বিজ্ঞান ব্লগে লেখার ফিল্ড গাইডলাইন

লেখালেখি একটা সৃজনশীল কাজ। কীভাবে লিখতে হয় সেটার কোন নিয়ম আসলে নাই। কিন্তু নতুন যারা লিখতে চায় তারা অনেক সময় বুঝতে পারে না কিভাবে শুরু করবে। তাদেরকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে এই সংক্ষিপ্ত গাইড-লাইনটি। লেখাটাকে ফিল্ড গাইডলাইন বলছি, কারণ আমি এখনো এই ফিল্ড — অর্থাৎ বিজ্ঞানব্লগ প্ল্যাটফর্ম নামক মাঠে আছি: লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া ও একটু একটু করে ক্রমাগত শেখার চেষ্টা করছি। সেখান থেকে আমার অভিজ্ঞতাগুলোকে একটু সাজিয়ে লেখার প্রচেষ্টা।

লেখার গঠন ও গবেষণা

একটি লেখার শুরু করার আগে একটা গাঠনিক মানচিত্র তৈরি করা যায় যে ঐ লেখাতে আসলে কী কী বিষয় থাকবে। 

লেখার মধ্যে টপিক ও সাবটপিকগুলো সাজানো হয়ে গেলে ইন্টারনেট বা বইপত্রিকায় সেটার গবেষণা করা সহজ হবে। 

লেখার মধ্যে হেডিং, সাবহেডিং আকারে বিষয়গুলো সাজালে সেটা লেখা সহজ হয়ে যায়। যেমন এই লেখাতেই আমি কঙ্কালটা এভাবে আগে সাজিয়ে নিয়েছিলাম

  • শুরু
    • লেখার গঠন ও গবেষণা
    • অনুবাদের ভাষা
    • ছবি, ছবি, ছবি
    • ফরম্যাট
    • রেফারেন্স দেয়া
    • শিরোনাম কেমন হওয়া উচিত?
    • প্রচ্ছদ ছবি ও কভার ইমেজ
  • অন্যান্য সহায়িকা

লেখার গঠন কেমন হতে পারে সেটা দেখুন বিবিসি-র এই লেখাটিতে।

লেখার ভাষা 

লেখার ভাষা ও শব্দচয়ন কেমন হবে তা একেক জনের ক্ষেত্রে নিজস্ব ব্যপার। নিয়মিত লেখালেখি চর্চা ও অন্যান্য ভালো লেখকদের লেখা পাঠের মাধ্যমে তা ক্রমেই উন্নতি হবে।

তবে অনেক সময় আমরা লেখার তথ্য খোঁজা ও গবেষণার জন্য ইন্টারনেটের সাহায্য নেই। তখন বিভিন্ন তথ্যের বর্ণনা ইংরেজি থেকে বাংলাতে অনুবাদের প্রয়োজন পড়ে। অনেকেই এক্ষেত্রে গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্য নেন।

কিন্তু এ ধরনের আক্ষরিক অনুবাদ করলে অনেকগুলো বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। যেমন, ইংরেজি আর বাংলায় বাক্যের গঠন খুব ভিন্ন।

I eat rice এর অনুবাদ আমি ভাত খাই। লক্ষ্য করুন বাক্যে riceভাত এর অবস্থান ইংরেজি ও বাংলা ভাষাতে ভিন্ন। সুতরাং বিশেষ্য-বিশেষণ ইত্যাদির পারস্পারিক অবস্থান অবশ্যই পরিবর্তন করে নিতে হবে।

তাছাড়া ইংরেজিতে প্রচুর দীর্ঘ ও জটিল-যৌগিক বাক্য ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে বাংলাতে আমরা মূলত সরল বাক্য বেশি ব্যবহার করে থাকি। যেমন:

The language of an article depends upon the purpose and audience; usually, the vocabulary of the article will fit the topic content, and who it is targeted at.

এই বাক্যটা বেশ জটিল। বাংলাতে অনুবাদ করার সময় অবশ্যই এটাকে ভেঙে ফেলতে হবে পাঠকের পড়ার সুবিধার জন্য। এর অনুবাদ হতে পারে এমন:

একটি প্রবন্ধের ভাষা নির্ভর করে এর উদ্দেশ্য ও পাঠকের উপর। সাধারণত প্রবন্ধে যেসকল শব্দ ব্যবহার করা হবে তা ওই প্রবন্ধের বিষয়ের সাথে মানানসই হয়। এছাড়া উদ্দীষ্ট পাঠক কে তাদের জানাশুনার সাথে মিলতে হবে।

লক্ষ্য করুন কিভাবে এখানে একটা বড় ইংরেজি বাক্যকে ভেঙে তিনটি ছোট বাংলা বাক্য তৈরি করা হয়েছে।

লেখার সময় বানান নিয়ে সতর্ক থাকুন। লেখা শেষে প্রুফ দেখুন। বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নির্দেশনা দেখুন এখানে। 

ছবি, ছবি, ছবি

২০০০ সালে মানুষের গড় মনোযোগ দৈর্ঘ্য ছিলো ১২ সেকেন্ড। ২০১৫ সালের গবেষণায় সেটা ছিলো ৮.২৫ সেকেন্ড।

সূত্র: টাইম

ওয়েবসাইটে কোন লেখা প্রকাশ করতে যেহেতু ছবি দেয়াটা কোন সমস্যা না (যেটা আবার প্রিন্ট মিডিয়াতে বড় সমস্যা), তাই আমি মনে করি অনলাইনে বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করলে যথেষ্ট পরিমাণ ছবি থাকা উচিত। এর কারণ আসলে দুইটি:

১. নান্দনিক। যত বেশি ছবি থাকে তত পাঠক পড়তে পছন্দ করেন। লেখা বড় হলেও ভালো ছবি থাকলে বিরক্ত লাগে না। মনোযোগ হারিয়ে যায় না বা একঘেঁয়ে লাগে না। আজকাল মানুষের মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা কম। ছবি মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

২. তথ্যমূলক। উইকিপিডিয়া কিংবা বিভিন্ন জার্নালে লেখার বিষয় সম্পর্কিত ছবি, মাইক্রোগ্রাফ, পরিসংখ্যানের গ্রাফ, গবেষণাপত্র থেকে নেয়া ছবি দেয়া আসলে শুধু নান্দনিক না বরং লেখার বিষয়ের সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করে। এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গ্রাফ যদি বাংলায় লেবেল লেখা যায় তা আরো কাজে দেয়। তখন ছবি শুধুমাত্র লেখার সজ্জা বাড়ানোর মশলা থাকে না, নিজেই একটা মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে ছবির লিঙ্ক এমবেড করে লেখাতে যুক্ত করা যায় ওয়ার্ডপ্রেসে। তবে ছবি অবশ্যই সরাসরি বিজ্ঞান ব্লগে আপলোড করা উচিত। কারণ তাহলে মূল জায়গা থেকে ছবি ডিলেট হয়ে গেলেও আমাদের ওয়েবসাইটে ছবির অনুলিপি থাকে।

ফরম্যাট

লেখা প্রকাশের আগে সুন্দর করে ফরম্যাট করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটা ভালো ফরম্যাটের লেখা পাঠকের পড়ার কাজটা অনেক সহজ করে দেয়।

ফরম্যাটিং সৃজনশীল কাজ। তবে হেডিং, সাবহেডিং, ছবির বর্ণনা, উদ্ধৃতি এগুলো দেয়া উচিত। লক্ষ্য করুন এই গাইডলাইনে আমরা অনেকগুলো হেডিং (H1) দিয়েছি। 

আমরা ওয়ার্ডপ্রেসে গুটেনবার্গ ব্যবহার করি। গুটেনবার্গ ব্যবহার করে কিভাবে লেখা ফরম্যাট করবেন সেটা দেখুন এখান থেকে। 

রেফারেন্স দেয়া

বিজ্ঞান লেখায় অবশ্যই তথ্যের রেফারেন্স দিতে হবে।

যেসব অন্যান্য সূত্র থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে, সেগুলো হাইপারলিঙ্ক-টেক্সট সহ লেখার মাঝে ও  শেষে দেয়া উচিত। 

লেখার মাঝে বিভিন্ন তথ্যের সূত্র সরাসরি লিঙ্ক আকারেই দেয়া যায়। যেমন এই লেখাটা (টেস্টিং সল্ট নিয়ে কথা) দেখুন। যেই লাইনে যে তথ্য নেয়া হয়েছে, সেই লাইনেই সেটার লিঙ্ক দেয়া হয়েছে।

এছাড়া শেষে তথ্যসূত্র দেয়ার ক্ষেত্রে এই লেখার (বিশেষ আপেক্ষিকতার বিশেষ ভর) তথ্যসূত্রগুলো দেখুন – বইয়ের ক্ষেত্রে নাম, লেখক ও সাল দেয়া হয়েছে; ইন্টারনেটের ফেসবুক নোট বা প্রবন্ধের ক্ষেত্রে নাম, শিরোনাম ও লিঙ্ক হাইপারলিঙ্ক দেয়া হয়েছে; বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও সেটা করা হয়েছে তারিখ সহ।

  • তথ্যসূত্রঃ 
    • John Robert Taylor. Classical mechanics. 2005. 
    • Leonard Susskind, Art Friedman. Special Relativity and Classical Field Theory: The Theoretical Minimum. 2017.
    • Daniel Fleisch. A Student’s Guide to Vectors and Tensors. 2011.
    • Arshad Momen. Relativistic Mass: A Lost Cause. 2013 – Facebook Note.
    • Why is relativistic mass considered a bad concept? – Quora.
    • Z. K. Silagadze. Relativistic Mass and Modern Physics. 2014. arXiv: 1103.6281.
    • Eugene Hecht. How Einstein Confirmed. 2011. DOI: 10.1119/1.3549223.
    • Eugene Hecht. Einstein Never Approved of Relativistic Mass. 2009. DOI: 10.1119/1.3204111.

এছাড়া, বিজ্ঞান ব্লগে যদি ইতিমধ্যে আপনার লেখার বিষয় সম্পর্কিত কোন লেখা পূর্বপ্রকাশিত থাকে, সেগুলোরও লিঙ্ক দিন। যেমন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা বিষয়ক একটি লেখায় যেখানে প্রযোজ্য সেখানে আমি বিজ্ঞান ব্লগে থাকা অন্য চারটি লেখা লিঙ্ক দিয়ে সংযুক্ত করেছি।

শিরোনাম কেমন হওয়া উচিত?

শিরোনাম লিখতে গিয়ে এ কী করলেন বিজ্ঞান-লেখক (ভিডিও সহ)

বুঝতে পারছেন যে এটা মূলত ক্লিক-বেইট। অর্থাৎ সংবেদনশীল শিরোনাম লেখা হয়েছে যেটার উদ্দেশ্যই হলো পাঠককে ক্লিক করানো।

ডিজিটাল মার্কেটার, স্প্যামারদের জ্বালায় এই ধরণের টাইটেল বা শিরোনাম এখন আমরা এড়িয়েই চলি। কিন্তু এমন না যে সেখান থেকে শেখা যাবে না।

আপনি অনেক যত্ন নিয়ে, প্রচুর পড়াশুনা আর গবেষণা করে একটা তথ্যনির্ভর বিজ্ঞানের লেখা লিখলেন। তারপর সেটা ব্লগে সুন্দর করে ফরম্যাটিং করলেন। লেখার জায়গায় জায়গায় সমর্থিত রেফারেন্স দিলেন হাইপারলিঙ্কের মাধ্যমে। তারপর লেখাটা ফেসবুকে শেয়ার করে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলেন পাঠকদের পাঠকদের মাঝে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু হয়তো একটা ভালো শিরোনামের অভাবে উদ্দীষ্ট পাঠকরা বুঝতেই পারলো না লেখাটা কি নিয়ে।

