কোভিড-১৯ মহামারী ২০২০

পাঠসংখ্যা: 👁️ 154

[ঘোষণা: এই পাতায় নিয়মিত কোভিড-১৯ মহামারী সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ক্রমাগত যুক্ত করা হবে। সকল তথ্যের সাথে জনস্বাস্থ্য, অণুজীববিজ্ঞান গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের মূল তথ্যসূত্র দেয়া হবে। কোভিড-১৯ মহামারী সম্পর্কে তথ্যগুলো খুব দ্রুত বদলিয়ে যাচ্ছে, নতুন নতুন তথ্য আসছে। আমাদের পক্ষথেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আপডেট থাকার জন্য। তবে এই তথ্যগুলো (বা যে কোন তথ্যই) কোথাও ব্যবহারের পূর্বে মিলিয়ে দেখার অনুরোধ করছি। ]

জ্বী, অবস্থা বেশ খারাপ

আতঙ্কগ্রস্থ হবেন না। কিন্তু নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সম্পর্কিত বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সতর্কতাবাণী ফেলে দেবেন না, মনোযোগ দিয়ে শুনুন। হয়তো এই কোভিড-১৯ মহামারী কয়েক সপ্তাহ আগেও দমন করা যেত, কিন্তু এখন তা আর বাস্তব সম্মত নয় [১]। ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ কে বৈশ্বিক মহামারী (প্যান্ডেমিক) বলে ঘোষণা দিয়েছে। চীনে যদিও দুই মাস আগে থেকে শুরু হওয়া এ মহামারী আমাদের কিছুটা সময় দিয়েছে প্রস্তুতী নেয়ার, কিন্তু ইতালি সহ বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার চরম বিপর্যয় প্রমাণ করে আমরা সে সময়টা আসলে নষ্টই করেছি [২]। নভেল করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নিয়েছে, যা পরবর্তীতে নিয়মিত বিরতীতে ফিরে আসবে যদি না আমরা ভ্যাক্সিন বা প্রতিষেধক আবিষ্কার করি [৩]। ভাগ্য ভালো হলে নতুন ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করতেও দেড় থেকে দুই বছর লেগে যাবে (আরো বেশি সময় লাগার কথা) [৪]।

এটা কোন সাধারণ ফ্লু নয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী বিভিন্ন বয়স সীমার মধ্যে কোভিড-১৯ কারণে মৃত্যুর হার ৩.৫% [৫]। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সরাসরি তত্ত্বাবধায়ন করা উপাত্ত সরবরাহ করেছে প্রমাণ হিসেবে। উপাত্ত থেকে বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্যখাতের বিশেষজ্ঞরা একমত যে যাদের বয়স ৬০ এর বেশি এবং যাদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা আছে, তারা কোভিড-১৯ এ সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আছেন।

এই মহামারীর শুরুর দিকে আশা ছিলো যে এই গড় ৩.৫ শতাংশ হিসাবটা হয়তো ভুল প্রমাণিত হবে। তবে বিভিন্ন দেশে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সে আশা দুরাশা বলেই মনে হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মৃত্যু হার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম, ০.৭%। তবে, দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যায় তরুণদের সংখ্যাই বেশি। এছাড়া একদম শুরু থেকেই দক্ষিণ কোরিয়া এই মহামারীর বিরুদ্ধে সতর্কতার সাথে যাবতীয় প্রস্তুতী নিয়ে যাচ্ছিলো।

আর যদি কোভিড-১৯ এর প্রকৃত মৃত্যুহার ১% হয়ে থাকে, সেটা মৌসুমী ফ্লু এর তুলনায় ১০ গুণ বেশি (মৌসুমী ফ্লু এর মৃত্যুহার ০.১%)!

অধিকাংশ মানুষের জন্য এই রোগ খুব মৃদু উপসর্গ দেখায়। মৃদু উপসর্গ হলেও ভাইরাসটি তখনো ছড়াতে পারে। এভাবেই এই নভেল করোনা (SARS-CoV-2) ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে যায় মানুষের মধ্যে। যাদের ভাইরাসটি আক্রান্ত করে কাবু করে ফেলে, তাদের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। মৃত্যুহারই আসলে পুর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। ইটালির সাম্প্রতিক মহামারীতে দেখা গেছে ১০% আক্রান্তদের হাসপাতালে চিকিৎসা করা তো লাগেই, ICU-তেও নিতে হয়। এবং এই সেবাটি ৩-৬ সপ্তাহ পর্যন্ত নেয়া লাগতে পারে।

যা করিতে হইবে

#রোগ_বিস্তার_কমাও

প্রকৃত মৃত্যুহার কত সেটা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। তবে আমরা এখনো মহামারীর প্রথমদিকেই আছি বলে ধরে নিতে হবে। এই মৃত্যুহার সঠিকভাবে বের করতে হয়তো কয়েক বছরের গবেষণা লেগে যেতে পারে। কিন্তু আমরা জানি মৃত্যুহার ০.৫% থেকে ৪% এর মাঝে। এই সীমাটি যথেষ্ট মহামারী যাতে আরো না ছড়ায় তার বিপরীতে বৃহৎ পরিসরে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য।

সবচাইতে গুরুত্বপূরণ কাজটা আমাদের সবাইকেই করতে হবে। সেটা হলো #flatten_the_curve। যে কোন মহামারী শুরু হওয়ার পর আক্রান্তদের সংখ্যা হু হু করে বাড়তেই থাকে। সময়ের সাথে আক্রন্ত রোগীর সংখ্যার রেখটি যদি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায় তাহলে তা দেশ ও পৃথিবীর জন্যই বড় বিপদজনক ঘটনা। তাই আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক, ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে উপযুক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে আক্রান্তদের সংখ্যা হাসপাতালের ধারণক্ষমতার সীমার বাইরে চলে না যায়।

সময়ের সাথে সাথে কোন মহামারীতে আক্রান্তরোগীর সংখ্যার রেখ। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হাসপাতালে ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেলে বিপদ। ছবিতে লাল রেখটি দেখাচ্ছে কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়া আক্রান্তের রেখ, কালো ড্যাশ-লাইনটি স্বাস্থ্যাব্যবস্থার ধারণ ক্ষমতা, আর সবুজ রেখাটি রোগ ছড়ানো প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নিলে তার আক্রান্তের রেখ। যে কোন মহামারীতে আমাদের উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে লাল-রেখটিকে সবুজ-রেখে পরিণত করা যায়।

কোভিড-১৯ মহামারী প্রতিরোধে কি করবেন?

এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছে অণুজীববিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের গবেষক হাসান উজ জামান শ্যামল। তার ফেসবুক পোস্টটির লিঙ্ক। সংক্ষেপে, চুম্বক অংশগুলো তুলে ধরলাম

সত্যিই যদি করোনাভাইরাসকে ঠেকাতে চান, ওসব মাস্ক-টাস্কের দিকে না গিয়ে নিচের ব্যাপারগুলো করুন।

১। প্রথমত, লোকসমাগম বা ভিড় যদ্দূর সম্ভব পরিহার করার চেষ্টা করুন। দেশের মানুষের অতটা মুখে হাত দিয়ে হাঁচি-কাশি দেওয়ার অভ্যাস নেই, তা করোনাভাইরাস আসুক আর যাই হোক। কাজেই কখন কে আপনার তিন ফুটের মধ্যে করোনাভাইরাস-অলা একটা হ্যাঁচ্চো দিয়ে বসে, তার ওপর আপনার সেরকম নিয়ন্ত্রণ নেই। ঝামেলা এড়াতে তাই যতদূর সম্ভব ভিড়বাট্টা থেকে দূরে থাকুন। জানি এটা বলা সহজ হলেও করা কঠিন, তবে চেষ্টা করুন পাবলিক বাস-টাসে একটু কম উঠতে।

বিশেষ করে যদি আপনার সর্দিকাশি জাতীয় কিছু হয়- সম্ভব হলে স্কুলকলেজ অফিস কামাই দিন।

২। যদি দেখেন আপনার আশেপাশে কেউ হাঁচি-কাশি দিচ্ছে, তার থেকে ফুটছয়েক দূরে চলে আসুন।

দেখুন, মানসম্মান, ভদ্রতা- এই জিনিসগুলোর একটা স্থান-কাল আছে। এই মুহূর্তে হয়ত দেশের মধ্যে নতুন একটা ভাইরাস ঘুরে বেড়াচ্ছে, যার টিকাই এখনো আবিষ্কার হয়নি- এটা ভদ্রতা দেখানোর সময় নয়। আপনার এবং আপনার পরিবারের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব আপনার হাতে। কাজেই কে কী ভাবল কিছু মনে করবেন না, বিন্দুমাত্র সঙ্কোচ না করে হাঁচি-কাশিঅলার কাছ থেকে দূরে চলে আসুন।

