নক্ষত্র যাত্রা: বাসযোগ্য গ্রহের উদ্দেশ্যে

আ লোর গতিতে ভ্রমণ করা অনেক আগে থেকেই মানুষের স্বপ্ন। কিন্তু আলোর গতি হলো অনিবার্য প্রাকৃতিক গতিসীমা। তাই ভর আছে এমন কোনো বস্তুর পক্ষে এই গতিতে পৌঁছানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে কি মানুষ থেমে থাকবে? মহাবিশ্বে বিকল্প বাসযোগ্য গ্রহে যাওয়ার স্বপ্ন থমকে যাবে আলোর গতি না পাওয়ার কারণে? কখনোই না। তাইতো বিজ্ঞানীরা দিনরাত খুঁজে যাচ্ছে মহাকাশে দীর্ঘসময় ভ্রমণের বিকল্প উপায়। বাসযোগ্য গ্রহের খোঁজেই চলুন আমরা কিছু সময় ব্যয় করি। 

এত গুলোয় বাসযোগ্য গ্রহ কোনটি?

রাতের আকাশের দিকে তাকালে খোলা চোখেই হাজার নক্ষত্র দেখা যায়। এরকম প্রতিটি নক্ষত্রেরই আছে গোটাকয়েক গ্রহ। এত লাখ লাখ, কোটি কোটি গ্রহের মধ্যে জীবন ধারণের উপযোগী সঠিক গ্রহটি খুঁজে বের করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আবার গ্রহটি যত নিকটবর্তী হবে, ততই সুবিধা। আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র আলফা সেন্টারি। সূর্য থেকে যার দুরত্ব ৪.৩৭ আলোকবর্ষ। অর্থাৎ আলোর গতিতে চললেও সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে চার বছর লেগে যাবে। ২০১২ সালে আলফা সেন্টারির পাশেই একটি পৃথিবী সদৃশ গ্রহের অস্তিত্ব খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। গ্রহটি পৃথিবী সদৃশ হলেও জীবন ধারণের জন্য যে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হবে তা প্রায় নিশ্চিত। 

এছাড়াও সম্প্রতি পৃথিবী থেকে প্রায় ১০০ আলোকবর্ষ দূরে একটি বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান পাওয়ার দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর আকৃতির ওই গ্রহের নাম দেওয়া হয়েছে ‘টিওআই৭০০ডি’।এটি ‘টিওআই৭০০’ নামের একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে।তবে মিশনে বের হওয়ার আগে বাসযোগ্য গ্রহটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ আশংকামুক্ত হতে হবে। এক্ষেত্রে গ্রহটিতে প্রথমেই পর্যবেক্ষণকারী রকেট পাঠাতে হবে। 

কোথায় পাব বিপুল শক্তি? 

মহাকাশের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার একটি বড় সমস্যাই হলো শক্তি নিয়ে। বাসযোগ্য সবচেয়ে কাছের গ্রহতে পৌঁছাতেও হাজার হাজার বছর লেগে যাবে যদি না আলোর কাছাকাছি না হলেও অতি দ্রুত গতি অর্জন করা যায়। আর এই ধরনের গতি অর্জনের জন্য দরকার বিপুল পরিমাণ শক্তি। ১৯৪৬ সালে পারমাণবিক বোমা নিয়ে কাজ করা ম্যানহাটন প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার বোমার শক্তি দিয়ে স্পেসশিশ চালানোর প্রস্তাব করেন। নিউক্লিয়ার বোমাগুলো হবে আকারে ছোট। ষাটের দশকে ‘ওরিয়েন’ নামক একটি গোপণ প্রজেক্ট চালু করে নাসা। এখানে বিজ্ঞানীরা স্পেসশিপের জ্বালানী হিসেবে নিউক্লিয়ার পালস ইউনিটের কথা ভাবেন অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।

প্রজেক্ট ‘ওরিয়েন ‘।

এই অসাধারণ শক্তির সাহায্যে পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহে যাওয়া আসা মিলে মাত্র ১২৫ দিন লাগতো।এটি আলোর ৫% গতি অর্জন করতে সক্ষম। কিন্তু নিউক্লিয়ার শক্তি চালিত যানের গবেষণায় ছেদ ঘটে এর বেশ কিছু কুফল ধরা পড়লে। নিউক্লিয়ার শক্তি বেশ বিপজ্জনক। এ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য মহাকাশে ছড়িয়ে পড়লে সরানো যথেষ্ট ঝামেলার। তাছাড়া নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনের ভরও হবে অনেক বেশি (সাধারণ ইঞ্জিন থেকে প্রায় ১০ গুণ)। যা উড্ডয়নের সময় অনেক ঝামেলা সৃষ্টি করবে। আর এর রক্ষণাবেক্ষণও অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। এ ধরনের বিভিন্নমুখী সমস্যার কারণে সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকা এ সম্পর্কিত গবেষণা গুটিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে অর্থ সংকটের কারণে প্রজেক্ট ‘ওরিয়েন ‘ বন্ধ হয়ে যায়। 

প্রজেক্ট “ডায়েডেলাস”।

এরপরে আরও একটি প্রজেক্ট “ডায়েডেলাস” চালু হয়। প্রজেক্টটির লক্ষ্য ছিল দ্বিতীয় নিকটবর্তী গ্রহ বার্নাডাতে পৌছানো। আলোর ১২% গতি লাভ করতে সক্ষম এমন যানেরই আলফা সেন্টারিডে পৌছাতে প্রায় ৪০ বছর সময় লাগে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে বিকল্প বাসযোগ্য গ্রহে পৌছাতে মানুষের কত দীর্ঘ সময় আর কত দ্রুত গতি লাগবে! এই ধরনের অতি দ্রুত মহাকাশযানের শক্তির উৎস হবে থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণে পারমাণবিক ভাঙন হবে এবং এতে উত্তপ্ত প্লাজমা হতে প্রচন্ড শক্তিশালী প্রবাহ মহাকাশযানের উল্টো দিক থেকে বের হবে। আর এই উল্টোমুখী ধাক্কার ফলে স্পেসশিপ তীব্র গতিতে সামনে এগিয়ে যাবে নিউটনের তৃতীয় সূত্র মোতাবেক (Every action has an equal and opposite reaction)। 

মহাবিশ্বের ছড়ানো গ্যাস কি দিতে পারবে শক্তি? 

প্রজেক্ট ডায়াডেলাসের সুবিধা থাকলেও এরকম ভারী মহাকাশযান উৎক্ষেপনের জন্য কোনো স্টেশন তৈরি হয় নি এবং অদূর ভবিষ্যতে হবে এমন সম্ভবনাও অত্যন্ত কম। তাই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে মহাশূন্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাইড্রোজেন অণুগুলি। 

যদি মহাকাশ যান এমন হয় যে এটি কোনো একভাবে মহাকাশ থেকেই হাইড্রোজেন গ্যাস সংগ্রহ করবে এবং ইঞ্জিনের রিঅ্যাকটরে হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ ঘটাবে, আর এই শক্তিকেই মহাকাশযানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তবে এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হলে দরকার বিশাল আকারের সংগ্রাহক (প্রায় কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী)। কারণ মহাকাশের সবখানে হাইড্রোজেন পাওয়া গেলেও এর ঘনত্ব অতি নগণ্য। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে বড়জোর একটি থেকে দুটি হাইড্রোজেন অণু আছে যার সাথে আবার মিশ্রিত থাকবে অন্যান্য রকমারি গ্যাসের অণু। কাজেই এ বিকল্প সমাধানটিরও বেশ কিছু অসুবিধা পাওয়া যায়। 

জেনারেশন স্টারশিপ

স্টারশিপ কথাটা শুনেই বোঝা যাচ্ছে নক্ষত্রের মতো বড় কোনো মহাকাশযান হবে নিশ্চয়! আসলেও তাই।দূর দূরান্তের বাসযোগ্য গ্রহের বুকে কি শুধু এক প্রজন্মে পা দেওয়া সম্ভব?  এমন প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচতে ২টি উপায় আছে। হয় মহাকাশযানকে হতে হবে প্রচন্ড গতিশীল, যেনো চোখের পলকে দূরের অজানা গ্রহের দিকে ছুটে যাওয়া যায় অথবা যুগের পর যুগ স্পেসশিপ মহাকাশে ঘুরে বেড়াবে আর মহাকাশ যানে তৈরি হবে প্রজন্মর পর প্রজন্ম।  এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম স্পেসশিপের দায়িত্ব নিবে। এভাবে একদিন চলতে চলতে নতুন বাসযোগ্য গ্রহে পৌছানো যাবে। তবে ব্যাপারটা আসলে বলা যতটা সহজ প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে হাজার গুণ কঠিন। স্টারশিপে প্রথমেই তৈরি করতে হবে কৃত্রিম মধ্যাকর্ষণ বল। এজন্য স্টারশিপকে হতে হবে চাকতি আকৃতির।কৃত্রিম উপায়ে চাষাবাদ, অক্সিজেন সরবরাহ,  বর্জ্য নিষ্কাশন ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। গন্তব্যে পৌছানোর পর নতুন গ্রহে কলোনি স্থাপনের সব উপকরণও স্টারশিপে থাকা চাই। 

জেনারেশন স্টারশিপ।

এছাড়া কিছু সামাজিক সমস্যা তো আছেই। স্টারশিপে গড়ে উঠবে বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি। নির্ধারিত গ্রহে পৌঁছাতে ১০ হাজর বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। হতে পারে যাত্রা শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই পৃথিবী থেকে এর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় স্টারশিপের ছোট্ট গন্ডিই হবে তাদের সব। স্টারশিপের মূল লক্ষ্যই থাকবে নতুন কোনো গ্রহে কলোনি স্থাপন করে বাসযোগ্য করা। 

সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন (সায়েন্স ফিকশন থেকে বাস্তবে) 

এই বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটির সাথে প্রতিটি কল্পবিজ্ঞান প্রেমীরা পরিচিত। সায়েন্স ফিকশনগুলোতে মহাকাশযাত্রীরা শীতল ঘরে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয় বছরের পর বছর। কোনো প্রাণকে আকস্মিকভাবে যদি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পৌছে দেওয়া যায় তাহলেঐ প্রাণের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মূহুর্তের মধ্যে থেমে যাবে। আক্ষরিক অর্থে সে মৃত। হৃদযন্ত্র এবং কোষ বিভাজন বন্ধ। যদি জীবদেহটিকে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার  নাইট্রোজেনে ডুবিয়ে রাখা হয় এবং উপযুক্ত পদ্ধতি আয়ত্তে থাকলে পরবর্তীতে আবারও ঔ জীবটিতে আগের মতো প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। যদিও এটা এখনো সম্পূর্ণই কল্পনা। কারণ কিছুক্ষণের 

সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন।

জন্য জীবদেহের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে দীর্ঘসময়ের জন্য বন্ধ করা সম্ভব নয়। যেমন সাপ বা ব্যাঙ গোটা শীতকাল ঘুমিয়ে কাটায়। তখন এদের দেহের কার্যক্রম একদম সীমিত হয়ে গেলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। এরা ছাড়া আরও কিছু প্রাণীর মধ্যে শীতনিদ্রা দেখা যায় তবে কেউই পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। মানুষকে এখনও শীতনিদ্রায় পাঠানোই সম্ভব হয় নি। তাই মানুষের জন্য সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন অনেক সুদূর ভবিষ্যতের বিষয়। তবে যদি সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন সত্যিই ঘটানো সম্ভব হয় তবে তা হবে স্পেস অভিযানের জন্য এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। সম্ভবনা-অসম্ভবনা সবকিছু নিয়েই বিজ্ঞান। আজকের সায়েন্স ফিকশনই আগামী দিনের বাস্তবতা। 

তথ্যসূত্রঃ

রুফফা নূর জারিয়াহ
আমি বিজ্ঞান ভালোবাসি। ধীরে ধীরে বিজ্ঞানকে আরও ভালোভাবে শিখতে চাই। বর্তমানে পুলিশ লাইন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।