স্বপ্নের কি কোন মানে আছে?

Share
   

স্বপ্ন-অভিধান

সবাই স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন। ঘুমে দেখা স্বপ্ন জেগে উঠে খুব অর্থবোধক বলে মনে হয়। স্বপ্ন কেন দেখি? স্বপ্নের কি কোন মানে আছে? পৃথিবীর প্রতিটি সংস্কৃতিতেই এই প্রশ্নের উত্তরে বিস্তৃত ভাবনা খুঁজে পাওয়া যাবে। অনেকেই খোয়াবনামা বইটি দেখেছেন। খোয়াবনামাকে বলা যেতে পারে স্বপ্ন অভিধান যেখানে প্রতিটি স্বপ্ন দৃশ্যর রূপকঅর্থ বলে দেয়া আছে। অনেক সময় স্বপ্নকে দেখা হয়েছে ঐশ্বরিক বার্তা হিসেবে। খ্রিষ্টীয় বাইবেল, মুসলমানদের কুরআন আর হিন্দু-বৌদ্ধদের পুরাণে স্বপ্নের মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বানীর কথা পাওয়া যায় । কোন কোন প্রাচীন গোষ্ঠী ভাবতো যে ঘুমের সময় আত্মা দেহ থেকে বের হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায় – যে ভ্রমণকাহিনী আমরা স্বপ্ন হিসেবে দেখি। যদি ধরা হয় স্বপ্ন গভীর তাৎপর্যপূর্ণ, তাহলে মনে হবে স্বপ্ন অতীত স্মৃতি আর চিন্তা-দুশ্চিন্তার সরাসরি অনুবাদ। কিংবা এটাও মনে হতে পারে, স্বপ্ন আসলে রূপক-মন্ডিত একটি ছায়াছবি, যেখানে বিভিন্ন দৃশ্যকল্পে গোপন ইঙ্গিত লুকায়িত থাকে, এসব রূপকের আলাদা ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে আদিম মিশরে স্বপ্ন বিশ্লেষণের জন্য অনেকগুলো মন্দির ছিলো। সেখানে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুরোহিতরা থাকতো স্বপ্নের মানে বলে দেয়ার জন্য। তখনকার পান্ডুলিপি থেকে স্বপ্নের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে জানা যায়। বেশিরভাগ স্বপ্নকেই তারা ভবিষ্যদ্বানী বলে ভাবতো। উদাহরণ — স্বপ্নে যদি কাক দেখেন তাহলে কোন প্রিয়জনের মৃত্য সামনে ঘটবে।

The American Dream in Dali`s Painting | Dali paintings, Salvador dali  paintings, Dali art
সালভাদর ডালির চিত্রকর্ম।

মিশরীয়দের বহু বছর পর মনোবিশ্লেষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড স্বপ্ন বিশ্লেষণের জন্য একটি তত্ত্ব প্রণয়ন করেন। ‘The Interpretation of Dreams’ বইটিতে এই তত্ত্বটির ব্যাখ্যা দেন তিনি। ফ্রয়েডের মতে স্বপ্ন উৎসরিত হয় মানুষের অবদমিত কামনা হতে।  সারাদিন যেসব যৌন কিংবা আক্রমনাত্মক কামনা সচেতন মন দমিয়ে রাখে, সেগুলোই স্বপ্নে দেখা দেয়। এই অবদমিত কামনা যদি সরাসরি স্বপ্নে দেখা দেয় তাহলে ঘুমন্ত ব্যক্তি হয়তো জেগে উঠবেন। তাই সরাসরি না এসে অবচেতন কামনারা বিভিন্ন প্রতীক বা রূপকের ছদ্মবেশে স্বপ্নে চলে আসে। ফ্রয়েড মনে করতেন, আকাশে উড়ার স্বপ্নের মানে হলো বিপথগামী যৌন কামনা। আর পুরুষের স্বপ্নে দাঁত পড়ে যাওয়ার মানে হলো তার মনে পৌরষত্বহীনতার ভয় কাজ করছে (অবশ্য এই স্বপ্ন মহিলারা দেখলে কি ব্যাখ্যা হবে সেটা তেমন পরিস্কার না)। আদিম মিশরীয় আর ফ্রয়েড-পরবর্তী মনোবিশ্লেষণে স্বপ্নের ব্যাখ্যাদান-পদ্ধতির মাঝে যে তেমন অমিল  নেই। যদিও এ দুইটি ধারার উদ্দেশ্য ভিন্ন – মিশরীয়রা চাইতো ভবিষ্যত সম্পর্কে জানতে। আর ফ্রয়েডিয় স্বপ্ন-বিশ্লেষণের লক্ষ্য অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন ঘটনা ও কর্মপ্রেরণার উপর আলো ফেলা। উভয়ই স্বপ্ন-বিশ্লেষণের জন্য রূপক-অভিধানের উপর খুব বেশি নির্ভরশীল।

স্বপ্ন দেখে যেগে ওঠার পর যে সেটাকে অর্থবহ ও রূপক দিয়ে ভরা বলে মনে হবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তাই স্বপ্ন ব্যাখায় খোয়াবনামা ধরনের বই বিশ্বজুড়ে প্রতি বছরই প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়। স্বপ্ন বিশ্লেষণের এই রূপক-অভিধান ধারাটি বিশ্বের প্রায় সব সংস্কৃতিতেই দেখা গেলেও এটা সবাই মেনে নেন না। এই না-মানা ব্যক্তিদের মধ্যে স্নায়ুবিজ্ঞানীদের সংখ্যাই বেশি, যারা উল্টো মনে করেন স্বপ্নের আসলে কোন মানেই নেই। তাঁদের মতে স্বপ্ন হলো মগজে স্মৃতি-সংরক্ষণের মতো অন্যসব গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার উপজাত মাত্র। স্বপ্ন হলো ধোঁয়া, আগুন নয়। চলুন স্নায়ুবিজ্ঞানীদের চোখ দিয়ে স্বপ্নের বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করা যাক। প্রথমে আমরা দেখবো যে মস্তিষ্কে বিভিন্ন ছাঁচের কার্যক্রম হতে কিভাবে স্বপ্ন তৈরি হওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। তারপর আমরা স্বপ্নের সাম্ভাব্য কাজ কি হতে পারে তা নিয়ে কথা বলবো। শেষে আমরা স্বপ্নের বিষয়বস্তুর কি কোন মানে আছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।

কি হবে এই স্বপ্নের মানে? শিল্পী Michael Cody Scott

স্বপ্ন-জার্নালের কাঁটাছেঁড়া

আপনি ঘুম থেকে উঠে কোন কোন সকালে হয়তো কোন স্বপ্নই মনে করতে পারেন না। আবার কোন কোন রাতে স্বপ্নেরা ভীড় করে মাথার মাঝে, একটির পর আরেকটি। স্বপ্ন শেষ হওয়ার পর পরেই যদি ঘুম ভেঙ্গে যায়, তাহলে স্বপ্ন মনে থাকে, স্বপ্ন দেখার পর আবার স্বপ্নহীন ঘুমে তলিয়ে গেলে তা মনে করতে পারার কথা না। বহু বছর ধরে মনে করা হতো যে রেম-ঘুমের সময়েই মানুষ স্বপ্ন দেখে থাকে।  এখন আমরা জানি যে ঘুম থেকে মানুষ জাগার পর স্বপ্নের কথা বলতে পারে, তা তিনি ঘুমচক্রের যে ধাপ থেকেই জেগে উঠুন না কেন। তবে বিভিন্ন ধাপে দেখা স্বপ্নের চরিত্র, সময়সীমা আর স্বপ্নের সংখ্যা এক নয়।

‘The Accidental Mind’ বইয়ের লেখক ডেভিড লিনডেনের স্বপ্ন-জার্নাল থেকে তিনটি উদাহরণ সম্পর্কে জানা যাক।

Loading...

স্বপ্ন ১: তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার একটু পড়েই আমি পানির নিচে ডুবসাঁতারের অনুভূতি পেতে শুরু করি, যে অনুভূতি পেয়েছিলাম গতকালকে, বাচ্চাদের সাথে প্রতিবেশীদের সুইমিংপুলে সাঁতার কাটার সময়।

স্বপ্ন ২: গবেষনা প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবের কাগজপত্র তৈরির জন্য তেমন কিছুই করতে পারি না আজকে। তাই সারারাত ঘুমের মধ্যেও আতঙ্কিত ছিলাম — হয়তো নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে কাজটা শেষ করতে পারবো না।

স্বপ্ন ