ছায়াপথে নিঃসঙ্গ গ্রহের দল

কিছু কিছু গ্রহ আছে যারা অনেকটা ঘরছাড়া গরুর মতো মহাকাশে ঘুরে বেড়ায়। এদের কোন সৌরজগত নেই। প্রশ্ন হলো, এরকম নিঃসঙ্গ গ্রহদের বিজ্ঞানীরা কিভাবে খুঁজে পান?

গ্রহের কথা মাথায় এলেই আমাদের চোখের  সামনে ভেসে ওঠে একটি গোলাকার বস্তু যা একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছ। আমাদের ধারণা গ্রহ বলতেই সেগুলো কোনো না কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরবে। তবে ধারনাটা ঠিক নয়। মহাবিশ্বে এমন কিছু গ্রহ আছে যারা কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে না এদেরকে বলা হয় নিঃসঙ্গ গ্রহ বা ইংরেজিতে Rogue planet। অনেকে এদেরকে ভাসমান গ্রহও বলে। সম্প্রতি গতবছরের  ২২ ডিসেম্বর  ন্যাচার পত্রিকায় এরকম ৭০ থেকে ১৭০ টি এমন ধরনের  গ্রহ খুজে পাওয়ার দাবী করেছে ফ্রান্সের বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাোতির্পদার্থবিদ ড. নুরিয়া মিরেট রেয়িগ এবং তার দল। এই গ্রহগুলোর বেশির ভাগেরই আকার বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে বেশি। 

তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসানো অবজারভেটরি টেলিস্কোপের ১৮ টি ক্যামেরার ২০ বছর ধরে ধারণ করা প্রায় ৮০০০০ ছবি বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা চালান। তারা যে টেলিস্কোপগুলো থেকে তথ্য নেন তার মধ্যে অন্যতম  হলো চিলিতে অবস্থিত ইউরোপীয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ, হাওয়াইতে অবস্থিত জাপানের সুবারি টেলিস্কোপ এছাড়া তারা মহাকাশ অবস্থান করা গায়া স্যাটেলাইটের তথ্যও গবেষণাটিতে ব্যবহার করেন।

প্রথম এধরনের নিঃসঙ্গ গ্রহের সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৯০ সালের দিকে। তারপর মাঝে মধ্যে এধরনের গ্রহের সন্ধান পাওয়া যেতো। তাহলে এবারের আবিষ্কার এগুলো গুরুত্বপূর্ণ কেনো? ড. মিরেটের করা আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ এর আবিষ্কারের পদ্ধতির দিক থেকে। নিঃসঙ্গ এই গ্রহগুলোকে শনাক্ত করা সহজ কোনো কাজ নয়।সৌরজগতের বাইরে যে গ্রহগুলো থাকে তাদের আমরা সাধারণত বলি এক্সোপ্ল্যানেট। এদেরকে সাধারণ শনাক্ত করা হয় এরা যখন এদের কেন্দ্রের নক্ষত্রের সামনে দিয়ে আবর্তন করে তখন নক্ষত্রের আলোর তীব্রতা কমে যায়।   সেই আলোর তীব্রতা কমা দেখে আমরা গ্রহগুলোকে শনাক্ত করি কিন্তু নিঃসঙ্গ গ্রহগুলোকে এভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয় কারণ এটি কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে না।

আকাশের আপার স্করপিয়ন এলাকা, Image credit: NOIRLab/Eso

বিজ্ঞানীরা যে পদ্ধতি ব্যবহার করে এধরনের গ্রহ আবিষ্কার করেন সে পদ্ধতির নাম হলো গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং। এই পদ্ধতিটি হলো যখন কোনো গ্রহ কোনো নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে তখন গ্রহের ভরের কারণে গ্রহটির পিছনে থাকা নক্ষত্রটির আলো এর গা ঘেসে বের হয় ফলে নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়। কিন্তু এই পদ্ধতিতে সমস্যা হলো গ্রহটি যেহেতু নক্ষত্রটিকে আবর্তন করে না তাই এটিকে আর খু্ঁজে পাওয়া যায় না।

তবে ড. মিরেট ও তার দল একটি আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন গ্রহগুলো শনাক্তের ক্ষেত্রে। তারা যে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন তা হলো, একটি গ্রহ যখন নতুন তৈরী হয় তখন তা অত্যন্ত উত্তপ্ত থাকে এবং ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়। এই ঠান্ডা হওয়ার সময় এরা অবলোহিত রশ্মি বা ইনফ্রারেড রশ্মির বিকিরণ করে। আর এই অবলোহিত রশ্মি অতিসূক্ষ্ণ ক্যামেরায় ধরা সম্ভব। মিরেট বিভিন্ন টেলিস্কোপ থেকে নেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এধরনের গ্রহ শনাক্ত করেছেন

এগুলো শনাক্ত করতে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে মিরেট যে স্থানটি বেছে নেন তা হলো আমাদের ছায়াপথের আপার স্করপিয়াস রিজিওন ( Upper scorpius region)। এটি হলো পৃথিবী থেকে ৪২০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি নক্ষত্র জন্মস্থান। এটি সৌরজগতের সবচেয়ে কাছে থাকা নক্ষত্র জন্মস্থান।

ছবিতে লাল লাল বৃত্তগুলো একেকটা সম্ভাব্য নিঃসঙ্গ গ্রহ

প্রথমে বলা হয়েছে সম্ভাব্য গ্রহের সংখ্যা হতে পারে ৭০ থেকে ১৭০ টি এই অনিশ্চিয়তার কারণ হলো সবগুলো গ্রহ নাও হতে পারে। কারণ এই আপার স্করপিয়ন রিজিওনের বয়স হলো ৩ থেকে ১০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে। যদি এই এলাকার বয়স ৩ মিলিয়ন হয় তবে যে অবলোহিত রশ্মিগুলো আসছে তা নতুন গ্রহ থেকে আসার সম্ভাবনা বেশি। আর যদি ১০ মিলিয়ন হয় তবে রশ্মিগুলো কোনো বয়স্ক কোনো বস্তু থেকে আসছে যা গ্রহ না হলে বামন নক্ষত্র বা মৃত নক্ষত্র হবে। সেক্ষেত্রে মৃত নক্ষত্রের পরিমাণই বেশি হবে। মিরেটের এই গবেষণা আমাদের জানা নিঃসঙ্গ গ্রহের সংখ্যা দ্বিগুণ করে দিয়েছে। আশা করি সামনে আরো গবেষণা থেকে জানা যাবে এদের বসয় বা এরা কিভাবে তৈরী হয় কারণ এদের জন্মরহস্যের কিনারা হলে নক্ষত্রের জন্মের আরো অজানা অধ্যায় উন্মুক্ত হবে। 

Image credit: NOIRLab/Eso

তথ্যসূত্রঃ 

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?

অনিক কুমার সাহা
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ। একজন শৌখিন জ্যোতির্বিদ