কোভিড-১৯: এন্টিবডি কি কেবল সুরক্ষাই দেয়?

পাঠসংখ্যা: 👁️ 507

জীবাণুর সংক্রমন হলে আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নানা ভাবে তা ঠেকাতে চেষ্টা করে। এর ভিতর সবথেকে বেশী আলোচিত নাম এন্টিবডি। এন্টিবডি সাধারন ভাবে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াকে পরাজিত করে শরীরের সুস্থতা নিশ্চিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীরকে সুরক্ষিত রাখে। এন্টিবডির আরো কিছু ব্যবহার রয়েছে যেমন ঔষধ হিসাবে এবং রোগ সনাক্তকরণ সরঞ্জামের গুরুত্বপূর্ন উপাদান হিসাবে। কিন্তু কোন কোন সময়ে এই এন্টিবডি শরীরে রোগ বৃদ্ধির কারন ও হয়ে যায়। কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে এন্টিবডির ভূমিকা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে কিছু কথা থাকছে আজকের এই লেখায়।

এন্টিবডি কি?

আমাদের শরীর কে রোগ জীবানু এবং বাইরের বিষাক্ত যেকোন উপাদান থেকে সুরক্ষা দেবার জন্য শরীরে প্রতিরক্ষা বাহিনী সম্মিলিত ভাবে কাজ করে। এটাকে ইমিউন সিস্টেম বা প্রতিরোধক ব্যবস্থা বলা হয়। শরীরে যখন কোন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্য ক্ষতিকর কিছু প্রবেশ করে তখন দেহের একাধিক কোষ বাইরে থেকে আসা এই শত্রু কে শনাক্ত করে, শত্রু চেনার জন্য উল্লেখযোগ্য কোন বৈশিষ্ট অন্য কোষের কাছে তুলে ধরে এবং এর ধারাবাহিকতায় এন্টিবডি তৈরী হয়। সাধারন ভাবে বাইরে থেকে আসা ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া কে শরীর বহিরাগত হিসাবে দেখে এবং এদেরকে এন্টিজেন (antigen) বলা হয়। এই এন্টিজেনের যে অংশ গুলো অনন্য বৈশিষ্টের সেগুলোকে এন্টিজেনের এপিটোপ (epitope) বলা হয়। এপিটোপ সাধারনত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বাইরের অংশে বের হয়ে থাকা প্রোটিন হয়ে থাকে। এন্টিবডি কিছুটা ইংরেজী ওয়াই (Y) অক্ষরের মতো দেখতে প্রোটিন মলিকিউল। যা আকারে একটা ব্যাকটেরিয়া থেকেও অনেক গুন ছোট। ওয়াই এর দুই মাথা, যাদের কে Fab বলে তারা এন্টিজেনের এপিটোপের সাথে যুক্ত হতে পারে। আর নীচের অংশটি যার নাম Fc সেটি অন্য কোষের গায়ে যুক্ত হতে পারে।

উদাহরন স্বরূপ, কোভিড-১৯ ভাইরাসের বাইরে অনেকগুলো করোনা বা কাঁটার মত অংশ আছে (স্পাইক প্রোটিন), যেটা দিয়ে ভাইরাস টি আমাদের ফুসফুসের কোষে যুক্ত হয় এবং ভিতরে প্রবেশ করে। আমাদের প্রতিরোধক ব্যবস্থা এই স্পাইক গুলোকে এপিটোপ হিসাবে সনাক্ত করে এবং এমন এন্টিবডি বানায় যা সব সময় ঐ স্পাইক দেখলে আটকে ধরতে পারবে। অর্থাৎ ঐ এন্টিবডিগুলো কোভিড-১৯ এর অনন্য বৈশিষ্ট স্পাইক দেখে আলাদা করে চিনবে এবং তার সাথে যুক্ত হতে পারবে। একটি ভাইরাসের বাইরে নানা রকমের এপিটোপ থাকতে পারে। তাই ভাইরাস সংক্রমন হবার পর শরীর যে এন্টিবডি গুলো তৈরী হয় তা ভাইরাস টির অনেকগুলো এপিটোপ এর বিপক্ষে কাজ করে। এরকম এন্টিবডির মিশ্রন যারা ভাইরাসের একাধিক এপিটোপ সনাক্ত করতে পারে তাদের পলিক্লোনাল এন্টিবডি (polyclonal antibody) বলে। এর বিপরীতে যেসব এন্টিবডি কেবল মাত্র একটা এপিটোপ কেই চিনতে পারে তাদের কে মনোক্লোনাল এন্টিবডি (monoclonal antibody) বলে।

শরীরে ভাইরাস ঢুকলে এন্টিবডি কিভাবে কাজ করে?

শরীরে ভাইরাসের সংক্রমনের শুরুর দিকে অন্যান্য প্রতিরোধক কোষ ভাইরাস কে মেরে ফেলতে চেষ্টা করে এবং সপ্তাখানেক এর ভিতর শরীরে পলিক্লোনাল এন্টিবডি তৈরী হয়ে যায়। এই পলিক্লোনাল এন্টিবডি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কয়েক বছর পর্যন্ত অবস্থান করে যা একই ভাইরাসের পুনঃ আক্রমন হলে দ্রুত ভাইরাস কে প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। এন্টিবডি দুইভাবে শরীরে ভাইরাস কে মোকাবেলা করে। (১) এন্টিবডি গুলো ভাইরাসের এপিটোপ গুলোর সাথে যুক্ত হয় এবং ঘিরে ধরে, ফলে ভাইরাস মানব দেহের কোষের গায়ে যুক্ত হতে পারে না, এভাবে ভাইরাস গুলো নিস্ক্রিয় হয়ে যায়। তাই এ ধরনের এন্টিবডি কে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি (neutralizing antibody) বা নিস্ক্রিয়কারী এন্টিবডি বলা হয়। (২) এন্টিবডি ভাইরাস কে সরাসরি নিস্ক্রিয় করেনা, বরং প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্য কোষের কাছে খবর পৌঁছে দেয় এবং তারাই ভাইরাস টিকে ধ্বংস করে ফেলে। ব্যাপারটা অনেকটা আসামীকে গ্রেপ্তার বা অবস্থান সনাক্ত করে অন্য সংস্থার হাতে তুলে দেয়ার মত। এই এন্টিবডি গুলোকে নন-নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি বা বাইন্ডিং এন্টিবডি বলে।

সুরক্ষা দেবার বদলে এন্টিবডি ক্ষতির কারন হয় কখন?

কিছু কিছু ভাইরাসের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, ভাইরাস কে শরীরে নিষ্ক্রিয় করার বদলে এন্টিবডি কোন কোন ক্ষেত্রে ভাইরাস কে মানব শরীরের কোষে প্রবেশে সাহায্য করে যার ফলে ভাইরাসের সংক্রমন আরো গতি পায়। এটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় এন্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহান্সমেন্ট (ADE) অর্থাৎ এন্টিবডির মাধ্যমে সংক্রমন বৃদ্ধি। ADE কিভাবে ঘটে সেটা পুরোপুরি না জানা গেলেও বেশ কিছু সম্ভাব্য কারন বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন। গবেষকরা এই ঘটনাটি ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, এইচআইভি, ইবোলা এবং করোনাভাইরাসে ঘটতে দেখেছেন। উদাহরন হিসাবে ডেঙ্গু ভাইরাসের কথা বলা যায়। ডেঙ্গু ভাইরাসের বেশ কিছু সেরোটাইপ আছে, অর্থাৎ সেরোটাইপগুলোর এপিটোপে কিছু পার্থক্য থাকে তাই তাদের সংক্রমনে যে এন্টিবডি তৈরী হয় তাতে ভিন্নতা থাকে। কোন ব্যক্তিকে যখন প্রথম কোন একটি সেরোটাইপ ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমন করে তখন এর বিপরীতে এন্টিবডি তৈরী হয়ে শরীরে থাকে। পরে কোন সময় যদি ঐ একই ব্যক্তি অন্য কোন সেরোটাইপের ডেঙ্গু দ্বারা আক্রান্ত হন তাহলে আগের তৈরী হওয়া এন্টিবডি পুরোপুরিভাবে এই ভাইরাস কে নিষ্ক্রিয় করতে পারেনা। তখন এই এন্টিবডি ই ভাইরাস কে উল্টো শরীরে প্রবেশ করিয়ে সংক্রমন বৃদ্ধি করে। এবং এ কারনেই দ্বিতীয় সংক্রমনে রোগীর জটিলতা এবং মৃত্যুর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে ADE কেন গুরুত্বপূর্ন?

একদল গবেষক মার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে ADE নিয়ে গবেষনা করে জার্নাল অব ভাইরোলজি তে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন (1)⁠। ল্যাবে আলাদা ভাবে কালচার করা মানব কোষে নিউট্রালাইজিং মনোক্লোনাল এন্টিবডি দিয়ে তারা দেখেছেন এই ভাইরাসের ক্ষেত্রে ADE ঘটে। তবে ডেঙ্গুর মতো সেরোটাইপ আলাদা না হয়েও এটি ঘটতে পারে। অর্থাৎ একই এন্টিবডি যা ভাইরাস কে নিষ্ক্রিয় করতে পারে তা আবার পরিস্থিতি ভেদে ভাইরাস কে মানব কোষের ভিতরে প্রবেশে সাহায্যও করতে পারে। তারা এটিও দেখিয়েছেন এন্টিবডি ভাইরাসের স্পাইকের যেখানে যুক্ত হয়, মানব কোষের রিসেপ্টর ও একই জায়গাতে যুক্ত হয়। অর্থাৎ এন্টিবডি ADE করার ক্ষেত্রে কেবল একটা মাধ্যম হিসাবে কাজ করে। তারা আরো দেখান যে এন্টিবডির পরিমান বাড়িয়ে দিলে ADE কমতে থাকে। অর্থাৎ অল্প এন্টিবডি পরিপূর্ন ভাবে ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করতে পারেনা এবং সেই ক্ষেত্রে ভাইরাস কে মানব কোষে প্রবেশ করিয়ে দেয়। তবে এ ব্যাপারে আরো ভালোভাবে নিশ্চিত হতে অন্য প্রানী এবং মানুষে আরো গবেষনা প্রয়োজন।

[কোভিড-১৯ এ এন্টিবডির মাধ্যমে সম্ভাব্য সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া। এখানে উদাহরণস্বরূপ শরীরে পূর্বে সার্স সংক্রমণ এর ফলে তৈরী এন্টিবডি কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে কেমন আচরণ করতে পারে তা দেখানো হয়েছে।]

অন্যান্য ভাইরাসে ADE ঘটার প্রেক্ষিতে কানাডার একজন গবেষক ও মনে করছেন হয়তো কোভিড-১৯ এর জন্য দায়ী নতুন এই সার্স-কভ-২ (SARS-CoV-2) ভাইরাসের অধিক সংক্রমন এর ক্ষেত্রে ADE এর কোন ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা আছে (2)⁠। সার্স-কভ-২ ই মানবদেহে রোগ সৃষ্টিকারি একমাত্র কিংবা প্রথম করোনাভাইরাস নয়। মানব দেহে এটি ছাড়াও চারটি করোনাভাইরাস (হিউম্যান করোনাভাইরাস OC43, HKU1, 229E এবং NL63) হালকা ঠান্ডা উপসর্গ তৈরী করতে সক্ষম এবং দুটি করোনাভাইরাস (সার্স করোনাভাইরাস বা SARS-CoV এবং মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিম্পটম করোনাভাইরাস বা MERS-CoV) অধিকতর জটিলতা তৈরী করে মৃত্যুর কারন ঘটায়। নতুন ভাইরাস টি পুরানো সার্স করোনাভাইরাসের সাথে সবথেকে বেশী মিল থাকায় এর নাম দেয়া হয়েছে সার্স-কভ-২। মৃদু ঠান্ডার উপসর্গ সৃষ্টিকারী চার রকমের করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী বছর জুড়ে মানুষ কে সংক্রমণ করে ফলে এগুলোর বিপক্ষে শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়, সেই সাথে সার্স ও মার্স করোনাভাইরাস আক্রান্ত মানুষের শরীরেও এন্টিবডি তৈরী হয়ে থাকছে। অন্যান্য ভাইরাসের মতো হয়তো সার্স কভ-২ ভাইরাস সংক্রমনের পর আগে থেকে শরীরে থাকা যেকোন এন্টিবডি নতুন ভাইরাসকে পুরোপুরি নিস্ক্রিয় করতে না পেরে ADE এর মাধ্যমে সংক্রমন আরো ভয়াবহ করে তুলছে। সার্স করোনাভাইরাস (SARS-CoV) এবং সার্স-কভ-২ (SARS-CoV-2) এর দুটি স্পাইক এপিটোপ তুলনা করে দেখা গেছে তাতে ৭২.৭% এবং ১০০% মিল রয়েছে। অর্থাৎ এই মিল না থাকা এপিটোপের জন্য ADE ঘটার সম্ভাবনা থাকতে পারে। যেহেতু ভাইরাস খুব দ্রুত নিজেকে মিউটেশন করে পালটে ফেলতে সক্ষম, তাই বাইরের স্পাইক প্রোটিনের গঠন ও পালটে যায়।

বিজ্ঞানীরা ভ্যাক্সিন বানানোর সময় এই স্পাইক প্রোটিন কে ফোকাস করেন। ফলে বিজ্ঞানীরা সাবধানতার সাথে ভ্যাক্সিন না বানালে, ভ্যাক্সিন শরীরে যে এন্টিবডি তৈরী করবে তা পরবর্তীতে পালটে যাওয়া ভাইরাসের সংক্রমনে ADE ঘটাতে পারে। এন্টিবডির আরেকটি ব্যবহার হলো আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে রক্ত নিয়ে রক্তের প্লাসমা তে থাকা এন্টিবডি সংগ্রহ করা। এবং এই এন্টিবডি ঔষধ হিসাবে অন্য আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে দেয়া যা ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। এই পদ্ধতিকে কনভেলেসেন্ট (convalescent) প্লাজমা থেরাপি বলা হয়। কিন্তু এখানেও অত্যন্ত সতর্ক না থাকলে ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত এন্টিবডি ভাইরাস সংক্রমন কমানোর বদলে ADE এর মাধ্যমে উলটো ক্ষতির কারন হতে পারে। তাই এন্টিবডির এসব সম্ভাব্য ক্ষতির দিক বিবেচনায় রেখে এগিয়ে চলছে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বিজ্ঞানীদের প্রানান্তকর প্রচেষ্টা। বিজ্ঞানীদের তথ্য উপাত্ত ভিত্তিক পদক্ষেপ বনাম ভাইরাসের দ্রুত রূপ বদলিয়ে দানব হয়ে ওঠার যুদ্ধে কি ফলাফল আসে তা এ মূহুর্তে আমাদের সকলের অজানা।

তথ্যসূত্রঃ

1. Wan Y, Shang J, Sun S, Tai W, Chen J, Geng Q, et al. Molecular Mechanism for Antibody-Dependent Enhancement of Coronavirus Entry. J Virol. 2019;

2. Tetro JA. Is COVID-19 receiving ADE from other coronaviruses? Microbes Infect. 2020;

আসিফ আহমেদ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক। বিজ্ঞানচর্চায় আত্মনির্ভরশীল এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে দেশীয় গবেষণা মানুষের সবথেকে জরুরি চাহিদাগুলো মেটাতে সমর্থ হবে। এছাড়া বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান গবেষণাধর্মী লেখা সহজবোধ্য ভাবে ছড়িয়ে দেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।