পানি, যাকে জীবন বলে জানি

পৃথিবীর তিন ভাগ জল, একভাগ স্থল। এ কথাটা সেই ছোটবেলা থেকে পড়ে এসেছি। কিন্তু এতো জল এখানে এলো কি করে? প্রথম দর্শনে প্রশ্নটা হয়তো বোকার মতো মনে হবে। খিলখিল করে হেসেও দিতে পারেন। মনে হতে পারে, পৃথিবীতে পানি সবসময়েই ছিলো নাকি আসলে অন্য কোন জায়গা থেকে এসেছিলো এধরনের চিন্তা একমাত্র পাগলরাই করতে পারে। কিন্তু এরকম নিরীহদর্শন প্রশ্নগুলো মাঝে মাঝে নাকানী-চুবানী খাওয়ায়। হাওয়ার ২১ ভাগ অক্সিজেনের তলে ডুবে থাকতে থাকতে যেমন আমরা কখনোই চিন্তা করতে পারি না যে একসময় বায়ুমন্ডলে বলতে গেলে কোন অক্সিজেনই ছিলো না। আবার পৃথিবীর আদি প্রাণের উদ্ভব হয়েছিলো যে ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে তাদের যে অক্সিজেন লাগতোই না এই তথ্যট অবাক লাগতে পারে। তেমনি হয়তো অবাক হবেন জেনে যে মহাসাগর ভর্তি এতো পানি কিভাবে পৃথিবীতে এলো এই প্রশ্নটা যে অনেক বিজ্ঞানীর মাথা কুঁড়ে খেয়েছে।

আমাদের সৌরজগতে গ্রহের সংখ্যা বর্তমানে আটটি। এদের সবার মধ্যে পৃথিবী ভিন্ন অন্তত দুইটি কারণে। প্রথমত, পৃথিবীতে বৈচিত্র্যময় প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। দ্বিতীয়ত, একমাত্র পৃথিবীতেই তরল পানি ব্যাপক পরিমাণে পাওয়া যায়। এমনিতে মহাবিশ্বে পানি খুব একটা বিরল কোন পদার্থ নয়। গ্যালাক্সীর দূরতম প্রান্তের বিভিন্ন নেবুলাতে ব্যাপক পরিমাণে পানি পাওয়া গেছে। সে হিসেবে পৃথিবীতে কিভাবে এতো পানি এলো তা বিজ্ঞানীদের জন্য এতো কঠিন প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়। কিন্তু ঘটনা ঠিক তাই। কেউই ঠিকমতো জানে না পৃথিবীতে কিভাবে মহাসাগর ভর্তি পানি এলো।

 

‘জলের মতো সহজ’

আমরা প্রায়ই বলি অংকটা জলের মতো সহজ । অংক কষা সহজ হলেও জল কিন্তু এতো সহজ জিনিস নয়। মহাসাগরে এতো জল কিভাবে এলো তার জন্য অন্তত চার রকমের জলদ-গম্ভীর ব্যাখ্যা আছে। মহাকাশ থেকে আমাদের পৃথিবীটাকে নীলাভ রঙে সৌম্যময় লাগে দেখতে। পৃথিবী শিশুকালে কিন্তু এরকম নীলাভ ছিলো না। তখন পৃথিবী ছিলো গনগনে একটা আগুনে গোলা। পৃথিবীর শৈশবে অজস্র গ্রহাণু এবং উল্কাপিন্ড ধরাধামে পতিত হয়েছিলো। একটি তত্ত্ব বলে যে তাদের অনেকেই ছিলো জলপূর্ণ, আদি পৃথিবীতে এতো জল এনেছিলো সেসব গ্রহাণু এবং উল্কাপিন্ডরা।

অন্য একটি তত্ত্বে বলা হয় ভূত্বকের নিচে বিভিন্ন শিলাতে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন অটকা পড়ে ছিলো। অক্সিজেন ছিলো অক্সাইড আকারে। এই তত্ত্ব মতে শিলার মধ্যে আটক অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন রাসায়নিক বিক্রিয়া করে পানি গঠন করে। এ পানি পরবর্তীতে আগ্নেয়গিরির বিষ্ফোরণের সাথে সাথে বাষ্প আকারে বের হয়ে আসে। পরে এই বাষ্প বৃষ্টি আকারে পতিত হয়ে তৈরি করে সাগর-মহাসাগর। একটা সাম্প্রতিক তত্ত্বে বলা হয় এতো পানির উৎস আসলে পৃথিবী জন্মের সময় থেকেই। এই সৌরজগতে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ গঠিত হয় এক বিশাল মহাজাগতিক ধূলি-পূঞ্জ থেকে। জলকণারা এই ধূলিদের সাথে যুক্ত হয়ে একেকটা গ্রহ তৈরিতে অংশ নেয়। সেখান থেকেই নাকি এতো জলের উদ্ভব।

আরেকটা উল্লেখযোগ্য তত্ত্ব হলো যে পানি এসেছে মূলত ধূমকেতু থেকে। ধূমকেতুকে বিভিন্ন সময় ঝাড়ুর সাথে তুলনা দেয়া হয়েছে। কারণ ধূমকেতুর একটি লেজ থাকে যা কিনা দেখতে অনেকটা ঝাড়ুর মতো। আসলে এই লেজটি জলীয়বাষ্পের ও ধূলির ধারা ছাড়া কিছু নয়। ধূমকেতুর মূল অংশটি হলো তার নিউক্লিয়াস, যা থেকে এই জলীয়বাষ্প আসে। ধূমকেতুর মূল নিউক্লিয়াসের অন্যতম উপাদান হলো বরফ। একেকটা ধূমকেতু সাগর পরিমাণ পানি ধারণ করতে পারে। তাই ধূমকেতু থেকে পৃথিবীর জল আসার মতবাদটি অত্যন্ত অাকর্ষণীয়। কিন্তু এই তত্ত্বটিতে একটি বড় সমস্যা ছিলো। তা হলো পৃথিবীর জল আর ধূমকেতুর জলের রাসায়নিক ভিন্নতা। মহাসাগরের জল যদি ধূমকেতু থেকেই আসে তাহলে রাসয়নিক ভাবে দুই জলই এক হওয়ার কথা। কিন্তু ২০১১ সালের আগ পর্যন্ত দেখা গেছে যে ধূমকেতুর জল পৃথিবীর জল থেকে রাসায়নিকভাবে ভিন্ন। কিন্তু রাসায়নিক ভাবে জলের ভিন্নতার মানে আসলে কি?

ভারী জল

সব পানি সমান নয়। কারণ সব হাইড্রোজেন এক না। এখানে চলে আসে আইসোটোপের কথা। হাইড্রোজেন সবচাইতে সরলতম পরমাণু। কি আছে এতে? একটি প্রোটনের চারপাশে বনবন করে ঘুরছে একটি মাত্র ইলেকট্রন। কিন্তু কোন কোন হাইড্রোজেনের ভেতরের ঘটনা একটু ভিন্ন। তাদের ক্ষেত্রে ইলেকট্রন ঘুরছে, তবে একটা প্রোটনের সাথে সাথে একটা নিউট্রনও রয়েছে কেন্দ্রে। সাধারণ হাইড্রোজেনের তুলনায় এদের পারমাণবিক ভর দ্বিগুণ। এই ভারী হাইড্রোজেন আসলে হলো হাইড্রোজেনেরই একটি আইসোটোপ। বেশ রাশভরী নাম এই আইসোটোপের – ডিউটোরিয়াম। সাধারণ জল হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন দিয়ে তৈরি। ডিউটোরিয়াম অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে যে জল তৈরি করে তাকে বলা হয় ভারী জল। ডিউটোরিয়াম জল, সাধারণ জলের চেয়ে দশ শতাংশ ভারী। দেখা গেছে, সমুদ্রের মাঝে প্রতি ৩২০০ পানির অণুর মাঝে একটি হলো ভারী জল। তারমানে পৃথিবীর জল যেখান থেকেই আসুক না কেন, সেখানেও ভারী জল একই অনুপাতে থাকবে। যেসব তত্ত্ব বলছে যে পৃথিবীর পানি বাইরে থেকে এসেছে, তাদের এই অনুপাতের একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, গ্রহাণু এবং কোন কোন উল্কা এই নির্দিষ্ট অনুপাতের ভারি জল বহন করে।

১৯৮০ সালের আগ পর্যন্ত ধূমকেতু তত্ত্ব পৃথিবীতে জলের আবির্ভাবের জন্য বেশ আশানুরূপ ছিলো। কারণ ১৯৮০ সালের আগ পর্যন্ত ধূমকেতুর সঠিক রসায়ন জানা ছিলো না বিজ্ঞানীদের। যখন হ্যালীর ধূমকেতু এবং হায়াকুতাকি ধূমকেতুর রাসায়নিক গঠন প্রথম মাপা হলো, দেখা গেল সেখানে ভারী পানির অনুপাত পৃথিবীর ভারী পানির অনুপাতের চাইতে বেশি। তার মানে, ‘হ্যালীর মতো’ ধূমকেতু সম্ভবত কখনোই সমুদ্রের জলের উৎস হতে পারবে না। পৃথিবীতে জল আবির্ভাবের ধূমকেতু তত্ত্ব খুব একটা টেকসই বলে মনে হচ্ছিলো না সে সময়টাতে।

হার্টলি ২ ধূমকেতুর চিত্র, ছবিটি তুলেছে নাসা

অবশ্য বিজ্ঞানীরা হাল ছেড়ে দেন নি। ২০০০ সালে লিনিয়ার নামের এক ধূমকেতু সূর্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় ভেঙে যায়। তখন বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ করেন, পরিমাপ নেন। যদিও তারা ডিউটোরিয়াম সরাসরি মাপেন নি, কিন্তু অন্যান্য পর্যবেক্ষণ তাদের বলছিলো লিনিয়ারে ঠিক পৃথিবীর অনুপাতেই ভারী জল রয়েছে। আরো দশ বছর পর ২০১১ সালে হার্শেল মহাকাশ স্টেশনের একদল আন্তর্জাতিক গবেষক হার্টলি ২ ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পারেন ধূমকেতুটি সমুদ্র-পরিমাণ পানি ধারণ করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এখানে ঠিক পৃথিবীর অনুপাতেই ভারী জল রয়েছে।

মনে করা হয়, হার্টলি ২ ধূমকেতুর উৎপত্তিস্থল কাইপার বেল্ট। কাইপার বেল্ট নেপচুন গ্রহের কক্ষপথের ঠিক পরেই অবস্থিত। সূর্য ও বৃহস্পতিগ্রহের আকর্ষণে হার্টলি ২ বৃহস্পতিগ্রহ অঞ্চলে চলে অাসে বলে ধূমকেতুটিকে বৃহস্পতি-পরিবারের ধূমকেতু হিসেবে ধরা হয়। হ্যালী এবং হায়াকুতাকি ধূমকেতুর উৎপত্তিস্থল কাইপার বেল্ট নয়, এজন্য তাদের পানির রসায়ন ভিন্ন।

বিজ্ঞানীরা অপেক্ষায় আছেন কাইপার বেল্ট অঞ্চল থেকে নতুন ধূমকেতুর প্রতীক্ষায়। যদি নতুন ধূমকেতুর পানির রসায়ন পৃথিবীর পানির রসায়নের অনুরূপ হয়, তবে সমুদ্রের জলের ধূমকেতু-কেন্দ্রীক উদ্ভব তত্ত্বটি শক্ত ভিত্তি পাবে। তবে খুব সম্ভবত একাধিক প্রক্রিয়াতে পৃথিবীতে জলের উদ্ভব হয়েছে। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ মতে, ধূমকেতু এই জলের উদ্ভবে বেশ ভালো পরিমাণ অবদান রেখেছে।

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, ধূমকেতুর উৎপত্তি হয় কিভাবে? কুইপার বেল্ট সহ ভিন্ন অঞ্চলে উৎপত্তির জন্য তাদের রসায়ন বদলে যায় কেন? সে এক মজার গল্প। সেই গল্পটা না হয় তোলা থাকুক আরেক বাদল দিনের জন্যে।

তথ্যসূত্র: http://earthsky.org/space/did-comets-bring-water-to-earth

আমরা নিয়মিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনপ্রিয়-বিজ্ঞান ও গবেষণা-ভিত্তিক লেখালেখি করি বিজ্ঞান ব্লগে। এছাড়া আমাদের লেখকেরা বিভিন্ন সময় বিজ্ঞান-বিষয়ক বইও প্রকাশ করে থাকেন। ই-মেইলের মাধ্যমে এসব খবরা-খবর পেতে নিচের ফর্মটি ব্যবহার করুন। ।

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 76 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

    কত আগে লেখাটা লিখেছিলেন। ১৩ এর জুনে। আজকের দিনে রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগছে। ভাল জিনিস কখনো মরে না। 🙂 । কোনো এক কারণে ঢাকায় অবস্থান করছিলাম, ম্যাগাজিন তো সাথে নেই। অনলাইনে প্রকাশিত থাকাতে দরকারের সময় পেয়ে গেলাম।

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.