ভাইরাসও প্রকৃতির ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইবোলা, এইচআইভি, ডেঙ্গু এরা আমাদের বার বার মনে করিয়ে দেয় যে ভাইরাস কতটা ক্ষতিকর। গঠনের দিক থেকে ভাইরাস সহজ সরল। অল্প কিছু জীন এবং তার চারপাশে ঘিরে একটি প্রোটিনের তৈরী খোলস নিয়ে গঠিত হয় একটি ভাইরাস, যার আকার প্রায় একটি অণুর সমান। কিন্তু  এই ক্ষুদ্র ভাইরাসটির ক্ষমতা আমাদের ধারণারও বাইরে। এরা যখন দেহের কোন কোষকে আক্রমণ করে তখন সেই কোষের ভেতরে সব রকম কর্মকান্ডের দখল নিজের আয়ত্তে নেয়। ভাইরাস ওই কোষের সাহায্যেই সংখ্যাবৃদ্ধি করে আরও অসংখ্য ভাইরাস তৈরি করে।

একেক রকম ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির ধরণ একেক রকম। কোনটা খুব দ্রুত আবার কোনটা খুব ধীরে বংশবৃদ্ধি করে। কোন ভাইরাস পোষক দোহের কোষকে আক্রান্ত করে তার এনজাইমগুলো ব্যবহার করে বংশবৃদ্ধি করে। আবার কোন ভাইরাস বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় জীনগুলো নিজেরাই বহন করে — তাদের প্রয়োজন হয় শুধুমাত্র একটি পোষক দেহের।

 

 

কিন্তু তাই বলে সব ভাইরাস যে ক্ষতিকর, তা নয়। কিছু ভাইরাস আছে যারা উপকারেও আসে। উদ্ভিদ ও প্রাণীকোষ সহ বিভিন্ন রকম কোষকেই ভাইরাস আক্রমণ করে। এমনকি ব্যাকটেরিয়াও ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়। তবে ব্যাকটেরিয়া এককোষী জীব হওয়ায় এরা সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয়। নদী-নালা, সমুদ্র, মাটি সব জায়গার ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে এবং ভাইরাস আক্রমনের ফলে একটি জীবের পরিবর্তন ঘটতে পারে। সেই পরিবর্তনের ফলে কি ঘটবে তা নির্ভর করে ভাইরাস আক্রমনের উপর। একটি জীবের পরিবর্তন ও বিকাশে ভাইরাস বিশেষ ভূমিকা রাখে। সেই সাথে পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের উপরও ভাইরাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সুতরাং, বাস্তুসংস্থান ভাইরাস দ্বারাও প্রভাবিত হচ্ছে। আর এর মধ্যে দিয়েই ভাইরাস প্রকৃতির ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে। তবে ভাইরাসের এই ভূমিকার ব্যপারে এখনো অনেক কিছইু অজানা রয়েছে।

এই অজানা রহস্যের পেছনেও কিছু কারণ আছে। প্রথমত, ভাইরাস এতটাই ক্ষুদ্র যে এদের নিয়ে গবেষণা করাটা খুবই কঠিন। একটি ভাইরাস আয়তনে একটি ব্যাকটেরিয়া হতে ১ – ১০,০০০ গুণ ক্ষুদ্রতর হতে পারে। তাই এদেরও খালি চোখে দেখা অসম্ভব। সামান্য কিছু জীন নিয়ে খুব সহজ সরলভাবে গঠিত হলেও এসব ভাইরাস গুলোর একে অপরের মধ্যে অনেক ভিন্নতা রয়েছে। যেমন এক ধরনের ভাইরাসের সঙ্গে অন্য ধরনের ভাইরাসের কোন জীনের মিল থাকে না। আর এসব কারণেই এদের সনাক্ত করাও অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে এই ভিন্নতা ক্রমে বেড়েই চলেছে।

এই পৃথিবীতে ভাইরাস কতটুকু ভূমিকা রাখছে সেটা ভাইরাসের সঙ্গে পোষকের পারস্পরিক ক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। ভূ-পৃষ্ঠের সমুদ্র গুলোতে প্রতি ১ লিটার পানিতে প্রায় ১ মিলিয়ন এর কাছাকাছি সায়ানোব্যাকটেরিয়া আছে। এরা কার্বন-ডাই  অক্সাইডকে বিভিন্ন রকম জৈব পদার্থে পরিণত করে এবং প্রায় সারাদিনে স্থলজ উদ্ভিদগুলোর সমান পরিমাণ কার্বন ফিক্সেশন (Carbon fixation) করে থাকে। কার্বন-ফিক্সেশন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রাকৃতিক অজৈব পদার্থ থেকে কার্বন নিয়ে, তা দিয়ে অন্য জৈব পদার্থ তৈরি করা হয়।

 

 

সায়ানোব্যাকটেরিয়াগুলো পরবর্তীতে সামুদ্রিক খাদ্য শৃঙ্খলের সর্বনিম্ন স্তরে পরিণত হয় এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য খাদ্য হিসেবে থাকে। বাস্তুসংস্থান পরিচালনায় সায়ানো ব্যকটেরিয়াগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এসব সায়ানোব্যাকটেরিয়াও ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং ভাইরাস আক্রমণের ফলে এরা পরিবর্তিত বা কোন ক্ষেত্রে ধ্বংস হয়ে যায়। এর মধ্যে দিয়েই ভাইরাস বাস্তুসংস্থানের উপরও প্রভাব ফেলে। কোন ভাইরাস যখন একটি জীবন্ত কোষকে আক্রমণ করে তখন বিভিন্ন রকমের ঘটনা ঘটতে পারে। হয়ত ভাইরাসটি জীবন্ত কোষটিকে ধ্বংস করে দেবে, নাহলে ভাইরাসটি নিষ্ক্রয় অবস্থায় থাকতে পারে। আবার মাঝে মাঝে ভাইরাসগুলো এসব কোষের সাথেই বসবাস করতে পারে। তবে সব ভাইরাসই তো ক্ষতিকারক নয়। তাদের আক্রমণে সবসময়ই যে অসুখ হবে তা কিন্তু না। মাঝে মাঝে তা উপকারেও আসতে পারে। কখনও কখনও ভাইরাস আক্রমণের ফলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। কারণ, প্রত্যেকবার আক্রমণের ফলে শরীরে অ্যান্টিবডি উৎপাদন হয়, যার ফলে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। আবার এই ভাইরাস গুলো কখনও কিছু ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে দেয় এবং পরে এদের অবশিষ্ট অংশগুলো অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এভাবে ভাইরাস গুলো বিভিন্ন রকম জৈবিক পরিবর্তন ঘঠানোর মধ্যদিয়ে প্রকৃতির বাস্তুসংস্থানকে প্রভাবিত করে এবং বাস্তুসংস্থানকে নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। ভাইরাসের এসব বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য বৈজ্ঞানিকদের কাছে ভাইরাস অনেক জনপ্রিয়। বর্তমান যুগে বিভিন্ন রকম চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভাইরাসকে কাজে লাগানো হচ্ছে, বিশেষ করে ঔষধ বা জেনেটিক থেরাপি দেওয়ার ক্ষেত্রে।


তথ্যসূত্র: “Unveiling the Viral Ecology of Earth”, Science Philanthropy and Alliance (http://alliance.nautil.us/article/219/unveiling-the-viral-ecology-of-earth)

মন্তব্যসমূহ

আপনার মতামত