টেস্টিং সল্ট নিয়ে কথা

Share
   

টেস্টিং সল্ট, যেটাকে MSG (Monosodium Glutamate) বলে আর এর ই-নাম্বার হলো E621 । 

তো, আসা যাক মূল কথায়। MSG নিয়ে কন্ট্রোভার্সি আছে বেশ বহু বছর ধরেই যে, এটা asthma, headaches এমনকি brain damage করতে পারে বলে ধারণ করা হয়। যদিও কিডনি ড্যামেজের কথা কোথাও উল্লেখ করা হয় না, তবে বাংলাদেশে তো গুজব ছড়ায় দ্রুত, তাই বাংলাদেশের সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন পোস্টে সেই সাথে কিডনি ড্যামেজও সংযুক্ত করে দিয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ অফিসিয়াল সোর্স বলে, পরিমাণমতো MSG নিরাপদ। কিন্তু সেটার দিকে না চোখ না দিয়ে চলুন আমরা দেখি MSG এর কার্যকলাপ।

MSG কী?

MSG বা Monosodium Glutamate বা E621, যেটাই বলি না কেন–এটা অ্যামাইনো অ্যাসিড গ্লুটামেট বা গ্লুটামিক অ্যাসিড থেকে উদ্ভূত, যেটা আসলে প্রকৃতিতে সবচেয়ে বেশি পাওয়া অ্যামাইনো অ্যাসিড। গ্লুটামিক অ্যাসিড একটি non-essential অ্যামাইনো অ্যাসিড, অর্থাৎ শরীর এটা উৎপাদন করতে পারে। তাছাড়া এই অ্যামাইনো অ্যাসিড প্রায় সব খাবারেই পাওয়া যায়। 

MSG আসলে সাদা রঙের ক্রিস্টালাইন (স্ফটিক) পাউডার যেটা দেখতে লবণ বা চিনির মতো। এটা সোডিয়াম এবং গ্লুটামিক অ্যাসিড একত্রিত করে তৈরি, যেটা বাজারে সোডিয়াম লবণ নামেও পরিচিত। MSG-এর গ্লুটামিক অ্যাসিড স্টার্চ ফার্মেন্টেশন করে তৈরি করা হলেও এটা বিভিন্ন খাদ্যে উপস্থিত গ্লুটামিক অ্যাসিডের মতোই। 
যদিও MSG-তে থাকা গ্লুটামিক অ্যাসিড শরীর সহজেই শোষণ করতে পারে, কারণ এটা যেহেতু স্টার্চ ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় তৈরি, তাই এটা কোনো বড়ো প্রোটিন অণুর মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। যার ফলে শরীরকে সেই প্রোটিন অণু আলাদা করে ভাঙতে হয় না, সহজেই শোষিত হয়ে যায়।

MSG কি ক্ষতিকর?

Loading...

গ্লুটামিক অ্যাসিড মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে। যেহেতু এটি একটি excitatory নিউরোট্রান্সমিটার, যার মানে এটি তার সংকেত রিলে করার জন্য স্নায়ুকোষকে উদ্দীপিত করে। কিছু লোক দাবি করেন যে, মস্তিষ্কে অতিরিক্ত গ্লুটামেট স্নায়ুকোষে অতিরিক্ত উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। যার ফলে MSG কে এক্সসিটোটক্সিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক্সসিটোটক্সিন হলো সেসকল নিউরোট্রান্সমিটার যারা সংখ্যায় নির্দিষ্ট পরিমাণের অধিক হলে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।

১৯৬৯ এর দিকে এক গবেষণায় দেখা যায় যে, সদ্য জন্ম নেওয়া বা নবজাতক ইঁদুরের মধ্যে MSG-এর বড়ো ডোজ ইনজেক্ট করলে ক্ষতিকর স্নায়বিক প্রভাব সৃষ্টি করে।
এটা সত্য যে গ্লুটামেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করলে মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে, তাছাড়া MSG বড়ো ডোজ রক্তে গ্লুটামেটের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, MSG-এর একটি মেগাডোজ রক্তে গ্লুটামেটের মাত্রা 556% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। তবে খাদ্যে পরিমাণমতো গ্লুটামেট মস্তিষ্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না যেহেতু এর অল্প পরিমাণ blood–brain barrier (BBB) অতিক্রম করতে পারে না।[]

মজার তথ্য: জাপানে সবচেয়ে বেশি MSG ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

সামগ্রিকভাবে, স্বভাবিক পরিমাণে MSG এক্সাইটোটক্সিন হিসাবে কাজ করে এমন কোনও জোরালো প্রমাণ নেই। সেজন্য বলা যেতে পারে, পরিমাণমতো MSG বা Monosodium Glutamate বা E621 খাওয়া মস্তিষ্কের কোনো ক্ষতি করে না।

তাহলে কি সব ভুল?

না, এখানে কিছু কথা আছে। কিছু মানুষ MSG খাওয়ার ফলে কিছু বিরূপ প্রভাব অনুভব করতে পারে। এটাকে ‘Chinese restaurant syndrome‘ বা MSG symptom complex বলে। 

Loading...

একটা গবেষণায় দেখে গেছে যে, যারা নিজেরা বলেছে তাদের MSG-র জন্য স্বাস্থ্যে বিরুপ প্রভাব পড়েছে তাদের মধ্যে হয় কেউ ৫ গ্রাম বা তার চেয়ে বেশি MSG গ্রহণ করেছে, অথবা প্লেসিবো ইফেক্টের ফল। যেখানে ৩৬.১% MSG আর ২৪.৬% প্লেসিবো, বাকিটা অন্য কারণে। 

থ্রেসহোল্ড ডোজ বা যতটুকু নিলে বিরূপ লক্ষণ দেখা যাবে সেটা হলো প্রতি খাবারে প্রায় ৩ গ্রাম। আর মনে রাখবেন, প্রতি খাবারে ৩ গ্রাম কিন্তু অনেক বেশি। যদি আমাদের দেশের কথা চিন্তা করেন, তাহলে মিলিগ্রাম পর্যায়ে থাকে, যদিও এখন অনেকে MSG বর্জন করছেন। 

এখন MSG-এর থ্রেসহোল্ড ডোজ ঠিক কোন কারণে এরকম বিরূপ প্রভাব ফেলে সেটা এখনও আনক্লিয়ার। তবে কিছু গবেষক অনুমান করেন যে MSG-এর বড়ো ডোজ blood–brain barrier (BBB) অতিক্রম করতে পারে এবং নিউরনের সাথে ইন্টারেক্ট করে মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলে।

কেউ কেউ দাবি করেন যে, MSG কিছু মানুষের মধ্যে অ্যাজমা অ্যাটাকও ঘটায়। তো, ৩২ জনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী MSG-এর বড়ো ডোজের কারণে অ্যাজমা অ্যাটাকের শিকার হয়েছেন। তবে পরে আর কোনো গবেষণায় স্পেসিফিকভাবে এমনটা হতে দেখা যায়নি। অর্থাৎ MSG আর অ্যাজমা অ্যাটাকের সাথে কোনো সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। ওজন বৃদ্ধির সাথে অনেকে MSG-কে দায়ী করে, কিন্তু এর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি।

শেষ কথা

আপনি কাকে জিজ্ঞাসা করেছেন তার ওপর নির্ভর করে MSG পুরোপুরি নিরাপদ না কি বিপজ্জনক নিউরোটক্সিন। তবে সত্যটা এর মাঝে বরাবর।
গবেষণা নির্দেশ করে যে MSG মডারেট পরিমাণে খাওয়া নিরাপদ। তবে, মেগাডোজ ক্ষতি করতে পারে। তবে আপনার MSG খেলে যদি কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তাহলে আপনার উচিত খাওয়া বন্ধ করা। তাছাড়া এমনিতেও টেস্টিং সল্ট বা MSG ফাস্টফুড/Junk Food এ ব্যবহার করা হয়। সেগুলা এমনেতেও পরিহার করা উচিত। 

লেখাটি ব্যাঙাচি – অক্টোবর ২০২০ (গুজব) -এ প্রকাশিত হয়েছে

Loading...

তানভীর রানা রাব্বি

I'm Nobody 😎

You may also like...

২ Responses

  1. এমএসজি ক্ষতিকর জানতাম, কিন্তু নিরাপদ মাত্রাসীমা আছে সেটা জানা হলো। বিভিন্ন তথ্যের জায়গায় সরাসরি লিঙ্ক দিয়ে দেওয়া খুব ভালো ফরম্যাটিং চর্চা। আর যেখানে বাংলা লেখা যায় সেখানে ইংরেজি না ব্যবহার করাই ভালো: যেমন শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, মস্তিষ্কের ক্ষতি ইত্যাদি।

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

গ্রাহক হতে চান?

যখনই বিজ্ঞান ব্লগে নতুন লেখা আসবে, আপনার ই-মেইল ইনবক্সে চলে যাবে তার খবর।

%d bloggers like this: