পড়া কেন মনে থাকে না? স্মরণশক্তিটা যদি আরেকটু ভালো হতো? আহা লোকটার নাম ভুলে গেলাম? বাড়ির ঠিকানাটা যেন কি ছিলো? স্মৃতি নিয়ে আমাদের অভিযোগের শেষ নেই। তবে বিভিন্ন তথ্য মনে রাখতে পারি জন্যেই আমরা দৈনন্দিন কাজ করতে পারি। নাইলে কবেই সব ভেস্তে যেত। তথ্য মনে রাখার প্রক্রিয়াটা কি ধরণের? আমরা কি মাথার কোটরের মধ্যে একেকটা তথ্য গুঁজে রাখি? মস্তিষ্ক কি একটা ফাইল কেবিনেটের মতো যার একেকটা ড্রয়ারে একেকটা তথ্য স্মৃতি হিসেবে জমা হয়? স্নায়ুবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে মস্তিষ্কে স্মৃতি জমা রাখার প্রক্রিয়াটা ভিন্ন ধরনের। আসলে জীবনের ঘটনাবহুল স্মৃতিগুলোর টুকরো টুকরো অংশ মস্তিষ্কের একেক জায়গার স্নায়ুসংযোগে জমা থাকে। আমরা যখন মনে করার চেষ্টা করি, তখন এই বিচ্ছিন্ন অংশগুলো জোড়া লেগে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র আমাদের মনের জানালায় ভেসে উঠে।

মস্তিষ্কে অজস্র স্নায়ু কোষ রয়েছে। এ কোষেরা একে অপরের সাথে সিন্যাপ্স নামক সংযোগের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। মস্তিষ্কে নতুন স্মৃতি তৈরি হওয়ার সময় বিভিন্ন স্নায়ুকোষের মধ্যে নতুন নতুন সিন্যাপ্স তৈরি হয়। সিন্যাপ্সের মধ্যে যোগাযোগটা হয় কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিক নিউরোট্রান্সমিটারের মাধ্যমে।

এই নিউরোট্রান্সমিটার হলো একেকেটা ক্ষুদেবার্তা (এসএমএস বা মেসেজ) মতো। মনে করুন, আপনি ভীষণ ব্যস্ত। এসময় স্বল্পপরিচিত কারো কাছ থেকে দুয়েকটা ক্ষুদেবার্তা আসলো। আপনি হয়তো এদেরকে এড়িয়ে যাবেন। কিন্তু আপনি যদি একই ব্যক্তির কাছ থেকে শত শত ক্ষুদেবার্তা পেতে থাকেন তখন কি হবে? বিশেষ করে যদি এই ক্ষুদেবার্তার বক্তব্য যদি একই হয়? তখন আপনি যত ব্যস্তই হোন না কেন, প্রেরকের প্রতি মনোযোগ দেয়া শুরু করবেন। বলবেন, কেন রে ভাই আমাকে এসব ক্ষুদেবার্তা পাঠাচ্ছিস?

স্নায়ুকোষেরা যখন প্রতিবেশী স্নায়ু থেকে একই নিউরোট্রান্সমিটার অসংখ্য পরিমাণে পায়, তখন সে প্রেরক স্নায়ুর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। এসব যোগাযোগের শক্তিমাত্রাই ঠিক করে দেয় কিভাবে একটি স্মৃতি তৈরি হবে। একাধিক স্নায়ুকোষের মধ্যে সিন্যাপ্সের সক্রিয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে দীর্ঘ-মেয়াদী বিভবীকরণ (long-term potentiation বা LTP)। স্মৃতি নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীদের মাঝে দীর্ঘ-মেয়াদী বিভবীকরণ খুবই পরিচিত। এ প্রক্রিয়া সিনাপ্স সংযোগের দৃঢ়তা বদলে দিতে পারে। স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী তৈরি হওয়ার জন্য সিন্যাপ্সের সংযোগ দৃঢ় হওয়া জরুরী।

দীর্ঘমেয়াদী বিভবীকরণের আগে প্রেরক স্নায়ু সময় প্রাপককে বারবার নিউরোট্রান্সমিটার সংকেত পাঠায়। একই সিনাপ্সে বেশ কয়েকবার সংকেত বিনিময়ের একটা পর্যায়ে প্রেরককে বাড়তি নিউরোট্রান্সমিটার না পাঠালেও প্রাপক অধিক পরিমাণে উদ্দীপিত হয়। উদ্দীপ্ত প্রাপক স্নায়ু তখন উচ্চ-বিভবে তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেত দেয়া শুরু করে। এ অবস্থাকেই বলে দীর্ঘ-মেয়াদী বিভবীকরণ। এটা অনেকটা ক্ষুদেবার্তার অর্ধপরিচিত প্রেরকের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি করার মতো। বার্তাপ্রেরককে আগের মতো অধিক হারে ক্ষুদেবার্তা পাঠাতে হচ্ছে না। অথচ তার সাথে পারস্পরিক যোগাযোগ অনেক সহজ ও সাবলীল হয়ে গেছে। আপনি হয়তো বার্তাপ্রেরককে আপনার ফোনের যোগাযোগের তালিকায় যুক্ত করে নেবেন যাতে পরবর্তী যোগাযোগ আরো সহজ হয়। ঠিক তেমনই মস্তিষ্ক দীর্ঘ-মেয়াদী-বিভবীকরণের মাধ্যমে দৃঢ় সিন্যাপ্স-যোগাযোগ তৈরি করে। নির্দিষ্ট স্মৃতি স্মরণ করা নির্ভর করবে সিন্যাপ্সের দীর্ঘমেয়াদী সংযোগের উপর। বিপরীতভাবে, আপনি যদি বার্তাপ্রেরকের সাথে কথা না বলেন, আপনাদের মধ্যে সম্পর্ক আরো ক্ষীণতর হয়ে যাবে।

যারা গিটার বা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন, তারা খেয়াল করবেন কোন নতুন সুর তোলার জন্য সেটা বার বার ধীরে ধীরে পুনরাবৃত্তী করতে হয়। প্রথমে সুরটা যত জটিলই মনে হোক না কেন, নিয়মিত চর্চায় তা সহজ হয়ে আসে। এক সময় সাবলীলভাবে দ্রুততার সাথে সেটা বাজাতে সক্ষম হয়ে যায়। এ সময় মস্তিষ্কে আসলে কি ঘটে? শেখার সময় নতুন নতুন সিন্যাপ্স তৈরি হয়। নিয়মিত পুনরাবৃত্তি সেই স্নায়ুপথের রাস্তাগুলো মসৃণতর করে তোলে দীর্ঘ-মেয়াদী-বিভবীকরণের মাধ্যমে। এক পর্যায়ে সুর একা একা বাজানো সহজাত হয়ে যায়। অন্যদিকে, শিক্ষার্থী যদি নিয়মিত সুরের চর্চা থেকে কিছুদিন বিরত থাকেন তাহলে উল্টো ঘটনা ঘটে। জড়তা চলে আসে, ভুল হওয়া শুরু হয়।

আমাদের মস্তিষ্ক নমনীয় একটি অঙ্গ। এখানে নতুন নতুন সিন্যাপ্স প্রতিনিয়তই তৈরি ও পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে এটি পেশির মতোই। ব্যয়াম না করলে পেশির ঘনত্ব কমে গিয়ে যেমন নরম হয়ে যায়, স্নায়ুসংযোগের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটতে পারে। আমাদের যেমন সহজেই নতুন নতুন স্মৃতি তৈরি হয়, ঠিক তেমনই স্মৃতিগুলো দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য মনোযোগ ও পুনরাবৃত্তি আবশ্যক। মস্তিষ্ক কিভাবে স্মৃতি জমা করে সেই জ্ঞান আমাদের মনে রাখার জন্য চর্চার প্রয়োজনীয়তা সচেতন হতে সাহায্য করবে।

 

[১] How does memory work? https://www.sciencedaily.com/releases/2016/05/160517131928.htm

[২] Cellular Mechanisms of Learning and Memory https://courses.washington.edu/conj/bess/memory/cellular-memory.html

[এই লেখাটি বিজ্ঞানচিন্তা পত্রিকার অক্টোবর ২০১৭ সংখ্যায়  “মস্তিষ্কে কিভাবে স্মৃতি জমা হয়” শিরোনামে প্রকাশিত]

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 67 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত