স্বপ্ন মরমী অর্থে পূর্বাভাস নয়তবে স্বপ্নের ভিন্নধর্মী মানসিক পূর্বাভাসের শক্তি আছে

 

১.

সম্ভবত বাইবেলে স্বপ্নে ভবিষ্যদ্বানীর সবচেয়ে বিখ্যাত কথা পাওয়া যায়। ফারাও (কুরআনের ফেরাউন – অনুবাদক) স্বপ্নে দেখেন তিনি নীল নদের তীরে দাঁড়িয়ে আছেন। সাতটি মসৃণ, তরতাজা স্বাস্থ্যবান গরু নদী থেকে উঠে আসলো। তারপর আরো সাতটি হাড্ডিসার, কুৎসিত গরু পিছু নিয়ে সামনের হৃষ্টপুষ্ট গরু সাতটিকে খেয়ে ফেলে। কিন্তু এ স্বপ্নের মানে কি? এখানে একটা ধাঁচ লক্ষ্যণীয়, তাই না? খারাপ ভালোকে অনুসরণ করে এসে গ্রাস করে ফেললো। আর সংখ্যা ছিলো সাত। ফেরাউন যোসেফকে (কুরআনের ইউসুফ (আ.) – অনুবাদক) তলব করলে তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেন। ব্যাখ্যাটি ছিলো টানা সাত বছরের সমৃদ্ধির পর সাত বছর ধরে দুর্ভিক্ষ বিরাজ করবে। এই ব্যাখ্যা ফারাওয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখন তিনি ভবিষ্যতে কি হবে আঁচ করতে পারেন আর খারাপ সময়ের জন্য সঞ্চয় করা শুরু করেন। কিন্তু ফারাও যদি আন্দাজই করতে পারেন, তাহলে কেন তিনি স্বপ্নে সরাসরি সাতটি সমৃদ্ধির বছর আর সাতটি দুর্ভিক্ষের বছর দেখলেন না? স্বজাতী-ভক্ষক গরুর বিষয়টাই বা কি? গরু কি ফারাওয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত কোন ধাঁচকে নির্দেশ করছে? আর এধরণের ধাঁচ চিহ্নিত করা গেলে তা থেকে কি ভাবে ভবিষ্যদ্বানীই করা যাবে?

আসলে বিষয়টি মস্তিষ্ক কিভাবে কাজ করে তার সাথে সম্পর্কিত। মস্তিষ্ক মোটেই নিষ্ক্রিয়ভাবে বাইরের জগতের তথ্য সংগ্রহ করে না। বরং সক্রিয়ভাবে তথ্যের ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে সেখানে ঘটনার-ধাঁচ খুঁজতে থাকে। যদি সবকিছুই এলোপাথাড়ি ঘটতো তাহলে কোন ধাঁচই থাকতো না। ফলে পরবর্তীতে কি ঘটতে পারে সে ভাবীকথন অসম্ভব হতো। আপনি শুধু নিজের অভিজ্ঞতার (বা আরোহিত জ্ঞান, যা আপনার অভিজ্ঞতারই একটি অংশ) কোন ধাঁচ বুঝতে পারলেই অনুমান করতে পারেন সামনে কি হতে পারে। ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কি কোন ধারাবাহিকতা আছে? কোন ঘটনা কি অন্য ঘটনার সাথে একসাথে ঘটে? যদি একাধিক ঘটনা একসাথে ঘটবার ধাঁচ পাওয়া, তাহলে পরবর্তীতে কি ঘটবে আন্দাজ করতে ধাঁচটিকে  ব্যবহার করা যাবে।

কিছু কিছু ধাঁচ আছে যারা নির্ধারণবাদী ও যৌক্তিক। যেমন দিন শেষে রাত হয়। তাই দিন ও রাত মানব-মনে একটি অনুক্রমের সাথে সম্পর্কিত। আমরা বলতে পারি যে রাত শেষে নতুন দিন আসবে। আরেকটা উদারহণ: যখন অধিক যাত্রী রাস্তায় নামে তখন ট্রাফিকের অবস্থা সবচেয়ে বাজে থাকে। যানজটের সাথে সম্পর্ক যাত্রীদের গাড়িচড়ার। এই সম্পর্ক প্রাকৃতিক কোন নিয়ম দিয়ে নির্ধারিত নয়। তবে অধিকাংশ মানুষ সাধারণত কখন পথে বের হয় সে সময়টা না বদলালে কিংবা গাড়ি যাওয়ার রাস্তা পরিবর্তিত না হলে আপনি বলতেই পারেন সকাল ৮-টার দিকে ট্রাফিক জ্যামের অবস্থা খুব খারাপ হবে।

তবে কিছু কিছু ঘটনার ধাঁচ এতটা সুস্পষ্ট  নয়। আমরা এদেরকে ‘সাম্ভাব্য’ বলি। কারণ এরা সেসব ঘটনার সাথে সম্পর্কিত যাদের একসাথে বা পরপর ঘটবার প্রবণতা রয়েছে। এ কারণে এরা ঘটবে কি না আমরা তা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। মানুষ ও অন্যান্য জীবন্ত প্রাণীর আচরণ আন্দাজ করা একটি সম্ভাবনার বিষয়। তাদের অতীতের আচরণ দেখে আপনি বুঝতে পারবেন যে তারা হয়তো নির্দিষ্ট কিছু একটা করবে। কিন্তু আপনি কখনই নিশ্চিত হতে পারবেন না। তাদের আচরণ এলোমেলো নয়, কিন্তু পূর্বনির্ধারিতও নয়। প্রাণ যেকোন সময়েই আপনারকে বিস্মিত করে দিতে পারে।

যেমন আমি একই সাথে গবেষক ও শিক্ষক। আমরা শিক্ষাদানের সময় নির্দিষ্ট। আমার অধিকাংশ সময়ই কাটে বাসায় বসে গবেষণাপত্র লিখে। আমি কখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো তা বলতে পারা খুব একটা সহজ নয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো কি না তার ভবিষ্যদ্বানী সবচাইতে সফল হবে আমার ক্লাস রয়েছে কি না তার খোঁজ নিলে (এ ধরনের ঘটনাকে ভাবী-কথক বলা যায় যার উপর কোন ফলাফল নির্ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে – অনুবাদক)। তবে আমার যদি কোন গবেষণা-বিষয়ক কাজ থাকে তাহলে আমি পাঠদানের সময় পিছিয়ে দেবো। অন্য একটি ভাবী-কথক দেখা যেতে পারে। আমার পূর্বনির্ধারিত কোন মিটিং আছে কি না তা দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করলেও তা সফল হতে পারে। তবে যদি গবেষণা সম্পর্কিত কোন জরুরী সময়সীমা তাড়া দেয় তাহলে আমি মিটিংটা বাদ দিয়ে দেব। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকবো কি না তা শিক্ষাদান ও মিটিঙের সাথে সংঘটিত (ও সম্পর্কিত) হওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু এটি মোটেও শিক্ষাদান ও মিটিঙ দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

আরেকটি অপরিস্কার ভাবী-কথক হবে কোন বুদ্ধিদীপ্ত সহকর্মীর সাথে কফিপানের প্রস্তাব। আমি যদি শিক্ষাদান ও মিটিঙে যোগদান এবং কোন সহকর্মীর সাথে কফিপানের সাথে সুযোগ পাই, তাহলে খুব সম্ভবত আমি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকবো। তবুও এটা একটা সম্ভাবনা ছাড়া অন্য কিছু নয়। অন্যদিকে আমি হয়তো কোনদিন ক্যাম্পাসে থাকতে পারি শুধুমাত্র কোন সহকর্মীর সাথে কফি পানের জন্য। অথবা হয়তো আমি এক অফিস থেকে অন্য অফিসে যাচ্ছি সেজন্য। তবে এগুলো একসাথে ঘটবার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে কোন সহকর্মীর সাথে কফি পান করে একই দিনে অফিসে যাচ্ছি – এ দু’টি ঘটনা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সম্ভাব্য ভাবী-কথক।

কিন্তু এসবের সাথে স্বপ্নের সম্পর্কটা কোথায়?

জাগ্রত অবস্থায় আমরা যৌক্তিক ও নির্ণয়বাদী ধাঁচ অনায়সে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সুদক্ষ। আমরা সচরাচর ভাবি যে কাজ করার জন্য আমাদের জেগে থাকা দরকার। তবে এটা বাস্তব নয়। সারাদিনে চব্বিশ ঘন্টার মাঝে আরেকটি দশা রয়েছে যেখানে আমাদের মস্তিষ্ক একই ভাবে সক্রিয় থাকে। কোন কোন গবেষক মনে করেন এ দশায় মস্তিষ্ক জাগ্রত অবস্থার চেয়েও বেশি সক্রিয় থাকে। এ অবস্থা হলো দ্রুত-চক্ষু-আন্দোলন বা র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) ঘুম। রেম ঘুমের সময় আমরা বেশিরভাগ স্বপ্ন দেখে থাকি। এ দশায় আমরা বিভিন্ন ঘটনার মাঝে কম-প্রকট বা দূরের সম্পর্ক সনাক্ত করার কাজে দক্ষ। এ বিষয়টি সাম্ভাব্য-ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করে।

বেশ কিছু গবেষণায় এটি দেখা যায়। ১৯৯৯ সালে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে রবার্ট স্টিকগোল্ড নামক এক মনোচিকিৎসক ও তার সহকর্মীরা দেখান যে রেম ঘুম থেকে জাগানোর পর মানুষ রেম ঘুমের বেশ পরে জাগানোর তুলনায় বেশি পরিমাণে ‘দূর-সম্পর্ক’ তৈরি করতে পারে। যেমন গবেষণায় অংশগ্রহণকারীকে ‘গরম’-এর মতো শব্দ বললে তার মধ্যে ‘সূর্য’ শব্দটি দিয়ে উত্তর দেয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্তু মস্তিষ্ক পূর্ণ জাগ্রত থাকা অবস্থায় মানুষ সাধারণত ‘ঠান্ডা’ শব্দটা বেশি উত্তর দেয়, এরা বিপরীতধর্মী শব্দ, এদের মাঝে রাত-দিনের মতোই বিপরীতমুখী প্রকট সম্পর্ক।

২০০৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যানিস কাই নামের এক মনস্তত্ত্ববিদ সহকর্মীদের নিয়ে একটি পরীক্ষা চালালেন যেখানে অংশগ্রহণকারীদের কয়েকটি আপাত অসম্পর্কিত শব্দ পরপর দেখানো হয়। যেমন ‘পড়ন্ত’, ‘অভিনেতা’, ‘ধূলি’ এ শব্দ-অনুক্রমের কথা ভাবুন। রেম-ঘুম থেকে জাগানো অংশগ্রহণকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘তারকা’-র মতো শব্দ দিয়ে এ তিনটিকে সম্পর্কিত করেন।

২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একজন ঘুম গবেষক মুরি বার্সকি ও তার সহকর্মীগণ এই সাম্ভাব্য-সম্পর্কটি আরো গভীরে বিশ্লেষণ করে দেখেন। তাদের গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কোন ঘটনার বর্ণনা থেকে সম্পর্ক স্থাপন করে ‘সূর্য’ বা ‘বৃষ্টি’ এই দুইটি সম্ভাবনা আন্দাজ করতে হতো। যেসব অংশগ্রহণকারীরা রেম ঘুমের একটি নিদ্রা নিয়েছিলেন আর যারা জাগ্রত ছিলেন তাদের ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক কি না, তা তুলনা করা হয়। দেখা গেল এ তুলনায় রেম-ঘুম থেকে জাগারা সফলতার সাথে এগিয়ে থাকছেন।

এসবের উপর ভিত্তি করে আমার মত হচ্ছে, আমরা রেম ঘুমের পর অপ্রকট শব্দ-ভিত্তিক সম্পর্ক অবলীলায় খুঁজে পেতে পারি। এর কারণ হলো ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা ও ঘটনার মধ্যে উপস্থিত অস্পষ্ট সম্পর্কের ধাঁচ খুঁজে পেতে আমাদের মস্তিষ্ক তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ কেউ যদি অনুমান করতে চায় আমি কোন বিশেষ দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবো কি না, তাহলে একটা ঘুমের পর আন্দাজ করলে তাদের সাফল্যের হার বেড়ে যাবে।

 

২.

জাগ্রত অবস্থার তুলনায় আমাদের মস্তিষ্ক রেম ঘুমের সময়ে কিছুটা ভিন্নভাবে কাজ করে। মস্তিষ্কের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাওয়া যাবে কপালের পেছনে মাথার দুই পাশে অবস্থিত ল্যাটেরাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে। এই এলাকাগুলো যৌক্তিক চিন্তা, পরিকল্পনা আর সমস্যার সবচেয়ে সংশায়াতীত সমাধানের উপর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য দায়িত্বরত। অন্যান্য বিষয়ের সাথে সাথে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স মনকে এলোপাথাড়ি ঘুরে-বেড়ানো থেকে দমিয়ে রাখে। কিন্তু তুলনামূলক জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অনেক সময় দূরবর্তী, অপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন জরুরী হয়ে দাঁড়ায়। তখন মনের এলোপাথাড়ি ঘুরে-বেড়ানো বা ‘প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে’  চিন্তা করাটা জরুরী হয়ে পড়ে।

মিলানো-বিকোক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ কার্লো রেভারবি ও সহকর্মীগণ ২০০৫ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধে এই বিষয়টি উত্থাপন করেন। তাদের দল মস্তিষ্কের ল্যাটেরাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে ক্ষতিগ্রস্থ রোগীদের কোন কঠিন সমস্যা দিতেন যা সমাধান করতে প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে হবে। দেখা গেলো এই দল সমস্যাটি সমাধানে স্বাভাবিক ব্যক্তিদের দলের তুলনায় অধিক ভালো করছে। এ দক্ষতা অর্জনের জন্য মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্থ হওযার দরকার নেই। রেম ঘুমের সময় মস্তিষ্কের ল্যাটেরাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এমনিতেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তখন যৌক্তিক চিন্তা বাধাগ্রস্থ হলেও অপ্রকট, দূরবর্তী সম্পর্কিত বিষয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন ও অন্তর্দৃষ্টিজাত সিদ্ধান্ত টানা সহজ হয়।

আমাদের স্বপ্নে পরিচিত মানুষজন, স্থান ও ঘটনা উঠে আসে। কিন্তু ল্যাটেরাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে এরা বাস্তবে যেমন সেরকম অভিজ্ঞতা আমরা পাই না। বরং বিভিন্ন ব্যক্তি, স্থান ও অভিজ্ঞতা পুর্নমিলিত হয়ে পরিচিতকে অপরিচিত রূপে উপস্থাপন করে। এর ফলাফল প্রায়ই অদ্ভূতুড়ে হয়ে থাকে। আমার মতে রেম ঘুমের সময় পরিচিত অপরিচিত হয়ে যায় কারণ আমরা তখন স্মৃতিগুলো প্রকৃত অবস্থা যেরূপ থাকে সেভাবে দেখি না। বরং আমরা এমন একটি ছবি তৈরি করি যেখানে অনেকগুলো অভিজ্ঞতার স্মৃতি মিশ্রিত হয়। স্বপ্নের ছবি অদ্ভূতুড়ে হয়ে থাকে কারণ এটি বিভিন্ন ব্যক্তি, স্থান বা ঘটনায় সম্পর্কিত উপাদান মিশিয়ে একটি ধাঁচকে চিত্রায়িত করে। রেম ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক মানুষ, স্থান ও ঘটনার মধ্যকার অপ্রকট সম্পর্কের ধাঁচ সনাক্তকরণে তৎপর থাকে। তাই রেম ঘুম থেকে জেগে আমরা ‘পতনশীল’, ‘অভিনেতা’ ও ‘ধূলি’-র সাথে ‘তারকা’ শব্দটি সম্পর্ক টানতে বেশি সক্ষম হই।

