ঘড়ির ঘণ্টার কাটা ঘুরানোর কথা চিন্তা করুন। গণিতবিদেরা অনেক আগে থেকেই জানেন কিভাবে এধরনের ঘূর্ণনকে সাধারণ গুণন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। খুব সহজ, যে সংখ্যা দিয়ে কাটার অবস্থান প্রকাশ করা হল, সেটাকে আরেকটা ধ্রুবক সংখ্যা দিয়ে গুণ করলে ঘুরে যাবে অবস্থান। এ ঘুর্ণন তো ছিল একটা তলে, মানে দ্বিমাত্রিক ঘুর্ণন। তাহলে এরকম সহজ উপায় দিয়ে কি ত্রিমাত্রিক ঘুর্ণনকেও ব্যাখ্যা করা যায়? এই সমস্যাটাই এক দশকের বেশি ভাবিয়েছে উইলিয়াম হ্যামিল্টনকে। তিনি ছিলেন ১৯ শতকের অন্যতম এক গণিতবিদ। সমাধান করতে গিয়ে তিনি পেলেন চার মাত্রিক এক নতুন সংখ্যা পদ্ধতি, যা সূচনা করেছে আধুনিক বীজগণিতের।

বাস্তব সংখ্যার সাথে আমরা পরিচিত। স্কুলে শেখা যে সংখ্যারেখা আঁকি, তার সবই বাস্তব সংখ্যা। যেমনঃ \(0,–3.7, 5\sqrt{2}, 42\)। ধনাত্বক, ঋণাত্বক, ভগ্নাংশ, মূলদ, অমূলদ সবই এর অংশ। এরপর বিভিন্ন হিসাব ও সমীকরণ সমাধানে প্রয়োজন পড়ে একটা নতুন ধরনের সংখ্যার, কাল্পনিক সংখ্যা \((i)\)। একে বাস্তব সংখ্যারেখায় স্থান দেয়া গেল না। বরং তার লম্ব বরাবর দিতে হল এই কাল্পনিক সংখ্যা রেখা। ফলে সংখ্যারা শুধু এক মাত্রিক রেখাতেই সীমাবদ্ধ থাকল না। বাস্তব ও কাল্পনিক অক্ষ মিলে তৈরি হল সংখ্যার জটিল এই তলে জটিল সংখ্যাকে অ্যারো দিয়ে প্রকাশ করা যায়। যোগে-বিয়োগের মাধ্যমে স্থান পরিবর্তন করানো যায়; গুণ-ভাগের মাধ্যমে ছোট বড় করা যায়, ঘোরানো যায়।
ধরুন,
বাস্তব সংখ্যা, \(ℝ: a\)
জটিল সংখ্যা, \(ℂ : a+bi\)
\(ℝ ⊂ ℂ\)

যোগ করার মাধ্যমে জটিল সংখ্যাতলে সরণ ঘটানো যায়। \((a+bi)\) এর অবস্থান বাস্তব অক্ষে \(a\) একক ডানে আর কাল্পনিক অক্ষে \(b\) একক উপরে। এর সাথে যদি \((c+di)\) যোগ করা হয়, তবে নতুন অবস্থান হয় \((a+c)+(b+d)i\)। অর্থাৎ, বাস্তব অক্ষ বরাবর \((a+c)\) একক ডানে, কাল্পনিক অক্ষে \((b+d)\) একক উপরে।
গুণ করার মাধ্যমে সংখ্যাকে তলে ঘুরানো যায়।
\(i\) দিয়ে গুণ করলে \(90\) ডিগ্রি ঘোরে। \((a+bi)\) হয়ে যায় \((-b+ai)\)।
\(i^2\) দিয়ে গুণ করলে \(180\) ডিগ্রি ঘোরে। \((a+bi)\) হয়ে যায় \((-a-bi)\)।
একইভাবে \((a+bi)\) কে \(45\) ডিগ্রি ঘুরাতে চাইলে এর সাথে গুণ দিতে হবে \((\frac{1}{\sqrt{2}}+\frac{1}{\sqrt{2}} i)\)।

গণিতবিদ হ্যামিল্টন বিষয়টাকে আরো একধাপ উপরে নিতে চাইলেন। ভাল কথা, তিনিই কিন্তু ক্লাসিকাল আর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের হ্যামিল্টনিয়ান অপারেটরের জনক। তিনি আরো একটা কাল্পনিক অক্ষ j আনলেন, ফলে সংখ্যা হয়ে গেল তিন মাত্রিক। কিন্তু এই তিন মাত্রিক সংখ্যায় কোথায় যেন একটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছিল। গুণ করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছিল। অনেক চিন্তা করেও সমস্যার কোন সুরহা পাচ্ছিলেন না তিনি। যেমন, দেখালাম জটিল সংখ্যাতলে গুণ ঘুর্ণন তৈরি করে। i দিয়ে গুন দিলে সংখ্যা ৯০ ডিগ্রি ঘোরে। কিন্তু 3-D জন্য তিনি অনুরুপ কোন গুণনের সম্পর্ক বের করতে গিয়ে আটকে গিয়েছিলেন। 3-D ঘুর্ণন কেন কঠিন তা বোঝার জন্য একটা ঘুরন্ত চাকতির সাথে গোলকের তুলনা করা যাক। চাকতির প্রত্যেক বিন্দু একইসাথে একই ভাবে ঘোরে। তাই এদের একই জটিল সংখ্যা গুণ করলেই চলে। কিন্তু গোলাকের ক্ষেত্রে তা হয় না। এর বিষুবরেখার বিন্দুগুলো উপর-নিচের চেয়ে দ্রুত ঘোরে। আবার মেরুবিন্দু গুলো তো ঘোরেই না। যদি এর সব বিন্দুগুলোই একভাবে ঘুরত, তাহলে একে 2-D ঘূর্ণনের মত করে ব্যাখ্যা করা যেত, কিন্তু সেটা হচ্ছে না।

চিত্রঃ কোয়াটারনিয়নের বিখ্যাত ফলক \((i^2=j^2=k^2=ijk=-1)\), ব্রুম ব্রীজ, ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড। (উইকিপিডিয়া)

অবশেষে সমাধানটা হ্যামিল্টন সাহেবের মাথায় আসে ১৬ অক্টোবর, ১৮৪৩ এ যখন তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ডাবলিনের ব্রুম ব্রীজ পার হচ্ছিলেন। সমাধানটা হল গোলকটিকে একটা স্পেসে এমন ভাবে বিদ্ধ করা যেন এই অক্ষ বরাবর ঘূর্ণন দ্বিমাত্রিকের মত হয়। এর জন্য হ্যামিল্টনের প্রয়োজন পড়ল দুইটা নয়, বরং তিনটা কাল্পনিক অক্ষ, \(i\), \(j\) ও \(k\); সাথে একটা বাস্তব সংখ্যা রেখা। এই চারটা অংশ নিয়ে একটা নতুন ধরনের সংখ্যা উপস্থাপন করা হল। এটা 4-D স্পেসে একটা অ্যারো নির্দেশ করে। একেই নাম দিলেন “Quaternion” \((ℍ)\)। সেই সাথে তিনি 3-D অ্যারোকে ঘুরানোরও একটা উপায় বের করে ফেললেন। এর জন্য তিনি কোয়াটারনিয়নের বাস্তব অংশ a কে শুন্য ধরলেন। তখন থাকে শুধু তিনটা কাল্পনিক অংশ \(i\), \(j\) এবং \(k\) — এই ত্রয়ীকে তিনি নাম দিলেন “ভেক্টর”। এই 3-D ভেক্টরকে ঘুরানোর অর্থ হল এক জোড়া 4-D কোয়াটারনিয়ন দিয়ে গুণ করা, এই কোয়ান্টারনিয়ন জোড়ায় থাকবে ঘুর্ননের দিক ও মাত্রার তথ্য।

ধরুন, ভেক্টর \(V = \left< V_1,V_2,V_3 \right>\)

একে \(P(x,y,z)\) বিন্দুর সাপেক্ষে \(θ\) কোণে 3-D তে ঘুরাব।

কোয়াটারনিয়ন জোড়া \(h=a+bi+cj+dk\) এবং \(h^*=a-bi-cj-dk\)।

যেখানে \(a=\cos{(\frac{θ}{2})}\), \(b=V_1 \sin{(\frac{θ}{2})}\), \(c=V_2\sin{(\frac{θ}{2})}\), \(d=V_3 \sin{(\frac{θ}{2})}\)।

এখন বিন্দুটিকে \(P=xi+yj+zk\) দিয়ে প্রকাশ করলে তার সাপেক্ষে ঘূর্ণন হবেঃ \(hPh^*\) ।

 বাস্তব ও জটিল সংখ্যায় যা করা যায়, কোয়াটারনিয়নে তার সবই হয়। শুধু একটা পার্থক্য আছে। আমরা জানি, \(2 × 3\) আর \(3 × 2\) উভয়ই হয় \(6\); কিন্তু কোয়াটারনিয়নের গুনের বেলায় এটা হয় না। গণিতবিদেরা সংখ্যার এমন বৈশিষ্ট্য এর আগে কখনো দেখেন নি। আসলে দৈনন্দিন জীবনে আমরা কিন্তু এমন্টাই দেখি। একটা উদাহরন দেই। আপনার ফোন টেবিলের উপর রাখুন। বামে \(90\) ডিগ্রি ঘুরান, এবার আপনার দিকে উল্টিয়ে দিন, দেখবেন ফোনের ক্যামেরা বামদিক নির্দেশ করছে। এখন ফোন আগের অবস্থায় আনেন। এইবার প্রথমে আপনার দিকে উল্টান, তারপর বামে ঘুরান। দেখুন এখন ক্যামেরা ডান দিকে, তাই না? রুবিক্স কিউব দিয়েও বিষয়টা খেয়াল করতে পারেন। R’+F মুভ আর F+R’ মুভ দিলে কম্বিনেশন কি একই থাকে? নাহ, থাকে না।

এই বৈশিষ্ট্যকে বলে বিনিময়-অযোগ্যতা (non-commutativity)। দেখাই যাচ্ছে কোয়াটারনিয়নের এই বৈশিষ্ট্য বাস্তবতার সাথে বেশ মিলে। অর্থাৎ এখানে \(AB≠BA\)।

কিন্ত এখানেও একটা ত্রুটি থেকে যায়। যখন আপনার ফোন বা অ্যারোকে \(360\) ডিগ্রি ঘুরানো হয়, এর সম্পর্কিত কোয়াটারনিয়ন চতুর্মাত্রিক স্পেসে \(180\) ডিগ্রি ঘোরে। তাই কোয়াটারনিয়নকে পূর্ব অবস্থার আনতে অ্যারোকে সম্পূর্ণ দুইটা ঘুর্ণন দিতে হবে। বিষয়টা বুঝতে এই ঘুরন্ত কিউবটা দেখুন। এর সাথে যুক্ত ফিতার দিকে লক্ষ রাখুন। একবার ঘুরে আসলে ফিতা পেঁচিয়ে যায়। আর দ্বিতীয় ঘূর্ণনে প্যাঁচ খুলে যায়। কোয়াটারনিয়ন এভাবেই আচরণ করে।

কোয়াটারনিয়নে উর্ধ্বমুখী অ্যারো কৃত্রিম ঋণাত্বক চিহ্ন দেয়, এটা ফিজিক্সে বেশ ঝামেলা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কোয়াটারনিয়ন আবিষ্কারের ৪০ বছর পরেও ফিজিক্সে এটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাক-বিতণ্ডা চলে। পরিস্থিতি আরো গুরুতর হয়ে যায় যখন ইয়েল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জোসায়াহ গিবস আধুনিক ভেক্টরের ধারণা উপস্থাপন করেন। চার মাত্রা নিয়ে ঝামেলা এড়াতে তিনি কোয়াটারনিয়নের বাস্তব অংশ \(a\) বাদ দিয়ে দিলেন। থাকল কেবল \(i, j, k\)। এদের গুণ করার পদ্ধতি দুইটা অপারেশনে ভাগ করে দিলেনঃ ডট গুণন আর ক্রস গুণন। এরপর কোয়াটারনিয়ন বনাম ভেক্টর নিয়ে বহু বছর আলোচনা সমালোচনা চলে। বহু পেপার, জার্নালে লেখালেখি হয় পক্ষে-বিপক্ষে। শেষমেশ ব্যবহার উপযোগীর দিক দিয়ে জয়ী হয় ভেক্টর।

কোয়াটারনিয়ন অনেকদিন ভেক্টরের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে। ১৯২০ এর দিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে এটা নতুনভাবে পরিচয় পায়। দেখা গেল ফোটন ও অন্য বলবাহী কণা \(360\) ডিগ্রি ঘুরে আদি দশায় ফিরে। কিন্তু ইলেক্ট্রন ও অন্যান্য ভরবাহী কণার স্পিন তেমন না। আদি দশায় ফিরতে এদের প্রয়োজন হয় দুইটা পূর্ণ ঘুর্ণন অর্থাৎ \(720\) ডিগ্রি। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই, এই বৈশিষ্ট্য ইংগিত দেয় কোয়াটারনিয়নের দিকে। এখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সে এর নাম স্পিনর।

তবুও পদার্থবিদেরা তাদের সচরাচর হিসাবকাজে কোয়াটারনিয়ন তেমন ব্যবহার করলেন না। স্পিনর নিয়ে কাজ করতে তারা ম্যাট্রিক্সের সাহায্য নিলেন। গত কয়েক দশকে আবার নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে কোয়াটানিয়ন। কম্পিউটার গ্রাফিক্সে ঘূর্ণন হিসাবে এটা কাজে আসে। আবার কাজে আসে উচ্চমাত্রিক তলের জ্যামিতিতে। এরকম একটা বিশেষ তল হল হাইপারকাহলে ম্যানিফোল্ড (hyperkähler manifold)। এটার চমৎকার বৈশিষ্ট্য হল এটা দিয়ে ভেক্টরগ্রুপ ও স্পিনরগ্রুপের মধ্যে সম্পর্ক আনা যায়। ভেক্টর বলবাহী কণাকে বর্ণনা করে, আর স্পিনর করে ভরবাহী কণাকে। তাই পদার্থবিদেরা খুব এটা নিয়ে কৌতুহলী হয়ে পড়েন, এ দুই ধরনের কণার মধ্যে কোন সিমেট্রি (সুপারসিমেট্রি) আছে কি না।

তবে গণিত-মহলে কোয়াটানিয়ন নিয়ে মাতামাতি কখনো কমে নি। হ্যামিল্টনের এই আবিষ্কারের পরপরই অনেক গণিতবিদ লেগে পড়েন নিজেদের সংখ্যা পদ্ধতি তৈরির কাজে। যদিও সেগুলোর বেশিরভাগ ছিল অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু আস্তে আস্তে এসব কাজের ফলাফলই দোয়ার খুলে দেয় আধুনিক অ্যালজেব্রার। আর সেই সূত্র ধরে এখনকার বিমূর্ত গণিতবিদেরা (abstract algebraists) গবেষণা করে চলেছেন অদ্ভুত-চমকপ্রদ বৈশিষ্টের হরেক রকম সংখ্যা পদ্ধতি নিয়ে, যেকোন সংখ্যক মাত্রা নিয়ে।

তো হ্যামিল্টনের বন্ধু জন গ্রেভস আরো এক ধাপ এগিয়ে আরেকটা সংখ্যা পদ্ধতি বের করলেন। এটা কোয়াটানিয়নের মত চারমাত্রিক না, বরং এটা হল আট মাত্রিক “Octonion” \((𝕆)\)। প্রথমদিকে ভাবা হচ্ছিল এটার বাস্তব কোন ব্যবহার নেই। কোয়াটারনিয়ন শুধু গুণের বিনিময় (Commutative) বৈশিষ্ট্য হারায়। আর অক্টানিয়ন শুধু বিনিয়ম না, সেই সাথে এটা মানে না গুণের সংযোগ সূত্র (Associative low)। মানে এখানে \((AB)C≠A(BC)\)। কিন্তু এখন অনেক পদার্থবিদেরা মনে করেন এই আট মাত্রিক সংখ্যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ করে কণাপদার্থবিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।

এখানেই কিন্তু শেষ না। গণিতবিদেরা কি আর থেমে থাকার পাত্র! তারা উপস্থাপন করলেন ১৬ মাত্রিক সংখ্যা, “Sedenion” \((𝕊)\)। বুঝতেই পারছেন এটা আরো বেশি বিমূর্ত। হারায় বাস্তব সংখ্যার আরো কিছু গুণাবলি ।

চিত্রঃ উচ্চমাত্রিক বিভিন্ন সংখ্যা-পদ্ধতির গুণাগুণের তুলনা (উইকিপিডিয়া)

বাস্তব ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ হোক বা না হোক, গণিতজ্ঞদের চিন্তাশক্তিকে তো দমিয়ে রাখা যায় না। তবুও বলা যায় না, হয়তো দেখা গেল, বিজ্ঞানের কোন জটিল সমস্যা সমাধানে এই সংখ্যার শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। গণিত-বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন উদাহরণ নেহাৎ কম নয়।

আজকের লেখা এখানেই শেষ করছি। গণিতের রাজ্যে সবার ভ্রমণ শুভ হোক।

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন মুবতাসিম ফুয়াদ

শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মুবতাসিম ফুয়াদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 7 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত