রিচার্ড ফিলিপ্‌স ফাইনম্যান, বিংশ শতাব্দীর একজন অন্যতম তাত্ত্বিক পদার্থবিদ। নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানী কোয়ান্টাম বলবিদ্যার উন্নয়নে রেখেছেন অসামান্য ভূমিকা। অসাধারণ ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। তাঁকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘The Great Explainer’ হিসেবে। তাঁর একটা বিশেষ গুণ ছিল, খুবই জটিল তাত্ত্বিক বিষয়কে সহজে বোঝাতে পারতেন, সহজে অনুভব করানোর জন্য বের করতেন চমৎকার বিভিন্ন টেকনিক। অতিপারমাণবিক কণার আচরণ এবং মিথস্ক্রিয়ার জটিল গাণিতিক সমীকরণকে খুব সহজে প্রকাশ করার একটি চিত্রিত পদ্ধতি বের করেন তিনি। নাম দেওয়া হয় ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম। কণা পদার্থবিদ্যায় খুব কম জিনিসই আছে যা ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের মত নামকরা এবং জনপ্রিয়। কণা পদার্থবিদদের চকবোর্ডে জটিল হিজিবিজি সব সমীকরণগুলোর পাশে ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম নামের এই ছোট আঁকাবাঁকা রেখাচিত্রগুলো হরহামেশাই দেখা দেয়।

আচ্ছা, পাঠকদের মধ্যে আপনারা যারা উচ্চ মাধ্যমিকে আছেন তারা কি কোন ধরনের ডায়াগ্রাম পাঠ্যবইতে দেখেছেন ? খেয়াল করে দেখুন তো ! এ লেখার শেষের দিকে আশা করি সেটা খেয়াল করতে পারবেন।

দেখতে সোজাসাপ্টা এবং নান্দনিক এসব ডায়াগ্রামের প্রতি বিশেষ কৌতূহল এবং আকর্ষণ থাকা বেশ স্বাভাবিক। কিন্তু এসব চিত্রের পেছনে থাকা অতি উচু পর্যায়ের জটিল গাণিতিক এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের কথা চিন্তা করে এর প্রতি আমাদের আগ্রহ কিছুটা দমে যায়। জেনে খুশি হবেন ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের মূল ধারণাটি আসলেই বেশ সহজ। এর বেসিক আইডিয়াটি বুঝে নিয়ে আপনি খুব সহজে নিজেই আপনার ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম আঁকতে পারবেন এবং তার ভৌত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

শুনে অবাক হতে পারেন, এটার বেসিক শিখতে আপনার মাথা আওলে দেওয়া জটিল কঠিন কোন গণিত বা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা জানার দরকার হবে না!

এটাই সত্যি। পাঠকদের মধ্যে আপনারা যাঁরা বিজ্ঞানপ্রেমী কিন্তু গণিত-তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যাকে কিছুটা এড়িয়ে যান, ভয় পান; তাঁদেরকে আশ্বস্ত করছি, আজকের এ লেখায় কোন রকম সমীকরণ থাকবে না। শুধু থাকবে নিরীহ গোছের কিছু আঁকাবাঁকা রেখা। তাই স্কুলপড়ুয়ারাও খেলাচ্ছলে ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম আঁকা শিখে ফেলতে পারবে আশা করি, আর সেই সাথে শিখতে পারবে কিছু মজার বিজ্ঞান। কণা-পদার্থবিজ্ঞানের মজা সবার জন্যই উন্মুক্ত!

চলুন, দেরি না করে খেলাচ্ছলেই শেখা শুরু করি। সাথে একটা কাগজ, কলম/পেন্সিল রাখলে ভাল হয়। নিয়মগুলো পড়ে নিন একটু ধৈর্য আর মনোযোগের সাথেঃ

১। আপনি দুরকম রেখা আঁকতে পারেন। তীর-চিহ্নসহ সরলরেখা আর ঢেউয়ের মত বক্ররেখা।

আপনি ইচ্ছামত এর দিকনির্দেশ করতে পারেন।

২। আপনি এই রকমের রেখাকে যুক্ত করতে পারেন যদি আপনার কাছে দুইটা সরলরেখা এবং একটা বক্ররেখ থাকে। বক্ররেখাকে যুক্ত করতে পারবেন তীরচিহ্ন সহ সরলরেখা দুটির শীর্ষ বা মিলনবিন্দুতে।

তবে খেয়াল রাখবেন, সরলরেখা দুটির তীরচিহ্নের দিকবিন্যাস কিন্তু এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে অবশ্যই একটা তীর চিহ্নকে আঁকতে হবে মিলনবিন্দুর দিকে (অন্তঃমুখী) এবং অপরটিকে উল্টোদিকে মানে মিলনবিন্দুর বিপরীত দিকে (বহিঃমুখী)।

৩। আপনার ডায়াগ্রামের প্রতিটি অংশকে সংযুক্ত রাখতে হবে। মানে প্রত্যেকটা রেখাই কোন না কোন মিলনবিন্দুর সাথে যুক্ত থাকতে হবে। ডায়াগ্রামে কোন বিচ্ছিন্ন অংশ রাখা চলবে না।

দেখুন, বামের ডায়াগ্রামটি গ্রহণযোগ্য, কিন্তু ডানেরটি ঠিক নয় কারণ এর উপর আর নিচের অংশ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন।

৪। ডায়াগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল প্রতিটি রেখার শেষবিন্দু, তাই উচিত হবে বাহুল্যদোষ মুক্ত রাখা, অতিরিক্ত বক্রতা না এঁকে যতটা সম্ভব সহজ ও সংক্ষিপ্ত রাখাই শ্রেয়। এই নিয়মটা অনেকটা ইলেক্ট্রিক সার্কিট আঁকার মত। আরেকটু সুহজ ভাষায় বলি – আপনি প্রত্যেকটা রেখাকে সূতা বা জুতার ফিতা ভাবতে পারেন। প্রতিটিকে টান টান করে ধরুন যেন দেখতে সুন্দর, পরিছন্ন লাগে। অর্থাৎপ্রত্যেকটাকে যতটা সম্ভব সোজা রাখা উচিত। তবে বক্ররেখাকে কিন্তু বক্র রাখতে হবে, এদেরকেও সোজা রাখবেন কিন্তু যেন টেনে টেনে সরলরেখা বানিয়ে ফেলবেন না !

এই তো, শেষ! খেলার নিয়ম মাত্র এই কয়টাই। আপনার আঁকা যেকোন ডায়াগ্রাম যদি এই নিয়মগুললোর সাথে খাপ খায়, তাহলে বলতে পারবেন সেটা একটা অর্থপূর্ণ এবং বৈধ ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম। আমরা এই খেলাটিকে ডাকব QED নামে। এখন এ লেখার পরবর্তী অংশ পড়ার আগে একটু বিরতি নিন এবং নিয়মগুলো মেনে নিজের ইচ্ছামত মাথা খাটিয়ে বেশ কিছু ডায়াগ্রাম আঁকুন। আর আঁকার সময় অল্প কিছু সাধারণ ত্রুটির ব্যাপারে সতর্ক থাকুন যেগুলোর কারণে ডায়াগ্রাম কাজ করে না। (দেখে বুঝতে পারছেন কেন?)

বেশ কিছু ডায়াগ্রাম আঁকাআঁকি করলে আপনি কিছু প্যাটার্ন টের পাবেন। যেমন ধরুনঃ আপনি ডায়াগ্রামের বহিঃস্থ রেখাগুলোর (একপ্রান্ত মুক্ত) এবং অন্তঃস্থ রেখাগুলোর (দুই প্রান্তই বদ্ধ, শীর্ষে যুক্ত) সংখ্যা গণনা করে দেখেন। কী? কিছু পেলেন?

এই সংখ্যাগুলোর মাঝে কি কোন সংযোগ আছে? বহিঃস্থ রেখাগুলোর সংখ্যা কিভাবে অন্তঃস্থ রেখাগুলোর সংখ্যা এবং এদের শীর্ষবিন্দুগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত?

আমি যদি আপনাকে কোন ডায়াগ্রামের অন্তঃমুখী তীরচিহ্ন-ওয়ালা বহিঃস্থ রেখার সংখ্যা বলে দেই, আপনি কি আমাকে ওই ডায়াগ্রামের বহিঃমুখী তীরচিহ্ন-ওয়ালা বহিঃস্থ রেখার সংখ্যা হিসাব করে বলতে পারবেন?

আপনি যদি তীরচিহ্নের রেখা বরাবর চলতে থাকেন, তাহলে মাঝে কোন মিলনবিন্দু বা ছেদবিন্দুতে কি পথ শেষ হবার সম্ভাবনা আছে?

আপনি কি এমন কোন ডায়াগ্রামের কথা ভেবেছেন যেটাতে বদ্ধ লুপ আছে? যদি না ভেবে থাকেন তবে ভাবুন, এক্ষেত্রে আগের প্রশ্নগুলোতে আপনার উত্তর কি পরিবর্তন হবে?

একটু বিরতি নিন। আর সময় নিয়ে ডায়াগ্রাম আঁকার চমৎকার QED খেলাটা উপভোগ করুন। হয়তো নিজেই অনেক কিছু বুঝে ফেলতে পারেন। কিছুক্ষণ পর যদি আবিষ্কার করেন আপনার খালি কাগজটা নিরীহ ডায়াগ্রামেরা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে, তাহলে বুঝবেন আপনি এ লেখার পরবর্তী অংশে যাবার জন্য প্রস্তুত।

এসব ডায়াগ্রামের মানে কী? কী হবে এসব দিয়ে?

চলুন একটু পদার্থবিদ্যা ঘেটে নেই। নিয়ম ১ এর প্রতিটি রেখা হচ্ছে কণিকা (particle) আর নিয়ম ২ তে বলা মিলনবিন্দুগুলো হল বিক্রিয়া বা মিথস্ক্রিয়া (interaction)। মূলত এনিয়মগুলো হল বিভিন্ন অতিপারমাণবিক কণা ও তাদের মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যাকারী তত্ত্ব চিত্রায়নের শর্ত। আর এই তত্ত্ব হল QED, পুরো নাম Quantum Electrodynamics। তীরওয়ালা সরল রেখা দিয়ে বোঝায় ভরবাহী বা বস্তু কণা (ফার্মিওন) আর বক্ররেখা হল বলবাহী বা ক্ষেত্র কণা (বোসন)। যদি দেখেন বোসন কণা তড়িতচুম্বকীয় বল বহন করছে, বা তড়িতচুম্বকীয় মিথস্ক্রিয়ায় প্রভাব রাখছে তাহলে বুঝবেন এটা আপনার আমার অতি আপন, পরিচিত বোসন, যাকে আমরা বলি ফোটন। আচ্ছা আমরা কেন ফার্মিওনদের তীর চিহ্ন দিচ্ছি, কিন্তু বোসন দের না। কারণ এদের নিদির্ষ্ট কোন দিক নেই; গতি সময় প্রবাহের দিকে বা বিপরীতে সব দিকেই হতে পারে।

একগুচ্ছ কণা কিভাবে মিথস্ক্রিয়া করে, ডায়াগ্রাম আমাদেরকে সেই গল্প বলে। ডায়াগ্রামকে পড়তে হয় বাম থেকে ডান দিকে। তাই ডায়াগ্রামে কোন উপর-নিচ গামী রেখা থাকলে তাদেরকে সুবিধামত কিছুটা সরিয়ে দেখাতে পারেন। যেমন ধরুন যে রেখাটির দিক ডান দিকের সাথে তীর্যকভবে আছে, সেটাকে ডান দিক বরাবর সম্পূর্ণ আনুভূমিক করেও আঁকতে পারেন। ডান থেকে বামে পড়ার নিয়মটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ ডায়াগ্রাম সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি, ব্যাখ্যা সব এটার উপর নির্ভর করে।

বাম থেকে ডানদিকগামী কণাটি যদি ইলেক্ট্রন হয়, তবে ডান থেকে বামদিকগামী কণাটি হল পজিট্রন (ইলেক্ট্রনের প্রতিকণা)। আসলে আপনি তীরচিহ্নকে ইলেক্ট্রিক চার্জ প্রবাহের দিক হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। তাহলে এর সারাংশ আঁকা যায় এমনঃ

(\(e^+\) হল পজিট্রন, \(e^-\) ইলেক্ট্রন আর \(\gamma\) হল ফোটন, গামা রশ্মি বলতে পারেন।)