তবে কথা এখানেই শেষ নয়। ‘পতনশীল’, ‘অভিনেতা’ ও ‘ধুলি’-র সাথে ‘তারকা’ যে সম্পর্কিত তা মনে রাখার সেরা পদ্ধতি হলো এদেরকে একটি ছবিতে যুক্ত করা। ছবিটি হতে পারে কোন বিখ্যাত ‘অভিনেতা’ (যেমন টম ক্রুজ) ‘ধুলো’ দিয়ে ঢেকে গেছেন আর কোন ‘নক্ষত্র’ থেকে ‘পড়ছেন’। সংক্ষেপে আমি বলতে চাই যে, ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর স্বপ্নছবি আমাদের কাছে অদ্ভূতুড়ে লাগে কারণ সে ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে উপাদান সম্পর্কিত করে একটি ‘ধাঁচ’-কে চিত্রায়িত করা হয়। গতানুগতিক ঘটনার তুলনায় আমরা অদ্ভূত ঘটনা খুব দ্রুত স্মরণ করতে পারি। তাই অদ্ভূতুড়ে ছবিগুলো আমাদেরকে ধাঁচটি মনে রাখতে সাহায্য করে।

আমার ব্যক্তিগত স্বপ্ন-ভান্ডার থেকে একটা স্বপ্নছবির কথা বলা যাক। ‘বালি-কাপড় বাড়ি’ স্বপ্নছবিটির বর্ণনা নিচের অংশের মতো লাগতে পারে।

অদ্ভুতুড়ে বাড়িটি সম্পর্কে আমার স্বপ্ন-প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য অংশটা এরকম:

আমি এখন শহরতলির কোন শান্ত রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছি। রাস্তার পাশে গোছানো বাড়ি আছে যাদের সামনে রয়েছে বাগান … তবে একটা কিছু একটু অন্যকরম – যদিও দিনটি রোদেলা আর মনে হচ্ছে সবই ঠিকঠাক … রাস্তার শেষে ব্রিজের পাশে শেষ বাড়িটি মনে হচ্ছে এখনো নির্মাণাধীন। আমি ঐ বাড়িটির দিকে এগুতে থাকলাম, খেয়াল করলাম এটা কি বিশ্রি লাগছে – এর আকৃতি অনেকটা গোলাকার কিন্তু পরিস্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে না। তরাপর আমি দেখলাম কোনকিছু দিয়ে বাড়িটির চারপাশ ঢাকা আছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না জিনিসটা কি – হয়তো এটা কোন বিশাল একটা কাপড় … তারপর আমি এর রঙটি বুঝলাম – হলুদ – আমি আরো দেখলাম বাড়িটি বালি দিয়ে ঢাকা। আমি আতঙ্ক অনুভব করলাম। তারপর স্বপ্নছবিটি বদলে গেল – আমি এখন একটি সমুদ্রতটের দিকে হাঁটছি …

এ স্বপ্নের উপর ভিত্তি করে আমি যদি আপনাকে ‘বাড়ি’, ‘কাপড়’, ও ‘বালি’-কে সম্পর্কিত করতে বলি তাহলে আপনি হয়তো ভুল উত্তর দেবেন। সঠিক উত্তরটি হলো ‘মৃত্যু’। কিন্তু এটি আপনার জানার কথা না। কারণ স্বপ্নটা আমার – আমার অভিজ্ঞতাগুলো মিশ্রিত হচ্ছে, আপনি জানেন না এখানে অভিজ্ঞতাগুলো কি। স্বপ্নটা মনে করার সময় আমি জাগ্রত অবস্থায় এসে গেছি। তাই এদের মধ্যকার সম্পর্ক বের করতে আমাকে বেশ কষ্ট করতে হবে। কারণ আমার জাগ্রত মস্তিষ্ক দূরবর্তী ও অপ্রকট সম্পর্ক সনাক্তকরণের জন্য তৈরি নয়।

তবে এদের সাথে আমার বড় ছেলে সম্পর্কিত। সে একটা বাড়ি কেনার চিন্তা করছে। ঐ বাড়িটিতে কেউ একজন মারা গিয়েছিলো। ছোটবেলায় আমি চোরাবালিতে আটকা পড়ে মারা যাওয়ার ভয় পেতাম। আর ছোটবেলায় আমার একটা বাড়িতে ট্রমার-অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। আমি তখন ভেবেছিলাম আমার প্রিয় কেউ হয়তো মারা যাবে। মৃত ব্যক্তিদের সবসময় একটি কাপড় বা শবাচ্ছাদনবস্ত্র দিয়ে মোড়ানো হয় (এটা একটি সাংস্কৃতিক রীতি যার অংশীদার আমরা সবাই )।

আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বালি-কাপড় মোড়ানো বাড়ির স্বপ্নছবির অন্তর্নিহিত অর্থ হিসেবে উঠে আসে ‘মৃত্যু’। আমি মনে করতে পারি কারণ এ স্বপ্নটা আমাকে জাগিয়ে দিয়েছিলো। তবে অধিকাংশ স্বপ্নই আমরা মনে করতে পারি  না, আর তাদের ব্যাপারে আমরা কখনো সচেতনও হই না।

তবে স্বপ্ন অচেতন পর্যায়ে ধরে রাখা সম্ভব। কোন কিছু সচেতনভাবে স্মরণ করা ও অচেতন পর্যায়ে ধরে রাখার মধ্যে বিশাল তফাত রয়েছে। মস্তিষ্কের প্রায় ৯৮ শতাংশ কর্মকাণ্ড অচেতন ভাবে সংঘটিত হয়। ধরে রাখা স্বপ্নের ধাঁচ এর একটি অংশ হিসেবে থাকতে পারে। জাগ্রত অবস্থায় অনেক অাচরণই হয়তো নির্ধারিত হয় আমার মনে-করতে-না-পারা-স্বপ্নে তৈরি ও চিত্রায়িত অচেতন সম্পর্কের ধাঁচ দিয়ে।

যখন আমার ছেলে বাড়িটি কেনার ব্যাপারে আমার মতামত জিজ্ঞেস করলো, তখন আমি বলতে চেয়েছিলাম ‘বাড়িটি কিনো না’। আমি সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে পছন্দ করি, কিন্তু আমি এ কাজটি কখনোই একা করি না। হয়তো আমার (সচরাচর অচেতন) চোরাবালির আতঙ্কের কারণে। রাত্রিবেলা কোন বাড়িতে একা দুরূহ হয়ে পড়ে আমার ছেলেবেলার অভিজ্ঞতার কারণে। এ বিষয়গুলো আলাদা করে বোঝার জন্য আমার স্বপ্নের সচেতন স্মৃতির প্রয়োজন হয়েছে।

 

৩.

ধাঁচ সনাক্ত করার ক্ষমতা মানব মনের একটি বিশেষ দিক। আমাদের দর্শন-প্রক্রিয়ার ধাঁচ চেনার জন্য প্রায় অসীম ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কেন আমাদের জাগ্রত মস্তিষ্ক যৌক্তিক ও নির্ণয়বাদী ধাঁচ চেনার ক্ষেত্রে দক্ষ, যখন রেম ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সাম্ভব্য ধাঁচ সনাক্তের ক্ষেত্র পারদর্শী? আর সম্ভাবনার ধাঁচ চিত্রায়িত করা রেম স্বপ্নের ছবি কেনইবা অচেতন থাকে?

আমরা বেঁচে থাকার তাগিদে স্বপ্ন দেখি – এই বিবর্তনীয় অনুজ্ঞায় হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে। জীববিজ্ঞানী থিয়োডসিয়াস ডবঝাঙ্কস্কি যেমন বলেছেন, ‘Nothing in Biology Makes Sense Except in the Light of Evolution’ অর্থাৎ ‘বিবর্তনের আলোয় না দেখলে জীববিজ্ঞানের কোন কিছুই অর্থপূর্ণ মনে হয় না’ (১৯৭৩)।

মস্তিষ্কের বিবর্তনে প্রাচীন স্নায়ু-জালিকা থেকে রেম ঘুমের উদ্ভব। মানুষসহ সকল স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যেই দ্রুত-চক্ষু-নাড়াচাড়ার রেম ঘুম দেখা যায়। জটিল চিন্তার জন্য দরকারী ভাষাগত দক্ষতা প্রাণীদের নেই। তবে তারা সম্ভবত ছবির মাধ্যমে চিন্তার করতে পারে। খুব সম্ভবত আদি মানবরাও ছবির মাধ্যমে চিন্তা করতো। এই ছবি-নির্ভর চিন্তা ক্ষমতা রেম ঘুমের প্রাচীন বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত রয়েছে বলে ভাবা হয়। কেন রেম ঘুম অপ্রকট সাম্ভাব্য ঘটনার ধাঁচ সনাক্ত করে অচেতন ছবি হিসেবে ধরে রাখে? এর উত্তর হয়তো প্রাচীন মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কিত।

আদিম মানুষের জন্য কোনমতে বেঁচে থাকাটাই জীবন-সংগ্রামের বিষয় ছিলো। ব্রিটিশ সমাজ-মনস্তত্ত্ববিদ গ্রাহাম ওয়েলা তাঁর দ্যা আর্ট অব থট (১৯২৬) বইটিতে বিভিন্ন বিষয়ে অপ্রকট ধাঁচ চেনার জন্য বিবর্তনীয় অপরিহার্যতার কথা উল্লেখ করেন। যেমন পথে কুড়ে পাওয়া বিভিন্ন বস্তু যারা মানুষের জন্য ‘খাদ্য’, কিংবা বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী যারা মানুষের ‘শিকারী’।  তিনি এ ধরণের প্রাচীন ধাঁচ চেনার প্রক্রিয়াকে ‘পার্থক্যের মধ্যকার সমরূপতা’ হিসেবে দেখার ক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

