কৃষ্ণগহ্বরের পেছন থেকে আসা আলো সনাক্ত

Light detected behind a black hole for the first time
পাঠসংখ্যা: 👁️ 227

বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো ব্ল্যাকহোল এর পিছন থেকে আলো সনাক্ত করেছেন। এটি আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের একটি ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ করে। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে প্রমাণিত হয়েছে যে আলোর গতিকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রভাবিত করতে পারে।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড্যান উইলকিনস এবং তার সহকর্মীরা টেলিস্কোপ দ্বারা ৮০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের একটি সর্পিল গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত Zwicky-1 নামক একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল (অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর) থেকে X-ray পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তখন টেলিস্কোপগুলি কিছু ক্ষুদ্র X-ray এবং বিভিন্ন রঙের উজ্জ্বল রশ্মি (bright flares) রেকর্ড করেছিল। এই কৃষ্ণগহ্বরটি আয়তনে সূর্যের থেকেও প্রায় ১০ কোটি গুণ বড়। কৃষ্ণগহ্বরে মহাকর্ষীয় বলের মান এত বেশি হয়, যা মহাবিশ্বের অন্য সব বলকে অতিক্রম করে। তাই কোনো কিছুই কৃষ্ণগহ্বরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেতে পারে না। এমনকি আলো বা বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বিকিরণও নয়।

ড্যান উইলকিনস
Study author and research scientist at the Kavli Institute for Particle Astrophysics and Cosmology at Stanford University and SLAC National Accelerator Laboratory

ড্যান উইলকিনস এক বিবৃতিতে বলেছে;

 “Any light that goes into that black hole doesn’t come out, so we shouldn’t be able to see anything that’s behind the black hole”.

যাইহোক, কৃষ্ণগহ্বরের এর এই অদ্ভুত প্রকৃতি আসলে আমাদের পর্যবেক্ষণকে সহজ করেছে। তিনি কৃষ্ণগহ্বরেরটির এই অদ্ভুত প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ এর পর বলেন,

“The reason we can see that is because that black hole is warping space, bending light and twisting magnetic fields around itsel

Light detected behind a black hole for the first time

এই গবেষণা Nature জার্নালে ২৮ জুলাই, ২০২১ তারিখে  প্রকাশিত হয়েছে। যা আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের একটি ভবিষ্যদ্বাণী নিশ্চিত করে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে স্থান-কালের বক্রতা সম্পর্কে বর্ণনা করেছিলেন। আইনস্টাইন এ তত্ত্বে বর্ণনা করেন যে কিভাবে বিশাল বস্তু মহাবিশ্বের স্থান কালের চাদর (Space-Time fabric) কে বিকৃত করতে পারে, কোনো একটি বস্তুর কারণে স্থানকালের যে ধরনের বক্রতা তৈরী হয় তাকেই বলে স্থানকালের বক্রতা (Space-time Curvature)।

স্থান-কালের বক্রতা

থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী, এ স্থানকালের বক্রতার প্রভাবই হলো মহাকর্ষ আর এই প্রভাব কোনো প্রকার আকর্ষণবল নয়। বস্তুটি শুধুমাত্র তার চারপাশের স্থান বা স্পেসকেই বাকিয়ে ফেলে না বরং সময়কেও বাকিয়ে ফেলে। একে বলা হয় মহাকর্ষীয় কাল দীর্ঘায়ন (Gravitational Time dilation) পদার্থ এবং শক্তির উপস্থিতিতে স্থান-কালের  বিকৃত হয়। এই বাঁকা স্থানটি পালাক্রমে শক্তি এবং পদার্থের চলাচলের  নিয়ম নির্ধারণ করে। যদিও আলো একটি সরলরেখায় ভ্রমণ করে, তবে মহাকাশ-কালের একটি অত্যন্ত বাঁকা অঞ্চল এর ক্ষেত্রে, ব্ল্যাকহোল তার চারপাশের স্পেসকে এমনভাবে বাকিয়ে দেয় যে, যা এর ভেতরে একবার ঢোকে তা কখনো বের হতে পারে না, কিন্তু একটি কৃষ্ণগহ্বর এর আশেপাশের স্থান দিয়ে আলো পরিক্রমণ করে, তখন তার পিছন থেকে সামনের দিকে  আলো একটি বক্ররেখায় পরিক্রমণ করে। 

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মূলত আইনস্টাইনের এ তত্ত্ব মেনে নিতে চাননি, যা ১৯১৫ সালে একশ বছরেরও বেশি আগে প্রণয়ন করা হয়।

যদিও একটি কৃষ্ণগহ্বর থেকে আলো বের হতে পারে না, তবে এর চারপাশে থাকে করোনা (corona) দেখা যায় যা অতি-গরম বস্তু কণার সংগ্রহ। যা পরবর্ততিত গ্যাস হয়ে কৃষ্ণগহ্বরের এর উপর পড়ে।

নিচের চিত্রে, কৃষ্ণগহ্বরের এর উপরে সাদা আলোর বলটি হল এর  করোনা।

ব্ল্যাকহোলের করোনা

যা পরবর্তীতে গ্যাস হয়ে কৃষ্ণগহ্বরের উপর পরার পর অনেকটা নিচের চিত্রের মত দেখায়

ব্ল্যাকহোলের করোনা

তবে এর চারপাশের বিশাল মাধ্যাকর্ষণ উপাদানগুলিকে (corona/করোনা) কয়েক লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত গরম করতে পারে।  কৃষ্ণগহ্বরের বিশাল মাধ্যাকর্ষণ গ্যাসের কণাগুলি থেকে ইলেকট্রন কণার মেঘ পৃথক করে। গবেষকদের মতে, পরমাণু থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া ইলেকট্রন  কণার মেঘ চুম্বকায়িত প্লাজমায় (magnetized plasma) পরিণত করে।এই পৃথকীকৃত ইলেকট্রনগুলিই চুম্বকীয় ক্ষেত্রের সংস্পর্শে এসে উচ্চ শক্তির ইলেকট্রন উৎপন্ন করে যা পরবর্তীতে এক্স-রে নির্গত করে।

গবেষকরা নির্ণয় করেছেন যে ছোট ছোট flares গুলো একই এক্স-রে থেকে নির্গত হয়ে ছিল। কিন্তু কৃষ্ণগহ্বরের পিছন থেকে প্রতিফলিত হয়েছিল। গবেষকরা জানাচ্ছেন, কৃষ্ণগহ্বর এর আকর্ষণের কারণে স্থানের বিকৃতি ঘটে। ফলে আলোকরেখা সরল পথে এগতে পারে না। বরং, তা আবদ্ধ হয়ে থাকে ব্ল্যাকহোলের মধ্যেই। ফলে সেই আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায় না। এক্ষেত্রেও ঘটেছিল সেই ঘটনাই। অন্যদিকে কৃষ্ণগহ্বর এর চারিদিকে আয়নিত গ্যাস এবং ধূলিকণার একটি ঘূর্ণায়মান ডিস্ক তৈরি হয়। আই জুইকি-১-এর ক্ষেত্রে ব্ল্যাকহোল থেকে নির্গত এক্স-রে পথ পরিবর্তন করে প্রতিফলিত হয়েছিল সেই ডিস্কে। আর সেই প্রতিফলিত আলোর বিচ্ছুরণই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। 

উইলকিন্স তার বিবৃতিতে X-ray নির্গমন সম্পর্কে বলেন;

 “This magnetic field getting tied up and then snapping close to the black hole heats everything around it and produces these high energy electrons that then go on to produce the X-rays,”

এখন গবেষকরা তাদের পরবর্তী ধাপে আরো বিস্তারিতভাবে গবেষণা করবেন এটা জানতে যে কিভাবে আলো কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে বেঁকে যায় এবং কিভাবে এই ধরনের উজ্জ্বল আলোর বিচ্ছুরণ করে। 

উইলকিন্স বলেন;

 “I’ve been building theoretical predictions of how these echoes appear to us for a few years. I’d already seen them in the theory I’ve been developing, so once I saw them in the telescope observations, I could figure out the connection.”

কৃষ্ণগহ্বর এর চারপাশে এই ঘূর্ণায়মান ডিস্কের উষ্ণতা থাকে প্রায় কয়েক লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা গ্যাসের কণাগুলি থেকে ইলেকট্রন পৃথক করে তৈরি করে প্লাজমা। উইলকিন্স জানাচ্ছেন, এই পৃথকীকৃত ইলেকট্রনগুলিই চুম্বকীয় ক্ষেত্রের সংস্পর্শে এক্স-রে’র জন্ম দেয়। সম্প্রতি এই অভিনব আবিষ্কার থেকে আইনস্টাইনের তত্ত্বের প্রমাণ তো মিললই, পাশাপাশি এই এক্স-রে বিচ্ছুরণের মাধ্যমে ব্ল্যাকহোলের আভ্যন্তরীণ গঠনের বিস্তারিত তথ্যও আগামী দিনে সামনে আসবে বলেই আশাবাদী তারা।

তথ্যসূত্রঃ

  • মূল গবেষণা প্রবন্ধের লিঙ্ক: Wilkins, D.R. et al. Light bending and X-ray echoes from behind a supermassive black hole. Nature 595, 657–660 (2021).
  • Light detected behind a black hole for the first time – CNN
  • কৃষ্ণগহ্বর থেকে আলোকরশ্মির নির্গমন – দৈনিক ইত্তেফাক

পূর্ব প্রকাশিতঃ

https://sciencetech26.blogspot.com/2021/08/light-detected-behind-black-hole-for_13.html

ইফতেখার ইসলাম
আমি ইফতেখার ইসলাম, Bangladesh Gas Fields School & College কলেজে দাদ্বশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। বিজ্ঞানকে ভালোবাসি এবং বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান নিয়ে লিখতে পছন্দ করি। বিজ্ঞানকে বাংলা ভাষায় আরও সহজ ভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। আমি আমার নিজস্ব বিজ্ঞান বিষয়ক ব্লগ [ Sci-Tech Daily](https://sciencetech26.blogspot.com/) এর এডমিন এবং লেখক।