মানুষের যত পূর্বপুরুষ (পর্ব-১)


লিখেছেন

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

১৮৫৬ সাল। জার্মানির ডুসেলডর্ফের অদূরে নিয়ান্ডারথাল নামক স্থানে একদল শ্রমিক চুনাপাথর খননকার্যে ব্যস্ত। প্রচুর পরিশ্রম এই কাজে; তবে পারিশ্রমিকও ভালো। খনন করতে করতে একসময় তারা গুহার গভীরে পৌঁছে যায়। এখানটায় বেশ অন্ধকার। যদিও আলোর ব্যবস্থা রয়েছে; তবে তা অপর্যাপ্ত। হঠাৎ একসময় একজন শ্রমিক চিৎকার দিয়ে উঠে। গুহার ভেতর মাটি খোড়ার সময় হঠাৎই সে কিছু কঙ্কালের দেখা পেয়েছে। অদ্ভুত দেখতে এই কঙ্কালগুলোকে ঠিক মানুষের কঙ্কাল বলা চলে না। যেই লোকের নেতৃত্বে খননকার্য চলছে, তিনি খুবই বুদ্ধিমান লোক। দ্রুতই সেই কঙ্কালগুলো পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দিলেন গবেষণাগারে। বিভিন্ন শারীরতত্ত্ববিদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন সেই কঙ্কালসদৃশ জীবাশ্মগুলোকে। হ্যাঁ,হাজার বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে সেই কঙ্কালগুলো ততদিনে জীবাশ্মে পরিণত হয়েছে। যাহোক, ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ১৮৫৭ সালে শরীরতত্ত্ববিদ ‘হারম্যান শ্যাফহাউসেন’ রায় দিলেন যে, জীবাশ্মগুলো বর্বর,যুদ্ধবাজ আদিম কোনো মানবগোষ্ঠীর। তবে এই রায়ে সন্তুষ্ট হলেন না কিছু গবেষক। এই জীবাশ্মগুলোকে নিয়ে চলতে থাকলো নানা গবেষণা।

অবশেষে আবিষ্কারের ৭ বছর পর আইরিশ ভূতাত্ত্বিক ‘উইলিয়াম কিং’ জানান যে, এই জীবাশ্মগুলো মানব প্রজাতি তথা হোমো সেপিয়েন্স এর কোনো সদস্যের নয়। বরং অন্য এক প্রজাতির মানুষ এরা। হোমো সেপিয়েন্স থেকে অনেক আলাদা এদের বৈশিষ্ট্য। এদের মস্তিষ্ক এবং নাসারন্ধ্রের আকার হোমো সেপিয়েন্স দের থেকে বড়, যদিও শারীরিক আকারে এরা সেপিয়েন্স দের থেকে অনেকটাই ছোট। মানুষের নতুন এই প্রজাতির তিনি নাম দেন হোমো নিয়ান্ডারথালেনসিস। এভাবেই আবিষ্কার হয় মানুষের পূর্বপুরুষের প্রথম জীবাশ্ম। এরপর কিছু বছর অন্তর অন্তর নতুন নতুন জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া যেতে লাগলো। ধীরে ধীরে মানুষের বিবর্তনের পাজলের টুকরাগুলো একত্র করা হলো। তৈরি হলো মানুষের বিবর্তনীয় বৃক্ষের।¹ এখনও নতুন নতুন জীবাশ্ম পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো মানব বিবর্তনের পুরো গল্পটা জানতে পারবো। তবে আজ আমরা আলোচনা করবো মানুষের বিভিন্ন প্রজাতি নিয়ে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র হোমো গণের প্রজাতি নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো।

মানুষের বিবর্তনবৃক্ষ

হোমো হাবিলিস 

১৯৬০ সালে আফ্রিকার তাঞ্জানিয়া’য় খনন করে কিছু প্রাচীন হোমিনিন এর জীবাশ্ম পাওয়া যায়। গবেষকেরা প্রথমে মনে করেছিলেন এগুলো মানুষের আরেক আত্মীয় অস্ট্রালোপিথেকাস এর জীবাশ্ম। তবে পরবর্তীতে এরকম আরো বেশকিছু জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া যায়,যেগুলোর বৈশিষ্ট্য অস্ট্রালোপিথেকাস এর চেয়ে আলাদা। তবে কিছু গবেষক এখনো মনে করেন যে,হাবিলিস দের বৈশিষ্ট্য অস্ট্রালোপিথেকাস’দের সাথেই বেশি মিলে; হোমো গণের অন্য প্রজাতির সাথে নয়! তাই ধারণা করা হয় যে, অস্ট্রালোপিথেকাস’দের থেকে বিবর্তনের মাধ্যমেই হোমো হাবিলিস এর উদ্ভব হয়েছে। জীবাশ্ম রেকর্ড অনুযায়ী, হাবিলিসদের মস্তিষ্কের আকার ছিল প্রায় ৫০০ থেকে ৯০০ ঘন সেন্টিমিটার, যা তাদের পূর্ববর্তী প্রজাতি অস্ট্রালোপিথেকাসদের তুলনায় বড়। অস্ট্রালোপিথেকাস’দের মস্তিষ্কের আকৃতি ছিল ৪০০-৫০০ ঘন সেন্টিমিটার।

শিল্পীর কল্পনায় হোমো হাবিলিস 

এবার হোমো হাবিলিস’দের পরিচয় দেওয়া যাক। হোমো হাবিলিস (Homo habilis) হলো প্রাচীন মানুষের একটি বিলুপ্ত প্রজাতি, যারা প্রায় ২৩ লক্ষ থেকে ১৬.৫ লক্ষ বছর পূর্বে আফ্রিকায় বসবাস করত। এই প্রজাতির নামকরণ লাতিন শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ “হাতিয়ার ব্যবহারকারী মানুষ।” এ নাম দেওয়া হয় এ কারণে যে, হোমো হাবিলিসকে ‘প্রথম পাথরের তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহারকারী মানব প্রজাতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় (যদিও পরবর্তীতে মানুষের আরো কিছু পুরোনো আত্মীয় প্রজাতির মাঝে পাথরের তৈরি হাতিয়ারের ব্যবহার লক্ষ্য করা গিয়েছে)। এদের উচ্চতা ছিল ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি থেকে ৪ ফুট ৫ ইঞ্চি পর্যন্ত এবং গড় ওজন ছিল ৩২ কেজি।

হোমো হাবিলিস এর বড় মস্তিষ্ক তাদের আরও উন্নত সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, যোগাযোগের প্রাথমিক ধাপ, এবং পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল তৈরি করতে সহায়তা করেছে। ফলে এরা সৃষ্টি করেছে মানুষের নতুন একটি ধারার। এক সময় মনে করা হতো যে, হোমো হ্যাবিলিসরা ছিল হোমো ইরেক্টাসদের পূর্বপুরুষ। তবে পরবর্তীতে দুইটি প্রজাতির জীবাশ্মের তুলনামূলক বিচার করে দেখা গেছে যে, উভয় প্রজাতির মধ্য অনেক মিল থাকলেও, এরা পৃথকভাবে বিকশিত হয়েছিল। হয়তো এদের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন কোনো প্রজাতি ছিল যেটি কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে। হোমো হাবিলিস মূলত পাথরের তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করে পশু শিকার, ফল সংগ্রহ, এবং পশুর হাড় থেকে মজ্জা আহরণ করত। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, হোমো হাবিলিস আধুনিক মানুষের (Homo sapiens) বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।² 

হোমো রুডলফেনসিস

মানুষের এই প্রাচীন প্রজাতিটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মাঝে বেশ বিতর্ক বিদ্যমান। এই প্রজাতির জীবাশ্ম যেখানে আবিষ্কার হয়েছে সেই জায়গায়ই অনেক হাবিলিস এর জীবাশ্মও খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তাই বিজ্ঞানীদের মতে এরা হোমো হাবিলিস এরই কোনো সদস্য। অনেক বিজ্ঞানী অবশ্য এদের অস্ট্রালোপিথেকাস কিংবা কেনিয়ানথ্রোপাস’দের বংশধর হিসেবেও চিহ্নিত করে থাকেন। যাহোক, অন্য মানব প্রজাতি থেকে বেশকিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য এদের রয়েছে। এরা প্রায় ২৫ লক্ষ থেকে ১৯ লক্ষ বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় বসবাস করতো। পূর্ব আফ্রিকার রুডলফ হ্রদের তীরে এদের জীবাশ্ম আবিষ্কার হয়, যা থেকেই মূলত এই নামকরণ হয়েছে। ১৯৭২ সালে কেনিয়ার বিজ্ঞানী রিচার্ড লিকির নেতৃত্বাধীন একটি দল প্রথম হোমো রুডলফেনসিসের জীবাশ্ম (KNM-ER 1470) আবিষ্কার করে। জীবাশ্মটি শুধুমাত্র একটি মস্তিষ্কের জীবাশ্ম ছিল। তবে বেশ কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকায় এটি বিজ্ঞানীদের মাঝে কৌতুহল জাগায় এবং পরবর্তীতে আলাদা প্রজাতি হিসেবে স্থান করে নেয়।

মানুষের বিভিন্ন প্রজাতির মাঝে সম্পর্ক

এবার এদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। হোমো রুডলফেনসিসের মস্তিষ্কের আয়তন প্রায় ৭৫০ ঘন সেন্টিমিটার ছিল, যা তার সমসাময়িক প্রজাতি হোমো হাবিলিসের তুলনায় কিছুটা বড়। এ থেকে বোঝা যায় যে, মস্তিষ্কের আকারের ক্ষেত্রে  তারা আরও উন্নত ক্ষমতা অর্জন করেছিল। ধারণা করা হয়, খাদ্যাভ্যাসে মাংস যুক্ত হওয়ার কারণেই মানুষের এই প্রজাতিগুলোর মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পেয়েছিল। দাঁতের গঠন দেখে ধারণা করা হয় উদ্ভিদজাত খাদ্যের পাশাপাশি মাংসও গ্রহণ করতো তারা। আর এক্ষেত্রে শিকার ধরার জন্য সম্ভবত ছোট ছোট পাথরের হাতিয়ারও ব্যবহার করতো।

যদিও কোনো সম্পূর্ণ জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া যায় নি, তবে ধারণা করা হয় হোমো রুডলফেনসিস দের উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির আশেপাশে ছিল। অবশ্য মহিলা সদস্যদের আকার ৪ ফুট ১১ ইঞ্চির মতো ছিল। এরা প্রায় ৬০ কেজি ওজনের হতো। যদিও পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি,

তবে ধারণা করা হয় হোমো রুডলফেনসিস’দের শরীর লোমে আবৃত ছিল; কারণ তারা কিছুটা ঠান্ডা এলাকায় বসবাস করতো। এদেরকে হোমো হাবিলিস ও হোমো ইরেক্টাস এর সংযোগসূত্র হিসেবেও তুলনা করা হয়। তবে মানুষের বিবর্তনীয় বৃক্ষে এদেরকে হাবিলিস’দের পাশেই স্থান দেওয়া হয়েছে।³

হোমো এর্গাস্টার

মানুষের পূর্বপুরুষদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে পৃথিবীতে হেঁটে চলা প্রজাতির মধ্যে অন্যতম হলো হোমো এর্গাস্টার। ১৯৭৫ সালে বিজ্ঞানী কলিন গ্রুভস এবং ভ্রাতিস্লেভ মাজাক এই প্রজাতি’কে হোমো ইরেক্টাস থেকে আলাদা করে স্বতন্ত্র প্রজাতির স্বীকৃতি দেন। অবশ্য এদেরকে হোমো হাবিলিস হিসেবেও গণ্য করা হতো একসময়। এখনো অনেক নৃতত্ত্ববিদ এদের ‘আফ্রিকান হোমো ইরেক্টাস’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রথম দিকে প্রাপ্ত জীবাশ্ম থেকে বিজ্ঞানীরা একপ্রকার নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, প্রাচীন এই মানব প্রজাতি প্রায় ১৯ থেকে ১৪ লক্ষ বছর পূর্বে আফ্রিকায় বসবাস করত। তবে পরবর্তীতে এর থেকেও কম বয়সী হোমো এর্গাস্টার এর জীবাশ্ম খুঁজে পা-ওয়া যায়। এমনকি ৬ লক্ষ বছর আগের এর্গাস্টারের জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এদের নিয়ে তাই বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে।

হোমো এর্গাস্টার এর জীবাশ্ম

এই প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে গ্রিক শব্দ “এর্গাস্টার” থেকে, যার অর্থ “কর্মী মানুষ” বা “ওয়ার্কম্যান”। কেনিয়ার ‘লেক তুর্কানা’ অঞ্চলে এই প্রজাতির জীবাশ্ম সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছে। সেসব জীবাশ্মের পাশে পাথরের তৈরি বহু হাতিয়ারও পাওয়া গিয়েছে। তাই মূলত এদের কর্মী মানুষ হিসেবে নামকরণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এদের সাথে অস্ট্রালোপিথেকাসদের কিছু অমিল রয়েছে। আবার ইরেক্টাসদের তুলনায়ও এরা আলাদা। হোমো এর্গাস্টার তুলনামূলক দীর্ঘ পা এবং শরীরের অনুপাতের কারণে আধুনিক মানুষের মতো হাঁটাচলার ক্ষমতা অর্জন করে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। এদের মস্তিষ্কের আকার ছিল প্রায় ৬০০ থেকে ৯০০ ঘন সেন্টিমিটার, যা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা নির্দেশ করে।

হোমো এর্গাস্টারের সবচেয়ে অক্ষত জীবাশ্মটি ‘তুর্কানা বালক’ হিসেবে পরিচিত। মূলত লেক তুর্কানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৭-১২ বছর বয়সী এক ছেলের জীবাশ্ম এটি। এই জীবাশ্মের সাথে অস্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতির অনেক পার্থক্য রয়েছে। ‘তুর্কানা বালক’ এর জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বের করেছেন এরা প্রায় মানুষের মতো হাঁটতে পারতো,হাত ছিল অস্ট্রালোপিথেকাস দের চেয়ে ছোট। তবে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, হাঁটার সময় এরা ঝুঁকে পড়তো, ফলে বেঁকে যেত এদের পা। এছাড়া শরীরের গঠন থেকে ধারণা করা হয় এদের উচ্চতা পূর্বের প্রজাতির থেকে বেশি ছিল। যেখানে অস্ট্রালোপিথেকাস দের গড় উচ্চতা ১ মিটারের মতো ছিল, সেখানে তুর্কানা বালক এর উচ্চতা প্রায় ১.৬২ মিটার। হয়তো এরা ৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতো। আফ্রিকার সাভানা অর্থাৎ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় বসবাস করার কারণে এদের মধ্যে নতুন করে মিউটেশন ঘটে। ফলে শরীরে চুল এবং লোমের প্রয়োজন কমে যেতে থাকে। হয়তো সেসময়ই মানুষের দেহ থেকে অপ্রয়োজনীয় লোম উধাও হয়ে যায়। তবে এর আগে থেকেই মানুষের পূর্বপুরুষদের মাঝে লোমের পরিমাণ কমতে থাকে। ধারণা করা হয়, ৩০ লক্ষ বছর আগে থেকেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।

আত্মরক্ষা এবং শিকারের জন্য তারা পাথর এবং কাঠের কুঠার ব্যবহার করতো। এছাড়াও তারা আগুনের প্রাথমিক ব্যবহার জানত বলে ধারণা করা হয়। তাদের খাদ্যাভ্যাসে উদ্ভিদ, মাংস এবং শিকারের মাধ্যমে প্রাপ্ত অন্যান্য খাদ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, হোমো এর্গাস্টারই ছিল আফ্রিকার বাইরে চলে যাওয়া প্রথম মানব প্রজাতি, যা পরবর্তীকালে হোমো ইরেক্টাসে রূপান্তরিত হয়। এছাড়া কথা বলার উপযোগী স্বরতন্ত্র এবং বাগ্-প্রত্যঙ্গের বিকাশ হয়েছিল এদের মাঝে। হোমো এর্গাস্টার মানব বিবর্তনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর চিহ্নিত করে, কারণ এটি আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষ হিসেবে বিবেচিত হয়।⁴

হোমো ইরেক্টাস

এতক্ষণ ধরে যেসব প্রজাতির মানুষের কথা বলা হয়েছিল তারা ছিল একেবারে আদিম বৈশিষ্ট্যের মানুষ। তবে এদের পরপরই পৃথিবীতে রাজত্ব করতে চলে আসে নতুন এক মানব প্রজাতি। এই মানব প্রজাতির সাথে শিম্পাঞ্জিদের মিল কম বরং বর্তমা মানুষদের মিলই বেশি ছিল। এদের বলা হতো হোমো ইরেক্টাস। এই ইরেক্টাস শব্দটিও এসেছে তাদের দৈহিক গঠন থেকে। এরাই প্রথম মানব প্রজাতি যারা একেবারে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতো। আর ইরেক্টাস নামের অর্থ “সোজা দাঁড়ানো মানুষ,” যা এই প্রজাতির শারীরিক গঠন এবং উন্নত অবস্থানের প্রতীক। এই হোমো ইরেক্টাস’রা ২০ লক্ষ থেকে ১১ লক্ষ বছর আগ পর্যন্ত পৃথিবীতে টিকে ছিল। যেখানে বর্তমান হোমো সেপিয়েন্স’রা মাত্র ৩ লক্ষ বছর ধরে টিকে রয়েছে, সেখানে এরা প্রায় ১০ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াতো। 

হোমো ইরেক্টাস এর জীবাশ্ম 

হোমো ইরেকটাস (Homo erectus) প্রাচীন মানব প্রজাতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকা প্রজাতি এবং এরা মানবজাতির বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এরা বলতে গেলে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। এশিয়া, আফ্রিকা, এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার জাভা নামক দ্বীপে এদের প্রথম জীবাশ্ম উদ্ধার করা হয় বলে অনেকে একে জাভা মানব বলেও ডাকে। এরা ছিল শিকারী সংগ্ৰাহক গোষ্ঠী। ব্যবহার করতো উন্নত মানের পাথরের তৈরি অস্ত্র। এরাই প্রথম হোমিনিন যারা আগুনের উপর আয়ত্ত এনেছিল, পাড়ি দিতে পারতো অনেক লম্বা দূরত্ব (টানা ৫ ঘন্টার মতো হাঁটার ক্ষমতা) এবং তর্কসাপেক্ষে হয়তো তাদের মধ্যে ব্যবহার ছিল কোন ধরনের সাংকেতিক ভাষা ও।

এদের মস্তিষ্কের আকার ছিল প্রায় ৮০০ থেকে ১১০০ ঘন সেন্টিমিটার, যা প্রমাণ করে তারা পূর্ববর্তী প্রজাতির তুলনায় অধিক উন্নত বুদ্ধি এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অর্জন করেছিল। এ প্রজাতি পাথরের হাতিয়ার যেমন হাত কুঠার এবং অন্যান্য শিকার সরঞ্জাম তৈরি করত, যা তাদের টিকে থাকার ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে। তাদের খাদ্যাভ্যাস মিশ্রিত ছিল; মাংসের পাশাপাশি উদ্ভিজ্জও খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিছু গবেষক মনে করেন, হোমো ইরেকটাস ছিল আগুনের প্রাথমিক ব্যবহারকারী প্রজাতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। আগুন ব্যবহারের মাধ্যমে তারা খাদ্য রান্না করা, তাপের উৎস জোগানো এবং শিকারি প্রাণীদের থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করত। মূলত, ইরেক্টাসদের জীবাশ্মের পাশে পোড়া কাঠের জীবাশ্মও খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। যা থেকে এই ধারণার উদ্ভব হয়েছে। এখন, তারা আসলেই আগুনের আবিষ্কার করেছিল নাকি দাবানল থেকে এই আগুনের সূত্রপাত তা নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে এখনো বিতর্ক চলমান।

শিল্পীর কল্পনায় আগুনের ব্যবহার করছে ইরেক্টাস’রা

হোমো ইরেক্টাস শারীরিক গঠনের দিক থেকেও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদের লম্বা পা এবং অপেক্ষাকৃত ছোট হাতের কারণে তারা আধুনিক মানুষের মতো দৌড়ানো এবং দীর্ঘ দূরত্ব হাঁটতে পারত। এদের মুখমণ্ডল এবং চোয়াল অপেক্ষাকৃত বড় এবং দাঁত মজবুত ছিল, যা কঠিন খাদ্য চর্বণে সহায়ক। হোমো ইরেকটাস সম্ভবত প্রথম মানব প্রজাতি ছিল যারা আফ্রিকা ছেড়ে এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের জীবাশ্ম ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপ, চীনের ঝউকৌডিয়ান, এবং কেনিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, তারা বৈশ্বিক অভিযোজন ক্ষমতার দিক থেকে মানবজাতির বিবর্তনে এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে।⁵

হোমো গণের প্রথম দিকের সদস্যদের মধ্যে পার্থক্য করা কিছুটা মুশকিল। এদের শারীরিক গঠন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য প্রায় কাছাকাছি। তবে হাঁটতে পারার ক্ষমতা,বড় মস্তিষ্ক, হাঁড়ের সংযোগ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা এসব প্রজাতির মাঝে আলাদা রেখা টেনেছেন। তবে মানুষের এসব প্রজাতি নিয়ে এখনও প্রচুর গবেষণা বাকি রয়েছে। ভবিষ্যতে এদের সম্পর্কে হয়তো আরো ভালভাবে জানতে পারবো আমরা। পরবর্তী পর্বগুলোতে মানুষের অন্য প্রজাতি নিয়ে আলোচনা করা হবে।

তথ্যসূত্র-

লেখাটি 62-বার পড়া হয়েছে।


নিজের ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান? হোস্টিং ও ডোমেইন কেনার জন্য Hostinger ব্যবহার করুন ৭৫% পর্যন্ত ছাড়ে।

আলোচনা

Leave a Reply

ই-মেইল নিউজলেটার

বিজ্ঞানের বিভিন্ন খবর সম্পর্কে আপডেট পেতে চান?

আমরা প্রতি মাসে ইমেইল নিউজলেটার পাঠাবো, মাসে একবার। নিউজলেটারে সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন খবরাখবর নিয়ে বিশ্লেষণ থাকবে। এছাড়া বিজ্ঞান ব্লগে কি কি লেখা আসলো, কি কি কর্মযজ্ঞ চলছে, সেটার খবরও থাকবে।







Loading