আফ্রিকার বিড়াল [African Cats – 2011]

প্রাণী প্রকৃতি পরিবেশের উপর তথ্যচিত্র দেখতে কার না ভাল লাগে? তেমনই একটি অসাধারণ তথ্যচিত্র African Cats দেখে ফেললাম। ২০১১ সালের আর্থ ডে বা ধরিত্রী দিবসকে উপলক্ষ করে  ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিও এই ডকুমেন্টারিটি রিলিজ দেয়। এসব প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্টারি তৈরির জন্য ডিজনির[১] স্বতন্ত্র একটি শাখা আছে Disneynature নামে এরই আওতায় Oceans, Earth, Chimpanzee, Bears নামের ডকু ফিল্মগুলো মুক্তি পেয়েছে। বলা বাহুল্য প্রত্যেকটিই অসাধারণ। বরাবরের মতো African Cats ও অসাধারণ হয়েছে।

Cat বলতে এখানে শুধু বিড়ালকে বুঝানো হয়নি। বিড়াল জাতীয় প্রাণী বাঘ ও সিংহকে বুঝানো হয়েছে। মূলত ডকুটি বাঘ ও সিংহের জীবনধারণ, চলাফেরা, যুদ্ধ, সংগ্রাম ইত্যাদি নিয়ে তৈরি হয়েছে। একদল বাঘ শাবক আর একদল সিংহ শাবকের ছোটবেলাকার গল্প এবং তার পটভূমিতে আশেপাশের সকল ঘটনা চরিত্রকেও চিত্রায়িত করা হয়েছে। আঁকারে ছোট (দেড় ঘণ্টা) হলেও এর পটভূমি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পরিমাণ বিস্তৃত।

চিত্র: আঁকাবাঁকা নদী দিয়ে একটি এলাকা দুই ভাগে বিভক্ত। দুই ভাগে দুই রাজ্য, দুই রাজার শাসন।

কেনিয়ার এক সংরক্ষিত এলাকায় এই মুভির পটভূমি। আঁকাবাঁকা একটি ছোট নদী দ্বারা একটি এলাকা দুই ভাগে বিভক্ত। দুই ভাগে দুটি আলাদা আলাদা রাজ্য। এতে আলোকপাত করা হয় একটি সিংহ শাবককে। তার নাম ধরা হয় ‘মারা’, আর মারা’র মায়ের নাম ‘লেইলা’। এরা থাকে নদীর এক পারে। অন্যদিকে আছে আরেক বাঘিনী মা ‘সিতা’ ও তার পাঁচটি নব জন্ম নেয়া বাচ্চা। মারা ও লেইলার লিডার হিসেবে আছে আরেক সিংহ ‘ফ্যাং’ যে তার সাহসিকতা দিয়ে অন্য প্রাণীদের হুমকি থেকে নিজের অনুগত প্রাণীদের রক্ষা করে। ফ্যাং এর একটি দাঁত থাকে ভাঙ্গা, যেটা তরুণ বয়সে যুদ্ধ করার সময় ভেঙ্গে গিয়েছিল। তাদের সমাজে এই ভাঙ্গা দাঁতের অধিকারীকে সাহস এবং শক্তি সামর্থ্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। সিতার এলাকার মাঝেও সরদার আছে কালি নামের এক বড় রকমের সিংহ। এই দুই এলাকার মাঝে, দুই সর্দারের যুদ্ধ।মুভির এক পর্যায়ে দেখা যায় দুই দলনেতার একজন অন্যজনকে পরাজিত করে ফেলে এবং পরাজিত জন এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। এতে করে তার ছায়ায় থাকা সকল প্রাণী নিরাপত্তাহীন হয়ে যায়। যেকোনো সময়েই করে বসতে পারে আক্রমণ। খাবার দাবারে নেই কোনো স্বাধীনতা। ইচ্ছে করলেই একটা শিকার ধরে খেতে পারবে না। এই বনে টিকে থাকাই মূল কথা। টিকে থাকতে গিয়ে নানান রকমের এডভেঞ্চারের দেখা পাওয়া যায়। মূলত তাদের জীবনের সমস্তটাই তো এডভেঞ্চারে ভরা।

এখানে বাঘ সিংহের কোমল দিকগুলো দারুণ ফুটে উঠেছে। আমরা বাঘ-সিংহকে শিকারি, হিংস্র বলেই চিনি। তাঁরা চোখের পলকেই হরিণ, গরু সহ অন্যান্য নিরীহ প্রাণীদের মেরে ফেলে। এই বলে আমাদের মানসিকতা তাদেরকে জন্তু ক্যাটাগরিতে। মূলত খুন তো আমরা সবাই করি। আমরা খাবারের সময় কত কত গরু মারছি তার কি কোনো হিসাব আছে? তাঁরাও তাঁদের জীবনের তাগিদে অন্য প্রাণকে মেরে থাকে। শুধু পদ্ধতিটা আলাদা, আমরা মারি দা-বটি-ছুরি দিয়ে আর তাঁরা মারে দাঁত-নখ দিয়ে।

চিত্র: শিকারি চিতা ক্ষিপ্র গতিতে ছুটছে শিকারের দিকে।

এই মুভিতে দেখা যায় বাঘ ও সিংহের মমতাময় অন্য এক পরিচয়। এক মা কীভাবে তার সন্তানদের টিকে থাকার জন্য সকল কিছু শিখিয়ে দিবেন তার আপ্রাণ চেষ্টার চিত্র। কীভাবে এক মা সকল বিপদ থেকে তার সন্তানদের রক্ষা করে রাখে তার চিত্র। কিন্তু সন্তান তো একাধিক আর মা তো একজন। তার উপর দিনের একটা সময় তো তাকে ঘুমিয়ে কাটাতে হয়। তখন কি হয় যখন মা ঘুমিয়ে থাকে? বিপদ পদে পদে। ঘুমের সময় মায়ের বুক খালি করে নেয় হায়েনার দল। জলে ডাঙ্গায় সবখানেই বিপদ। কোনো কাজে নদীর উপারে যেতে হলে আছে কুমিরের ভয়। কিন্তু তবুও জীবনের তাগিদে কুমিরে ভরা নদী পারি দিতে হয়।

চিত্র: জলে আছে কুমিরের ভয়।

শিকারেও থাকে ভয়। প্রত্যেকটা শিকারেই ঝুঁকি থাকে। লেইলার ক্ষিপ্র গতিতে জেব্রা শিকার করার সময় জেব্রা পেছন দিক হতে তাকে লাথি দেয়। এটা জেব্রাদের জীবন রক্ষা করার একটা কৌশল। শিকারি যখন পেছন দিক থেকে শিকার করতে আসবে সে পালানোর পাশাপাশি পেছন দিক থেকেও নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। এই একটা লাথিতেই পাল্টে যায় লেইলার পুরো জীবন। খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটতে হয় তাকে এবং আর জোরে জোরে দৌড়ানো সম্ভব হয় না। বাঘ বা সিংহরা যদি জোরে জোরে দৌড়াতে না পারে তাহলে তাঁরা শিকার করতে পারবে না। ফলাফল ধুকে ধুকে মরা।


চিত্রঃ অসতর্ক একটা লাথিতেই পাল্টে যেতে পারে একটা সিংহের জীবন।

এক এলাকায় সবসময় পর্যাপ্ত খাবার থাকে না, তাদেরকে খাবার অনুসারে এলাকা পাল্টাতে হয়। এলাকা পাল্টানোর সময় পুরো দল একসাথে যায়। লেইলার ছোট মেয়ে এখনো নিজের নিরাপত্তা নিজে করতে পারবে না, তাই দলের সাথে থাকা দরকার। আবার সে জখম হওয়া পা নিয়ে দলের সাথে তাল মিলিয়ে যেতেও পারবে না। এমন অবস্থায় কি করবে একজন মা? সন্তানকে যেতে দিয়ে একা হয়ে যাবে না সন্তানকে নিজের কাছে অরক্ষিত রেখে দিবে? এক চরম মানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় এই সময়। একটি মা কি করে সন্তানের প্রতি আর একটি সন্তান কি করে মায়ের প্রতি।

লেইলা যখন সন্তানের সুরক্ষার জন্য তাকে ত্যাগ করে একা একা চলে যায় তখন কান্না কান্না পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শিকারে অক্ষম লেইলা যখন ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায় তখন আশ্চর্য লাগে এই দেখে, ভালোবাসা কেমন হতে পারে। আর এই মুহূর্তে এমন একটা ব্যাকগ্রাউন্ড টিউন দেয় যে একেবারে হৃদয়ে গিয়ে লাগে। ছোটখাটো কিছু সুর, কিছু শব্দ একটা ভিডিওকে অপূর্ব করে তোলে। সুর দিয়ে যেন সমস্ত আবেগটাকে বের করে আনে। এই সুরের মাধ্যমেই যেন বোঝানো হয় লেইলা তার সন্তানকে ছেঁড়ে দূরে সরে আসে সন্তানের চোখের আড়ালে ভাল একটা জায়গায় যেন তার মরণ হয়। সন্তানের সামনে সন্তানের দুঃখের কারণ হয়ে সে মরতে চায় না। একটা ছবি কিংবা তথ্যচিত্রকে প্রিয় তালিকায় স্থান করাতে এই সকল বিষয়গুলো অনেক ভূমিকা পালন করে। ডিজনির ডকু মুভিতে সুর ব্যবহার ছিল একদম পারফেক্ট। শুধু একটা যায় সমস্যা একই সুর দুইটা বা তিনটা ভিন্নধর্মী জায়গায় ব্যবহার করেছে। সমধর্মী স্থানে ব্যবহার করলে সমস্যা ছিল না।


চিত্রঃ লেইলা ও তার সন্তান মারা।

এভাবেই একটু একটু করে শাবকেরা বেড়ে ওঠলে ডকুমেন্টারিটি সমাপ্ত হয়। ডকুমেন্টারিটি রিলিজের প্রথম দিনেই ৩.৩ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করে নেয়। এটি প্রথম দিনে ডকুমেন্টারি ফিল্মের মাঝে তৃতীয় সেরা উপার্জন। এর আগের স্থান দখল করে রেখেছে ডিজনিরই আরেক ডকু ফিল্ম Earth আফ্রিকান ক্যাট রিলিজ হবার আগেই অগ্রিম টিকেট বিক্রি হয় ১.৭ মিলিয়ন কপি।


চিত্রঃ শাবকেরা বড় হয়ে ওঠলে ডকুমেন্টারি সমাপ্তির দিকে যায়।

ডাওনলোড লিঙ্কঃ এই মুভিতে কিউট কিউট অসাধারণ কতগুলো আফ্রিকীয় বিড়াল দেখে আর অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মাথা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই এটি উচ্চ ডেফিনেশনে দেখার অনুরোধ করছি। নিম্নমানের ডেফিনেশনে দেখে মুভির মজা আর সৌন্দর্যটা নষ্ট করে লাভ নেই।  ||1080p এর লিঙ্ক ||আর যারা আরও ভাল চান তাঁরা ||এখান ||থেকে অনেকগুলোর মাঝে থেকে ভাল দেখে দেখে একটা নামিয়ে নিন। অনলাইনে সরাসরি দেখতে চাইলে ||এখানে ||

সবশেষে মুভি থেকে কতগুলো স্ক্রিনশট তুলে দিচ্ছি।

 

ছবি ও তথ্যঋণ

  1. Wikipedia : African_Cats
  2. ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেস : http://www.imdb.com/title/tt1223236/
  3. Disneynature : http://disney.com/africancats

১ thought on “আফ্রিকার বিড়াল [African Cats – 2011]”

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

গ্রাহক হতে চান?

যখনই বিজ্ঞান ব্লগে নতুন লেখা আসবে, আপনার ই-মেইল ইনবক্সে চলে যাবে তার খবর।