অনকোলাইটিক ভাইরাস থেরাপি

Share
   

শিরোনামটা একটু কঠিন মনে হতে পারে, তাই শুরুতে কয়েকটা সংজ্ঞা পরিষ্কার করে নিলে সম্পুর্ণ ব্যাপারটাবুঝতে সুবিধা হবে।

অনকো (onco) শব্দের অর্থ টিউমার (tumor), আর লাইটিক (lytic) মানে ধ্বংস বা বিনাশ করা (destruction)। অতএব, অনকো লাইটিক মানে হলো টিউমারকে ধ্বংস করা বা বিনাশ করা।

এখন, যদি বলি অনকো লাইটিক ভাইরাস, তার মানে দাঁড়ায়, যে ভাইরাস টিউমারকে ধ্বংস করে। তাহলে সহজেই বোঝা যাচ্ছে, অনকো লাইটিক ভাইরাস থেরাপি হলো ভাইরাস দিয়ে টিউমার চিকিৎসা করা।

ব্যাপারটা খুবই ইন্টারিস্টং তাই তো! কিন্তু মনে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়?

ভাইরাস টিউমার কে বিনাশ করবে কিভাবে? ভাইরাস তো নিজেই ক্যান্সার বা টিউমার হতে সাহায্য করে। যেমন হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (HBV) লিভার ক্যান্সার হতে সাহায্য করে, অন্যদিকে হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাস (HPV) জরায়ুর ক্যান্সার হতে সাহায্যে করে।

প্রশ্নের উত্তর খুজতে হলে, সর্বপ্রথম দুইটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, এক ভাইরাস কী? দুই টিউমার বা ক্যন্সার কী?

ভাইরাস কী?

Loading...

ভাইরাস হলো এমন কণা বা বস্তু যা আমাদের কোষগুলিকে সংক্রামিত (infect) করে কোষের ভিতরে প্রবেশ করে। তারপর, কোষের জেনেটিকাল ম্যাটারিয়াল ব্যবহার করে নিজের অনুলিপি (copy) তৈরি করে এবং অবশেষে তৈরিকৃত নতুন ভাইরাসগুলো কোষটা ধ্বংস করে পরবর্তীতে আশেপাশের অরক্ষিত কোষগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে, যা লাইটিক সাইকেল নামে পরিচিত।

অপর দিকে এমন কিছু ভাইরাস আছে যারা কোষে প্রবেশ করার পরে তাদের জেনেটিকাল ম্যাটারিয়াল গুলো ওই কোষের জেনেটিক ম্যাটারিয়ালের সাথে যুক্ত করে দীর্ঘদিন সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে, যা লাইসোজেনিক সাইকেল নামে পরিচিত। যা পরবর্তীতে লাইটিক সাইকেলে পরিবর্তিত হতে পারে।

চিত্রঃ অনকো লাইটিক ভাইরাস থেরাপি

টিউমার বা ক্যন্সার কী?

আমরা জানি, আমদের শরীরের কোষগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর মারা যায়। এই পুরনো কোষগুলোর জায়গায় নতুন কোষ এসে জায়গা করে নেয়। সাধারনভাবে কোষগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে এবং নিয়মমতো বিভাজিত হয়ে নতুন কোষের জন্ম দেয়।

যদি কোনো কারনে এইসব সাধারন কোষগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর মারা না যায়, তাহলে কি ঘঠনা ঘতে পারে?

হা, ঠিক তখনই শরীরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কোষের সংখ্যা বাড়তে থাকে যার ফলে ত্বকের নিচে মাংসের দলা অথবা চাকা দেখা যায়, যাকে টিউমার বলে। যা পরবর্তীতে ক্যান্সারে রুপান্তরিত হয়। তার মানে, যদি একেবারেই সহজ করে বলি সাধারণ কোষ একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে মারা যায় আর টিউমার বা ক্যান্সার কোষ একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে মারা যায় না।

যদি কোনভাবে টিউমার বা ক্যান্সার কোষগুলোকে বিনাশ করা যায় তাহলে অতি সহজে ক্যান্সারকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর এখন পর্যন্ত ক্যান্সার বা টিউমারের যতগুলো চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে যেমন কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি সবগুলো ট্রিটমেন্ট এর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্যান্সার বা টিউমার কোষকে ধ্বংস করা।

উপরে ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি যে,ভাইরাস সাধারণ কোষকে লাইটিক সাইকেলের মাধ্যমে ধ্বংস করতে পারে, ভাইরাসের এই বৈশিষ্ট্যটাকে কাজে লাগিয়ে যদি টিউমার কোষকে ধ্বংস করা যায়, তাহলে খুব সহজেই টিউমাররে চিকিৎসা করা যাবে। যা জীববিজ্ঞানের ভাষায় অনকো লাইটিক ভাইরাল থেরাপি নামে পরিচিত।

Loading...

এখন প্রশ্ন হতে পারে, ভাইরাস যে টিউমার বা ক্যনাসার কোষ্কে বিনাশ করতে পারে তা আবিষ্কার হলো কীভাবে?

এইতো, ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত রিপোর্টে ছিলো যে ভাইরাস কাকতালীয় ভাবে টিউমারকে রিগ্রেশন করে পারে, কিন্তু তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কিংবা ধারনা কারোই জানা ছিলো না।

পরবর্তীতে, ১৯০০ সালের শুরুতে দেখা গেলো অনেক ক্যন্সার আক্রান্ত রোগী সাধারণ ভাইরাস দ্বারা আকান্ত হওয়ায় আশ্চর্যজনকভাবে তাদের অবস্থার উন্নতি হয়। তারপরেই ব্যাপারটা নিয়ে সব মহলে একটা ব্যপক সাড়া পড়ে যায়।  

১৯০৪ সালের ঘটনা, ৪২ বছরের এক মহিলা ক্রোনিক মায়োলেজেনাস লিউকেমিয়ায় (chronic myelogenous leukemia) আক্রান্ত ছিলেন, যার কারণে উনার শরীরে প্রচুর পরিমাণের শ্বেত রক্তকণিকা ছিলো। উনি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হসপিটালে ভর্তি হন। তখন এই ব্যাপারটা দৃষ্টিগোচর হলো যে ভাইরাল ইনফেশনের কারনে তার শ্বেত রক্ত কনিকা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছে।  

এই পর্যবেক্ষণগুলো দ্বারা বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলো যে সরাসরি ভাইরাস দিয়ে বা ভাইরাসের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্যান্সার চিকিৎসা করা যেতে পারে।

অবশেষে, ১৯৪৯ সালে সর্বপ্রথম হেপাটাইটিস বি ভাইরাস দিয়ে (Hodgkin’s disease) হটগিনক্স ডিজিজে আক্রান্ত ২২ জন রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছিলো। এবং তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে Egypt virus, APC virus, Mumps virus ইত্যাদি ভাইরাস দিয়ে বিভিন্ন ক্যন্সার আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করা শুরু হইয়েছিলো। যদিও সেই সময় সম্পুর্ণ সুস্থ হওয়ার হারটা কম ছিলো কিন্তু তা সত্ত্বেও এই আবিষ্কার খুলে দিয়েছে ক্যন্সার চিকিৎসার এক বিশাল দ্বার।  

১৯৯১ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা একটু নতুনভাবে ভাবতে শুরু করলেন। তারা ভাইরাসের ভিরুলেন্ট (virulent) অংশটা (ভাইরাসের যে অংশটি রোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে বাদ দিয়ে দেন। বিজ্ঞানীরা সেই জেনেটিক্যালি মডিফাইড ভাইরাস দিয়ে ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন পদ্ধিতি আবিস্কার করেন। এই পর্যায়ে সফলাতার হার অনেক অংশে বৃদ্ধি পেয়েছিলো।

২০০৫ সালে সর্বপ্রথম চীনে (nasopharyngeal cancer) নসোফেরিংজিয়াল ক্যান্সার চিকিৎসায় জেনেটিক্যালি মডিফাইড H101 virus ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হয়। তারও ১০ বছর পরে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে FDA (US Food and Drug Administration) বিশ্বব্যাপী T-VEC ভাইরাসকে (যা herpes simplex virus এর মডিফাইড স্ট্রেইন) অনকোলাইটিক ভাইরাস হিসেবে ক্যান্সার চিকিৎসার অনুমোদন দেয়। যদিও বর্তমানে আরো অনেক গুলো অনকো-লাইটিক ভাইরাস ট্রায়েল ফেইজে আছে।

সব কিছুর পরেও একটা কথা কিন্তু থেকে যায় কারণ অনকো-লাইটিক ভাইরাস থেরাপি নিয়ে এখনো আমদের অনেক কিছু অজানা। তাছাড়া রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা আশাবাদী। সেদিন হয়তো আর বেশি দেরি নেই যেদিন ভাইরাস দিয়ে আমরা ক্যন্সারকে জয় করবো।

Loading...

You may also like...

২ Responses

  1. Arafat says:

    লেখাটা অনেক তথ্য বহুল। আমরা আর এমন লেখা আশা করি মনির হোসেন সাহেবের কাছে।

  2. খুব ভালো লেখা। যেভাবে তুমি শুরু করেছো অনকো আর লাইটিক আলাদা করে ভেঙে বুঝিয়ে, সেটা দারুণ। ভাইরাস যে এভাবে থেরাপিতে ব্যবহার করা যায়, সেটা নতুন একটা দৃষ্টিকোণ থেকে জানা গেলো এবং তোমার লেখাতে ইতিহাস থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গবেষণার খবরও উঠে এসেছে। আরেকটা ভালো দিক যে তুমি ছবিটা বাংলা করেছো ও মূল লেখায় হাইপারলিঙ্ক হিসেবে মূল গবেষণার রেফারেন্স দিয়েছো — এটা প্রশংসনীয় চর্চা। বিজ্ঞান ব্লগে স্বাগতম!

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

গ্রাহক হতে চান?

যখনই বিজ্ঞান ব্লগে নতুন লেখা আসবে, আপনার ই-মেইল ইনবক্সে চলে যাবে তার খবর।

%d bloggers like this: