ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স পর্ব-২: গ্যালিলিয়ান ট্রান্সফর্মেশন ও স্পেসটাইম ডায়াগ্রাম

আগের পর্বে আমরা নিউটনের গতিসূত্র কীভাবে আসলো, সূত্রগুলো কখন খাটে এসব নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা এটা দেখেছি যে নিউটনের সূত্রগুলো একটা বিশেষ ফ্রেমে খাটে, যাদের ইনারশিয়াল ফ্রেম বা গ্যালিলিয়ান ফ্রেম বলা হয়। আজকে আমরা এই বিশেষ ফ্রেম নিয়ে সবিস্তর আলোচনা করবো। আর এর সাথে আমরা আজকে স্পেসটাইম ডায়াগ্রামের সাথে পরিচিত হবো। ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স সিরিজের শেষের দিকে আমরা যখন আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের সাথে পরিচিত হবো, তখন আমাদের এই লেখার ধারণা দারুণ কাজে দেবে বলে আমার বিশ্বাস।

ধরুন, আপনি একটা ট্রেনে বসে আছেন, আপনি কিন্তু ট্রেনের ভেতর আপনার ট্রেন সাপেক্ষে স্থির। চারদিক অন্ধকার। আপনি বাইরে তাকালে শুধু অন্য একটা ট্রেন দেখতে পারবেন, এর বেশি কিছু না। আপনি তাকিয়ে দেখলেন বাইরের ট্রেনটি চলছে। আপনাকে বলা হলো এই দুটো ট্রেনের ভেতর কেবল একটা চলছে (বাহিরের কোন পর্যবেক্ষক সাপেক্ষে)। এখন আপনি বলুন তো আসলে কোন ট্রেনটি চলছে? আপনার ট্রেন নাকি আপনি বাইরে তাকালে যে ট্রেনটা দেখছেন? এটা কি বলা সম্ভব?

আপনি হয়ত চিন্তা করে বলবেন একটা উপায় আছে বৈকি! আপনার ট্রেন যদি তার বেগ পরিবর্তন করে তখন আপনি বুঝতে পারবেন, কেননা যদি আপনার ট্রেন বেগ বাড়ায় তবে আপনি জড়তার জন্য পিছনের দিকে ঝুঁকে পড়বেন! আর যদি ট্রেন তার বেগ কমায় তবে আপনি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়বেন! এখন এইসকল ক্ষেত্রে আপনি বলতে পারবেন যে আপনার ট্রেন চলছে এটা নিশ্চিত! 

এখন এই অবস্থায় আরেকটু চিন্তা করুন। যখন আপনার ট্রেনে বেগ পরিবর্তন হয়, অর্থাৎ ত্বরণ হয় তখন আপনি সামনে বা পিছনের দিকে হেলে পড়লেন! আপনি তো স্থির ছিলেন আপনার ট্রেন সাপেক্ষে! আপনাকে কেউ ধাক্কাও দেয় নি! নিউটনের ফার্স্ট ল’ বলে আপনি স্থির থাকলে বাহির থেকে আপনাকে কোন ফোর্স না দিলে আপনি সারাজীবন স্থির থাকবেন। কিন্তু এইক্ষেত্রে কি নিউটনের ফার্স্ট ল’ খাটলো? উত্তর হলো- না! 

তার মানে যেসব রেফারেন্স ফ্রেমে ত্বরণ হয় এদের বেলায় নিউটনের ফার্স্ট ল’ খাটে না! আর এদের বলা হয় নন-ইনারশিয়াল ফ্রেম।   

NON-INERTIAL FRAMES
নিউটনের সূত্র সবসময় ইনারশিয়াল ফ্রেম থেকে খাটাতে হয়

আবার আপনার ট্রেনে ফিরে যাওয়া যাক। ধরা যাক, আপনার ট্রেনে এবার আপনি সবসময় নিউটনের ফার্স্ট ল’ খাটতে দেখেন। তাহলে আপনার ট্রেন এখন একটা ইনারশিয়াল ফ্রেম। এবার আপনি বাইরে তাকিয়ে দেখলেন অন্য ট্রেনটিও সমবেগে চলছে। এবার বলুন তো কোনটা আসলে গতিশীল? আপনি যতোই চেষ্টা করুন, এইবার কোন সিদ্ধান্তেই আসতে পারবেন না। তার মানে দাঁড়ালো, এই দুইটা ফ্রেম একই বৈশিষ্ট্যের। দুটো ফ্রেমের মাঝে কোনটা আসলে সমবেগে চলছে কোনটা আসলে স্থির সেটা কোনভাবেই বলা সম্ভব না। কাজেই এই ধরনের ফ্রেমগুলো, অর্থাৎ ইনারশিয়াল ফ্রেমে প্রকৃত সমবেগ বা স্থির বলাটা আদৌ কোন অর্থবহন করে না! কেননা পরম ফ্রেম বলতে কিছু নেই। পুরো গতিই আপেক্ষিক, তাই যে যেই ফ্রেমে আছে সে সেই ফ্রেমকেই স্থির ভাবে ও অপর ফ্রেমকে ভাবে গতিশীল। এখান থেকে বুঝা যায় সকল ইনারশিয়াল ফ্রেমই একজাতীয়। ইনারশিয়াল ফ্রেমে আপনি সরাসরি নিউটনের ল’ খাটাতে পারেন। যেহেতু সব ইনারশিয়াল ফ্রেম একই ধরনের, যে যে নিজের সাপেক্ষে স্থির ও অন্যকে গতিশীল ভাবে, তাই যেকোন ইনারশিয়াল ফ্রেমেই ফিজিক্সের সব সমীকরণ একই আকারের হয়।  

ইনারশিয়াল ফ্রেমগুলোতে ফিজিক্সের সূত্রগুলো একই আকারের, এটা গ্যালিলিও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবন। আইনস্টাইনও তার আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে এটিকে স্বীকার্য হিসেবে নেন।

এখন চাইলেই আপনি আপনার গ্যালিলিয়ান ফ্রেমে বসে আপনার সাপেক্ষে সমবেগে চলা অন্য একটি গ্যালিলিয়ান ফ্রেম কী মাপছে সেটা বলে দিতে পারেন! এর নামই হলো গ্যালিলিওর রূপান্তর।

ধরা যাক, আপনি S ফ্রেমে আছেন (যেমন প্লাটফর্ম)। আপনার সাপেক্ষে S’ ফ্রেম (ট্রেন, যেখানে আপনার বন্ধু বসে আছে) +x অক্ষ বরাবর v বেগে চলছে। \(t=t’=0 \) সময়ে উভয় ফ্রেম মূলবিন্দুতে আপতিত ছিল।

Inertial Reference Frames
এখানে একটা আরেকটা সাপেক্ষে সমবেগে চলছে

এখন t সময়ে আপনার বন্ধু \(vt \) পরিমাণ সামনে এগিয়ে যাবে। কাজেই আপনি \(x \) অক্ষ বরাবর যা মাপবেন, তা আপনার বন্ধু \(vt \) পরিমাণ কম মাপবে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই \(y, z \) অক্ষ বরাবর একই মাপবে। তাহলে আমরা বলতে পারি,

\(x’= x – vt \) , \(y’=y \) , \(z’=z \)

এবার আমরা দেখি আপনার বন্ধু আপনাকে কী মাপতে দেখবে। আপনার বন্ধু দেখবে আপনি তার \(-x’ \) অক্ষ বরাবর v বেগে যাচ্ছেন। কাজেই আপনি আপনার দেখা সমীকরণগুলোতে v এর জায়গায় -v, আর \((x, x’), (y, y’), (z, z’), (t, t’) \) অদল বদল করে বসিয়ে দিলেই আপনার বন্ধু আপনাকে কী মাপতে দেখছে তা বের হয়ে যাবে। সুতরাং, \(x= x’+vt’ \)

এবার আমরা আগের x’ এর মান বসালে পাই, \(x=(x-vt)+vt’ \)

যেহেতু v অশুন্য (দুটি ফ্রেম আলাদা), কাজেই \(t=t’ \) , তার মানে উভয় ফ্রেমে সময়ের গতি একই।

গ্যালিলিওর রূপান্তর আমাদের আর কী বলতে চায়?

ধরি, S ফ্রেমে +x অক্ষ বরাবর কোন কিছুর বেগ u মাপলো। আমরা দেখতে চাই S’ ফ্রেম তার বেগ কী মাপবে? ধরি সেটা u’, আমরা u ও u’ এর সম্পর্ক বের করতে চাই।

ক্যালকুলাসের ভাষায় \(u= \frac{dx}{dt} \) আর \(u’= \frac{dx’}{dt’}= \frac{dx’}{dt} \frac{dt}{dt’} \)

আমরা জানি, \(x’=x-vt \), কাজেই, \(\frac{dx’}{dt}= \frac{dx}{dt} -v = u-v \) আর \(t=t’ \) বা \(\frac{dt}{dt’}=1 \)

কাজেই, \(u’=u-v \) , যা S’ ফ্রেম সাপেক্ষে আপেক্ষিক বেগ (relative motion)।

আমরা বাস্তবে এটি অনুভব করি। যেমন ধরুন আপনি প্লাটফর্মে বসা। আপনার বন্ধু +x অক্ষ বরাবর চলন্ত ট্রেনে। আপনার সামনে দিয়ে অন্য কোন ট্রেন যদি +x অক্ষ বরাবর যায়, আপনার বন্ধু নিশ্চিতভাবে তার বেগ কম মাপবে (নিজের বেগ বিয়োগ হবে)। আবার অন্য একটা ট্রেন \(-x \) অক্ষ বরাবর গেলে আপনার বন্ধুর মনে হবে ট্রেনের বেগ অনেক বেশি! আমরা ট্রেনে বসে উল্টোদিকে কোন ট্রেনকে যেতে দেখলে এরকমই বেশি বেগে চলতে দেখি, যদিও আমরা জানি এটি আসলে অতোটা দ্রুত নয়!

Relative motion
এখানে S ফ্রেম হলো রাস্তায় দাঁড়ানো লোক, আর S’ হলো সাইকেলে বসা লোক

এবার ধরা যাক আপনি প্লাটফর্ম থেকে +x অক্ষ বরাবর কোন টর্চ মারলেন। আলোর বেগ আপনি মাপবেন \(c=299792458 ms^{-1} \), আপনার বন্ধুর বেগ যদি আলোর বেগের অর্ধেক হয় তাহলে গ্যালিলিয়ান ট্রান্সফর্মেশন অনুসারে আপনার বন্ধু মাপবে \(c’= c-\frac{c}{2}=\frac{c}{2} \)

কিন্তু আমরা পরে দেখবো যে আলোর বেগ মোটেও পর্যবেক্ষক নির্ভর নয়, যা আপেক্ষিকতার অন্যতম স্বীকার্য! আর এটি ঠিক রাখতে গিয়েই আমাদের গ্যালিলিয়ান ট্রান্সফর্মেশনকে পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা অতো গতিতে চলতে পারি না। তাই আমাদের কাছে আপাতভাবে গ্যালিলিয়ান ট্রান্সফর্মেশনের ভুল ধরা পড়ে না!

গ্যালিলিয়ান ট্রান্সফর্মেশনের স্পেসটাইম ডায়াগ্রাম

আমরা এটা বুঝতে পারি যে সময় একটি অক্ষ, কেননা কোন ঘটনা (event) বর্ণনা করতে একই সাথে স্থানাংক ও সময় লাগে। যেমন আমরা বলতে পারি অমুক সময়ে অমুক স্থানে কোন ঘটনা ঘটেছে। এইক্ষেত্রে আমরা তাই ঘটনাকে জ্যামিতিকভাবে বিন্দু হিসেবে দেখাতে স্পেসটাইম ডায়াগ্রামের সাহায্য নেই। আইনস্টাইনের শিক্ষক মিনকোয়াস্কি প্রথম এই ডায়াগ্রাম দিয়ে আপেক্ষিকতার জ্যামিতিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বলে একে মিনকোয়াস্কি ডায়াগ্রামও বলে।

Minkowski diagram
S ফ্রেমের স্পেসটাইম ডায়াগ্রাম

সময়কে চতুর্থ মাত্রা ধরলে চারটি মাত্রা আসলে আমাদের দেখানো সম্ভব নয়। তাই আমরা এই ডায়াগ্রামে শুধু \(x,t \) অক্ষ দেখাবো। আমরা জানি অক্ষ এর মাত্রা হয় দৈর্ঘ্য, যেহেতু শূন্যস্থানে আলোর বেগ ধ্রুবক (আমরা যদিও এখনো এটি নিয়ে বিস্তারিত বলি নি) তাই সময়ের সাথে আলোর বেগ গুণ করা হয়েছে। এর একটা সুবিধেও আছে। কোন বস্তু \(v \) বেগে \(t \) সময়ে \(x \) দূরত্ব গেলে \(x=vt= \frac{v}{c} (ct) \) ,আমরা \(\beta= \frac{v}{c} \) সংজ্ঞায়িত করলে তা হয় \(x=\beta (ct) \), কাজেই সমবেগে গেলে বেগ ct অক্ষের সাথে \(tan^{-1}(\beta) \) কোণ তৈরি করে।

আলোর বেলায় \(\beta=1 \) বলে তা স্পেসটাইম ডায়াগ্রাম ct এর সাথে 45° কোণ করে। অন্যান্য বেগের বেলায় কোণ আরো কম হয়।

এখন বলুন তো, স্পেসটাইম ডায়াগ্রামে x অক্ষের সমীকরণ কী? অবশ্যই \(ct=0 \) আর একইভাবে ct অক্ষের সমীকরণ \(x=0 \)

এবার বলুন তো স্পেসটাইম ডায়াগ্রামে S’ এর অক্ষগুলো দেখতে কেমন হবে?

x’ এর সমীকরণ \(ct’=0 \), যেহেতু \(t’=t \), কাজেই x’ অক্ষ x অক্ষের সাথে মিলে যাবে। আর ct’ এর সমীকরণ হলো \(x’=0 \), আর \(x’= x- \beta(ct) \) , কাজেই ct’ অক্ষের সমীকরণ হবে \(x= \beta (ct) \)

Spacetime diagrams

তার মানে কেবল \(t’ \) অক্ষ এক্ষেত্রে ঘুরে গিয়েছে! ঘুর্ণনের এই অসাম্যও আমাদের ধারণা দেয়, কিছু তো একটা গরমিল আছেই!

আমরা গ্যালিলিয়ান ট্রান্সফর্মেশনকে ম্যাট্রিক্স ফর্মে দেখলেও এটা বুঝতে পারি।

মাঝের ট্রান্সফর্মেশন ম্যাট্রিক্সটা দেখলেই একটা প্রতিসাম্যতার অভাব বুঝা যায়! আর আমরা সেটা এই সিরিজের একটা পর্যায়ে ঠিকই জেনে যাব! আজ এখানেই থাকুক।

সবশেষে পাঠকের কাছে কিছু প্রশ্ন:

  1. S’ ফ্রেমের স্পেসটাইম ডায়াগ্রামে S ফ্রেমকে দেখতে কেমন লাগবে?
  2. আলোর বেগ দুই ফ্রেমে এক রাখতে গেলে স্পেসটাইম ডায়াগ্রাম দেখতে কেমন হওয়া প্রয়োজন?

One thought on “ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স পর্ব-২: গ্যালিলিয়ান ট্রান্সফর্মেশন ও স্পেসটাইম ডায়াগ্রাম

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.