একটি মানুষ আর একটি বাহিনী (আবদুল্লাহ আল-মুতী)

একটি মানুষ। তাও তার বয়স হয়েছে সত্তুর বছরের ওপরে। কতটুকুই-বা শক্তি তার গায়ে। তবু এই মানুষটি লড়ছে এক বিরাট সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে। নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে বিশাল বাহিনীকে। যে-সে বাহিনী নয়। সেকালের দুনিয়ার সবচেয়ে দুর্ধর্ষ রোমের সৈন্য তারা।

আরও আশ্চর্য, এই মানুষটি কিন্তু সেনাপতি নয়। যুদ্ধবিদ্যাই শেখেনি সে কোনোদিন। তবু তিন বছর ধরে লড়াই করে ঠেকিয়ে রেখেছে প্রবল পরাক্রমশালী রোমান বাহিনীকে। বুদ্ধির জোরে রক্ষা করেছে তার দেশের আজাদি।

এই লোকটির নাম আর্কিমিডিস। পুরনো দিনের দুনিয়ার সবচেয়ে নামজাদা বিজ্ঞানী। আজ থেকে সোয়া দু’হাজার বছর আগে বিজ্ঞানকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন মানুষের, দেশের নানা সমস্যার সমাধানের জন্যে।

সেকালে পণ্ডিত আর বিজ্ঞানী বলতে বোঝাত এমন সব লোককে যারা শুধু ভালো ভালো তত্ত্বকথার আলোচনা করেন। কিন্তু আর্কিমিডিস উলটে দিয়েছিলেন সে নিয়ম। তিনি দেখিয়েছিলেন বিজ্ঞানের তত্ত্বকে কী করে মানুষের জীবনে কাজে লাগানো যায়।

ভূমধ্যসাগরের বুকে একটি দ্বীপ, নাম তার সিসিলি। সেকালে এই দ্বীপের সবচেয়ে নামকরা শহর ছিল সিরাকিউজ। জায়গাটা ছিল গ্রীকদের বসতি। এখানেই আর্কিমিডিসের জন্ম হয়—খ্রিস্টের জন্মের ২৮৭ বছর আগে।

তিনি ছোটবেলায় লেখাপড়া করেছিলেন মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে, আর বেঁচেছিলেন প্রায় পঁচাত্তর বছর। এই ক’বছরের মধ্যে গণিত আর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কতকগুলো খুব বড় বড় আবিষ্কার করে গিয়েছেন তিনি।

লেখক আবদুল্লাহ আল-মুতী। বিজ্ঞান লেখক ও শিক্ষাবিদ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। স্কুল কলেজে তার লেখা পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়। আলোকচিত্র: নাসির আলী মামুন

আর্কিমিডিস বিখ্যাত হয়ে আছেন বস্তুর ঘনত্ব আর তরল পদার্থে কোনো জিনিস ভেসে থাকার নিয়মকানুন আবিষ্কারের জন্যে। এই আবিষ্কারটিকে আজও বলা হয় আর্কিমিডিসের সূত্র, আর স্কুলের বিজ্ঞানের প্রায় সব বইতে এর কথা লেখা থাকে। এত বড় একটা আবিষ্কার কিন্তু ঘটেছিল নিতান্তই আচমকা।

সিরাকিউজের রাজা হীরো (Hiero) যেমন ছিলেন সাহসী যোদ্ধা তেমনি ছিলেন ধর্মভীরু। এক-একটি যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করতেন আর এক-একটি জিনিস উৎসর্গ করতেন কোনো দেবতার উদ্দেশে।

একবার যুদ্ধজয়ের পরে হীরো স্থির করলেন দেবতার মন্দিরে উপহার দেবেন একটি মূল্যবান স্বর্ণমুকুট। স্যাকরাকে ডেকে হুকুম করা হল খাটি সোনার একটি খুব সুন্দর মুকুট বানাতে। রাজকোষ থেকে স্যাকরাকে খাঁটি সোনা মেপে দেওয়া হল।

অপূর্ব সূক্ষ্ম কারুকাজ করা মুকুট তৈরি হয়েছে। দেখে রাজা বেজায় খুশি। মুকুটটি তার খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু তবু মনে কেমন যেন খটকা রইল। এটা সত্যি সত্যি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি হয়েছে তো? যদি রুপো বা আর কোনো সস্তা ধাতুর খাদ মেশানো হয় তা হলে তো দেবতার কাছে তা উৎসর্গ করা চলবে না।

হীরো মুকুটটা সত্যি খাঁটি সোনার তৈরি কি না সেটা যাচাই করে দেখতে চাইলেন। যাচাই করতে হলে মুকুটটা গালাতে হয়। অথচ অমন সুন্দর মুকুটটাকে গালিয়ে দেখতে তার মন ওঠে না। কিন্তু না গালিয়ে এর ভেতরে রুপোর খাদ মেশানো হয়েছে কি না সেটা পরীক্ষাই-বা করা যায় কী করে! ডাক পড়ল তাই রাজপণ্ডিত আর্কিমিডিসের।

অলঙ্করণ: আবুল বারক আলভী

আর্কিমিডিস ভেবে কোনো কূলকিনারা পান না। ভাবতে ভাবতে তার চোখে ঘুম নেই। নাওয়া-খাওয়ার হিসেব নেই। একদিন তিনি গোসল করার জন্যে ভরা চৌবাচ্চায় পা ডুবিয়ে দিয়েছেন। চৌবাচ্চায় পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা পানি উছলে পড়ল। হঠাৎ আর্কিমিডিসরে মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সমস্যার সমাধান তিনি পেয়ে গেছেন।

পোশাক পরার কথা ভুলে আর্কিমিডিস পথ দিয়ে ছুটলেন রাজাকে খবরটা দিতে। গ্রীক ভাষায় যে-কথা বলতে বলতে তিনি ছুটেছিলেন তা আজও সারা দুনিয়ার লোকের মুখে মুখে ফেরে—ইউরেকা, ইউরেকা! আমি পেয়েছি, আমি পেয়েছি।

এই কাহিনীটা যদি সত্যি হয় তাহলে বলতে হবে আর্কিমিডিসই ইতিহাসের প্রথম আপনভোলা বিজ্ঞানী।

সমাধানটা আসলে আশ্চর্য রকম সহজ। অথচ এমন একটি সমাধানের কথা এর আগে আর কেউ কখনো ভাবেনি। আর্কিমিডিস জানতেন সমান আকারের রুপোর চেয়ে সোনা প্রায় দু’গুণ ভারী। অর্থাৎ একই ওজনের সোনার চেয়ে রুপোর আয়তন হবে দু’গুণ বেশি। কিন্তু জটিল আকারের কোনো জিনিসের আয়তন বের করার নিয়ম তখনও কারও জানা ছিল না।

আর্কিমিডিস দেখলেন ভরা চৌবাচ্চায় পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা পানি উপচে পড়ছে। পানিতে ডোবানো পায়ের আয়তন আর উপচে পড়া পানির আয়তন নিশ্চয়ই হুবহু এক। এমনি করে তিনি আবিষ্কার করে ফেললেন যে-কোনো আকারের জিনিসের আয়তন বের করার নিয়ম।

আর্কিমিডিস মুকুটটাকে পানিতে ডুবিয়ে দেখলেন কতটা পানি উপচে পড়ে। তারপর পানিতে ডোবালেন সমান ওজনের খাটি সোনা। দেখা গেল খাঁটি সোনা ডোবালে যতটা পানি উপচে পড়ছে, মুকুট ডোবালে উপচে পড়ছে তার চাইতে বেশি পানি। এতে প্রমাণ হল মুকুটের আয়তন সমান ওজনের খাটি সোনার চাইতে বেশি। অর্থাৎ এতে সোনার সঙ্গে হালকা কোনো ধাতুর খাদ মেশানো হয়েছে।

দুষ্টু স্যাকরা যখন শুনল আর্কিমিডিস কী কৌশলে তার ফাঁকি ধরতে পেরেছেন, তখন সে নিজেই তার দোষ স্বীকার করল। রাজা হীয়রা তাকে শাস্তি দিয়েছিলেন নিশ্চয়ই। তবে কী শাস্তি দিয়েছিলেন ইতিহাসে সে-কথা জানা যায় না।

পানিতে কী করে নানা জিনিস ভেসে থাকে সে সম্বন্ধে পরীক্ষা করে আর্কিমিডিস অনেক নতুন কথা জানতে পেরেছিলেন। তেমনি একটা লম্বা লাঠির সাহায্যে চাড়া দিয়ে যে খুব বড় বড় পাথর বা ভারী জিনিস নড়ানো যায় এ কায়দাও তিনিই আবিষ্কার করেন। একে আজকাল বলা হয় ‘লিভার’। এছাড়া কপিকলের সাহায্যে ভারী জিনিস সহজে ওপরে টেনে তোলার ব্যবস্থাও তিনিই প্রথম করেন।

মানুষের গায়ের জোর আর কতটুকু! কিন্তু লিভারের সাহায্যে চাড়া দিয়ে এই জোর বহু গুণে বাড়ানো যায়। আর্কিমিডিস একবার বলেছিলেন—আমাকে শুধু পৃথিবীর বাইরে দাঁড়াবার একটি জায়গা দাও, আর চাড়া দেবার একটা লম্বা লিভার পেলে আমি গোটা পৃথিবীসুদ্ধ নাড়িয়ে দিতে পারি।

কথাটি গিয়ে পৌঁছল রাজা হীরোর কানে। তিনি ভাবলেন এ এক পাগলা বিজ্ঞানীর মিথ্যা দম্ভ। হুকুম করলেন তার সামনে প্রমাণ দিতে হবে কী করে বিরাট জিনিস তিনি নড়াতে পারেন। পৃথিবী নড়াবার দরকার নেই, শুধু ভারী কিছু একটা নড়ালেই হবে।

আর্কিমিডিস দেখলেন বন্দরে একটা নতুন জাহাজ তৈরি হয়েছে, কিন্তু তখনও তাকে পানিতে ভাসানো হয়নি। তিন-মালের জাহাজ। শুধু জাহাজটা পানিতে নামাতেই বহু লোকের দরকার। তাতে ভরতি করা হল লোকজন, মালপত্র। এই জাহাজের সঙ্গে বাঁধলেন তিনি এক ধরনের কপিকল সমাবেশ। তারপর সেই কপিকলের রশি ধরে দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন।

বহু লোক জড়ো হয়েছিল আর্কিমিডিসরে শক্তিপরীক্ষা দেখতে। রশি ধরে একা তিনি টান লাগালেন। ভারী জাহাজটা আস্তে আস্তে পানিতে গিয়ে নামল। হীরো তাজ্জব হয়ে গেলেন। এ কী জাদুমন্ত্র!

আফ্রিকার উত্তরে এ সময়ে আর একটি শহর ছিল তার নাম কার্থেজ। কার্থেজের রাজার সঙ্গে রোমের সম্রাটের চলছিল বিবাদ। কার্থেজের সঙ্গে সিরাকিউজের ভাব ছিল। তাই সিরাকিউজ রোমের শত্রু হয়ে দাঁড়াল। হীরোকে জব্দ করার জন্যে রোমের সবচেয়ে সেরা সেনাপতি মার্সেলাস সিরাকিউজের বিরুদ্ধে অভিযানে বেরোলেন।

ছোট শহর সিরাকিউজ। কতই-বা তার সৈন্যসামন্ত! তার বিরুদ্ধে লড়তে আসছে বিরাট রোমান বাহিনী। কিন্তু রোমান বাহিনী থমকে দাঁড়াল সিরাকিউজের রক্ষাব্যুহের কাছে এসে। নগরের রক্ষাব্যবস্থার ভার পড়েছিল বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের ওপর। আর আর্কিমিডিস নগররক্ষার এমন সব আশ্চর্য ব্যবস্থা করেছিলেন যার কথা রোমান বাহিনী কল্পনাও করেনি।

শক্তিশালী লিভার আর স্প্রিং-এর সাহায্যে সিরাকিউজের সৈন্যরা রোমান বাহিনীর ওপর বিরাট বিরাট পাথর ছুড়ে মারতে লাগল। আর এসব যন্ত্র থেকে এমন প্রচণ্ড শব্দ হতে লাগল যে তাতেই ভয় পেয়ে গেল রোমের সৈন্যরা।

মার্সেলাস সমুদ্র আর স্থল দু’দিক থেকেই সিরাকিউজ অবরোধ করে বসে রইলেন তিন বছর ধরে। আর্কিমিডিসকে কিছুতেই কাবু করা যায় না। তিনি শহরের দেয়ালের ওপর বিরাট বিরাট আয়না বসিয়ে রেখেছিলেন। সেগুলো মার্সেলাসের সৈন্যভরতি জাহাজের দিকে ঘুরিয়ে ধরতেই জাহাজের মাস্তুলে আগুন ধরে গেল। না, এও জাদু নয়—বিজ্ঞানের কৌশল।

অলঙ্করণ: আবুল বারক আলভী

নগরের দেয়ালের ওপর দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে এল লম্বা লম্বা দাঁড়া। তারপর সেগুলো কামড়ে ধরল মার্সেলাসের জাহাজ। কপিকল আর লিভারের কী কৌশলে জাহাজ উঠে গেল শূন্যে। তারপর ধপাস-পানিতে।

তিন বছর অবরোধ করে থাকার পর নগরের কিছু লোক বিশ্বাসঘাতকতা করল। তাদের সহায়তায় মার্সেলাসের সৈন্যরা ঢুকে পড়ল সিরাকিউজের ভেতরে।

আর্কিমিডিসের খ্যাতি তখন দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেনাপতি মার্সেলাস তার সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন কেউ যেন আর্কিমিডিসের ক্ষতি না করে। কিন্তু বিজয়ের গর্বে উন্মত্ত সৈন্যরা আর্কিমিডিসের কদর বুঝল না।

গল্প আছে, সৈন্যরা যখন আর্কিমিডিসের কাছে এসে হাজির হল তখন তিনি তন্ময় হয়ে বালিতে জ্যামিতির আঁক কাটছেন। একটি সৈন্য কর্কশ গলায় তাকে বলল—আত্মসমর্পণ করো। কিন্তু জ্যামিতির সমস্যার সমাধান নিয়ে তিনি মগ্ন মারমুখো সৈন্যের হুকুম তার কানে পৌছল না। তিনি অন্যমনস্কভাবে বললেন—এ সময়ে আমাকে বিরক্ত কোরো না।

সৈন্যটি আর্কিমিডিসকে চিনতে পারল না। ভাবল, লোকটির স্পর্ধা তো কম নয়! আর্কিমিডিস তার হাতে নিহত হলেন। সে খ্রিস্টপূর্ব ২১২ সালের কথা।

আর্কিমিডিস নিহত হয়েছেন শুনে সেনাপতি মার্সেলাস অত্যন্ত অনুতপ্ত হলেন। তার জন্যে একটি সমাধিসৌধ তৈরি করলেন তিনি। আর তার গায়ে এঁকে দেওয়া হল আর্কিমিডিসের সবচেয়ে প্রিয় জ্যামিতিক আঁকটি।

আর্কিমিডিস প্রাণ দিয়েছেন আজ থেকে সোয়া দু’হাজার বছর আগে। কিন্তু তার শিক্ষা রইল আগামী দিনের সব মানুষের জন্যে। কী সে শিক্ষা? রোজকার জীবনের নানা সাধারণ সমস্যা থেকেই বেরিয়ে পড়ে বিজ্ঞানের তত্ত্ব। সোনা খাটি কি মেকি তার জবাব পেতে হলেও বিজ্ঞানের সাহায্য দরকার।

আর এই বিজ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে মানুষের সেবায়, দেশের সেবায়। লিভারের গাণিতিক তত্ত্ব লাঘব করতে পারে মেহনতি মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনি।

[বি: দ্র: এই লেখাটি ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত আবদুল্লাহ আল-মুতী’র লেখা বই ‘আবিষ্কারের নেশায়’ থেকে নেওয়া। বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য বিজ্ঞানের চিরায়ত লেখাগুলো সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে মূল বই থেকে একটি অধ্যায় ইউনিকোডে টাইপ করে এখানে উপস্থাপন করা হলো। এরকম অনেক অনেক লেখা বইয়ের পাতায় রয়ে আছে যেগুলো অনলাইনে লভ্য নয়। আমরা সকলে মিলে যদি অল্প অল্প করে সেগুলো অনলাইনে দিয়ে দিই তাহলে হাজার হাজার বিজ্ঞান পাঠক উপকৃত হবে। তাই আপনিও নেমে পড়ুন মহৎ এই কাজে।]

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.