গতির আপেক্ষিতা ও ‘পৃথিবীর চারপাশে সূর্যের ঘূর্ণন’
[এই লেখাটি ছোটদেরকে উদ্দেশ্য করে লেখা]
যখনই কোনো জিনিস নিয়ম মেনে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর ছন্দ আকারে ফিরে আসে, বিজ্ঞানের চোখে এমন ঘটনাকে দেখলে, ধরে নিতে হবে অবশ্যই কোনো কিছু দোলক (পেন্ডুলাম) এর মতো এদিক হতে ওদিকে দোলে চলছে কিংবা বৃত্তাকার পথে ঘুরে চলছে। যেমন ঘড়ির কাঁটা, এটি নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময় পর পর একটি স্থানে ফিরে আসে। আমাদের প্রতিদিনকার সঙ্গী দুটি ব্যাপার দিন-রাত ও শীত-গ্রীষ্মকে পৃথিবীর দুই ধরনের ঘূর্ণন দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। শীত ও গ্রীষ্মকে ব্যাখ্যা করা যায় সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর ঘূর্ণন দ্বারা। আর দিন ও রাতকে ব্যাখ্যা করা যায় নিজের অক্ষের উপর পৃথিবীর ঘূর্ণন দ্বারা। পৃথিবী তার নিজের অক্ষের উপর লাটিমের মতো ঘুরে চলছে প্রতিনিয়ত।
খালি চোখেই আমরা সকলে যে দেখছি, সূর্য আকাশ পথে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে তা আসলে একটি বিভ্রান্তি। দৃষ্টি সংক্রান্ত বিভ্রান্তি। আপেক্ষিক গতির কারণে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে বলে মনে হয়। এই ধরনের গতীয় বিভ্রান্তির সাথে তুমি হয়তো অনেক আগেই পরিচিত হয়েছ। ট্রেনে ভ্রমণ করে থাকলে এমন অভিজ্ঞতা হয়ে থাকতে পারে। তোমার ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রেনের ক্রসিং হলে পরে তোমার ট্রেন ছাড়বে। তুমি জানালার কাছে বসে আছ। হঠাৎ দেখলে তোমার ট্রেনটা চলা শুরু করেছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর অনুধাবন করলে আসলে তোমার ট্রেন স্থির হয়েই দাঁড়িয়ে ছিল। বিপরীত দিকের ট্রেনের গতির কারণে তোমার ট্রেনটি আপেক্ষিকভাবে ‘গতি’ প্রাপ্ত হয়েছে যার কারণে মনে হয়েছিল তোমার ট্রেনটি চলছে।
আমি এই ধরনের বিভ্রান্তিতে পড়ে বেশিরভাগ সময়েই খুব মজা পাই। পদার্থবিজ্ঞানের খুব দারুণ একটা জিনিস আমার সামনে ঘটে যাচ্ছে বলে খুব দারুণ লাগে। আমার অভিজ্ঞতায় যে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি ঘটেছে সেটি ধরনের দিক থেকে এক রকম হলেও কিছুটা ভিন্নতা আছে। প্রায় সময়ই স্টেশনে একাধিক ট্রেন থামিয়ে রাখে। কোনো একটি ট্রেনে আমি আছি। বিশ মিনিট-আধা ঘণ্টা- চল্লিশ মিনিট থামিয়ে রেখেছে দেখে বিরক্ত হয়ে যাই। হঠাৎ খেয়াল করি ধীরে ধীরে ঘটঘটাং শব্দ করে আমাদের ট্রেন চলা শুরু করেছে, একটু আশা পাই- যাক শেষমেশ ট্রেন ছাড়ল। কিন্তু পরে খেয়াল করি আমদের ট্রেনটা দাঁড়িয়েই আছে। পাশের লাইনে বিপরীত দিকে গমনকারী ট্রেনটি চলা শুরু করার কারণে এমন বিভ্রান্তিতে পড়েছিলাম। আসলে, সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি স্থান থেকে বা ভিন্ন একটি বস্তুর সাপেক্ষে পর্যবেক্ষণ না করলে এটা বলা খুবই কঠিন যে কোন ট্রেনটি চলছে আর কোন ট্রেনটি থেমে আছে। প্রকৃত গতি ও আপেক্ষিক গতির পার্থক্য করা শক্ত। যদি তোমার ট্রেন ঝাঁকি দিয়ে চলা শুরু করে তাহলে অবশ্য শুরু থেকেই অনুধাবন করা যাবে আসলে তোমার ট্রেন চলছে কিনা। কিন্তু ট্রেন যদি কোনো ঝাঁকি ছাড়াই মসৃণভাবে চলা শুরু করে তাহলে মূল গতির সাথে আপেক্ষিক গতিকে আলাদা করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
দুই ট্রেনের মাঝে দর্শকের চোখে প্রকৃত গতি আর আপেক্ষিক গতি নিয়ে যে ঝামেলা হয়, সূর্য আর পৃথিবীর গতির বেলাতেও দর্শকের চোখে সেই ধরনেরই ঝামেলা হয়। সূর্য মূলত প্রতিদিন পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে না। যে বস্তুটি ঘুরে সেটি হচ্ছে আমাদের পৃথিবী। পৃথিবী প্রতিনিয়ত বৃত্তাকার চক্রে ঘুরে বেড়ায়। মূলত মহাবিশ্বের উল্লেখযোগ্য সকল বস্তুই কোনো না কোনোভাবে ঘুরে বেড়ায়। এমনকি সূর্যও তার অক্ষের উপর ঘুরে বেড়ায় (পৃথিবীর চারদিকে নয়)। এই ঘূর্ণনগুলো আপাতত আমরা উপেক্ষা করে যেতে পারি।
পৃথিবী তার অক্ষের উপর লাটিমের মতো ঘুরছে। এই অক্ষটা কোথায়? উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু বরাবর এটি কল্পনা করে নিতে হয়। পৃথিবী একদমই মসৃণভাবে শূন্যে ঘুরে চলছে। অবশ্যই পৃথিবীর সাথে সাথে আমরাও ঘুরে চলছি। তাহলে বাতাস? আমাদের শ্বাস নেবার বাতাসও পৃথিবীর অভিকর্ষের টানে বাধা পড়ে পৃথিবীর সাথে ঘুরে চলছে। বাতাস যদি আমাদের সাথে না ঘুরতো তাহলে চলন্ত পৃথিবীতে আমরা টিকে থাকতে পারতাম না। আমরা পৃথিবীর সাথে ঘুরছি, কিন্তু বুঝতে পারছি না। যত দিন পর্যন্ত আমরা বুঝতে না পারব এবং বাতাসও আমাদের সাথে ঘুরবে ততো দিন পর্যন্ত আমরা প্রকৃত গতিকে অনুধাবন করতে পারব না। সেই দুই ট্রেনের ঘটনার মতো, আপেক্ষিক গতিকেই সত্যিকার গতি মনে করে বিভ্রান্ত হবো।
আমরা যে ঘুরছি তার প্রমাণ পেতে হলে পৃথিবীকে এমন কোনো স্থান থেকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে যে স্থান পৃথিবীর সাথে সাথে ঘুরে চলে না। যেমন মঙ্গল গ্রহ কিংবা দূরের কোনো নক্ষত্র।
পৃথিবীর ঘূর্ণন ঘন্টায় (কয়েক) হাজার কিলোমিটার। যদি পৃথিবীর গতি এতো বেশিই হবে তাহলে যখন আমরা উপরের দিকে লাফ দেই তখন কেন অন্য কোনো স্থানে এসে পড়ি না? লাফ দিয়ে যখন ভূমি থেকে উপরে উঠে যাই তখন তো এই সময়টার ভেতরে পৃথিবী কিছুটা দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলার কথা। হুম, ভালো প্রশ্ন। এবার নিজেকে একটা ট্রেনের ভেতর কল্পনা করো। ট্রেনের বেগ প্রতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার। চলন্ত ট্রেনের ভেতরে থেকে যদি তুমি উপরের দিকে লাফ দাও তাহলে দেখা যাবে তোমার পা আগের জায়গাতেই এসে নেমেছে। ট্রেনের গতির ফলে একটু পেছনে বা সামনে নিয়ে ফেলেনি। ট্রেনের সাথে সমান বেগে ট্রেনের ভেতরের বায়ুগুলোও চলছে, যার কারণে উপরের দিকে লাফ দিয়ে নিচে নামলে পা এসে আগের জায়গাতেই ঠেকে। চলন্ত ট্রেনের কামরায় বসে সোজা উপরের দিকে কোনো বল ছুড়ে মারলে বলটি ফিরেও আসবে সোজা নিচের দিকে। কামরা যদি খালি থাকে তাহলে তাতে টেনিস বা ব্যাডমিন্টন খেলা যাবে স্বাভাবিকভাবেই। কারণ ট্রেন চলার সাথে সাথে ট্রেনের ভেতরে বায়ু সহ অন্যান্য সবকিছুই ট্রেনের সমান বেগে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু যদি এই কাজগুলো করা হয় উন্মুক্ত তলে তাহলে এমন ফলাফল পাওয়া যাবে না। যেমন খোলা ট্রাক কিংবা ট্রেনের ছাঁদ। ট্রেন চলার সাথে সাথে যদি বায়ুস্তর না চলে তাহলে উপরের দিকে লাফ দিলে পা এসে আগের জায়গাতে নাও ঠেকতে পারে। যখন তুমি সমবেগে চলমান কোনো আবদ্ধ ট্রেনে বসে পরীক্ষাগুলো করবে ফলাফলগুলো স্বাভাবিকই পাবে। কিন্তু যদি ট্রেনের গতি বৃদ্ধি পায় বা কমে যায় অর্থাৎ ত্বরণ হয় তাহলে ফলাফল স্বাভাবিক পাওয়া যাবে না। এ কারণেই চলন্ত বাস ব্রেক কষলে যাত্রীরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যদি হঠাৎ করে গতির বড় রকম পরিবর্তন হয় এবং এমন সময় তুমি উপরের দিকে লাফ দাও তাহলে ভিন্ন একটি স্থানে এসে পা স্পর্শ করবে। আর ঐ পরিস্থিতিতে যদি ব্যাডমিন্টন খেলা হয় তাহলে খেলার ফুল সামলাবে কি, নিজেকে সামলাতেই তো বারোটা বেজে যাবে। পৃথিবীর গতিও যদি এমন ওঠানামা করতো তাহলে পৃথিবীতে আমরা যারা বাস করছি তাদের অনেক সমস্যা হতো।
সবার শেষে চিন্তাবিদ ভিটজেনস্টাইন ও তার বান্ধবী এলিজাবেথ এর মাঝে সামান্য কথোপকথন তুলে ধরছি। ভিটজেনস্টাইনঃ ‘মানুষ কেন বলে বেড়ায়, পৃথিবী তার অক্ষের উপর ঘুরার চেয়ে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে, এটা ভাবা অনেক সহজ ও স্বাভাবিক?’ এলিজাবেথ উত্তর দেন, ‘মনে হয় দেখতেই দেখা যায় সূর্য ঘুরছে, তাই এমন ভেবে নেয়াকে স্বাভাবিক বলে মনে করছে।’ প্রতি-উত্তরে ভিটজেনস্টাইন বলেন, ‘তো, তাদের ভাবনা অনুসারে, পৃথিবী যদি অক্ষের উপর ঘুরতো তাহলে পৃথিবীর চারপাশে সূর্যের ঘূর্ণন কেমন হতো?’ [নিজেই চেষ্টা করে বের করে এই প্রশ্নের উত্তর দাও!]
তথ্যসূত্রঃ The Magic of Reality, Richard Dawkins ছবিঃ Dave McKean

আমরা নিয়মিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনপ্রিয়-বিজ্ঞান ও গবেষণা-ভিত্তিক লেখালেখি করি বিজ্ঞান ব্লগে। এছাড়া আমাদের লেখকেরা বিভিন্ন সময় বিজ্ঞান-বিষয়ক বইও প্রকাশ করে থাকেন। ই-মেইলের মাধ্যমে এসব খবরা-খবর পেতে নিচের ফর্মটি ব্যবহার করুন। ।

মন্তব্যসমূহ

  1. Pingback: গতির আপেক্ষিতা ও ‘পৃথিবীর চারপাশে সূর্যের ঘূর্ণন’ &#82 ... | Zero to Infinity

  2. আরাফাত রহমান Reply

    ছোটদের জন্য সুন্দর লেখা। একটা রাশিয়ান বইয়ের কথা মনে পড়ে যায় — ই. পেরেলম্যানের পদার্থবিদ্যার মজার কথা। ওখানে এরকম গল্পের ভঙ্গিতে সুন্দর সুন্দর ছবিতে ছোটছোট বিষয় ব্যাখ্যা করা থাকতো। তো এখানে পাঠক যেহেতু ছোটরা, শব্দচয়ন আরো সহজ করতে পারো। যেমন অনুধাবন> বুঝতে পারা।

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.