তারামন্ডলের আরেকটি বড় সৌন্দর্য হল এই ধনু। নামটা শোনার সাথেই ধনুক এর কথা মনে হবে। SAGITTARIUS একটি ল্যাটিন শব্দ। এর অর্থ তীরন্দাজ। ধনু মন্ডলকে দেখলে মনে হবে কোন সেন্টর কাউকে নিশানা করে তীর হাতে দাঁড়িয়ে আছে। এখন মাথায় আসতে পারে, সেন্টর কি! গ্রীক পুরাণমতে সেন্টর হল স্বর্গরাজ্যের এক অদ্ভুত প্রাণী যাদের উপরের অংশ মানুষের মত, আর নিচের অংশ ঘোড়ার মত। তারা বেশিরভাগ যোদ্ধা ছিল। তাদের মধ্যে কিরণ ছিল সবচেয়ে বড় ধনুর্বিদ। বয়োজ্যেষ্ঠ এই ধনুর্বিদের সমকক্ষ আর কেউ হতে পারেনি শত চেষ্টাসত্ত্বেয়। বড় বড় বীরেরা, একিলিস, হেক্টর, জ্যাসন, হারকিউলিস প্রমুখ ছিল তার ছাত্র। একদিন সেন্টরদের সঙ্গে যুদ্ধ করার সময় নিজের অজান্তেই তার ছাত্র হারকিউলিস,কীরনকে তীরবিদ্ধ করে ফেলে। হাইড্রার রক্তমাখানো সে বিষাক্ত তীরের বিষক্রিয়ার ব্যথায় কাতর হয়ে একসময় কীরণ জিউসের কাছে ব্যথা নিরাময়ের প্রার্থনা করে। ফলে জিউস তাকে স্বর্গে উঠিয়ে নেয় এবং সসম্মানে নক্ষত্রলোকে স্থাপন করে। নক্ষত্রলোকে কীরন ধনুরাশির প্রতীক হয়ে ওঠে। অন্য বর্ণনামতে, বিষের ব্যথায় কাতর হয়ে ক্ষত নিরাময়ের কোনো উপায় না জেনে নিজের অমরত্ব প্রমিথিউসকে দান করে ইচ্ছা-মৃত্যু বরণ করে। আর কীরনের এই মহানুভবতায় প্রীত হয়েই জিউস তাকে নক্ষত্রলোকে স্থাপন করে। এই ধনু মন্ডলকে আকাশে চিনতে পারা খুব বেশি কষ্টের নয়। হেমন্তের পরিষ্কার আকাশে একে দেখা যায়। এটি দেখতে (Tea pot) এর মত। দক্ষিণ আকাশে এর অবস্থান। ঠিক ছবিতে যেরকম আছে। এবার তাহলে এই ধনু মন্ডল এর তারাগুলো সম্পর্কে জানা যাক।

Kaus Australis – (Epsilon Sagittarii): কাউস অস্ট্রেলিস প্রায় ১৪৩ আলোকবর্ষ দূরে। এটি ধনুমন্ডল এর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা এবং আকাশের ৩৬ তম উজ্জ্বল তারা। এই কাউস অস্ট্রেলিস শব্দটা এসেছে আরবী শব্দ ‘কাউস – qaws’ (ধনু) এবং ল্যাটিন শব্দ ‘অস্ট্রেইলিস – australis’ (দক্ষিণভাগ)। দুটি তারা ডেল্টা স্যাজিট্রি এবং ল্যাম্বডা স্যাজিট্রি মিলে এই যোদ্ধার ধনুকে নির্দেশ করে।

Nunki – (Sigma Sagittarii): এটি ধনুমন্ডল এর দ্বিতীয় উজ্জ্বল তারা। এটি প্রায় ২২৮ আলোকবর্ষ দূরে। এর অপর নাম ‘নুনকি’। এই নামটা ব্যাবিলন থেকে এসেছে। তবে এর উৎপত্তি কোথায় তা জানা জায়নি। ধারণা করা হয় এটি ব্যাবিলন এর ‘এরিদু’ নামক শহরকে নির্দেশ করে।

Kaus Media – (Delta Sagittarii): এটি প্রায় ৩৪৯ আলোকবর্ষ দূরে। এর ব্যাসার্ধ প্রায় সূর্যের ৬২ গুণ এবং ভরে প্রায় ৫ গুণ। এই ‘কাউস মিডিয়া’ শব্দের অর্থ হলো ধনুকের মধ্যভাগ।

Kaus Borealis – (Lambda Sagittarii): এটি একটি কমলা বর্ণ দানব তারা। এটি প্রায় ৭৮ আলোকবর্ষ দূরে। এটি ব্যাসার্ধে সূর্যের থেকে ১১ গুণ বড়। ‘কাউস বোরেলিস’ শব্দের অর্থ ধনুর উত্তরভাগ। এই ল্যাম্বডা স্যাজিট্রি এর পাশে একটি নেবুলা রয়েছে যার নাম ‘লাগুন’।

Rukbat – (Alpha Sagittarii): আলফা স্যাজিট্রি একটি নীল বামন তারা। এটি প্রায় ১৮১ আলোকবর্ষ দূরে। এর ‘ডেরবিস ডিস্ক’ আছে বলে ধারণা করা হয়। ডেরবিস ডিস্ক হলো বিভিন্ন ধুলা, তারার ধ্বংসাবশেষ বিশিষ্ট একটি গোলাকার রিং। এই আলিফা স্যাজিট্রি থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় এক্স-রে নির্গত হয়। আরবী ‘রুকাবাত’ শব্দের অর্থ হাঁটু।

Arkab – (Beta Sagittarii): এটি প্রায় ৩৭৮ আলোকবর্ষ দূরে। বিটা স্যাজিট্রি দুইটা তারার সমন্বয়ে গঠিত যথাক্রমে বিটা-১ এবং বিটা-২। এই বিটা স্যাজিট্রি এর আরেক নাম আকরাব। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী নাম যার অর্থ একিলিস এর টেন্ডন।

Ascella – (Zeta Sagittarii): এটি ধনুমন্ডল এর তৃতীয় উজ্জ্বল তারা। এটি প্রায় ৮৮ আলোকবর্ষ দূরে। এর অপর নাম আসসেলা। এটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ ‘বাহুমূল’। জিটা স্যাজিট্রি দুটি তারার সমন্বয়ে গঠিত। দুটি তারার মধ্যবর্তী দূরত্ব ১৩.৪ এস্ট্রোনমিকাল ইউনিট।

φ Sagittarii (Phi Sagittarii): এটি পৃথিবী থেকে ২৩১ আলোকবর্ষ দূরে। এটা চিত্রের চায়ের পাত্রের হাতল এবং ঢাকনার জয়েন্টে অবস্থিত।

Albaldah – π Sagittarii (Pi Sagittarii): এর আরেক নাম আলবালদাহ। এটি আরবী শব্দ ‘বালদাহ’ থেকে এসেছে যার অর্থ শহর। এটি পৃথিবী থেকে ৪৪০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এটি তিনটি তারার সমন্বয়ে গঠিত।

Alnasl (Nushaba) – (Gamma Sagittarii): গামা স্যাজিট্রি একটি দানব তারা। এটি প্রায় ৯৬.১ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এটা দুইটি তারার সমন্বয়ে গঠিত। গামা স্যাজিট্রি আলনাসল বা নুশাবা নামে পরিচিত। আরবী শব্দ ‘আল-নাসল’ থেকে এসেছে যার অর্থ তীরের মুখ। নুশাবা এসেছে আরবী শব্দ ‘যুজ আল-নাশশাবা’ যার অর্থ ও একই।

τ Sagittarii (Tau Sagittarii): টাউ স্যাজিট্রি একটা কমলা বর্ণের দানব তারা যা প্রায় ১২০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এটি জিটা এবং সিগমা স্যাজিট্রি এর মাঝখানে অবস্থিত। ১৯৭৭ সালের ১৫ আগস্ট এ ড. এহম্যান এর থেকে একটি রেডিও সিগনাল ডিটেক্ট করেন যা ‘ওয়াও’ সিগনাল নামে পরিচিত। এটি প্রথম পৃথিবীর বাইরে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্বের সম্ভাবনা তৈরী করেছিল। এই সিগনাল ৭২ সেকেন্ড যাবত স্থায়ী ছিল।

Sephdar (Ira Furoris) – (Eta Sagittarii): ইটা স্যাজিট্রি প্রায় ১৪৯ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এর আরেক নাম সেফডার। এই সেফডার শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে আজও জানা যায়নি। এটি যখন ধনুমন্ডল এর অংশ ছিলো না তখন এর নাম ছিল বিটা টেলিস্কোপি।

এরপর কোনো এক অন্ধকার রাতে খোলা আকাশের নিচে হয়তো তুমিও উপভোগ করতে পারবে ধনুমন্ডলের সৌন্দর্য।

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন Sakib Shahriar

খুবই সাদা মনের মানুষ।

Sakib Shahriar বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 2 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত