আচ্ছা, কেউ কি বলতে পারো আমাদের চারপাশের পদার্থ আসলে কি দিয়ে তৈরি? এই পদার্থ পৃথিবীতে আসলই বা কিভাবে? পদার্থগুলো সৃষ্টি হলো কখন?

 

ইতিকথা

কেউ এখন শুনে হাসতে পারে যে, গ্রীক সভ্যতার এক বিজ্ঞানী নাকি বলেছিলেন যে পানি, কেবল পানি দিয়েই তৈরি হয়েছে আমাদের মহাবিশ্ব। এই বিজ্ঞানী ছিলেন থ্যালিস। আরো পরে অ্যারিস্টোটল বললেন – না, মাটি, পানি, বাতাস আর আগুন এ চারটি মৌলিক পদার্থ দিয়েই আমাদের বিশ্ব গঠিত। এরাই মিলেমিশে অন্য সব বস্তু তৈরি করে। আসলে এখানে হাসার কোন কারণ নেই। তারা চেষ্টা করেছিলেন চারপাশের এই জগতের বাস্তবভাবে ব্যাখ্যা দেয়ার। তবে মজার ব্যাপার, অ্যারিস্টোটলের এই ধারণাটিকে পরবর্তী প্রায় দুই হাজার বছর ধরে কেউ প্রশ্ন করেনি। তিনি নিজেও তার মতামতকে পরীক্ষা করে দেখেন নি। তার সময়ে প্রচলিত ধারণা ছিল কেবল সুক্ষ্ণ চিন্তা দিয়েই সত্যজ্ঞান লাভ করা সম্ভব। প্রায় দুইহাজার বছর পর রবার্ট বয়েল নামের এক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী অন্যভাবে ভাবলেন। তিনি বললেন যে কোন মৌলিক পদার্থকে ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা দেখতে হবে যে পদার্থকে ভাঙলে তার খুব ছোট্ট ক্ষুদ্রাংশ পাওয়া যায় কিনা। যদি ঐ ক্ষুদ্রাংশ আর মূল পদার্থ ভিন্ন হয় তাহলে পদার্থটি মৌলিক নয়। তার সময়ে (সপ্তাদশ শতাব্দী) সোনা, রূপা, তামা, টিন সহ মোট বারোটি মৌলিক পদার্থের কথা জানা গেল। এখন আমরা জানি, প্রকৃতিতে মোট বিরানব্বইটি মৌলিক পদার্থ আছে।

আমরা না হয় সন্তুষ্ট হলাম, কিন্তু মৌলিক পদার্থের ভেতরেই বা কি আছে? কেউ যদি কি লোহাকে ভাঙতে থাকে, তাহলে কি কোন একক অস্তিত্ব পাওয়া যাবে? নাকি লোহা পানির ধারার মতই নিরবচ্ছিন্ন, ভাঙতেই থাকবে আরো ক্ষুদ্রাংশে? আরেকজন গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস বলেছিলেন যে পদার্থকে ভাঙতে থাকলে একসময় ক্ষুদ্র অদৃশ্য একক পাওয়া যাবে, যাকে বলে পরমাণু। ডোমোক্রিটাসের এই তত্ত্ব তখনকার অন্য গ্রীক দার্শনিকরা নাকচ করে দিলও পরে আঠারোশ শতকে বিজ্ঞান একে গ্রহণ করে নেয়।বিরানব্বইটি মৌলিক পদার্থের রয়েছে বিরানব্বই ধরণের পরমাণু। একেক ধরণের পরমাণু নানা ভাবে একে অপরের সাথে জোড়া লেগে তৈরি করে নতুন ধরণের যৌগিক পদার্থ – যার ক্ষুদ্রাংশকে আমরা বলি অণু।যেমন হাইড্রোজেনের দুইটি পরমাণু অক্সিজেনের দুইটি অণুর সাথে রাসায়নিকভাবে জোড়া লেগে তৈরি করে এক অণু পানি।

 

কি আছে পদার্থের গহীন কোটরে

আমরা যদি পরমাণুর রাজ্যে যদি উঁকি দিতে পারি তাহলে কি দেখব? দেখব, একটি কেন্দ্র আর তার পাশে অনেকগুলো কatomণা বনবন করে এত দ্রুত ঘুরছে যে কণাগুলোকেই দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে একটি ছায়াঅঞ্চল। বুঝিয়ে বলি, ফ্যানে তো মাত্র তিনটি পাখা। ফ্যান যখন জোরে ঘোরে তখন তো আমরা ফ্যান দেখি না, দেখি একটি গোলাকার ছায়াঅঞ্চল।পরমাণুতে এই ছায়াঅঞ্চলের কণাগুলোকে বলে ইলেকট্রন, আর কেন্দ্রকে নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসে আবার দুই ধরণের কণা থাকে – প্রোটন আর নিউট্রন। আমরা যদি পরমাণুকে তুলনা করি একটি স্টেডিয়ামের সাথে তাহলে নিউক্লিয়াস হবে স্টেডিয়ামের কেন্দ্রে একটি মটরশুঁটির দানা! আরো অবাক করা ব্যাপার, এই নিউক্লিয়াসেই পরমাণুর অধিকাংশ ভর থাকে।তাহলে বোঝা যায় ইলেকট্রন কত হালকা। মজার ব্যাপার কি, আমরা বাসায় যে বিদ্যুত ব্যবহার করি তা আসলে ইলেকট্রনেরই প্রবাহ।

আমরা প্রশ্ন করেছিলাম প্রথমে আমাদের চারপাশের পদার্থ কি দিয়ে তৈরি তা জানার জন্য। এখন পেলাম ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন।আমাদের বিরানব্বইটি মৌলিক পদার্থ মূলত এই কণাগুলোকে দিয়েই তৈরি। তাই বলে ভেবনা যেন মাত্র তিনটি কণাই বিশ্বজগত তৈরি করেছে। আমাদের এই মহাবিশ্বে এই তিনটি কণা ছাড়াও আরো অনেকগুলো মৌলিক কণা আছে। কঠিন তাদের নাম – পজিট্রন, নিউট্রিনো, মিওন আরো কতো কি।এদেরকে মূলত দুইভাগে ভাগ করা হয় – ভারী কণা (হেড্রন) আর হালকা কণা (লেপ্টন)।এদেরকেও আরো ছোট কণায় ভাগ করা যায় যাদেরকে বলে কোয়ার্ক। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, বিশ্বরাজ্য অত সহজ জায়গা নয়।শুনলে হয়তো কেউ অবাক হতে পারো, আমরা যে আলোয় আমাদের দিনগুলি আলোকিত হতে দেখি তা আসলে কণা দিয়ে তৈরি! এই কনার নাম ফোটন, বা আলোক কণা।

 

ইতিকথার আগের কথা

পৃথিবীর সবচাইতে কাছের তারা কোনটি? তুমি বলবে আলফা সেঞ্চুরি। আমি বলবো না। তুমি রেগে যাবে, বলবে সাধারণ জ্ঞানের বই এনে দেখাতে পারি কিন্তু। আমি বলবো, আরে থামো বৎস, আমাদের সূর্য একটি তারা। তুমি হেসে ফেলবে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখলেন, আমাদের পৃথিবীতে যেসব মৌলিক পদার্থ আছে তা সূর্যের মাঝেও আছে। তাহলে যেসব পরমাণু দিয়ে এই পৃথিবীর মাটি-বাতাস-পানি, তুমি আমি তৈরি তার উৎস কি সূর্য? আসলেই তাই। আমাদের সৃষ্টি এই পৃথিবী থেকে। আর পৃথিবীর সৃষ্টি সূর্য হতে। আব্দুল্লাহ আল-মুতী তাঁর মহাকাশে কী ঘটছে বইতে রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে এই ঘটনার বর্ণনায় ব্যবহার করেছিলেন: ‍‌

”বলি – হে সবিতা

তোমার তেজোময় অঙ্গের সূক্ষ্ণ অগ্নিকণায় রচিত যে

আমার দেহের অণু-পরমাণু।”

আসলে সূর্য কিন্তু একটি মাঝারী তারা। এটি একটি বড় চুল্লী, এখানে উচ্চতাপমাত্রায় চারটি হাইড্রোজেন পরমাণু যুক্ত হয়ে একটি হিলিয়াম পরমাণু হয় – আর আমরা পাই আলো, তাপ, শক্তি।এছাড়াও বাকি নব্বইটি মৌলিক পদার্থও এখানে আছে। কিভাবে এই মৌলিক পদার্থগুলো তৈরি হলো তা অন্য এক মজার প্রশ্ন। এই মৌলিক পদার্থগুলো না হয় নানা রকম কণা দিয়ে তৈরি। তা এই কণাগুলো তৈরি হলো কখন? সূর্যের বুকের কণাগুলো তৈরি হলো কখন? আসলে আমাদের মহাবিশ্বের সকল কণাই তৈরি হয়েছে এক মহাবিষ্ফোরণের মাধ্যমে। এই বিশ্ফোরণকে ইংরেজিতে বলে বিগব্যাঙ। বিগব্যাঙের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের এই মহাবিশ্বের – যার অসীমতা আমরা কল্পনা করতে পারি না। সময়েরও শুরু হয়েছিলো বিগব্যাঙের মাধ্যমে। বিগব্যাঙই হলো ইতিকথার আগের কথা।

 

পূর্বে  প্রকাশিত

আমরা নিয়মিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনপ্রিয়-বিজ্ঞান ও গবেষণা-ভিত্তিক লেখালেখি করি বিজ্ঞান ব্লগে। এছাড়া আমাদের লেখকেরা বিভিন্ন সময় বিজ্ঞান-বিষয়ক বইও প্রকাশ করে থাকেন। ই-মেইলের মাধ্যমে এসব খবরা-খবর পেতে নিচের ফর্মটি ব্যবহার করুন। ।

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 76 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. bengalensis Reply

    এই ধরনের লেখাই বেশি দরকার। চালিয়ে যাও।

  2. bengalensis Reply

    “আর পৃথিবীর সৃষ্টি সূর্য হতে। ” কথাটায় গন্ডগোল আছে।

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.