আমি নিজেও জানি না কিভাবে ভালো শিরোনাম লিখতে হয়। কোন গোপন নিয়ম নেই। কিন্তু ভালো শিরোনামের দুয়েকটা বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়।

প্রথমতঃ, শিরোনাম এক লাইনেই একটা গল্প বলবে, পড়লেই বোঝা যাবে কাহিনীটা আসলে কি।

দ্বিতীয়তঃ, সেটা পাঠককে কৌতুহলী করে তুলবে।

আমার কাছে সম্প্রতি বিজ্ঞান ব্লগের কয়েকটা লেখার শিরোনাম বেশ ভালো মনে হয়েছে। যেমন:

এই প্রতিটি শিরোনামের মধ্যেই একটা গল্প বলার ঢঙ আছে, সুনির্দিষ্ট বার্তা আছে। কৌতুহল জাগানোর একটা শক্তি আছে। লেখালেখি একটা শিল্পকলা বা craft। শিল্প হিসেবে না নিলেও নিজের লেখায় ‘ক্লিক‘ বাড়ানোর উদ্দেশ্যেও শিরোনাম নিয়ে চিন্তাভাবনা করা দরকার।

কেমন শিরোনাম দেয়া উচিত, তা সম্পর্কে এই ভিডিওটি দেখুন। যদিও সেটা ইংরেজির জন্য, কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রেও অনেকগুলো পদ্ধতি প্রযোজ্য।

প্রচ্ছদ ছবি বা কভার ইমেজ

বিজ্ঞান ব্লগের লেখাগুলো আমরা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করি। সেখানে শেয়ারের সময় প্রচ্ছদ ছবি হিসেবে কি দেয়া হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। 

এমন ছবি ব্যবহার করা উচিত যেটা বিষয় সম্পর্কিত, নান্দনিক এবং সুন্দর। 

অন্যান্য সহায়িকা

বলা বাহুল্য, এই গাইডলাইনটা একদম টেকনিক্যাল। এ ছাড়াও আব্দুল্লাহ আল-মুতী ও ফারসীম মান্নান-মোহাম্মদীর দুইটি সুন্দর লেখা রয়েছে বিজ্ঞান লেখালেখি নিয়ে।

আব্দুল্লাহ আল-মুতী

বাংলাতে সর্বসাধারণের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করেছেন আব্দুল্লাহ আল-মুতী। তিনি লেখালেখি শুরু করেন ছাত্রজীবন থেকেই। বিজ্ঞানের জটিল, সূক্ষ্ম বিষয়কে সহজ ভাষায় সর্বজনবোধ্য করে তোলার জন্য তার দক্ষতা ও সাফল্য ছিল তুলনাহীন। তাঁর প্রকাশিত বিজ্ঞান ও শিক্ষা বিষয়ক মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যা ২৭, অনুদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১০, সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১০।  বিজ্ঞান নিয়ে লেখা কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে রয়েছে তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধ। পড়ুন তাঁর বিজ্ঞান নিয়ে লেখা তেমন কঠিন নয় প্রবন্ধটি।

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীডক্টর ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান লেখক। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা: সবার জন্য জ্যোতির্বিদ্যা, দূর আকাশের হাতছানি, অপূর্ব এই মহাবিশ্ব, মহাকাশের কথা, ন্যানো, অংকের হেঁয়ালি ও আমার মেজোকাকুর গল্প, জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান পরিচিতি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান শব্দকোষ। মাসিক বিজ্ঞান পত্রিকা জিরো টু ইনফিনিটি এবং বিজ্ঞান সংগঠন বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি-র মাধ্যমে বাংলাদেশের চলমান বিজ্ঞান আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। পড়ুন তাঁর বিজ্ঞান-লেখা কেন ও কীভাবে  প্রবন্ধটি।

(আরাফাত রহমান। সংস্করণ ১। ৩০ জানুয়ারি, ২০২১)

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.