পরমাণুর আভ্যন্তরীন মহাবিশ্বে ভ্রমণ-৪

internet connection school technology
Photo by Tara Winstead on Pexels.com
পাঠসংখ্যা: 👁️ 284

পরমাণুর অাভ্যন্তরীন মহাবিশ্বে ভ্রমণ
মূল: আইজ্যাক আসিমভ
অধ্যায়-১: পদার্থ
অনুচ্ছেদ-৪: পরমাণুর বাস্তবতা

পারমাণবিক তত্ত্ব যতোই ভালোভাবে কাজ করুক কিংবা যতোই দক্ষতার সাথে এর উন্নতি ঘটানো হোক কিংবা যতোই এটি নতুন নতুন আবিষ্কারের দিকবর্তিকা দিক না কোন, একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত রয়েই যায় আর তা হচ্ছে পরমাণু কেউই দেখতে পায়নি কিংবা কেউ কোনোভাবে শনাক্ত-ও করতে পারে নি। পরমাণুর যাবতীয় সাক্ষ-প্রমাণই পরোক্ষভাবে অর্জিত। আপনি হয়তো পরমাণু ধরে নিলে আপনার অমুক পরীক্ষা ব্যাখ্যা করতে পারছেন কিংবা তমুক পর্যবেক্ষণের ভিত্তি দিতে পারছেন কিন্তু পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে ভুলও হতে পারে। পারমাণবিক তত্ত্ব মোটের উপর একটি চিত্র দেয় যা ঠিকঠাক কাজ করে বলে দেখা যায়, কিন্তু এটি হয়তো বা খুব সরলীকৃত একটি মডেল যার প্রকৃত বিষয়টি অত্যন্ত জটিলও হতে পারে। এই বিষয়টিকে পোকার খেলার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। পোকার খেলার শুরুতে নির্দিষ্ট পরিমান টাকার বিনিময়ে পোকার চিপ কিনতে হয় যে চিপগুলো খেলার মধ্যে টাকা হিসেবেই বিবেচিত হয়। খেলার মাঝে যাবতীয় লেনদেন সেই চিপের সাহায্যেই করা হয়, এবং লাভ ক্ষতির হিসেবও সেই চিপের সাহায্যে যথার্থভাবেই রাখা যায় কিন্তু আদতে পোকার চিপ কিন্তু টাকা নয়। পোকারের বাইরে সেগুলোর আর কোনো মূল্য নেই। সেগুলো কেবল টাকার একধরনের প্রতীক মাত্র।

এখন, মনে করুন, পরমাণুর ধারনাও রসায়ন নামক খেলায় পোকারের চিপের মতোই। যেখানে পরমাণু হয়তো এমন কোনো কিছুর প্রতীক যা আসলে খুবই জটিল এবং পরমাণু শুধুমাত্র সেসব জটিল বিষয়ের আংশিক প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। এমনকি ডাল্টনের সময়ের শতবর্ষ পরেও এমন কয়েকজন বিজ্ঞানী ছিলেন যারা এই বিষয়ে খুবই সাবধান ছিলেন এবং তাঁরা পরমাণু ধারনাটিকে আক্ষরিকভাবে গ্রহণের বিষয়ে অন্যদের সতর্ক করে দেন। তাঁরা বলেন, পরমাণুর ধারনা প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করো, কিন্তু এটা মনে কোরো না যে সত্যিই পরমাণু অতি ক্ষূদ্র গোলগাল বিলিয়ার্ড বলের আকৃতির মতো বস্তু। এই বিজ্ঞানীদের মাঝে একজন ছিলেন রাশিয়ান-জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ উইলহেম অসওয়াল্ড (Friedrich Wilhelm Ostwald, ১৮৫৩-১৯৩২)।

Wilhelm Ostwald.jpg
উইলহেম অসওয়াল্ড

পরমাণু তত্ত্ব সংক্রান্ত এই সমস্যার সমাধানে কিন্তু এরই মাঝে অনেক অগ্রগতি হয়ে এসেছিলো। এবং এই অগ্রগতি এমন একটি মাধ্যম থেকে এসেছে যার সাথে পরমাণু গবেষণার সম্পর্ক নেই বললেই চলে এবং এমন একজন বিজ্ঞানীর হাত ধরে তা এসেছে যিনি পরমাণু নিয়ে খুব সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছেন।(এটি মনে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, জ্ঞানের প্রতিটি শাখাই পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং আপাতদৃষ্টি সম্পূর্ণ পৃথক দু’টি বিষয়ও কাকতালীয় ভাবে এবং ঘটনাক্রমে পরষ্পরের সাথে গভীর সম্পর্ক যুক্ত হিসেবে আবিষ্কার করা যেতে পারে)।

১৮২৭ সালে স্কটল্যান্ডের উদ্ভিদবিদ রবার্ট ব্রাউন (Robert Brown, ১৭৭৩-১৮৫৮) একটি মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পানিতে ভাসমান পরাগরেণুর গতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি লক্ষ করেন যে, প্রতিটি পরাগরেণুই পানিতে হালকাভাবে এবং অত্যন্ত খামখেয়ালি ও বিক্ষিপ্তভাবে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছে। সেগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কনকনে পানিতে ঠান্ডায় কম্পমান। তিনি নিশ্চিত হলেন যে, পানির স্রোত, কিংবা পানির বাস্পীভবনজনিত গতি এই ঘটনার জন্য দায়ী নয়। তিনি উপসংহার টানলেন এই ভেবে যে ভিন্ন কোনো কারনে এই ঘটনাটি ঘটছে।

Robert Brown (botanist).jpg
রবার্ট ব্রাউন

ব্রাউন এরপর ভিন্ন ধরনের পরাগ নিয়ে চেষ্টা করলেন এবং দেখলেন প্রতি ক্ষেত্রেই রেণুগুলো একইভাবে কম্পমাণ, দেখে মনে হয় যেন সেগুলো জীবন পেয়েছে। তিনি নিশ্চিত হওয়ার জন্য শতবছরের পুরনো মৃত রেণু নিয়ে পরীক্ষা করলেন; ফলাফল একই। তিনি এরপরে ভিন্ন ধরনের ক্ষূদ্র বস্তু নিয়ে পরীক্ষা করলেন যেগুলোতে প্রাণের উপস্থিতি থাকার কোনো সুযোগ নেই যেমন: ঘাসের গুচ্ছ, কয়লা কিংবা ধাতু প্রভৃতি এবং এদের সবগুলোই একই ভাবে গতিশীলতা প্রদর্শন করল। এই বিশেষ ধরনের গতির নাম দেওয়া হলো ব্রাউনীয় গতি, এবং এই ঘটনার ব্যাখ্যা করার মতো কাউকে তখন পাওয়া গেলো না।