আবদুল গাফফারের জাতিস্মর। Photo Credit: Monirul Hoque Shraban

জাতিস্মর: এক বাংলাদেশি বিজ্ঞানী অভিযাত্রীর কাহিনী

লিখেছেন

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

আবদুল গাফফার দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখালেখি করছেন। পাশাপাশি টুকটাক বিজ্ঞান কল্পগল্পও লিখছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে উনার লেখালেখি ও বিজ্ঞান কল্পগল্প অনুসরণ করি। আবদুল গাফফারের কাছে যদি খুব করে কোনো জিনিস বেশি বেশি করে চাই, তা হবে বিজ্ঞান কল্পগল্প। উনার নন-ফিকশন বিজ্ঞান লেখালেখির হাত যতটুকু ভালো, তার চেয়েও ভালো তার কল্পগল্প লেখার হাত। পেশাগত কারণে মানুষকে অনেক কিছুই করতে হয়। লেখক আবদুল গাফফার যেহেতু পত্রিকা ও সাময়িকীর সাথে জড়িত, তাই তাকে পেশার তাগিদেই নন-ফিকশন লিখতে হবে। এতটুকো নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু তিনি পেশাগত সময়ের বাইরেও লেখালেখি নিয়ে সারাক্ষণ ভাবেন, কথা বলেন ও নানাজনের সাথে যোগাযোগ করেন। সে হিসেবে আমি মনে করি, পেশার বাইরে যতটা সময় উনার নন-ফিকশনে দেওয়া উচিত, তার চেয়েও বেশি সময় দেওয়া উচিত ফিকশনে।

‘জাতিস্মর’ বইয়ের গল্পের নায়ক ড. জামিল। মোট ১২টি গল্প আছে বইটিতে। ড. জামিল লেখকের সৃষ্ট একজন বিজ্ঞানী, যিনি প্রথাগত বিজ্ঞানচর্চা করেন না। তিনি ভালোবাসেন সত্যজিতের ফেলুদার মতো রহস্য সমাধান করতে আর তার ভালোবাসেন প্রফেসর শঙ্কুর মতো অদ্ভুত অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক যন্ত্র উদ্ভাবন করতে। শার্লক হোমসের যেমন একজন শত্রু লেগে থাকে মরিয়ার্টি, তেমনই ড. জামিলের শত্রু আরেক ক্ষ্যাপাটে বিজ্ঞানী পারভেজ আনোয়ার। জামিল বাংলাদেশে বসবাস করেন, এবং বিশ্বের সকল বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান সোসাইটি তার নাম ও আবিষ্কার সম্বন্ধে জানে। বাংলাদেশের বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও তাকে সমীহ করে চলে। যে কেস পুলিশ সমাধান করতে পারে না, তখন তারাই ডাক পড়ে ড. জামিলের। জামিলের অভিযানগুলোও হয় বাংলাদেশে, যেটা আমরা বাংলাদেশের সায়েন্স ফিকশন কিংবদন্তি মুহম্মদ জাফর ইকবালের গল্পগুলোতে খুব কম পাই। জাফর ইকবালের গল্পগুলো প্রায়ই ডিস্টোপিয়ান কিংবা কাল্পনিক কোনো স্থানকে কেন্দ্র করে। আবদুল গাফফারের সায়েন্স ফিকশন সেদিক থেকে অনেক আলাদা। তার গল্পের বর্ণনা আর সব সাধারণ বাংলা গল্পের মতো, গ্রাম বাংলার বিবরণ। কিন্তু প্লটটা সায়েন্স ফিকশনের। এখানেই আসলে লেখকের অনন্যতা। এখানেই অন্যান্য সায়েন্স ফিকশনিস্ট থেকে তিনি আলাদা। আমি মনে করি এভাবেই ড. জামিলকে নিয়ে তার এগিয়ে যাওয়া উচিত।

জাতিস্মর by Abdul Gaffar
আবদুল গাফফারের জাতিস্মর।
Photo Credit: Monirul Hoque Shraban, Device: Nikon D5600 with 18-55 mm Lens, Edited in Adobe Photoshop CC 2019
লেখক আবদুল গাফফার।
লেখক আবদুল গাফফার।
Photo: Collected from the author’s Facebook profile.

লেখক আবদুল গাফফারকে আমি ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু চিনি ও জানি তাতে বোধ করি লেখকের জীবনের নানা ঘটনার প্রতিফলন ঘটেছে গল্পগুলোয়। লেখক হয়তো সিলেটে বেড়াতে গিয়েছেন, সেখানটাকে কেন্দ্র করে সাজিয়েছেন কোনো একটা গল্পের প্লট। হয়তো কুমিল্লা ঘুরতে গিয়েছেন, সেখানের অভিজ্ঞতা থেকে সাজিয়ে নিয়েছেন কোনো গল্পের রসদ। গল্প তো এমনই হওয়া উচিত। ড. জামিলের আদতে আসলে লেখককেই খুঁজে পাওয়া যায়। এই বইয়ের প্রচ্ছদে জামিলকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, তা মূলত লেখকেরই চেহারা ও পোশাকের আদলে।

‘জাতিস্মর’ সংকলনের ১২টি গল্পের কোনোটিতে জম্বি হয়ে যায় যশোর রোডের সারি সারি শতবর্ষী কড়ই গাছ, কোনোটিতে পৃথিবীর সমান আস্ত এক গ্রহ চলে আসে আলুটিলার এক ছোট ঘরের কক্ষে, আর একটিতে চুয়াডাঙ্গার এক গ্রামে তৈরি হয় প্যারালাল ইউনিভার্সে যাবার এক ওয়ার্মহোল। কোথাও তিনি নিজের কক্ষে থেকেই ভ্রমণ করেন আরেক মহাবিশ্বে, আবার কোথায় খুঁজে পান চাঁদের অন্ধকার পিঠ নিয়ে পৃথিবীর কারো না জানা রহস্য। তিনি পারেন অদৃশ্য মানব তৈরির ফর্মুলা বানাতে, পারেন প্রায় আলোর বেগে ছুটতে। তার চমৎকার আবিষ্কারগুলোর পেছনে থাকে অন্যান্য অসভ্য বিজ্ঞানীদের লোলুপ দৃষ্টি। তার এ সমস্ত যন্ত্রপাতি, মেধা, উৎসাহ, আর নানা কাকতালের সমন্বয়ে জন্ম হয় একের পর এক গল্প। সে রকম কিছু গল্পেরই সংকলন এই বইটি। পড়তে মজার ও দারুণ উপভোগ্য।

লেখক তার জীবনে এখন পর্যন্ত (২০২৩) বিজ্ঞান বই লিখেছেন যে পরিমাণ, সে তুলনায় সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন খুবই কম। যদ্দুর মনে করতে পারি তার সায়েন্স ফিকশন বই মাত্র আড়াইটি। আড়াইটি বললাম এ কারণে, ১ম বইটি (কালাধুঙ্গির বিভীষিকা) কোথাও পাওয়া যায় না। এর পরেরটি ড. জামিল সিরিজের ১ম বই, ভিনগ্রহের পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হয়েছিল অনেক আগে ২০১২ সালে। ছোট্ট আয়তনের বইটিতে ছিল মাত্র ১টি গল্প। গল্পটিও আবার বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক আডগার এলান পো’র একটি গল্পের সাথে মিলে যায় (এনক্রিপটেড বাক্য থেকে মূল লেখা উদ্ধার করা)। তারপর ১১ বছর সময় নিয়ে আসে ‘জাতিস্মর’ বইটি। এটাকেই লেখকের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সায়েন্স ফিকশন বলা যায়। এবং এখন লেখকের লেখা আগের চেয়ে অনেক পরিণত। নবীন বয়সে লেখকদের মাঝে নবীনতার ছাপ থাকে, সেটা স্বাভাবিক। লেখালেখি চালিয়ে গেলে সেটা চলে যায় এবং ধীরে ধীরে পরিণতি আসে। আবদুল গাফফারও পরিণত হয়েছেন। যদি আরো লিখে যান, গল্প আরো দারুণ হবে নিঃসন্দেহে। সেজন্যই বলেছিলাম, সাহিত্যিক সামর্থ্য সবার থাকে না, কারো কলমে সাহিত্যিক ক্ষমতা থাকলে তার সঠিক ব্যবহার হওয়া উচিত। আবদুল গাফফারের যেহেতু সে ক্ষমতাটা আছে, তার উচিত সেটাকে পুরোদমে কাজে লাগানো। লেখক আবদুল গাফফার ও তার সৃষ্টি ড. জামিলের ভবিষ্যৎ আরো বিস্তৃত হোক।

বই: জাতিস্মর || লেখক: আবদুল গাফফার || প্রকাশক: আফসার ব্রাদার্স || প্রকাশকাল: ২০২৩ || পৃষ্ঠা: ১২৮ || মূল্য: ২৫০ টাকা

লেখাটি 123-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers