[যুগ্ম-লেখক: অারাফাত রহমান]

 

তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা।
ওই যে সুদূর নীহারিকা

যারা করিয়াছে ভীড়, আকাশেরো নীড়
ওই যারা দিনরাত্রি
আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী

(তুমি কি কেবলই ছবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

 

বিবর্তনের সাথে সাথে মস্তিষ্ক বিকাশের এক পর্যায়ে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে মানুষ বিস্মিত হয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে রাতের আকাশে উজ্জ্বল বস্তুনিচয়দের মানুষ পর্যবেক্ষণ করেছে, তারার মানচিত্র রচনা করেছে। এই চিরচেনা নক্ষত্রদের মাঝে হঠাৎ করে উদয় হওয়া বাউন্ডেলে ধূমকেতুগুলোকে খেয়াল করেছে তারা সচকিত হয়ে। সেই অতীত পর্যবেক্ষকরা জানতো না ধূমকেতু আসলে কি, কোথা থেকেই বা তারা আসে, আর তারা দেখতে কেনই বা ধোঁয়াশা ঝাড়ুর মতো । অনেক সময় ধূমকেতুদের মাঝে অতীত মানুষেরা খুঁজতে চেয়েছে ঐশ্বরিক অলৌকিক ইঙ্গিত, যুদ্ধ, বিগ্রহ, মহামারীর সংকেত। এরই একটা উদাহরণ হচ্ছে নিচের ছবিটা।

 

 

১০৬৬ সনে রাজা উইলিয়াম ইংল্যান্ড আক্রমণ করে। ঐ সময়েই আকাশে একটি ধূমকেতুর উদয় হয়। এই ধূমকেতুকে উইলিয়াম তার জয়ের ভাবীকথন বলে ধরে নেন। যুদ্ধে উইলিয়াম রাজা হ্যরল্ডকে হারিয়ে দেয়। এই ঘটনাটাই বেয়ু ট্যাপেস্ট্রি (Bayeux tapestry) নামে ভারি পর্দার ওপর সূঁচের কাজে বর্ণিত হয়েছে। ট্যাপেস্ট্রির ঠিক মাঝখানে, উপরে ধূমকেতুটিকে অনেকটা জাহাজের মাস্তুলের মত আঁকা হয়েছে। লেজটাকে ঝালরের মত লাগছে।

মানুষ শুধুমাত্র অলৌকিক উপাখ্যন দিয়ে হাতপা গুটিয়ে বসে থাকে নি । সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে যখন মানুষ যখন বিজ্ঞানের বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে শুরু করল, বদলে গেল দৃশ্যপট। ধূমকেতু সম্পর্কে নানা পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ভেদ করা শুরু করলেন নানা রহস্য।

কিন্তু মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানচর্চা গ্রীক মনীষী অ্যারিস্টোটলের চিন্তা চেতনায় প্রভান্বিত ছিল ভীষণভাবে। অ্যারিস্টোটল ভেবেছিলেন যেহেতু ধূমকেতুরা সব সময় গ্রহদের মত সূর্যপথ বা ecliptic-এর ওপর ভ্রমণ করে না, সেই জন্য ধূমকেতুরা গ্রহের মত নয়, বরং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপরের দিকের একটি ঘটনা। অবশেষে ষোড়শ শতাব্দীতে, যখন টিকো ব্রাহে, প্যারালাক্স পদ্ধতির মাধ্যমে দেখালেন যে ধূমকেতুরা চাঁদের দূরত্বের বাইরে অবস্থিত। কিন্তু শুনলে আশ্চর্য হবেন এমন কি বিচক্ষণ গ্যালিলিও, যাঁর কাজ কিনা কোপেরনিকাসের সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছে, ব্রাহের প্রমাণের পরও অ্যারিস্টোটলের মতই ধূমকেতুকে বায়ুমণ্ডলের ঘটনা হিসেবে ভেবেছেন।

১৬৮৭ সনে আইজাক নিউটন তাঁর বিখ্যাত প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমাটিকা বইটি বের করলেন। এই বইতে নিউটন দেখালেন যে মহাকর্ষের ব্যস্তানুপাতিক বর্গের সূত্র মেনে চলা বস্তুসমূহ সূর্যকে হয় উপবৃত্ত (ellipse), প্যারাবোলা বা হাইপারবোলা আকারের কক্ষপথে ভ্রমণ করবে। ১৭০৫ সনে নিউটনের বন্ধু এডমণ্ড হ্যালি ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে এমন একটি ধূমকেতু আবিষ্কার করলেন যেটাকে মনে হল প্রতি ৭৫ থেকে ৭৬ বছরে সূর্যের কাছাকাছি আসে। হ্যালি বললেন এই ধূমকেতুটি আবার ১৭৫৮/১৭৫৯ সনের দিকে দেখা যাবে, তাঁর ভাবীকথন সফল হয়েছিল।

অনেক ধূমকেতু পর্যবেক্ষক প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন ধূমকেতু যে বরফ দিয়ে তৈরি সূর্যের কাছাকাছি এলে সেটা বাষ্পে পরিণত হয়। কাজেই কোন ধূমকেতুর লক্ষ লক্ষ বার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার কথা নয়, তার আগেই সমস্ত বরফ ও ধূলা নিঃশেষ হয়ে যাবার কথা। ১৯৫০ সনে ওলন্দাজ বিজ্ঞানী ইয়ান ভান ওর্ট প্রস্তাব করলেন যে পৃথিবী থেকে আমরা যেসব ধূমকেতু দেখি এরা সবাই মূল সৌরজগতের বাইরে থেকে আসছে । সৌরজগতের বাইরে ধূমকেতুরা এক বিশাল মেঘাঞ্চল গঠন করছে । তিনি বললেন এই মেঘে রয়েছে সম্ভবত এক লক্ষ কোটি ধূমকেতু। তবে এস্টোনিয়ার জ্যোতির্বিদ আর্নস্ট এপিক সেই ১৯৩২ সনেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে দীর্ঘমেয়াদী পর্যায়ের ধূমকেতুরা সৌর জগতের সুদূর সীমানায় বেশীর ভাগ সময় কাটায়।

এই ধূমকেতু অঞ্চলের দূরত্ব, আধুনিক হিসেব মতে, সূর্য থেকে এক লক্ষ জ্যোতির্বিদ্যার এককের (এস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট) বেশীও হতে পারে । পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ধরা হয় এক জ্যোতির্বিদ্যা একক (A.U.)। সূর্য থেকে প্লুটোর দূরত্ব মাত্র ৪০ এ.ইউ.। এই তুলনা থেকে বোঝা যায় ওর্টের মেঘাঞ্চল আসলে কতটা দূরে। আরো মজার কথা, ওর্ট মেঘাঞ্চলের শেষ সীমানা থেকে সূর্যের নিকটতম নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টুরি খুব একটা দূরে নয়, ঐ তারাটির দূরত্ব আমাদের থেকে ২,৭৪,০০০ AU। নিচের ছবিটা থেকে সৌর জগৎ, ওর্টের মেঘ ও প্রক্সিমা সেন্টাউরির অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায়।

 

 

ছবি: ওর্টের মেঘাঞ্চল। সূত্র http://cse.ssl.berkeley.edu/segwayed/lessons/cometstale/frame_origins.html

 

পাশাপাশি ওর্ট মেঘাঞ্চল ছাড়াও ২,০০০ থেকে ২০,০০০ জ্যোতির্বিদ্যার একক দূরত্বে হিলের মেঘ নামে আর একটি ধূমকেতুর এলাকা আছে বলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। এর আকারটি অনেকটা ডোনাটের মত ধরা হয়। এই অঞ্চল থেকে ওর্ট এলাকায় ধূমকেতু সরাবরাহ করা হয় বলেও ধারণা করা হচ্ছে। হিলের ধূমকেতুর অঞ্চলকে আভ্যন্তরীণ ওর্ট মেঘাঞ্চলও বলা হয়।

ওর্ট অঞ্চলের ছোট গ্রহাণু বা ধূমকেতুর সংখ্যা নিরূপণ করা একটা কঠিন কাজ। যদিও বড় বড় টুকরোগুলোর সংখ্যা এক ট্রিলিয়ন (১০ সূচক ১২) ছাড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু তাদের সমগ্র ভর কয়েকটি পৃথিবীর সমান মাত্র হবে। হিল অঞ্চলের ধূমকেতুর সংখ্যা সম্পর্কে এখনো আমাদের ধারণা অস্পষ্ট।

তার মানে ধূমকেতুরা অনেক দূর থেকে সূর্যের কাছে ভ্রমণ করতে আসে । আসলেই কি ধূমকেতুরা সৌরজগতের বাইরের কোন অনাহুত আগুন্তক? নাকি ওরা সৌরজগতেরই ছিটকে পড়া কোন অংশ, আমাদেরই দূর সম্পর্কের আত্মীয়?

ধূমকেতুরা কিভাবে তৈরি হলো এই প্রশ্নের সাথে জড়িয়ে আছে ওর্টের মেঘাঞ্চলের ইতিহাস। আমাদের এই প্রিয় সৌরজগত কিভাবে তৈরি হল তা জানতে পারলে ভেদ করা যাবে ওর্ট মেঘাঞ্চল ও ধূমকেতু রহস্য।

 

 

ছবি: সৌরজগত গঠনের নীহারিকা অনুকল্প। সূত্র http://abyss.uoregon.edu/~js/ast121/lectures/lec24.html

 

সৌরনীহারিকা অনুকল্প

সূর্য ও তার গ্রহগুলো নিয়ে সৌরজগত তৈরি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে । অধিকাংশ বিজ্ঞানী মনে করেন এই সৌরজগত তৈরি হয়েছিল চরকির মতো ঘুরতে থাকা একটি নীহারিকা থেকে। সেই প্রারম্ভিক সৌরনীহারিকায় ছিলো গ্যাস ও ধূলির সমাহার । এই আদিম গ্যাস পরমাণু ও অণুসমূহের মধ্যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজ করে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই । তাই গ্যাসীয় ঘূর্ণনের সাথে সাথে নীহারিকার কেন্দ্রে ধূলো ও গ্যাস পরস্পর আকর্ষণে ক্রমেই জড়ো হতে থাকে । জড়ো হওয়ার সময় নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিও বাড়তে থাকে। এই ভীড়ের মাঝে পরস্পর ধাক্কা লেগে কারণে তারা ক্রমাগত উত্তপ্ত হয় । মাধ্যাকর্ষণের ফলে গ্যাসীয় অণুগুলোর কেন্দ্রে জড়ো হওয়া আর নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি এই দুইটি প্রক্রিয়ার টানাপোড়নে নীহারিকার কেন্দ্রে আবশেষে গঠিত হয় আমাদের সূর্য ।

প্রারম্ভিক সৌরনীহারিকার সকল গ্যাস সূর্য গঠনে অংশ নেয় নি । সেই বাকি গ্যাসেরা চাকতির মতো একটা তলে ঘুরতে থাকে সূর্যের চারপাশে । এই চাকতির বিভিন্ন স্থানে মাধ্যাকর্ষণের ফলে ছোট ছোট ঘন অঞ্চল তৈরি হয়, যারা পরবর্তীতে জমে গিয়ে মোটামুটি এক কিলোমিটার ব্যাসের সৌরবস্তু তৈরি করে। এদেরকে বলা হয় ক্ষুদ্র গ্রহাণু বা প্লানেটেসিম্যাল (planetesimals)। কি করে গ্যাস ও ধূলিকণা একত্রিত হয়ে এই গ্রহাণু সৃষ্টি করে সেটা পুরোপুরি বোঝা না গেলেও প্রথমে তড়িতআধারের (Electrical charge) আকর্ষণ কাজ করে বলে মনে হয়।

 

 

চিত্র: নীহারিকা থেকে যেভাবে সৌরজগত গঠিত হলো। সূত্র: http://www.sos.siena.edu/~jcummings/teaching/astronomy/

 

উপরের ছবিটা দেখলে পরিস্কার হবে কী করে এই ক্ষুদ্র গ্রহাণুগুলো বিভিন্ন গ্রহ তৈরি করে। বলতে গেলে, গ্রহ তৈরির ইট হিসেবে কাজ করেছিলো এরা । কিছু কিছু গ্রহাণু সূর্যের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে পরস্পর ধাক্কা লেগে যুক্ত হয়ে যায় । এভাবেই গড়ে উঠে বিভিন্ন গ্রহ । একেকটা গ্রহের ব্যাস কয়েক হাজার কিলোমিটার হয়ে থাকে ।