এটা থেকে আমরা আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল করতে পারিঃ

লক্ষ্য করুন, ফোটনের সাথে এই মিথস্ক্রিয়াটি কিন্তু ইলেক্ট্রিক চার্জের সংরক্ষণশীলতার নীতির কথা বলছেঃ ডানদিকে চলা প্রত্যেক রেখার বিপরীতে অবশ্যই বামদিকে চলা রেখা থাকবে। আরেকভাবে বলতে পারেন প্রতিটি ঋণাত্বক চার্জের বিপরীতে থাকবে ধনাত্বক চার্জ।

এখানেই শেষ নয়। আমরা যদি এই মিথস্ক্রিয়াটা একটু ঘুরিয়া আঁকি তাহলে কিন্তু একটা ভিন্ন গল্প বলবে। কারণ তো আগের বলেছি, ডায়াগ্রাম পড়ার নিয়ম হল বা থেকে ডানে। এই চারটি উদাহরণ দেখুন, অবাক হবেন – একটি মাত্র মিথস্ক্রিয়াকে কত রকমভাবে ব্যাখ্যা করা যায়! (সবগুলোকে পড়বেন বাম থেকে ডানে)

সহজ ভাষায় এগুলোর ব্যাখ্যা দাঁড়ায় এমনঃ

১। একটা ইলেক্ট্রন ফোটন নির্গত করল এবং চলতে থাকল

২। একটা পজিট্রন ফোটন শোষণ করল এবং চলতে থাকল

৩। একটা ইলেক্ট্রন ও পজিট্রন পরস্পরকে ধ্বংস করে ফোটনে পরিণত হল। (annihilation, ভর থেকে শক্তি)

৪। ফোটন থেকে একটি ইলেক্ট্রন-পজিট্রন যুগল উৎপন্ন করল। (pair-production, শক্তি থেকে ভর)

ডায়াগ্রামের বাম দিকে থাকে আগত কণা, এরা হল সেই সব কণা যারা পরস্পরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে মজার কিছু করতে চলেছে। যেমনঃ LHC তে এই আগত কণারা হচ্ছে উচ্চ ত্বরণে চলা প্রোটনের ভিতর থাকা কোয়ার্ক ও গ্লুয়ন। আর ডায়াগ্রামের ডানদিকে থাকে নির্গত কণা। এগুলো হল সেই কণা মিথস্ক্রিয়া পর যাদেরকে ডিটেক্টরে শনাক্ত করে পাওয়া যায়।

উপরের থিওরির জন্য পুরাতন LEP বা SLAC মত আমরা একটা ইলেক্ট্রন-পজিট্রন কলাইডারের কথা চিন্তা করতে পারি। এই গবেষণাগুলোতে ইলেক্ট্রন ও পজিট্রনের সংঘর্ষ ঘটানো হয় এবং নির্গত, উৎপন্ন কণাকে শনাক্ত করা হয়। কথা হল, আমাদের এই সাধারণ QED তত্ত্ব দিয়ে কি ধরনের পরীক্ষামূলক ফলাফল(বা উৎপন্ন কণাদের বৈশিষ্ট) হিসাব করা যাবে? যেমন ধরুন, একটা ইলেক্ট্রনের সাথে কি দুটো পজিট্রিন পাওয়া যেতে পারে? কোন সীমাবদ্ধতা বা শর্ত কি আছে যে কিভাবে ফোটন নির্গত হবে?

আচ্ছা, আমরা জেনেছি যে ডায়াগ্রামের তীরওয়ালা বহিঃস্থ রেখাগুলো দিয়ে বোঝানো হচ্ছে আগত ও নির্গত কণা। তাহলে মাঝের ওই বক্ররেখা কী ? এই অন্তঃস্থ রেখা দিয়ে বোঝায় ? এগুলো দিয়ে প্রকাশ করা হয় ভার্চুয়াল কণাদের। মজার ব্যাপার হল নাম শুনেই হয়তো আন্দাজ করতে পারছেন এদের কখনোই সরাসরি দেখা যায় না। এদের সৃষ্টি এবং বিনাশ হয় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জাদুতে। একমাত্র উদ্দেশ্য কণাদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য মিথস্ক্রিয়াগুলো ঘটান, যা আগত কণাদের নির্গত কণায় পরিণত হওয়ার অনুমতি দেয়।সহজ কথায়, এরাই হল মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যম। তাই এই ভার্চুয়াল কণা নিয়ে অনেক অনেক কিছু জানার আছে। তবে এখন এত বিস্তারিত না জেনে, চলুন একটা উদাহরণ দেখি যেখানে আমাদের আছে একটা ভার্চুয়াল ফোটন যা মাধ্যম হিসেবে একটা ইলেক্ট্রন আর পজিট্রনের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটাচ্ছে।

বামের ডায়াগ্রামটিতে একটা ইলেক্ট্রন পজিট্রন যুগল ধ্বংস হয়ে ফোটনে পরিণত হল এবং পুনরায় এটা আরেকটা ইলেক্ট্রন পজিট্রন যুগল সৃষ্টি করে। আবার ডানের ডায়াগ্রামে দেখা যাচ্ছে, একটা ইলেক্ট্রন তার পাশ দিয়ে চলা একটা পজিট্রনের দিকে ফোটন নিক্ষেপ করল।(পজিট্রনের সাথে মিলিত না হয়েও ফোটন বিনিময় করল!) আর এসবই আমাদের ধারণা দেয় যে ক্ষেত্র কণারা হল খুবই অদ্ভুত কোয়ান্টাম কণা যারা বল বহন করে। চমৎকার ব্যাপার হল, এ তত্ত্ব বস্তু কণা আর ক্ষেত্র কণা দুটোকেই একইভঙ্গিতে বিবেচনা করে। তাই আমরা এরকম ডায়াগ্রামও পেতে পারি, আদি ও শেষ দশায় (বহিঃস্থ রেখায়) আছে ফোটন, আর ইলেক্ট্রন সেখানে ভার্চুয়াল (অন্তস্থ রেখা)।

উদাহরণ হিসেবে বামের ডায়াগ্রামে দেখানো হয়েছে এমন একটা প্রক্রিয়া যেখানে ফোটন আর ইলেক্ট্রন নিজেদের সাথে ধাক্কা খায়, এটার নাম হল কম্পটন ক্রিয়া (Compton Scattering)। উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্ররা! এখন চেনা চেনা লাগছে তো! এখন ডানের ডায়াগ্রামে উলম্বভাবে আঁকা ভার্চুয়াল কণাকে ইচ্ছা করলে বাঁকা করেও দেখানো যায়। কারণ এটা ভার্চুয়াল ইলেক্ট্রন বা ভার্চুয়াল পজিট্রন দু রকমই হতে পারে। দেখুন ডানের ডায়াগ্রামে ভার্চুয়াল কণাকে যদি যদি ডানে বায়ে বাকাই, তাহলে ব্যাখা আসেঃ

(1) আগত ইলেক্ট্রন প্রথমে ফোটন নিঃসরণ করে আর তারপর আরেকটা আগত ফোটনের সাথে বিচ্ছুরণ করে। (এখানে ভার্চুয়াল ইলেক্ট্রন ছিল)

(2) আগত ফোটন প্রথমে ইলেক্ট্রন-পজিট্রন যুগল তৈরি করে। উৎপন্ন পজিট্রন আগত ইলেক্ট্রনের সাথে ধ্বংস হয়ে ফোটনে পরিণত হয়। (এখানে ভার্চুয়াল পজিট্রন ছিল)

তো এগুলোই মূলত ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের বেসিক আইডিয়া। এই নিয়মগুলোই আমাদের সহজে বলে দেয় কোন মিথস্ক্রিয়া সম্ভব আর কোনটা সম্ভব নয়। আসলে এগুলোর পেছনে বিস্তর গাণিতিক বিচার-বিশ্লেষণ আছে। সেসব গাণিতিক প্রক্রিয়া থেকে পাওয়া তথ্য বা ফলাফল থেকে আমরা জানতে পারি কোন মিথস্ক্রিয়া ঘটার সম্ভাবনা কত। তাই এখানে ব্যবহার করা গণিত আসলেই খুব জটিল এবং উচ্চতর পর্যায়ের। তবে মজার ব্যাপার হল, আক্ষরিক মূল্যের পাশাপাশি এসব ডায়াগ্রামগুলোর দেখতেও চমকপ্রদ এবং যেন এতে একটা শৈল্পিক রুচিবোধ আছে।

এ লেখায় বেশ কিছু নতুন আইডিয়া সম্পর্কে ধারণা পেলাম, তো আগ্রহী পাঠকদের কিছু প্রশ্ন উদয় হওয়া স্বাভাবিক, চলুন এমন কিছু প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা যাকঃ

১। এই ডায়াগ্রামগুলোতে x-অক্ষ আর y-অক্ষের তাৎপর্য কী ?

