আমরা যখন স্কুলে ভর্তি হই, অঙ্ক করা শিখি, ছোট ছোট যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগে অভ্যস্ত হই, তখন শিক্ষকেরা বড় বড় সংখ্যার যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ করা শেখান। এরপর আসে সরল। সরল সমাধানে অভ্যস্ত হতে না হতেই আসে ঐকিক নিয়ম। এভাবে গণিত কঠিন থেকে ক্রমে কঠিনতর হতেই থাকে। গণিতের নতুন পদ্ধতি আয়ত্ত করার সময় দেখা যায় কেউ কেউ খুব সহজেই নিয়ম শিখে ফেলেছে। অন্য অনেকে যখন বারবার একই ভুল করছে, তখন তারা অনায়সেই নতুন পদ্ধতি আয়ত্ত করে ফেলেছে। শুধু স্কুলে অঙ্ক করার সময় নয়, যে কোন কিছু শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশের তুলনামূলক দ্রুতি বা ধীরগতি চোখে পড়ে। দেখা যায় ক্রিকেট খেলার সময় কেউ সহজেই ব্যাট পরিচালনা করা শিখে ফেলছে, কেউ বা বাদ্যযন্ত্র থেকে সুর বের করে ফেলছে বিনা পরিশ্রমে, কেউ হয়তো প্রোগ্রামিংয়ের মূলনীতিগুলো ধরে ফেলছে তড়িৎ-গতিতে। কিন্তু যে ছেলে বা মেয়ে খুব দ্রুত শিখে ফেলছে, সে কি পরবর্তী জীবনেও সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করবে?

শিক্ষানবিশদের শেখার ক্ষেত্রে এ পার্থক্য লক্ষ্য করে আমরা অবধারিতভাবে ধরে নেই শেখার পরবর্তী ধাপেও এই পার্থক্য বজায় থাকবে। যে ছেলেটা বা মেয়েটা শিক্ষানবিশ অবস্থায় চমৎকার শিখছে, আমরা ধরে নেই পরবর্তী উচ্চতর স্তরেও এ ধারা অব্যাহত রাখবে। এটা অনেকটা সকাল দেখে বলে দেয়ার মতো দিনটা কেমন যাবে। কিন্তু ভবিষ্যদ্বানী তো ব্যর্থও হতে পারে! আসলে শিক্ষানবিশ থেকে সুনিপুণ, অভিজ্ঞ কিংবা পারদর্শী হওয়ার যাত্রা সরলরৈখিক নয়। শেখার একেক পর্যায়ে একই মানুষের গতি ভিন্ন হতে পারে। মনোবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে একটা নির্দিষ্ট সীমার পর উচ্চ বুদ্ধিমত্তা সাফল্য অর্জনে তেমন একটা সাহায্য করে না।

 

বুদ্ধিমান টারমাইটস
গত শতাব্দীর শুরুর দিকে ধারণা ছিল যে শিশুরা ছোটবেলাতে বেশি পড়াশুনা করলে অকালপক্ব হয়। ছোটবেলাতেই বেশি বুঝে ফেলার ফলে তারা প্রাপ্তবয়সে খুব দ্রুত ঝরে পড়ে। পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় তারা আর ভালো করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক লুইস টারমান এটা মানতেন না। ১৯২১ সালে তিনি একটি গবেষণা শুরু করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাথমিক স্তরের অনেকগুলো বিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রদের বাছাই করা হলো তাঁর গবেষণার জন্য। আইকিউয়ের ভিত্তিতে তাদের মধ্য থেকে সেরা ১০-শতাংশ বাছাই করা হলো। আবার তাদের বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা করা হলো। যাদের আইকিউ ১৩০-এর ওপরে, তাদের নিয়ে পুনরায় আরেকটা পরীক্ষা করা হলো। এভাবে টারমান আড়াই লাখ স্কুলছাত্র থেকে প্রায় দেড় হাজার (১,৪৭০ জন) শিক্ষার্থী নির্বাচিত করলেন। এরা ছিল সেরাদের সেরা। এদের আইকিউ ছিল ১৪০ থেকে ২০০ পর্যন্ত! এই শিশু-প্রতিভাদের নাম দেওয়া হলো টারমাইটস।

লুইস টারমান সারা জীবন এই টারমাইটদের অনুসরণ করে গেছেন। এদের বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা করা হতো, মাপা হতো, বিশ্লেষণ করা হতো। তাদের শিক্ষাগত অর্জন, বিয়ে, অসুস্থতা, মানসিক স্বাস্থ্য আর যাবতীয় পদোন্নতি কিংবা চাকরির পরিবর্তন নথিবদ্ধ করা হতো। টারমাইটরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টারমান এদের ওপর করা বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা শুরু করলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার শীর্ষতালিকায় প্রায়ই টারমাইটদের নাম খুঁজে পাওয়া যেত। টারমান মনে করতেন, টারমাইটরাই হবে আমেরিকার ভবিষ্যৎ অভিজাত। ধরা হতো টারমাইটসদের (অন্য কথায় উচ্চবুদ্ধিসম্পন্নদের) সাফল্য সুনিশ্চিত। কিন্তু আসলেই কি তাই হলো?

টারমাইটরা পূর্ণ বয়সে পৌঁছানোর পর লুইস টারমানের ভাবী কথনে ভুল বের হতে শুরু করল। কোন কোন টারমাইটস বই-লেখক ও গবেষক হলেন। কেউ হলেন ভালো ব্যবসায়ী। অনেকেই সরকারি চাকরি করতেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ভালো বিচারক ছিলেন। কিন্তু এই প্রতিভাধরদের মধ্যে খুব অল্প কয়েকজন জাতীয় ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলেন। টারমাইটদের উপার্জন গড়পড়তা ভালোই ছিল; কিন্তু অত ভালো না! এই টারমাইটদের মধ্যে কেউ নোবেল পুরস্কার পান নি। বরং টারমানের শিশুপ্রতিভা নির্বাচন প্রক্রিয়াতে দু’জন নোবেলজয়ী বাদ পড়ে গিয়েছিলেন! পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত উইলিয়াম শোকলে এবং লুইস অ্যালভারেজের আইকিউ টারমাইটদের দলভুক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট বেশি ছিল না।

 

Lewis Madison Terman.jpg

আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী লুইস টারম্যান, যিনি Genetic Studies of Genius-শীর্ষক কাজের জন্য বিখ্যাত।

 

লুইস টারমানের ভুল
টারমাইটস গবেষণার অদ্ভূত ফলাফলের ব্যখ্যা পাওয়া যায় সাম্প্রতিক একটি গবেষণা থেকে। ২০০৬ সালে তিন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মেরিম বাইলালিক, পিটার ম্যাকলিয়ড ও ফারন্যান্ড গবেট একটি উল্লেখযোগ্য পরীক্ষা করেন। তাঁরা ৫৭-জন তরুণ দাবা শিক্ষানবিশ নিয়ে এ গবেষণাটা করেন। এই দলটি ছিল ৯ থেকে ১৩ বছর বয়স্ক স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে। এদের একেকজন গড়ে ৪ বছর ধরে দাবা খেলার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই খেলায় খুব কুশলী ছিল। আবার অনেকেই ছিল যাদের দক্ষতা উল্লেখযোগ্য নয়। এ গবেষণার লক্ষ্য ছিল কেউ দাবা খেলায় দক্ষ হয়ে উঠবে কি না তার উপর বুদ্ধিমত্তার প্রভাব অনুসন্ধান।

গবেষকরা এই ৫৭-জন শিক্ষানবিশ দাবারুর আইকিউ সহ ধীশক্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন দক্ষতা মাপেন। তারা দলটিকে ছয় মাস ধরে ডাইরি রাখতে বলেন। এ ডাইরিতে দৈনিক অনুশীলন সময় লিপিবদ্ধ করবেন শিক্ষানবিশরা। আর এদের দাবার দক্ষতা মাপার জন্য গবেষকরা তাদের বিভিন্ন দাবার-ধাঁধা সমাধান করতে দিতেন।

এ গবেষণার যাবতীয় উপাত্ত হাতে আসার পর দেখা গেলো ভালো দাবা খেলার জন্য সবচেয়ে বড় প্রভাব রেখেছে দাবারুর অনুশীলনের পেছনে ব্যয় করা সময়। বুদ্ধিমত্তা বড় ভুমিকা না রাখলেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব লক্ষ্যণীয়। উচ্চতর আইকিউর সাথে দাবা খেলায় ভালো দক্ষতার সম্পর্ক বোধগম্য। এ ফলাফল থেকে গবেষকরা উপসংহার টানেন যে দাবা খেলায় দক্ষতার ক্ষেত্রে অনুশীলনের পেছনে দেয়া সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর সাথে সাথে বুদ্ধিমত্তাও একটি ভূমিকা রাখে।

তবে এ চিত্রটি আমূল বদলে যায় যখন গবেষকরা এ দলের মধ্যকার ২৩-জনের উপর পরীক্ষাটি করেন। এই উপদলটি ছিলো সেরাদেরও সেরা। এই সেরা-দাবারু দলটির গড় রেটিং ছিলো ১৫০০। তারা প্রায়ই বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতো। এদের ক্ষেত্রেও দেখা গেল অনুশীলনের পেছনে দেয়া সময় সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে বুদ্ধিমত্তার কোন ভূমিকাই নেই। বরং এই সেরা-দলটির মধ্যেও যারা তুলনামূলক ভালো খেলে তাদের আইকিউ দলের অন্যান্যদের তুলনায় কিছুটা কম!

বিষয়টা হজম করার জন্য কিছু সময় নেয়া যাক। এই সেরা-উপদলটির মধ্যে উচ্চ আইকিউ কোন বিশেষ সুবিধা না, বরং কিঞ্চিত অসুবিধাই বটে। গবেষকরা কারণ খুঁজে বললেন, সেরা দাবারু যাদের আইকিউ কম তাদের মধ্যে অনুশীলন করার ঝোঁকটা বেশি। যে কারণে তারা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছেন যে বেশি-আইকিউ সম্পন্ন সেরা-দাবারুদের চেয়েও তারা ভালো করছেন।

এই ফলাফল আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দাবা নয় বরং যে কোন দক্ষতার ক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তার চেয়ে অনুশীলন দরকারী। উচ্চ বুদ্ধিমত্তা শেখার ক্ষেত্রে শুরুর দিকে এগিয়ে রাখে। তবে এ সুবিধা শেখার একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত কাজ করে। বিশেষ করে নিয়ম শেখা ও স্মরণ করা পর্যন্ত। উচ্চ-বুদ্ধিমত্তা বিভিন্ন নিয়ম-কানুনের মধ্যকার সম্পর্ক সাজাতে ও পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে। কিন্তু এক পর্যায়ে অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুশীলনের মাধ্যমে বিভিন্ন নিয়ম ও এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্কের বিভিন্ন জটিল ধাঁচ এমনভাবে পরিচিত হয়ে যায় যে আর সচেতনভাবে চিন্তা করতে হয় না। অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অনুশীলনকারী যে কোন সমস্যার সামাধানে কোন পথে হাঁটতে হবে সেই অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে। বুদ্ধিদীপ্তভাবে বিভিন্ন উপাত্ত ও নিয়মের মধ্যকার অান্তঃসম্পর্ক খুঁজে বের করার চেয়ে এই অন্তঃদৃষ্টি নিমিষেই কাজ করতে পারে। তখন অনুশীলনকারী আর শিক্ষানবীশ থাকেন না, হয়ে পড়েন সেরাদের সেরা। এ জন্যই হয়তো ইংরেজীতে বলা হয়, when talent doesn’t work, hard work beats talent!

তথ্যসূত্র:
1. Outliers by Malcolm Gladwell
2. Peak by Anders Ericsson

 

[লেখাটাি অসীম বুদ্ধিমত্তা কতটুকু প্রয়োজন? শিরোনামে বিজ্ঞান চিন্তায় প্রকাশিত]

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 67 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত