আপনারা যারা সময়ভ্রমণ বিষয়ক গল্প-উপন্যাস, সিনেমা, কমিক নিয়ে উৎসাহী, তারা নিশ্চয় সময়ভ্রমণের বিভিন্ন প্যারাডক্স বা কূটাভাসের সাথে পরিচিত। আপনি অতীতে গিয়ে ঘটনাক্রমে আপনার দাদাকে তার শৈশবে মেরে ফেললেন। তাহলে কী হবে! আপনার দাদার সাথে দাদির বিয়ে হবে না, আপনার বাবার জন্ম হবে না। তারমানে আপনি কখনোই জন্মাবেন না। আর আপনার অস্তিত্বই যদি না থাকে, তাহলে অতীতে গিয়ে দাদাকে মারার তো কেউ থাকল না। তার মানে দাদা বেঁচে গেলেন, তো বাবার জন্ম হবে এবং আপনিও জন্মাবেন। সব কেমন গুলিয়ে গেল, তাই না! দেখলেন তো, আপনার অতীতভ্রমনের কারণে ঘটনাপ্রবাহে অদ্ভুত এক অসঙ্গতি সৃষ্টি হয়েছে। এটাই গ্রান্ডফাদার প্যারাডক্স। আরেকটা প্যারাডক্সের কথা বলি। ধরুন, একদিন আপনার ভবিষ্যৎ-সত্তা আপনার সাথে দেখা করতে আসল এবং টাইম-মেশিন বানানোর প্লান জানিয়ে গেল। তারপর আপনি সেই প্লান মোতাবেক টাইম-মেশিন বানিয়ে ফেললেন। অতীতে গিয়ে নিজের অতীত-সত্তাকে সেই একই প্লানটা জানিয়ে আসলেন। তাহলে প্রশ্ন হল, এই প্লান প্রথমে তৈরি করেছিল কে! এই প্যারাডক্সকে বলা হয় বুটস্ট্রাপ প্যারাডক্স বা ক্যাজুয়াল লুপ

সময়-ভ্রমণজনিত এরকম বিভিন্ন প্যারাডক্স সবসময় ভাবিয়ে তুলেছে আমাদের পদার্থবিদদের, দার্শনিকদের, লেখকদের। আর এসব ভাবনার অনুপ্রেরণায় সৃষ্টি হয়েছে জনপ্রিয় অনেক ফিকশন

আমার নিজের পছন্দের ফিকশন তালিকাও দীর্ঘ- ব্যাক টু দ্য ফিউচার, টাইম ট্রাভেলার’স ওয়াইফ, দ্য বাটারফ্লাই ইফেক্ট, প্রাইমার, প্রিডেস্টিনেশন, ডার্ক…। যাইহোক, এ তালিকা শেষ হবার নয়। আমরা বরং মূল কথায় আসি।

অতি সম্প্রতি কানাডার পেরিমিটার ইন্সটিটিউট-এর দুই তাত্ত্বিক পদার্থবিদ বারাক শোশানি এবং জ্যাকব হাউজার প্যারাডক্স এড়িয়ে একটা টাইমট্রাভেল মডেল উপস্থাপন করেছেন। তাদের এই মডেলে আছে বৃহৎ সসীম সংখ্যক সমান্তরাল টাইমলাইনের ধারণা।

তাদের এই গবেষণাপত্রটি গতমাসে প্রকাশিত হয় প্রিপ্রিন্ট আর্কাইভ arXiv-এ। তাদের দেওয়া মডেল তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করে, কিভাবে আপনি ওয়ার্মহোল দিয়ে এক টাইমলাইন থেকে অন্য টাইমলাইনে যেতে পারেন, যা তাদের দাবি অনুযায়ী গাণিতিকভাবে সম্ভব। তারা এটাকে বলছেন ‘Parallel universes approach’।

ড. শোশানি নিউ সায়েন্টিস্ট পত্রিকায় বলেছেন, “মহাবিশ্বকে একটা সেট হিসেবে চিন্তা করতে পারেন, স্থান-কালের প্রতিটি বিন্দু হল সেই সেটের উপাদান। আর টাইমলাইন বা ঘটনাপ্রবাহ হল একটা ফাংশন যেটা সেটের বিন্দুগুলোর ক্রম বিন্যাস রক্ষা করে। আমাদের দেওয়া parallel universes approach অনুযায়ী বহু সংখ্যক সমান্তরাল মহাবিশ্ব আছে, যেখানে সবকিছুই মোটামুটি একই রকম, এবং গাণিতিকভাবে প্রত্যেক মহাবিশ্ব আছে ভিন্ন ভিন্ন স্পেস-টাইম ম্যানিফোল্ডে। আপনি যখন সময়-ভ্রমণ করেন, তখন আপনি সেই ম্যানিফোল্ড গুলোর মধ্যে বিচরণ করতে পারেন।”

একটা মহাবিশ্বের মানে হল স্থান কালের শুধু একটা সেট। ভিন্ন ভিন্ন ফাংশন এই সেটের উপাদান বিন্দুগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ক্রম বিন্যাস বর্ণনা করে। এক্ষেত্রে এই ফাংশনগুলোই হল এক একটা টাইমলাইন। একটা ওয়ার্মহোলের ভিতর দিয়ে যাওয়ার অর্থ ফাংশনটির পরিবর্তন, অর্থাৎ ভিন্ন টাইমলাইন, ভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ।

বহুসংখ্যক টাইমলাইনের এই ধারণা সুযোগ করে দেয় ভিন্ন ভিন্ন টাইমলাইনে যাওয়ার। টাইমলাইনগুলো ভিন্ন হওয়ায়, সেখানে গিয়ে কোন কিছু পরিবর্তন করলেও কোন প্যারাডক্সের সম্ভাবনা থাকে না। তাদের এই মডেল প্যারাডক্স মুক্ত থাকতে হলে বিশাল সংখ্যক সমান্তরাল টাইমলাইনের দরকার পড়ে। তবে সংখ্যাটি যে অসীম হওয়ার প্রয়োজন নেই সেটা গবেষকযুগল দেখিয়েছেন।

তবে প্যারাডক্স মুক্ত হলেও তাদের এ মডেলে অপূর্ণতা থেকে যাচ্ছে। এটি ব্যাখা করা হয়েছে কেবল স্থানের একমাত্রায়। তাই বাস্তব জগতের সাথে সঙ্গতি আনতে মডেলটিকে এক মাত্রা থেকে তিন মাত্রায় রূপান্তর করা দরকার। সামনে সেটা করার পরিকল্পনা আছে বলে জানিয়েছেন উক্ত গবেষকদল। আবার এ মডেল প্রচলিত সময়ভ্রমণের ধারণা থেকে ভিন্ন। এ মডেল অতীতকে অক্ষুণ্ণ রাখে। কারণ এখানে নিজের অতীতে যাওয়ার উপায় নেই। সুযোগ নেই নিজের টাইমলাইনের অতীতে কিছু পরিবর্তন করার।

ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির জ্যোতিঃপদার্থবিদ এবং ডার্ক ম্যাটার এক্সপার্ট গ্যারেন্ট লুইস। আলোচিত এই গবেষণাপত্রটি সম্পর্কে তিনি নিউ সায়েন্টিস্টকে জানিয়েছেন, “এখানে সময় ভ্রমণ বলতে বোঝানো হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সমান্তরাল অতীতে গমন করা- এটা আরো বেশি অদ্ভুত।” তিনি আরো বলেন,“এক পর্যায়ে এটিকে আর সময়ের ভ্রমণের মতো মনে হচ্ছে না, কারণ অতীতে গিয়ে হিটলারকে মেরে কি লাভ যদি আপনি নিজের টাইমলাইনের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে রুখতে না পারেন!”

আজকের লেখা এ পর্যন্তই। ২০১৯ তো শেষ হতে চলল। এবছরে মুক্তি পাওয়া বহুল আলোচিত অ্যাভেঞ্জারসঃ এন্ডগেম সিনেমার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই! এ সিনেমায় দেখনো ট্রাভেল ট্রাভেল কন্সেপ্টে কিন্তু এরকম প্যারাডক্স-মুক্ত সমান্তরাল টাইমলাইনের আইডিয়া তুলে ধরা হয়েছে।

১৪ মিলিয়ন ভিন্ন ভিন্ন টাইমলাইন অনুসন্ধানরত মার্ভেল সুপারহিরো ডক্টর স্ট্রেঞ্জ (অ্যাভেঞ্জারসঃ ইনফিনিটি ওয়ার সিনেমার একটা দৃশ্য)



তথ্যসূত্রঃ
  • Time Travel Paradoxes and Multiple Histories (arXiv preprint)
  • Time travel without paradoxes is possible with many parallel timelines (New Scientist)

আমরা নিয়মিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনপ্রিয়-বিজ্ঞান ও গবেষণা-ভিত্তিক লেখালেখি করি বিজ্ঞান ব্লগে। এছাড়া আমাদের লেখকেরা বিভিন্ন সময় বিজ্ঞান-বিষয়ক বইও প্রকাশ করে থাকেন। ই-মেইলের মাধ্যমে এসব খবরা-খবর পেতে নিচের ফর্মটি ব্যবহার করুন। ।

লিখেছেন মুবতাসিম ফুয়াদ

শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মুবতাসিম ফুয়াদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 10 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. একলোটন Reply

    তোমার লেখার গদ্যশৈলী পড়তে বেশ আরাম লাগে। সময় পরিভ্রমণ নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবি। এবং এই বিষয়ে সিনেমাগুলো দেখতেও আনন্দ পাই। ডেনজেল ওয়াশিংটন অভিনীত সিনেমা দেজাভূ হয়তো দেখে থাকবে।
    সম্প্রতি এন্ডগামে ধারণাটি দেখানো হয়েছে তাও চমৎকার।
    বর্তমান মানব সভ্যতা এমন অবস্থায় আছে আমার মনে হয় না বিজ্ঞানীদের এখনকার তাত্ত্বিক এসংক্রান্ত গবেষণা অ্যাপ্লাইড পর্যায়ে যেতে পারে।
    সব ছাপিয়ে দুশ্চিন্তাটা প্রকট হয় এই পৃথিবীর আয়ু আর কতদিন। পৃথিবীর আয়ু যদি অনেক বেশি হতো তাহলে সময় পরিভ্রমণ সম্ভব হতো ভবিষ্যতের কোনো মানুষ বর্তমান কোন সময়ে থাকতো এবং আমাদের সাথে ভবিষ্যতের বিজ্ঞান প্রযুক্তি নিয়ে কথা বলতে পারতো। যেহেতু কোনোটিই হচ্ছে না ধরে নেয়া যেতে পারে পৃথিবী ধ্বংস অতি নিকটে।

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.