একবিংশ শতাব্দীতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ডায়াবেটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেন্জ হিসেবে দাড়িয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফাউন্ডেশনের হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে ৩৭১ মিলিয়ন লোক ডায়াবেটিসে ভুগছে আর এই রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে আরো ২৮০ মিলিয়ন লোক। ২০৩০ সালের মধ্যে অর্ধ মিলিয়ন লোক এই রোগে আক্রান্ত হবে। বাংলাদেশে এখন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লক্ষ। বিশেষত নিম্ন আয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর প্রভাব বেশীমাএায় পরিলক্ষিত হয়। এই রোগটি বর্তমানে বাংলাদেশর জন্যও একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা দাড়িয়েছে এবং এর প্রকোপ দিন দিন দ্রুত হারে বেড়ে চলছে। মূল কারণ হল, শারীরিক পরিশ্রম আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অনুপস্থিতি। ডায়াবেটিস মেলাইটাস বা বহুমূত্র একটি ক্রনিক রোগ যা নিরাময়যোগ্য না হলেও খুব সহজে পুরোমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্যানক্রিয়াসে যখন ইনসুলিন নামক হরমোন উৎপন্ন হয় না কিংবা উৎপন্ন হলেও দেহ সেটা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন ডায়াবেটিস দেখা দেয়। আমরা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাদ্য গ্রহণের পর সে খাদ্য ভেঙ্গে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয় এবং রক্তে অবস্থান করে। ইনসুলিন হরমোনটি রক্ত থেকে গ্লুকোজকে দেহকোষে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। কোষে এই গ্লুকোজ ভেঙ্গে শক্তি উৎপন্ন হয় যার সাহায্যে আমরা কাজ করে থাকি প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয় এই ইনসুলিন উৎপন্ন করে। যদি কোন কারণে ইনসুলিন উৎপাদিত হতে না পারে বা উৎপাদিত হলেও তাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা দেহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এ অবস্থাকে বলে Hyperglycemia (হাইপারগ্লাইসেমিয়া)। এই অবস্থাটি ডায়াবেটিস রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘদিন ধরে হাইপারগ্লাইসেমিয়াতে ভুগতে থাকলে বিভিন্ন অঙ্গকে তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে দেখা যায়। প্রধানত ৩ ধরণের ডায়াবেটিস আছে- টাইপ-১ ডায়াবেটিস, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, জ্যাস্টেশনাল ডায়াবেটিস । সাধারনত ৩০ বৎসরের কম বয়সীদের টাইপ- ১ ডায়াবেটিস হলেও যে কোনো বয়সের লোকই এ ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্বের মোট ডায়াবেটিক জনগোষ্ঠীর ৫-১০% এ ধরনের ডায়াবেটিসে ভোগে। এতে ভাইরাস সংক্রমণ বা অন্য কোনো অজানা কারনে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন নিঃসরন কারী বিটা কোষগুলোর বিপরীতে এন্টিবডি তৈরি হয় এবং কোষগুলো দ্রুত ধ্বংস হয়ে যেতে থাকে। এক সময় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে দেহে ইনসুলিন উৎপাদন করার মত বিটা কোষই থাকে না। আর তাই বেচে থাকার জন্য এদের বাইরে থেকে ইনসুলিন দেয়া অত্যাবশ্যক। এরা খুব দ্রুত আক্রান্ত হওয়ায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ডায়াবেটিসের উপসর্গ দেখা দেয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিক ব্যক্তিদের ওজন সাধারণত কম হয়ে থাকে । মোট ডায়াবেটিস রোগীর ৯০ ভাগ টাইপ-২ ডায়াবেটিস অন্তর্গত। প্রাপ্তবয়স্কদের ভেতর এই টাইপের হার বেশী। এতে শরীরে ইনসুলিনের প্রতি বাধা সৃষ্টি হয় (যাকে বলে insulin resistance) অথবা দেহে ইনসুলিনের অভাব ঘটে। দুটো ঘটনা একসাথেও ঘটতে পারে। এ ধরণের ডায়াবেটিসের পেছনে স্থূলতা একটি প্রধান কারণ। তাই নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস আর শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু একসময় oral drugs এবং/অথবা ইনসুলিন গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। জ্যাস্টেশনাল ডায়াবেটিস সাধারণত গর্ভাবস্থায় (Gestational Period) দেখা দেয়। প্রতি ২৫ জন গর্ভবতীর মধ্যে একজনের এই অবস্থা ঘটে যা মা এবং সন্তান – উভয়ের জন্যেই হুমকিস্বরূপ। যদিও এই ডায়াবেটিস গর্ভাবস্থা শেষে চলে যায় কিন্তু যারা এতে ভুগেন তাদের, এবং তাদের বাচ্চাদের ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। আমেরিকান ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের ২০১৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদশের সকল ডায়াবেটিক রোগীর মধ্যে শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ রোগী টাইপ-২ ডায়াবেটিসের অন্তর্গত। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী নিয়মিত ঔষুধ সেবনে শরীরে নানান ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাই গবেষকরা প্রাকৃতিক উপাদানের মাধ্যমে টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

চীন ও দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীদের সনাতন চিকিৎসায় হাজার হাজার বছর ধরে মাশরুম বা ছত্রাক থেকে পাওয়া উপাদান কাজে লাগানো হচ্ছে৷ চীনে প্রায় ১৬০০ বছর ধরে Cordyceps cicadae (family-Clavicipitaceae) যা সিকাডা ফুল নামে পরিচিত মাশরুম খাবার এবং চিকিৎসার কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রকৃতিতে এই মাশরুম দুর্লভ হওয়ায় গবেষকরা কৃত্রিম উপায়ে চাষ করার চেষ্টা করছেন। তাইওয়ানে অন্যতম শীর্ষ ও জনপ্রিয় বায়োটেক কোম্পানি “গ্রেপ কিং বায়ো” দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিজস্ব ল্যাবে নতুন উপায়ে Cordyceps cicadae মাশরুম চাষ করে আসছে।

প্রতিষ্ঠানটি তাদের দীর্ঘদিনের গবেষণায় মাশরুমটির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপুর্ণ বায়োঅ্যাক্টটিভ উপাদান খুজে পায় যা চিকিৎসার কাজে ব্যবহার হতে পারে এবং মাশরুমটিতে কোনো প্রকার বিষাক্ত উপাদান খুজে পাওয়া যায়নি। ২০১৮ সালে গ্রেপ কিং বায়ো তাদের এক গবেষণায় দেখতে পান যে, Cordyceps cicadae মাশরুমের সক্রিয় উপাদান এন৬ (২- হাইড্রক্সিইথাইল) এডিনোসিন কার্যকরীভাবে রক্তে গ্লকোজের পরিমান নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারনত রক্তে এলানিন ট্রান্সঅ্যামাইনেজ, অ্যাসপারটেট ট্রান্সঅ্যামাইনেজ, ব্লাড নাইট্রোজেন ইউরিয়া এবং ক্রিয়েটিনিনের পরিমান বেড়ে যাওয়ার ফলে শতকরা ২১-৭৮ ভাগ ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের লিভার এবং ফুসফুসের ওজন বৃদ্ধিসহ নানান ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণায় দেখা যায় যে, এন ৬ -(২- হাইড্রক্সিইথাইল) এডিনোসিন লিভারে ফ্যাট তথা রক্তে উপরে উল্লেখিত উপাদান সমুহের পরিমান কমিয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে । গ্রেপ কিং বায়ো প্রতিষ্ঠানটি তাদের গবেষণার ফলাফলের উপর ভিওি করে বাজারে Cordi C. নামে মাশরুম ক্যাপসুল নিয়ে আসে যেটা পরবর্তীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। নিয়মিত ঔষুধ সেবনের পাশ্বপ্রতিক্রিয়া থাকায় এই ধরনের প্রাকৃতিক মাশরুম বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে ডায়াবেটিস রোগের বিকল্প চিকিৎসা হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে।

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

আপনার মতামত