পরমাণুর আভ্যন্তরীন মহাবিশ্বে ভ্রমণ-৭

internet connection school technology
Photo by Tara Winstead on Pexels.com
পাঠসংখ্যা: 👁️ 394

পরমাণুর অাভ্যন্তরীন মহাবিশ্বে ভ্রমণ
মূল: আইজ্যাক আসিমভ

অধ্যায়-২ : আলো
অনুচ্ছেদ-২: চার প্রকার প্রতিভাস

পুরোপুরি সন্তোষজনক উত্তর খুবই বিরল এবং এই কথা বিজ্ঞানের জন্য খুবই প্রযোজ্য যেখানে প্রতিটি উত্তর একেকটি নতুন ও আরো সূক্ষ প্রশ্নের জন্ম দেয়। আমরা যদি স্বীকৃতি দিয়ে দিই যে, আলো; শব্দ কিংবা আন্দোলিত পুকুরের মতোই তরঙ্গের সমাহারে গঠিত তাহলে সমস্যা থেকে যায় যে, আলো খুব সহজেই শূন্য মাধ্যমে চলতে পারে যেখানে শব্দ কিংবা পানির তরঙ্গ তা পারে না।পানির তরঙ্গ তৈরি হয় কেননা পানির অণুগুলো নিয়মিত উপরে-নীচে স্পন্দিত হতে থাকে। যদি পানি না থাকত তাহলে পানির তরঙ্গও থাকত না। শব্দ তরঙ্গ তৈরি হয় বায়ুর অণুগুলোর (কিংবা অন্য পদার্থের অণু বা মাধ্যম যার মধ্য দিয়ে শব্দ চলাচল করে) আগে-পিছে আন্দোলনের মাধ্যমে। যদি বায়ু বা অন্য মাধ্যম না থাকত তাহলে শব্দ তরঙ্গও থাকতো না।

কিন্তু আলোর তরঙ্গের ক্ষেত্রে এমন কী আছে যা উপরে-নীচে স্পন্দিত হয়? এটি কোনো ধরনের পদার্থ হতে পারে না কেননা আলো তো শূন্য মাধ্যম দিয়েও চলাচল করে যেখানে স্পষ্টতই কোনো পদার্থ নেই। নিউটন ১৬৮৭ সালে যখন সর্বজনীন মহাকর্ষ নিয়ে কাজ করছিলেন তখন একই রকমের সমস্যায় পড়েছিলেন। সূর্য পৃথিবীকে ১৫ কোটি কিলোমিটার দূর থেকে এর মহাকর্ষীয় গ্রীবায় ধরে রেখেছে শূন্যের ভিতর দিয়ে। কীভাবে শূন্যের মধ্য দিয়ে ভ্রমন করে মহাকর্ষীয় প্রভাব সম্ভব?

নিউটন হালকাভাবে চিন্তা করে দেখলেন, হয়তোবা শূন্য মাধ্যম পুরোপুরি শূন্য নয়, এর বদলে এটি এমন এক ধরনের পদার্থ দিয়ে গঠিত যা সাধারণ পদার্থের চেয়ে আরো সূক্ষ এবং এই কারনে সহজে শনাক্ত করা যায় না। শূন্য মাধ্যমের এই পদার্থের নাম দেওয়া হলো ইথার (ether) যা এরিষ্টটলের “aether” নামের প্রতি সম্মানপূর্বক দেওয়া হয়েছে, যেটিকে এরিস্টটল ধারনা করেছিলেন সমগ্র স্বর্গীয় বস্তুসমূহের গঠনের উপাদান হিসেবে। সূর্যের মহাকর্ষের মাধ্যমে ইথারে টান লাগে যা পর্যায় ক্রমে ইথারের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে পরিবাহিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা পৃথিবীর প্রতি সূর্যের টান হিসেবে প্রতীয়মান হয়। হয়তোবা এটিই সেই ইথার (কিংবা অন্যরকম) যার উপরে-নিচে স্পন্দনের মাধ্যমে আলো অতিক্রম করে। এটিকে সম্পূর্ণ মহাবিশ্বেই ছড়িয়ে থাকতে হবে কেননা আমরা খুব দূরবর্তী তারকাও দেখতে পাই। আরো ব্যাপার হচ্ছে এটি এতই সূক্ষ এবং বিরল ধরনের পদার্থ যে এটি পৃথিবী বা অন্যান্য স্বার্গীয় বস্তুর চলাচলে কোনো রকম বাধা সৃষ্টি করে না। ফ্রে’নেল প্রস্তাব করলেন ইথার এমন পদার্থ যা পৃথিবী ও অন্যান্য স্বর্গীয় বস্তুকে ভেদ করে যেতে পারে।

ইথারের কণা তরঙ্গের আন্দোলনের সময় যখন উপরে উঠে তখন বিপরীত দিকে একটি বল অনুভব করে যা তাদের নিচে টেনে ধরে এবং সাম্যাবস্থা থেকে নিচের দিকে নামায়। এই সময় তারা পুনরায় উপরের দিকে টান অনুভব করে এবং উপরে উঠতে থাকে, এভাবেই ওঠা-নামা চলতে থাকে।কোনো মাধ্যম যতো বেশী দৃঢ় হবে এই ওঠা-নামা ততোই দ্রুততর হবে এবং তরঙ্গ ততোই দ্রুত এই মাধ্যমের মধ্য দিয়ে চালিত হবে। আলো প্রতি সেকেন্ডে ২৯৯,৭৯২ কিলোমিটার (১৮৬,২৯০ মাইল) পথ অতিক্রম করে। ড্যানিশ জোতির্বিদ ওলস রেমার (Olaus  Roemer, ১৬৪৪-১৭১০) সর্বপ্রথম স্থুল ভাবে আলোর গতি পরিমাপ করেন। যদি ইথারের মধ্য দিয়ে আলোকে অতিক্রম করতে হয় তাহলে তাকে স্টীলের চেয়ে দৃঢ় হতে হবে।

শূন্য মাধ্যমকে যদি এমন সূক্ষ কিছু দিয়ে তৈরি হতে হয় যা বিনা বাধায় এর মধ্য দিয়ে কোনো বস্তুকে যেতে দেয় আবার একই সাথে তাকে স্টীলের চেয়েও দৃঢ় হতে হয় তাহলে পরো ব্যাপারটি বিভ্রান্তিকর অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায় কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে সেই্ মূহুর্তে এই পরিস্থিতি ধরে নেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না।

আলো এবং মহাকর্ষের বাইরেও আরো দু’টি ঘটনা সেই সময়ে পরিচিত ছিলো যা শূন্য মাধ্যমের মধ্য দিয়ে অনুভব করা সম্ভব। এই দু’টি বিষয় হচ্ছে তড়িৎ এবং চৌম্বকত্ব। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী এ দু’টিরই প্রথম চর্চা করেছেন গ্রীক দার্শনিক থ্যালেস। তিনি নির্দিষ্ট এক ধরনের লোহার আকরিক নিয়ে অধ্যয়ন করেন যা এজিন সাগরের সমুদ্রতটে অবস্থিত ম্যাগনেসিয়া নামক শহরের কাছাকাছি পাওয়া যায়। এটি লোহার টুকরোকে আকর্ষণ করার মতো ক্ষমতা প্রাপ্ত এবং এর নাম তিনি ho  magnetes  lithos (the  Magnesian  rock ম্যাগনেসিয়ার পাথর) দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত লোহাকে আকর্ষনে সক্ষম সকল বস্তুকে ম্যাগনেট (magnet বাংলায় চুম্বক) নামে ডাকা হয়।

থ্যালেস আরো দেখলেন এম্বারের টুকরোকে (পাইন গাছ হতে নির্গত রেজিন) যদি ঘষা হয় তাহলে তা সুনির্দিষ্টভাবে লোহাকেই নয় বরং যেকোনো হালকা বস্তুকে আকর্ষণ করে। দু’ই ঘটনার এই পার্থক্য থেকে বোঝা যায় এ্যাম্বারের এই আকর্ষণ চৌম্বকত্ব নয় বরং অন্য কিছু। এ্যাম্বারের গ্রীক হচ্ছে electron এবং কালক্রমে এই ধরনের ঘটনা ইলেক্ট্রিসিটি (electricity বাংলায় তড়িৎ বা বিদ্যুৎ) নামে প্রসার লাভ করল।

একাদশ শতকের কোনো এক সময়ে চীনে (যদিও ঠিক কোন স্থানে এবং কার মাধ্যমে তা জানা যায় না) আবিষ্কৃত হয়েছিলো যে চৌম্বক আকরিক হতে তৈরি কিংবা ইস্পাতকে চৌম্বক আকরিকের সাথে ঘষে চুম্বকে পরিণত করা কোনো সূঁচকে যদি মুক্তভাবে ঝুলতে দেওয়া যায় তাহলে তা উত্তর-দক্ষিন দিকে দুই প্রান্ত নির্দেশ করে নিজেকে বিন্যাস্ত করে। শুধু তা-ই নয়, যদি সুঁচের প্রান্তগুলোকে চিহ্নিত করা হয় তাহলে দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট প্রান্ত সর্বদাই একটি নির্দিষ্ট দিকেই মুখ করে থাকে।

যে প্রান্তটি উত্তর দিকে মুখ করে থাকে তাকে উত্তর মেরু এবং অপর প্রান্তকে দক্ষিন মেরু আখ্যা দেওয়া হয়। ফরাসি পন্ডিত পেট্রাস পেরেগ্রিনাস (Petrus Peregrinus, ১২৪০-?) এই ধরনের সূঁচ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন এবং দেখলেন যে একটি সুঁচের উত্তর মেরু অপরটির দক্ষিন মেরুকে আকর্ষণ করে। অপর দিকে দু’টি সুঁচের উত্তর মেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। সংক্ষেপে, সমধর্মী মেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীত ধর্মী মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে।

১৭৮৫ সালে ফরাসি পদার্থবিদ চার্লস অগাস্তে দ্যা কুলম্ব (Charles Augustin de Coulomb, ১৭৩৬-১৮০৬) যে বলে একটি উত্তর মেরু অপর একটি দক্ষিন মেরুকে আকর্ষণ করে বা অপর একটি উত্তর মেরুকে বিকর্ষণ করে তা মেপে দেখেন। তিনি দেখলেন যে, আকর্ষণ বা বিকর্ষণ দুরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে দুরত্বের বর্গীয় (square) হারে কমতে থাকে (বিপরীত বর্গীয় সূত্র)। অর্থাৎ আপনি যদি পূর্বের দুরত্বের চেয়ে দু’টি বস্তুর দুরত্ব x গুণ বৃদ্ধি করেন তাহলে তাদের মধ্যবর্তী বলের মান হয়ে যাবে আগের মানের 1/x X 1/x বা 1/x^2। ১৬৮৭ সালে নিউটন যখন মহাকর্ষ বল নিয়ে কাজ করছিলেন তখন তিনিও সেখানে বিপরীত বর্গীয় সূত্রটি ক্রিয়াশীল দেখতে পেয়েছিলেন।

Charles de coulomb.jpg
চার্লস অগাস্তে দ্যা কুলম্ব