৩। আপনার যদি বাইরে হাঁচি-কাশি পায়, তাহলে কনুইয়ের ভাঁজে হাঁচি-কাশি দেবার একটা অভ্যাস করে ফেলুন। হাতের মধ্যে দিলে ভাইরাসগুলো সব হাতেই যাবে। সেই হাত দিয়ে কারো সাথে হ্যান্ডশেক করা মানে তার হাতও ভাইরাসে লেপ্টে দেওয়া।

আগেই বললাম এখন ঠিক ভদ্রতার সময় নয়। কাজেই কাউকে যদি দেখেন রাস্তাঘাটে খুব আয়োজন করে জোরসে হাঁচি-কাশি দিচ্ছেন- তাকে একটু পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করুন।

৪। চার নম্বর উপদেশটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাজারে ছোট ছোট বোতলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে পাওয়া যায়। এগুলোর একটা সবসময় সাথে রাখার অভ্যাস করুন। বাসের সিট বা রাস্তার রেলিং জাতীয় কোথায় হাত পড়লে সাথে সাথে এটা দু’হাতে ভাল করে মাখিয়ে নিন। ভাইরাস ছড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হল সন্দেহজনক কোথায় হাত লাগানো, তারপর সেই হাত নাকে-মুখে-চোখে দেওয়া। এটা করার মানে হল ভাইরাসকে তোয়াজ করে বলে- আয়রে ব্যাটা আমার ফুসফুসে আয়। এজন্য ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করার একটা অভ্যাস গড়ে তুলুন।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার কেনার সময়ও সতর্কতা অবলম্বন করবেন। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশানের পরামর্শ হল কমপক্ষে ষাট শতাংশ অ্যালকোহলওয়ালা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা। ডেটল আর লাইফবয়- দু’টোতেই যথেষ্ট অ্যালকোহল থাকে, কাজেই এদেরকে স্বচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারেন।

মনে রাখবেন, করোনাভাইরাস ঠেকানোর সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে ঘন ঘন হাত পরিষ্কার রাখা। এটা নিয়ে একটা চমৎকার শিক্ষণীয় কাহিনী আছে।

আজ থেকে আঠেরো বছর আগে এই ভাইরাসেরই এক ভাইবেরাদার চায়নাতে সার্স রোগের প্রকোপ সৃষ্টি করেছিল।

করোনাভাইরাস আসার সাথে সাথেই কর্তৃপক্ষ চায়নার বিভিন্ন প্রদেশে মোটামুটি তালাচাবি দিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু সেই সার্স প্রাদুর্ভাবের সময়টাতে বেইজিং এর একটা স্কুল খোলা ছিল। সেই স্কুলের হর্তাকর্তা তাদের বাচ্চাদের জন্য একটা বিশেষ নিয়ম জারি করলেন- প্রত্যেককে ঘন ঘন ক্লাসরুমের বেসিনে হাত ধুতে হবে। শুধু ধুলেই হবে না, হাত ধোয়ার সময় একটা গানও গাইতে হবে- যাতে অন্তত সেকেন্ড ত্রিশেক ধরে তারা ভালমত হাতটা ধোয়।

এই অভ্যাসটা করার পর দেখা গেল, স্কুলের ঐ বাচ্চাদের সার্স তো হলই না, এর পরের কয়মাস তাদের কোন অসুখই হল না। পেটখারাপ, সর্দিকাশি কিছুই না।

চলবে

ক্রমাগত এই পেজে আমি কোভিড-১৯ মহামারীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরবো।

তথ্যসূত্র

[১] The race to unravel the biggest coronavirus outbreak in the United States
[২] ফ্লোরিয়ান ক্র্যামার, প্রফেসর, ডিপার্টমেন্ট অব মাইক্রোবায়োলজি, ইকান স্কুল অব মেডিসিন, মাউন্ট সিনাই
[৩] Projecting the transmission dynamics of SARS-CoV-2 through the post-pandemic period
[৪] Trump gets a fact check on coronavirus vaccines — from his own officials POLITICO
[৫] WHO Director-General’s opening remarks at the media briefing on COVID-19 – 3 March 2020