কৃত্রিম বৃষ্টি : প্রকৃতি যখন হাতের নাগালে [১]

মানুষের প্রয়োজন ও সক্ষমতাঃ

খ্রিস্টের জন্মের ২১৫০ বছর আগে চীনের ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে তাকালে দেখা যাবে সেখানকার সম্রাট ইয়ু তার রাজ্যের বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা তৈরি করার মাধ্যমে কৃষকের ফসল রক্ষা করে বিখ্যাত হয়ে আছেন। কিন্তু আজকের দিনের সেই চিত্র একদমই ভিন্ন। একসময় যে চীনের এক স্থানে নদীর পানি আটকে রাখা শক্ত ছিল আজ এত বছর পরে সেই চীনেই একফোঁটা পানির জন্য নানা কসরত করতে হয়।

পানি মানুষের জন্য আশীর্বাদ। একসময় বৃষ্টি হবে, এই আশা করে এখনো অনেক এলাকায় ধান লাগানো হয়। যদি উপযুক্ত সময়ে বৃষ্টি না হয় তাহলে ধানের জমি কৃষকের মন খুশি করতে পারে না। বাংলাদেশেরই আবহাওয়া এরকম যে, দেখা গেল একসময় দিনের পর দিন বৃষ্টি হয়ে গেল যতটা বৃষ্টি মানুষের কোনো দরকার নেই। বৃষ্টি হতে হতে একেবারে বর্ষা ডিঙ্গিয়ে বন্যা হয়ে গেল কিন্তু তাতে মানুষের কোনো ফায়দা হলো না। আবার প্রয়োজনের সময় দিনের পর দিন বৃষ্টির নামে নাম নেই। তার টিকিটার দেখাও পাওয়া যায় না।

সেই কতকাল আগে থেকে মানুষ প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে চলে আসছে। যেদিন থেকে মানুষের সৃষ্টি সেদিন থেকেই মানুষ প্রকৃতির কাছে বশীভূত। কিন্তু মানুষ সে ‘মানুষ’- সে চায়না কারো বশে থাকতে। এমনই গুনের কারণে মানুষ ধীরে ধীরে প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণকে ছাড়িয়ে বরং প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। গরমের দিনে বাতাসের দেখা নেই তাতে কী, ফ্যান লাগিয়েছে। পানিতে হাঁটা যায়না তাতে কী, নৌকা বানিয়েছে, তাপশক্তিকে সহজে কাজে লাগানো যায় না তাতে কী, ইঞ্জিন বানিয়েছে। প্রকৃতির হাজার হাজার উপাদান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে বৃষ্টিকেও। ইচ্ছা হলেই বৃষ্টি নামিয়ে নিতে পারছে, ইচ্ছা হলেই অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিকে দূরে সরিয়ে দিতে পারছে।

‘মানুষের প্রচেষ্টায় কি বৃষ্টি নামানো যাবে?’- এমন জিজ্ঞাসা সামনে আসলেই দেখতে হবে বৃষ্টি কীভাবে তৈরি হয়। কীভাবে বৃষ্টি তৈরি হয় তার কলা-কৌশলটা জেনে গেলে মানুষ কৃত্রিমভাবে নানা প্রভাবক উপকরণ কিংবা বিকল্প উপকরণ দিয়ে বৃষ্টি নামানোর চেষ্টা করবে। কৃত্রিম বৃষ্টি নামক ব্যাপারটা আধুনিক একটা ধারণা হলেও এর চাহিদা ছিল হাজার হাজার বছর আগে থেকেই। গ্রামের মানুষেরা “আল্লা মেঘ দে পানি দে”র গানের মাধ্যমে সেই চাহিদার কথাটাই তো জানান। আর এই চাহিদা তো হাজার হাজার বছরের মানুষের চাহিদাই।

ফসলের সময় বৃষ্টি না হলে এখনো বাংলাদেশেরই অনেক জায়গায় ঈদের নামাজের মত করে সম্মিলিতভাবে বৃষ্টির জন্য মোনাজাত করা হয়। আমি নিজেও একবার এই মোনাজাত করেছিলাম। ^_^ [আমাদের গ্রামে অবশ্য এখন আর বৃষ্টির জন্য নামাজ পড়ে না। মাটির অনেক নিচে প্রসারিত প্রচুর পানি উত্তোলন করতে পারে এমন ক্ষমতাসম্পন্ন ডিপ টিউবওয়েল বসানো হয়েছে পাঁচ ছয়টা। যে জমিগুলো উঁচু কিংবা ডিপ টিউবওয়েলের পানি যেখানে যেতে পারে না সেখানে বসানো হয়েছে শেলো মেশিন। এভাবেই সময়ের সাথে সাথে মানুষ প্রকৃতির কাছে না চেয়ে নিজেই প্রকৃতির কাছ থেকে ছিনিয়ে আনছে নিজের চাহিদা।] এছাড়াও মাত্র শত বছর আগের মানুষেরাও বিজ্ঞানের মুখোশ পরিয়ে অপবিজ্ঞানের চর্চা করতো। যেমন ঐ সময়কার মানুষ খেয়াল করেছে বজ্রপাতের সময় বৃষ্টি হয়। আর বজ্রপাতের সময় বিশাল শব্দ হয়- তাই কৃত্রিমভাবে বজ্রপাতের মত করে শব্দ উৎপন্ন করতো আর মনে করতো এতে করে বৃষ্টি হবে। শব্দের মতই বিজলি বাতির মত আলোকের ব্যবস্থা করতো, চিৎকার চেঁচামেচি করতো। স্বাভাবিক ভাবেই এতে বৃষ্টি হতো না, মাঝে মাঝে দুয়েকবার বৃষ্টি হলেও সেটা নেহায়েতই যে কাকতালীয় সেটা যেন খেয়াল করতো না কেউ। এক হাজার বারের চেষ্টায় যদি দুই এক বার বৃষ্টি হতো তাহলে সেগুলোকেই স্মরণ করে রাখতো, কিন্তু নয়শো নিরানব্বই বারই যে ব্যর্থ হল সেটা যেন কারো চোখেই পড়ে না।

 

ক্রিয়া-কৌশলঃ

ভূমি থেকে কিংবা সমুদ্র থেকে যে পানিগুলো বাষ্প হয়ে উড়ে যায় সেগুলো পরে শীতলীত ও ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টি আঁকারে ঝরে পড়ে। বৃষ্টি সংঘটনের জন্য একদম মূল উপাদান ঘনীভবন। অনেক অনেক মেঘ একত্র হয়ে আছে কিন্তু সেগুলো দিনের পর দিন বৃষ্টি আঁকারে ঝরে পরার নামে নাম নেই এমন প্রায়শই দেখা যায়। এমনটা হবার কারণ মেঘের মাঝে অন্য সব প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়ে থাকলেও ঘনীভবনটা হয়নি। এমনকি সে মেঘের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে দিনের পর দিন থাকলেও ঘনীভবন না হলে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে না। [ঘনীভবন কী, বৃষ্টি সংঘটনের জন্য ঘনীভবন কেন দরকারী, বৃষ্টি সংঘটনের ক্রিয়া-কৌশল নিয়ে স্বতন্ত্র একটি লেখা আছে বিজ্ঞান ব্লগে। জিজ্ঞাসু হলে পড়তে পারেন।]

চিত্র: মেঘের কণা যতক্ষণ পর্যন্ত বাতাসে ভেসে বেড়ানোর মত হালকা থকবে ততক্ষণ তার তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকলেও বৃষ্টি আঁকারে ঝরে পড়বে না।

প্রাকৃতিকভাবে না হওয়া সেই ঘনীভবনটাই যদি কৃত্রিমভাবে করানো যায় তাহলে তো বৃষ্টি পাওয়া যাবার কথা। কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি নামানোর জন্য এই ব্যাপারটাকেই টার্গেট করেছিলেন বিজ্ঞানীরা।

বাষ্পের কণাগুলো যত ঠাণ্ডাই হোক না কেন হালকা থাকলে তা বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে। যখন সেটা ধীরে ধীরে ভারী হয় তখন আর বাতাসে ভর করে ভেসে থাকতে পারে না, অভিকর্ষের টানে নীচে নেমে আসে। ঘনীভবন ব্যাপারটা মেঘের কণাগুলোকে একত্র করে একটার সাথে আরেকটার মিলন ঘটিয়ে ভারী করে তুলে। এভাবেই বৃষ্টি নামে।

প্রাকৃতিক উপায়ে ঘনীভবন যদি না হয় তাহলে সেখানে ব্যবহার করা যেতে পারে কৃত্রিম উপায়। বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন মেঘের মাঝে যদি ড্রাই আইস ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে সেই ড্রাই আইস আশেপাশের মেঘের কণাগুলোকে একত্র করে ফেলতে পারে। অনেকটা আবেশী প্রক্রিয়ার মত। এর কৌশল এরকম- প্রচণ্ড চাপে সংকুচিত হয়ে যাওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ড্রাই আইস থাকে অত্যধিক পরিমাণ ঠাণ্ডা। মেঘের দেশে গিয়ে সেটি ধীরে ধীরে মুক্ত হতে থাকে এবং আশেপাশের মেঘের কণাগুলোকে একত্র করতে থাকে। আশেপাশের মেঘের কণাগুলো একত্র হয়ে গেলে, একত্র হওয়া এলাকার চারপাশের কণাগুলো একত্র হয়ে যায়, মোটামুটি বিশাল একটা এলাকায় ঘনীভবন সংঘটিত হয়। কৃত্রিম ভাবে বৃষ্টি নামানোর এই প্রক্রিয়াকে বলে ক্লাউড সীডিং [Cloud seeding]।

 

কৃত্রিম বৃষ্টির ইতিহাসঃ

১৯৪৬ সালের জুলাইতে বিজ্ঞানী ভিনসেন্ট শেইফার প্রথমে কৃত্রিম বৃষ্টির নীতি আবিষ্কার করেন। পরে তিনি এবং আরেক নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ল্যাংমুর একত্রে মিলে কৃত্রিম বৃষ্টি সৃষ্টি করার পন্থা উদ্ভাবন করেন। তারা শীতলীকরণ যন্ত্রে কৃত্রিমভাবে তৈরি মেঘমালাকে রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পান যে বৃষ্টি সৃষ্টি হতে যে পরিমাণ শীতলতার দরকার বায়ুমণ্ডলের বাষ্পকে মেঘে রুপান্তরিত করতে সে পরিমাণ শীতল এই যন্ত্র করতে পারে না। তখনকার সময় তিনি জানতেন ড্রাই আইস নামক কঠিনিত কার্বন ডাই-অক্সাইডের গুড়ো অনেক ঠাণ্ডা। তিনি পরীক্ষায় ড্রাই আইস ব্যবহার করলেন। এবং অবাক হয়ে আবিষ্কার করলেন সেখানে সৃষ্ট পদার্থ আলোর দারুণ প্রতিফলন করছে। তিনি বুঝতে পারলেন এখানে বরফের কেলাসের সৃষ্টি হয়েছে যা পরিষ্কারভাবে ল্যাম্পের আলোর প্রতিফলন দিচ্ছে। এবং সাথে সাথে উদ্ভাবন করে ফেললেন অতি শীতল করার দারুণ এক উপায়। সর্বপ্রথম প্রকৃতির মেঘকে মানুষের হাতে বৃষ্টিতে [তুষার] রূপান্তর করা হয় ১৯৪৬ সালের ১৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে।

 

[লেখাটি বড় হয়ে যাওয়াতে তিনটি অংশে ভাগ করে প্রকাশ করেছি। এরপর দেখুন ২য় অংশে]

৪ thoughts on “কৃত্রিম বৃষ্টি : প্রকৃতি যখন হাতের নাগালে [১]

  1. বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কৃত্রিম বৃষ্টির কথা ভাবছিলাম: বাংলাদেশে এখন কৃষিকাজ বৃষ্টি নির্ভর নয়, আমরা সেচ দিচ্ছি ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। বাংলাদেশে কখনো কৃত্রিম বৃষ্টির ব্যবস্থা করতে গেলে তখন ছোট আকারের উড়োজাহাজ লাগবে, সে জন্য প্রয়োজন মতো ছোট আকারের বিমান বন্দরও লাগবে। কৃষি ছাড়া অন্য কোন কাজে কৃত্রিম বৃষ্টি কি লাগবে?

    1. বাংলাদেশে তো প্রচুর খেলা হয়। বিশেষ করে ক্রিকেট। ওয়ান ডে বিশ্বকাপের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে টি-২০ বিশ্বকাপ। এছাড়াও অনেক আন্তর্জাতিক খেলাই বাংলাদেশে হয়। প্রতি বছরই অনেক খেলা বৃষ্টির কারণে আটকে থাকে। এই বছরেও তো অনেকগুলো উদাহরণ আছে। এই ক্ষেত্রে ম্যাচ শুরু হবার আগেই মাঠের আশপাশ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে নিলে ম্যাচের মাঝে বৃষ্টি নেমে যাবার ভয় থাকবে না।

      ভূ-গর্ভস্থ পানিতেও অনেকের আপত্তি আছে। পানির স্তর কমে যাবে, এই-সেই। তাই একটা বিকল্প পদ্ধতি নাগালের ভিতরে থাকা ভালো।

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.