সব ক্ষুদ্র গ্রহাণু কিন্তু গ্রহ গঠনে অংশ নেয় নি । এখানেই লুকিয়ে আছে ওর্টের মেঘাঞ্চল গঠনের রহস্য । গ্রহ গঠনে অনিচ্ছুক এই গ্রহাণুরা প্রথম দিকে নিজেদের মতো করে সূর্যের চারদিকে ঘুরছিলো । কিন্তু বৃহস্পতির মতো বড়োসড়ো কোন গ্রহের আসেপাশে এলেই তারা আর নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারলো না । বড়ো গ্রহরা তাদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দিয়ে এমন টান দিল যে এই ক্ষুদ্র গ্রহাণুরা তাদের নিজস্ব কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ল । নিজেদের আগের কক্ষপথ থেকে ছিটকে তারা নতুন রাস্তায় ঘোরা শুরু করল । এদের মধ্যে কোন কোন গ্রহাণু এমন রাস্তাতেই গেলো যে তারা আর আমাদের সৌরজগতে ফিরে এল না । কেউ কেউ অন্য গ্রহ বা উপগ্রহের সাথে ধাক্কা খেল । বিভিন্ন গ্রহে আমরা বড় বড় যেসব খাদ দেখি টেলিস্কোপ দিয়ে, সেগুলো সম্ভবত এই ধাক্কারই নিদর্শন । সূর্যের চারদিকে যেই তল বরাবর আটটি গ্রহ ঘুরছে, বাকি ক্ষুদ্র গ্রহাণুরাও সেই তলটি ছেড়ে চলে গেল । সেই তলটি ছেড়ে গেলেও তারা সৌরজগতকে ভোলে নি ডিম্বাকার কক্ষপথে ঘুরছে । এই কক্ষপথের এক প্রান্তে বা একটি ফোকাসে আছে সূর্য । এই প্লানেটেসিম্যালেরাই বা ক্ষুদ্র গ্রহাণুরাই গড়ে তুলেছে ওর্টের মেঘাঞ্চল – ধূমকেতুর এক বিশাল ভীড় সেখানে।

তবে বিজ্ঞান থেমে থাকে না । নতুন গবেষণা বলছে ওর্ট মেঘের উৎপত্তির ঘটনা হয়তো আরো চমক্প্রদ। প্রাকসৌরীয় মেঘ থেকে শুধু সূর্যের জন্ম হয় নি, আরো হয়তো কয়েকশো তারার জন্ম হয়েছিল। সেই সব তারারা একে অপরের কাছে ছিল এবং তাদের চারদিকের সমস্ত গ্রহাণু, ক্ষুদ্র গ্রহাণু ও গ্যাস তারা একে অপরের সাথে ভাগ করে নিয়েছিল। তাই ওর্ট অঞ্চলের অনেক ছোট গ্রহাণু ও ধূমকেতুদের উৎসই অন্য নক্ষত্র হতে পারে।

 

কাইপার বেল্ট

সব ধূমকেতু যে ওর্ট মেঘাঞ্চল থেকে আসে এমন না । বরং বেশির ভাগ ধূমকেতুই আসে নেপচুন পার হয়ে একটা মোটামুটি কাছের অঞ্চল থেকে । কিছুদিন আগে পর্যন্তও ধারণা ছিল এটি হচ্ছে কাইপার বেল্ট অঞ্চল, যা কিনা ৩০ থেকে ৫০ জ্যোতির্বিদ্যা একক পর্যন্ত বিস্তৃত। কাইপার বেল্টকে পেতে হলে পার হতে হবে ইউরেনাস ও নেপচুনের কক্ষপথ। বামন গ্রহ প্লুটো, হাউমিয়া ও মাকিমাকি এই এলাকার বাসিন্দা। ধারণা করা হচ্ছে যে কাইপার বেল্টে এক লক্ষের মত ১০০ কিলোমিটার ব্যাসের অধিক আকারের গ্রহাণু আছে। কিন্তু কাইপার বেল্টের সঙ্গে বিক্ষিপ্ত চাকতি বা ডিস্ক (scattered disk) বলে একটা অঞ্চলকে বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছেন। কাইপার বেল্টের বস্তুসমূহ মোটামুটি যেখানে স্থিত ভাবে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, বিক্ষিপ্ত চাকতির বস্তুরা নেপচুন গ্রহের অভিকর্ষের ফলে সৌর মণ্ডলের অভ্যন্তরে নিক্ষিপ্ত হয় ধূমকেতু হিসেবে। আর এই চাকতির বস্তুদের উৎকেন্দ্রিকতা (eccentricity) কাইপার বেল্টের বস্তুদের থেকে অনেক বেশী।

 

চিত্র: কাইপার বেল্টে রয়েছে অজস্র ধূমকেতু। সূত্র http://cse.ssl.berkeley.edu/segwayed/lessons/cometstale/frame_origins.html

 


কেন
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এতো ধূমকেতু
পাগল হন?
বিক্ষিপ্ত চাকতি, কাইপার বেল্ট, হিলের বেল্ট এবং ওর্টের মেঘাঞ্চলের সকল ধূমকেতুই আমাদের সৌরজগতের অংশ । আমাদের নিজস্ব নক্ষত্র সূর্যের চারপাশে ওরা ঘুরপাক খেয়ে থাকে । তারা বিভিন্ন গ্রহউপগ্রহের মতো একই গতিসূত্র অনুসরণ করছে । কিন্তু এসব ধূমকেতুর মধ্যে খুব অল্প কয়েকটিকেই আমরা দেখতে পাই ।

ধূমকেতুরা বেশ দুর্লভ বলেই কি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এতো অধীর আগ্রহের অপেক্ষা করে থাকেন তাদের দেখা পাওয়ার জন্য? তা তো অবশ্যই। ধূমকেতু পৃথিবীর আসেপাশে চলে আসলে বিজ্ঞানীরা মহাকাশযান পাঠাতে পারেন কাছ থেকে ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করার জন্য। এছাড়াও বিজ্ঞানীরা এমনসব কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করতে চলেছেন যারা ধূমকেতুর কাছে গিয়ে নমুনা যোগাড় করে আবার পৃথিবীতে নিয়ে আসবে। কিন্তু কেন বিজ্ঞানীরা ধূমকেতু নিয়ে এতো আগ্রহী?

প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে পৃথিবীর জন্ম । তখন পৃথিবী অনেক উত্তপ্ত ছিল । এরপর পৃথিবী অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ঠান্ডা হয়েছে পৃথিবী, ভূমি ও সাগর তৈরি হয়েছে, হয়েছে প্রাণের বিকাশ, বরফযুগ এসেছে, ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়েছে এরকম নানান পরিবর্তন হয়েছে। যেসব আদিম বস্তু দিয়ে পৃথিবী তৈরি, ধূমকেতুরাও ঠিক একই উপাদানেই তৈরি । কিন্তু ধূমকেতুরা বেশিরভাগ সময় সূর্য থেকে বেশ দূরে ছিলো । তাই তারা সময়ের সাথে সাথে খুব একটা পরিবর্তিত হয় নি । এ কারণে একটা ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করা মানে অনেকটা লক্ষকোটি বছর আগের একটুকরো পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করার মতোই। পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ, ডিএনএর আবির্ভাব, জলভর্তি সাগর গঠনের সাথে ধূমকেতুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার বেশ ভালো সম্ভাবনা রয়েছে । যে সৌরনীহারিকা থেকে আমাদের সৌরজগতের উৎপত্তি, সেই নীহারিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে এইসব ধূমকেতুরা । তাই ধূমকেতু পর্যবেক্ষণের জন্যে বিজ্ঞানীদের এতো তোড়জোড়। এ যেন সেই শৈশবের প্রশ্নোত্তর খোঁজার কৌতুহল।

খোকা মাকে শুধায় ডেকে
এলেম আমি কোথা থেকে,
কোন্খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে।

(
জন্মকথা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

আমরা নিয়মিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনপ্রিয়-বিজ্ঞান ও গবেষণা-ভিত্তিক লেখালেখি করি বিজ্ঞান ব্লগে। এছাড়া আমাদের লেখকেরা বিভিন্ন সময় বিজ্ঞান-বিষয়ক বইও প্রকাশ করে থাকেন। ই-মেইলের মাধ্যমে এসব খবরা-খবর পেতে নিচের ফর্মটি ব্যবহার করুন। ।

লিখেছেন দীপেন ভট্টাচার্য

বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানকল্পকাহিনীকার।

দীপেন ভট্টাচার্য বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 14 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.