এগুলো আসলে স্থান-কাল ডায়াগ্রাম যা প্রকাশ করছে কণার গতিপথ। আমরা ডায়াগ্রামগুলো পড়েছি বাম থেকে ডানে, বাম থেকে ডানে সময় সামনে যাচ্ছে। এখানে আনুভূমিক বরাবর সময়ের মাত্রা নেওয়া হয়, আর উলম্ব বরাবর নেওয়া হয়েছে স্থানের মাত্রা। চতুর্মাত্রিক জগতকে দ্বিমাত্রিক গ্রাফে ব্যাখা করতে স্থানের তিনটা মাত্রাকে একই অক্ষ বরাবর নেওয়া হয়।

বেশিরভাগক্ষেত্রে এই নিয়ম মানলেও অনেক জায়গায় আবার সময়ের মাত্রাকে উলম্বভাবে দেখানো হয়। এক্ষেত্রে ডায়াগ্রাম পড়তে হয় নিচ থেকে উপরে।

২। তার মানে বলা হচ্ছে কণা সবসময় সোজা পথে চলে ?

না, আসলে এই ভুল বোঝাবুঝিটা খুব সহজে হয়ে যেতে পারে, যদি এই ডায়াগ্রাম নিয়ে একটু বেশি সিরিয়াস হয়ে যান। বাস্তবে একটা কণা যে পথে চলে তা তো শুধু এর মিথস্ক্রিয়ার উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে গতিবিদ্যার উপরও। কিন্তু ডায়াগ্রামে শুধু মিথস্ক্রিয়াকেই বিবেচনায় আনা হয়। যেমনঃ ভরবেগ বা শক্তির সংরক্ষণশীলতার মত বিষয়গুলোও কিন্তু মাথায় রাখতে হয়। মূলত ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের লক্ষ্য স্পেসে কণার বাস্তব গতিপথ ব্যাখ্যা করা নয়, বরং গতিপথে কণাটি কিভাবে মিথস্ক্রিয়া করছে সেটা দেখানো।

৩। পজিট্রন সময়ের বিপরীতে চলা ইলেক্ট্রন?

কোয়ান্টাম তড়িৎগতিবিদ্যার শুরুর দিকে লোকে এটা বলতে বা ভাবতে স্বচ্ছন্দ ছিল। গাণিতিক হিসাবের স্বার্থে আর ডায়াগ্রাম অনুযায়ী বিষয়টাকে এভাবে সহজে ব্যাখা করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত এটাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়ার দরকার নেই। এটা দিয়ে আপনার কিছু আসবে যাবে না। এটা পরীক্ষা করে প্রমাণ করার কোন পদ্ধতিও নেই। তাছাড়া এই ব্যাখ্যাটি আরো বেশ কিছু টেকনিক্যাল কারণে কিছুটা অসঙ্গতিপূর্ণ , কারণ কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির গাণিতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কার্যকারণ(causality) ধারণার উপর ভিত্তি করে।

৪। এটার মানে কী যে একগুচ্ছ আগত ও নির্গত কণাদের বহুরকমের ডায়াগ্রাম থাকতে পারে ?

উপরে দেখানো বিচ্ছুরণের উদাহরণে একই আদি ও শেষ দশার জন্য দুইটা ভিন্ন ডায়াগ্রাম দেখানো হয়েছে। মূলত এদের জন্য এরকম ভিন্ন পথের অসীম সংখ্যক ডায়াগ্রাম আছে । কোয়ান্টাম মেকানিক্সে গাণিতিক উপায়ে এই সবগুলো ভিন্ন পথকে একসাথে যোগ করা হয়। আর সেটা করতে যে গাণিতিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয় তা হল ফাইনম্যান পথ সমাকলন

৫। ৩ এবং ৪ নং নিয়মের তাৎপর্য কী?

নিয়ম ৩ এ বলা হয় ডায়াগ্রামে আসলে মিথস্ক্রিয়ার একটি চেইন নিয়ে আলোচনা করা হয়। উপস্থিত অন্য কণাগুলো যেগুলো এই নির্দিষ্ট মিথস্ক্রিয়া দেয় না বা অন্য কোন স্বাধীন মিথস্ক্রিয়ায় চেইনে অংশ দেয়, আমরা সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামানো হয় না। আর নিয়ম ৪ হল ডায়াগ্রাম যতটা সম্ভব সহজ করার জন্য। তবুও জটিল মিথস্ক্রিয়ায় মাঝে মাঝে রেখা একটু বাঁকা করে আঁকতে হতে পারে।

৬। এই নিয়মগুলো এসেছে কোথা থেকে ?

যে নিয়ম গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, সেগুলোকে বল ফাইনম্যান রুল (Feynman rules), এগুলো আসলে কণা পদার্থবিদ্যার একটি তত্ত্বের সংজ্ঞা। আরো ঠিক করে বললে, তত্ত্বের প্যারামিটার গুলোর সাথে সম্পর্কিত কিছু সংখ্যা, মানও এই নিয়মগুলোর ভিতর পড়া উচিত। যেমনঃ কণাদের ভর, ক্রিয়াবলের শক্তি। কিন্তু এগুলো বিবেচনায় আনা হয় না। এই নিয়মগুলো এসেছে জটিল গাণিতিক প্রতিপাদনের মাধ্যমে, যা যেকোন সাধারণ পাঠকের মাথার উপর দিয়ে যাবে। উচ্চতর শিক্ষায় কণা পদার্থবিদ্যার শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ষের বেশির ভাগ সময়টা কাটায় গাণিতিক রূপ থেকে ডায়াগ্রাম আঁকা শিখতে, তারপর এই ডায়াগ্রাম ব্যবহার করে জটিল সব গণিত করা শিখে। এ ধরনের গাণিতিক রূপ গুলো যে কতটা জটিল হতে পারে, তা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন-

বলে রাখি, QED এর মত আছে QCD, Quantum Chromodynamics। এটা ব্যাখ্যা করে সবল নিউক্লিয় বলের ক্রিয়া। কিভাবে কোয়ার্ক এবং গ্লুওন নিজেদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া করে সেই আলোচনা নিয়েই এই তত্ত্ব। QCD এর ফাইনম্যান ডায়াগ্রামগুলো হয় আরো জটিল, এতে থাকে অনেক গ্লুয়ন রেখা। কারণ তড়িৎ চৌম্বক মিথস্ক্রিয়ায় ছিল ফোটন, এখানে সবল নিউক্লিয় মিথস্ক্রিয়ায় থাকবে গ্লুওন।

আরো জটিল হতে পারে, যেমনটা পাশের ডায়াগ্রামে দেখানো হয়েছেঃ এখানে ফোটন, W বোসন, হিগস, গ্লুওন সব আছে!

 

অন্য দিকে আধুনিক কম্পিউটারের মাধ্যমে এখন এসব সমীকরণ সিমুলেশনের মাধ্যমে কোয়ার্ক এবং গ্লুওন ক্ষেত্রের ফ্লাকচুয়েশন সরাসরি হিসাব করা যায়, এসব চিত্র একজন বিজ্ঞান প্রেমীকে মুগ্ধ করবেই,

(শূন্যস্থানে গ্লুওন ক্ষেত্র)

যাহোক,এই লেখায় উদ্দেশ্য ছিল ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম সম্পর্কে বেসিক ধারণা নেওয়া এবং কণা পদার্থবিদ্যায় আগ্রহী হয়ে ওঠা। পাঠকদের মধ্যে কণা পদার্থবিজ্ঞানের চমকপ্রদ জগতের কিছুটা ভাল লাগা এবং আগ্রহ তৈরি হলেই এই লেখা সার্থক ।

ধৈর্য রেখে এতক্ষণ সম্পূর্ণ লেখা পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

লেখাটি শেষ করছি প্রতিভাবান ফাইনম্যানের একটি উক্তি দিয়েঃ

I don’t know anything, but I do know that everything is interesting if you go into it deeply enough.

 

তথ্যসূত্রঃ

লিখেছেন মুবতাসিম ফুয়াদ

শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মুবতাসিম ফুয়াদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 5 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

আপনার মতামত