বালি, কাপড় ও বাড়ি এরা ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনুসারে আমার নিজের কাছে এদের সমন্বিত অর্থ ‘মৃত্যু’। সিংহ, সাপ ও হায়েনা আলাদা হলেও আমাদের পূর্বপুরুষের কাছে এরা সকলেই ‘শিকারী প্রাণী’, যার মানে হলো ‘মৃত্যু’। এভাবে দেখার ক্ষমতার সাথে হয়তো আমার বালি, কাপড় ও বাড়িকে মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত করার বিষয়টি জড়িত। আমার অদ্ভূতুড়ে বালি-কাপড়-বাড়ি হয়তো রেম স্বপ্নে সিংহ, হায়েনা ও সাপ যুক্ত হয়ে ‘সিংহায়সাপ’-এর মিশ্রছবি গঠনের মতো একই মূলনীতি অনুসরণ করে। যদি আদিম মানুষ প্রথমতঃ বিভিন্ন প্রাণীকে শিকারী হিসবে চিহ্নিত করেই থাকে, তারপর দ্বিতীয় ধাপে এদের আচরণের সুস্পষ্ট প্রকাশকে উপস্থিতির নির্ধারক হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে, তাহলে তৃতীয় ধাপ অবশ্যই হবে এদের আচরণের সাম্ভাব্য অপ্রকট ধাঁচ বোঝার চেষ্টা করা যাতে করে আশু বিপদ এড়িয়ে যাওয়া যায়।

আদিম মানুষের জীবনটা কেমন ছিলো? প্রচলিত মত অনুসারে প্রায় দশ হাজার বছর আগে কৃষিকাজ শুরু হয়। তারও আগে মানুষ ছিলো যাযাবর শিকারী-সংগ্রাহক। কিন্তু আদিম মানুষরা কি শিকারের চাইতে তুলনামূলক অধিক সময় খাবারের খোঁজে চরে বেড়াতো? তারা কি আসলেই যাযাবর ছিলো?

স্বল্প সংখ্যক প্রাণীই যাযাবর জীবন যাপন করে। বেশিরভাগই অন্তন এক ঋতু, কয়েক বছর বা আজীবনের জন্য একটি স্থিতিশীল আবাসস্থলে বসবাস করে। প্রাণীরা নিয়মিত যে এলাকাটি ব্যবহার করে তাকে বলা হয় ‘অধিবাস স্থান’। চার্লস ডারউইনও  এ ধারণা সম্পর্কে জানতেন। সংগ্রহের জন্য খাদ্য পাওয়া যাবে কি না (শিকার করা বিপজ্জনক) ও পানি পানের সুযোগ আছে কি না সে অনুযায়ী কোন অধিবাস স্থান বেছে নেয়া হতো। আদিম মানবের জন্য প্রচুর মাছ সম্বলিত নদী বা লেকের নিকটস্থ জায়গা বসতি স্থাপনের জন্য আকর্ষণীয় ছিলো। কোন অঞ্চলে পানি, মাছ, ফল, বাদাম ইত্যাদি সমভাবে বা এলোমেলোভাবে নয় বরং সাধারণত গুচ্ছে গুচ্ছে ছড়ানো থাকে। সুতরাং আদিমানবরা সম্ভবত ঘন ঘন সম্পদ-পূর্ণ জায়গায় যাওয়া-আসা করতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ক্রমানুসারে একাধিক সম্পদপূর্ণ জায়গায় সফর করতো।

এ ধরণের প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ স্থান মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীর জন্য আকর্ষণীয় ছিলো, এটা পরিস্কার। প্রাণীরা অবশ্যই জলাশয়ে যেত। কিন্তু এখানে শিকারী ও শিকার উভয়ই সমবেত হচ্ছে, তাই জায়গাগুলো ছিলো ভীষণ বিপদ-সংকুল। সিংহেরা জলাশয়ের আশেপাশে গাছপালার আড়ালে শিকারের জন্য ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকতো। আর সাপেরা পানির কাছেই শিকারকে ফাঁদে ফেলতে চাইতো। অন্যদিকে এরকম জয়গায় একই প্রজাতীর সঙ্গীরও দেখা মেলে। ফলে জলাশয়ের জায়গাগুলো প্রজনন ও সামাজিকতার সুযোগ তৈরি করে দেয়। একই সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীরাও জলাশয়ে আসে। তাই কখন শিকারী ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনুপস্থিত থাকবে কিন্তু সঙ্গীসাথিরা উপস্থিত থাকবে তা আন্দাজ করতে পারলে তা কোন প্রাণীর টিকে থাকা ও প্রজনন বাড়াবে।

কিন্তু এরকম ভাবীকথন কঠিন। কারণ প্রাণী ও মানুষের আচরণ অনিশ্চিত, সম্ভাবনার উপর নির্ভরশীল। তাই ভবিষ্যদ্বানী নির্ভর করবে অতীত অভিজ্ঞতার সম্ভাবনার ধাঁচ বুঝতে পারার উপর। কখন শিকারী, প্রতিযোগী ও সঙ্গীসাথী জলাশয়ের কাছে থাকবে, আর আমি কখন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবো, এ দু’টি বিষয় আন্দাজ করাটা খুব ভিন্ন কিছু নয়।

জলাশয়ের মতো সম্পদপুর্ণ অঞ্চলের পথে যাওয়া খুবই বিপজ্জনক। কারণ শিকারীরা এর আশেপাশেই নিজেদের লুকিয়ে রাখে। হয়তো কোন আদিমানব সেখানে যাওয়ার পথে এক চিলতে হলুদ দেখল (হয়তো কোন সিংহ)। সে অতীতের শিকারী-প্রাণী দর্শন ও তার সাথে অন্যান্য ঘটনার সম্পর্কিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অচেতন চিত্র-ভিত্তিক অনুমান টানবে। সাথে সাথে সে অন্যদের বিষয়টি জানাবে সফর চালিয়ে যাওয়া কিংবা পালিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রাণের-ঝুঁকি আছে এমনতরো অবস্থায় যে কোন পদক্ষেপ দ্রুত নিতে হবে। অচেতন অবস্থার ভাবীকথক মানসিক ছবি বিপদের মুখে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

ছবি ১-এর সরলীকৃত রেখাচিত্রে এরকম একটি অবস্থা চিত্রিত করছে। আদিম মানুষ সচরাচর ক্রমানুসারে 1 থেকে 5 নম্বর স্থানে যাতায়াত করে। কিন্তু এবার জলাশয়ের কাছে যাওয়ার সময় (4 নম্বর স্থানে) তার মাঝে সাম্ভাব্য বিপদের কোন ইঙ্গিত দেখে একটি অচেতন মানসিক ছবি তৈরি হয়। এর ভিত্তিতে সে 3 নম্বর স্থানে দ্রুত ফেরত গিয়ে লুকিয়ে পড়ে।

সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তার এই সফর ধারাবাহিক পূর্বচিহ্নিত স্থানের উপর নির্ভরশীল। সেখানে একটি ভবিষ্যদ্বানীর অনুক্রম জড়িত আছে। যেমন যদি আদি মানব 2 নাম্বার স্থানে খাদ্য-সম্পদ ফেলে যায়, তখন সে জানে যে এর পর একটি আশ্রয় স্থান আছে (3 নাম্বার স্থান), যার পরে জলাশয়টি রয়েছে। এ ধরনের যৌক্তিক অনুমান যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সাথেই টানা সম্ভব। অন্যদিকে এইসব স্থানের মধ্যে ‘কি ঘটতে পারে’ তা অাত্মবিশ্বাসের সাথে আন্দাজ করা সম্ভব নয়। কারণ এর সাথে অন্যান্য জীবের আচরণ জড়িত রয়েছে।

 

ছবি ১: আদিম মানুষ খাদ্য সংগ্রহের জন্য যে ভ্রমণ-পথ অনুসরণ করতে পারে তার সাম্ভাব্য রেখাচিত্র

 

আদি মানুষের এরকম মজ্জাগত ও স্থায়ী অভিজ্ঞতাই হয়তো মস্তিষ্কের সজাগ দশা ও রেম স্বপ্ন দশার জন্ম দিয়েছে। জাগ্রত অবস্থায় আমাদের সচেতন চিন্তা বেশ যৌক্তিক ও ধারাবাহিক। আমরা নির্ণয়নশীল ধাঁচ চিহ্নিত করতে পারি এবং পরবর্তীতে কি ঘটবে তা আত্মবিশ্বাসের সাথে অনুমানে এ ধাঁচ ব্যবহার করতে পারি।

নির্ণয়নশীল ধাঁচের বিপরীতে জীবন্ত প্রাণীর অাচরণ পূর্বনির্ধারিত নয়, তবে এরা সম্ভবত কি করতে পারে তা অনুমান করা যায়। রেম ঘুমে স্বপ্নের সময় মস্তিষ্ক এরকম সম্ভাবনার ধাঁচ সনাক্তকরণে তুলনামূলক অধিক পারদর্শী। এসব ধাঁচ অচেতন মনে ছবি হিসেবে অঙ্কিত হয় যা জাগ্রত অবস্থার জন্য রেখে দেয়া হয়। যখনই ব্যক্তির অচেতন মনে বিপজ্জনক অবস্থায় সজ্ঞাজাত দ্রুত-কর্মতৎপরতার প্রয়োজন অনুভূত হয়, তখন অতীত অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত এসব ছবি এক চিলতে হলুদ রঙের মতো দ্ব্যার্থক ও অস্পষ্ট ঘটনার সাম্ভাব্য গুরুত্ব আন্দাজ করতে চেষ্টা করে। এ বিষয়টি একটা বিস্ময়কর উপসংহারের জন্ম দেয়, তা হলো বিবর্তনীয় অতীতে আমরা বেঁচে থাকার জন্য স্বপ্ন দেখতাম।

 

৪.

আমরা বলতে পারি না যে স্বপ্ন সত্যি হবে। তবে আমরা এটা বলতে পারি যে স্বপ্ন ভবিষ্যদ্বানী করে। আমি মনে হয় না কখনো শহরতলীর রাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় বালিতে আবৃত বাড়ি দেখে ভয় পাবো। কিন্তু মনে হয় নিজের অভিজ্ঞতার সম্ভাবনার ধাঁচগুলো এসব স্বপ্নে সনাক্ত হয়। দীর্ঘ অতীতে এসব ধাঁচ কোন স্থানে কি ঘটতে পারে তা আন্দাজ করতে ব্যবহৃত হতো। আপনি ভেবে দেখুন, স্বপ্ন কিন্তু এটাও বলতে পারে যে আমি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিভাবে আচরণ করবো। কারণ এ ঘটনার পরিণতিগুলো আমি স্বপ্নে অচেতনভাবে জানছি। আপনি এখন জানেন আমার পছন্দের কেউ ব্যক্তি যদি এমন কোন বাড়ি কিনতে ইচ্ছুক হন যেখানে কেউ মারা গেছে, তাহলে আমি তাকে কিনতে নিষেধ করবো। আমার স্বপ্নে আমি যেসব সম্পর্ক নির্মাণ করি সেগুলোর অর্থ যদি আপনি জানেন, তাহলে আমার আচরণ কেমন হবে আপনি সেটা বলতে পারবেন। কিন্তু আপনি যদি আমার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবগত না হন তাহলে মনে হয়না আপনি আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।

 

ফারাও জেলখানার অন্ধকূপ থেকে জোসেফকে তলব করলো তার স্বজাতিভক্ষক গরু বিষয়ক স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য। আমরা কখনোই জানবো না ফারাওয়ের কোন অভিজ্ঞতা সাতটি স্বজাতিভক্ষক গরুর চিত্র নির্মাণ করেছে। একমাত্র আপনি নিজেই নিজের স্বপ্ন ব্যাখ্যা করতে পারেন। তবে জোসেফের দরকার ছিলো দ্রুত সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া। ফারাও যাতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন এমন ব্যাখ্যা দেয়া সুবুদ্ধির পরিচয় ছিলো। আমার মনে হয় না জোসেফ জানতেন এ স্বপ্নের রূপক অর্থ কি। কারণ তিনি ফারাও ছিলেন না। তবে তিনি ফারাও সম্পর্কে জানতেন। আরো জানতেন মিশরের ঋতুচক্র সম্পর্কে। তাই তিনি একটি ভবিষ্যদ্বানী করতে পেরেছিলেন যা ঘটা সম্ভব।

 

বিবর্তনীয় ভাষায় বলতে হয়, রেম স্বপ্নে যে দৃশ্য-সংকেত তৈরি হয় তা অচেতন বা লুকানো রয়ে যায়। এতে আদিম মানুষ জলাশয়ে যাওয়ার পথের মতো অবস্থায় সাম্ভাব্য বিপদ বা পুরষ্কারের ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারতো। আধুনিক জীবনে আমরা এখনো পরিচিত জায়গায় যাতায়ত করি সম্পদ আরোহনের জন্য। আমরা বাসা ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে যাই জীবিকা নির্বাহের জন্য। আমরা বাজারে যাই, বন্ধুর সাথে কফি খাই আর জিমে গিয়ে ব্যয়াম করি কর্মক্ষম থাকার জন্য। এসব সফরে যদিও আমরা শত্রু থেকে দূরে থাকতে চাই কিংবা সঙ্গীর খোঁজ করি। তবে আমাদের পূর্বপুরুষদের মতো কোন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়ি না যেখানে অন্য শিকারী প্রাণীর সম্মুখীন হতে হয়। এখন আর টিকে আমরা থাকার জন্য স্বপ্ন দেখি না।

তবে রেম ঘুমে অতীত অভিজ্ঞতায় সম্ভাবনার ধাঁচ সনাক্ত করার ক্ষমতা এখনো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের নানা রকম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি পড়তে হয়। এই ‘লুকানো’ সংকেত আমাদের স্বজ্ঞা অনুসারে কাজ করে অনিশ্চয়তা পাড়ি দিতে সাহায্য করে। স্বপ্নে লুকানো সংকেতের অর্থ উদ্ধার করা কি কোনভাবে সাহায্য করতে পারে? হ্যাঁ, বিশেষ করে যদি লুকানো কোন সংকেত আমাদেরকে বিপদজনক নয় এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত করে তোলে। যেমন আমার মতো বাড়িতে একা থাকার মতো পরিস্থিতিতে। আপনি হয়তো ভাবেন আপনি নিজেকে জানেন। তবে আপনি নিজের সম্পর্কে আরো অন্তর্দৃষ্টি লাভ করবেন যদি নিজের স্বপ্নের মাধ্যমে নিজেকে বুঝতে পারেন।

 

 

স্যু লেওয়েলিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববিদ্যার প্রফেসরতিনি স্বপ্ন, সৃজনশীলতা মনরোগের পারষ্পারিক সম্পর্ক বিষয়ে আগ্রহীমূল লেখা Are dreams predictions?, অনলাইন পত্রিকা aeon.co-তে প্রকাশিত। অনুবাদটি আমার বই প্রাণের বিজ্ঞান: সাম্প্রতিক জীববিজ্ঞানের ভাবনা ভাষান্তর (২০১৭) থেকে নেয়া।

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 70 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত