনের অস্তিত্বের প্রমাণ দেন। এর পর মানবদেহে মেলানোপসিনের কাজ সম্পর্কে ধীরে ধীরে জানা যায়। এটা ঘুম জাগরন চক্র, চোখের তারার সংকোচন, দক্ষতা অর্জন এমনকি বিপাকেও ভুমিকা রাখে।

melanopsin

রক্তনালীতে মেলানোপসিন

তবে রেটিনা ছাড়াও অন্যত্র যে মেলানোপসিন থাকতে পারে সেটা বের হয় চমৎকার একটা ঘটনার মাধ্যমে। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান বার্কোভিৎজ তার ল্যাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য স্বয়ংক্রিয় বাতি লাগান, যেগুলো মানুষের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠে। তার এক ছাত্র একদিন লক্ষ করলেন গবেষনার জন্য যে রক্তনালীতে ফোর্স ট্রান্সডিউসার লাগানো এবং সারাক্ষনই তথ্য দিতে থাকে, সেটাতে বাতি জ্বলে উঠলে রক্তচাপ কমে যায়! যদিও ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফটোরিলাক্সেশন ব্যপারটার অস্তিত্ব বিজ্ঞানীমহলে পরিচিত কিন্তু অন্তর্নিহিত রহস্যটা কারো জানা ছিলোনা। বার্কোভিৎজ এবং তার দল এরপরে অনুসন্ধান করে সেই রক্তনালীতে মেলানোপসিন প্রোটিন এবং তার সৃষ্টির জন্য দায়ী জিন Opn4 কে শনাক্ত করেন। নীল আলোর প্রভাবে মেলানোপসিনের উপস্থিতিতে রক্তনালী প্রসারিত হয় যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়। জেনে রাখা ভালো মেলানোপসিন নীল আলো সংবেদী এবং ঘুম জাগরনের সাথে জড়িত বলেই ঘুমানোর আগে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার নিষেধ করা হয়।

ইদুরের লেজকে নীল আলোয় আলোকিত করে দেখা যায় আসলেই তখন লেজের রক্তচাপ কমে যায়। কিন্তু ঘটনা হলো ইদুরের লেজের রক্তনালীগুলো চামড়ার কাছকাছি যার ফলে আলো প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ রক্তনালীই দেহের এত ভেতরে যেখানে কোনভাবেই আলো প্রবেশ করতে পারেনা। তাহলে সেখানে এই আলোকীয় সংগ্রাহী কিভাবে কাজ করতে পারে? বার্কোভিৎজ বলেন, এটা হতে পারে বিবর্তনের পদচিহ্ন কিংবা আলো ছাড়াও দেহে এমন কিছু আছে যেটা এদের সক্রিয় করতে পারে অথবা কোন অজানা পদ্ধতিতে দেহের ভেতরেই নীল আলো তৈরি হয় হয়তো! যা আমরা জানিনা।

এর সত্যিকার কাজ সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও বার্কোভিৎজ চেষ্টা করছেন এমন কোন বুদ্ধি বের করতে যাতে রক্তচাপ জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের চিকিৎসায় এই মেলানোপসিন সংক্রান্ত ফটোরিলাক্সেশনকে কাজে লাগানো যায়। রেনড’স ডিজিজ এ আক্রান্ত ব্যাক্তিদের ঠান্ডার প্রভাবে হাত ও পায়ের আঙ্গুলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে এবং তারা অবশ কিংবা ব্যাথা অনুভব করেন। তারা এমন মোজা পড়তে পারেন যা তাদের আঙ্গুল নীল আলোয় আলোকিত করে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে আনবে ও ব্যাথার উপশম ঘটাবে। নবজাতক শিশুরা যারা পালমোনারি হাইপারটেনশনে ভুগে তাদের ক্ষেত্রেও আলোকীয় চিকিৎসা কাজে লাগতে পারে। রক্তচাপজনিত রোগগুলোতে বর্তমানে যেসব ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো হয় তাতে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই আলো হতে পারে এসব ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ বিকল্প। তবে তার জন্য আমাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা আগে থেকেই বলা যাচ্ছেনা।

স্বাদেই নিস্তার…
আমরা খাওয়ার সময় যে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নেই, সেই স্বাদ নেওয়ার কাজটি করে থাকে বিভিন্ন স্বাদ সংগ্রাহী। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন এইবার বলবো এরা মুখ ছাড়াও দেহের অন্য কোথায় কোথায় আছে । তারা পেটের ভেতরে আছে, শুক্রানুতে আছে, শুক্রাশয়ে আছে, চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে দেহের ভেতর এদের কাজটা বের করা। কিছু কিছু কাজ জানা গেছে, যেমন পেটের ভেতরে যেসব স্বাদ সংগ্রাহী আছে তারা খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করে। আবার কিছু কিছু কাজ অর্ধেক জানা গেছে, যেমন ইদুরের শুক্রাশয়ে যেসব স্বাদ গ্রাহক আছে তাদের নিষ্ক্রিয় করে দিলে ইদুরগুলো আর প্রজননক্ষম থাকেনা। কেন এমন হয়? তার উত্তর জানা নাই।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিঙ্গার শুরুর দিকে মাছে এক ধরনের সংবেদনশীল কোষ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন যার জৈবরাসায়নিক এবং গাঠনিক দিক থেকে আমাদের স্বাদ কোড়কের সাথে মিল আছে। তিনি এর নাম দেন নিঃসংগ রাসায়নিক সংবেদী কোষ(solitary chemosensory cell)। ২০০৩ সালে তিনি দেখতে পান একই ধরনের কোষ স্তন্যপায়ীদের নাকেও রয়েছে। । তবে আমাদের চিন্তা এর নিঃসংগতা নিয়ে নয়। জেনে রাখা ভালো আমরা যে টক, ঝাল, মিষ্টি বিভিন্ন স্বাদ গ্রহন করি তার জন্য আলাদা আলাদা স্বাদ সংগ্রাহী আছে। ২০০৩ সালে ফিংগার ইদুরের শ্বাসনালীর উপরের দিকে অবস্থিত নিঃসংগ রাসায়নিক সংবেদী কোষের মধ্যে তিতা স্বাদ সংগ্রাহী শনাক্ত করেন যেগুলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাক্টেরিয়া নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিকের প্রভাবে সক্রিয় হয় এবং অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া(Immune Response) শুরু করে।

taste

নিঃসংগ রাসায়নিক সংবেদী কোষের মধ্যে তিতা স্বাদ সংগ্রাহীগুলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাক্টেরিয়া নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিকের প্রভাবে সক্রিয় হয় এবং অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু করে।

ইদুরে সাফল্যের পর স্বাভাবিক ভাবেই পরবর্তিতে ফিংগার মানুষের উচ্চতর শ্বাসনালীর নিঃসংগ রাসায়নিক সংবেদী কোষেও তিতা স্বাদ সংগ্রাহী খুঁজে পান এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াম কোহেন শনাক্ত করেন মিষ্টি স্বাদ গ্রাহক। ধারনা করা হয় এরা একই সাথে কাজ করে আমাদের অনাক্রম্যতাতে(Immunity) ভূমিকা রাখে। গ্লুকোজ কিংবা সুক্রোজের মাধ্যমে মিষ্টি স্বাদ সংগ্রাহী সক্রিয় হলে একই কোষের তিতা স্বাদ সংগ্রাহী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কোহেন দেখেন যে স্বাভাবিক স্বল্প মাত্রার গ্লুকোজই তিতা স্বাদ সংগ্রাহীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। তখন আর অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু হয়না, অনুজীব প্রতিরোধী পেপটাইডের নিঃসরনও বন্ধ থাকে। শ্বাসনালীতে ব্যাক্টেরিয়া প্রধানত গ্লুকোজ খেয়ে বেঁচে থাকে। ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে গ্লুকোজ কমতে কমতে একসময় তিতা স্বাদ গ্রাহক মুক্ত হয়ে গেলে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। সাইনুসাইটিস কিংবা ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের স্বাসনালীতে গ্লুকোজের পরিমান বেশি থাকায় তারা প্রায়ই এ ধরনের সংক্রমনের শিকার হন যা সহজে সাড়েনা।

নিঃসংগ রাসায়নিক সংবেদী কোষ ছাড়াও আরেক জায়গায় তিতা সংগ্রাহী পাওয়া যায়। উচ্চতর শ্বাসতন্ত্রে চুলের ন্যায় এক ধরনের কোষ থাকে যাদের সিলিয়া বলে এরা ব্যাক্টেরিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জিনিস যুক্ত মিউকাস বাহিরে বের করে দেয়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা দল সিলিয়াতেও তিতা স্বাদ গ্রাহকের অস্তিত্ব পেয়েছেন যেগুলো ব্যাক্টেরিয়ার খোঁজ পেলে অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারে। এই অবস্থায় মিউকাস বের করে দেয়ার গতিও বাড়ে। কোহেন একটি বিশেষ তিতা স্বাদ সংগ্রাহী T2R38 নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। ধারনা করা হয় এই সংগ্রাহীর উপস্থিতিই কিছু কিছু মানুষকে সুপার-টেস্টার বানিয়ে দেয়। এরা অতি অল্প মাত্রায় তিতা পদার্থের উপস্থিতিও সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারেন। মজার বিষয় হলো এদের সিলিয়াও অতি সামান্য ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থিতিও ধরে ফেলে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয় যার ফলে ওনারা ভাগ্যবান যে খুব কমই গ্রাম নেগেটিভ ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমনের শিকার হতে হয়।

কোহেন বলেন কোন, ব্যাক্তিতে নিরাপদ তিতা পদার্থের স্বাদ গ্রহন করতে দিয়ে বলতে পারি তিনি কতটা তিতা অনুভব করছেন। এই তথ্য থেকে খুব সহজেই বলা সম্ভব হতে পারে তিনি কতটা সংবেদনশীল। যে বেশি তিতা অনুভব করবেন, তার অনাক্রম্যতা এই ক্ষেত্রে তত শক্তিশালী। অদূর ভবিষ্যতে এটা এমনও হতে পারে তিক্ততার মাত্রা যাচাই এর মাধ্যমে আক্রমনকারী অনুজীবের পরিচয় জানা যাবে। নাকের মধ্যে তিতা কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে অনাক্রম্যতাকে উত্তেজিত করে চিকিৎসাও সম্ভব হতে পারে।

শ্বাসনালী ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে পেটের ভেতরে স্বাদ সংগ্রাহী পাওয়া গেছে। এরাও অনাক্রম্যতাতে ভুমিকা রাখতে পারে। অন্ত্রের টাফট কোষে স্বাদ সংগ্রাহী থাকে, ধারনা করা হতো এদের কাজ হয়তো খাদ্যের সাথে কোন বিক্রিয়া করা। কিন্তু ফিংগারের কাজ দেখে অনুপ্রানিত হয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল হাওইট গবেষনা শুরু করেন এবং হ্যা শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন ইদুরের অন্ত্রে এই টাফট কোষের স্বাদ গ্রাহগুলো এককোষি এবং গোলকৃমির উপস্থিতিতে সক্রিয় হয়ে অনাক্রম্য ব্যবস্থাকে জানান দেয়। যথাযথ কার্যপ্রক্রিয়া এখনো অজানা। তবে তিনি দেখেছেন সঠিক সংকেত অণুর অভাবে অনাক্রম্য ব্যবস্থা সক্রিয় হয়না, এবং পরজীবিটিকে খুঁজে তার থেকে পরিত্রান পেতে অনেক কষ্ট করতে হয়। কিন্তু সংকেত অণু যখন স্বাদ সংগ্রাহীকে নাড়া দেয় তখন কাজটা সহজ হয়ে যায়।

পরিশেষে অনুসন্ধ্যিৎসু মনে অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়েই লেখাটি শেষ করতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ প্রশ্ন করতে পেরেছিলো বলেই এতদূর আসতে পেরেছে। প্রচলিত গন্ডির বাইরে এসে কেউ কেউ ভাবতে পেরেছে বলেই আমরা জানতে পেরেছি এমনকি আমাদের দেহের ভেতরেও গন্ডির বাইরে কত ঘটনা ঘটে। অনেক কিছুই এখনো অজানা, কিভাবে এরা সক্রিয় হয়, কি কাজ করে। কিন্তু পরীক্ষাগারে এদের নিয়ে কাজ হচ্ছে, দিগন্তে উকি দিচ্ছে আরো চমকপ্রদ চিকিৎসা প্রযুক্তি। আমরা যদি সভ্য থাকি, বিজ্ঞান আমাদের সুন্দর একটা ভবিষ্যত উপহার দেবে, ভাবতে দোষ কি?

তথ্যসূত্রঃ
Senses in unlikely places, Sandeep Ravindran, The Scientist, September, 2016

লিখেছেন রুহশান আহমেদ

আমি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক কনটেন্ট তৈরির একজন স্বাধীন স্বেচ্ছাসেবক। শাবিপ্রবি থেকে জিন প্রকৌশল ও জৈব প্রযুক্তি বিষয়ে একটি স্নাতক ডিগ্রি বাগানোর চেষ্টায় আছি।

রুহশান আহমেদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 33 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    মজাদার বিষয়। ইন্দ্রিয়ের সাথে সচেতনতার একটা সম্পর্ক আছে, ইন্দ্রিয় আমাদের সচেতনতার জন্য দরকার। দেহের অন্যান্য অঙ্গে যেসব অনুরূপ রিসেপ্টর আছে, সেগুলো সচেনতনতা তৈরি করে না। সে হিসেবে এদেরকে ইন্দ্রিয়ও বলা যায় না। অবশ্য সংজ্ঞার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
    দারুণ লেখা, দারুণ ভাষা। বানান ভুল বেশ চোখে পড়লো, এ ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা আশা করছি।

আপনার মতামত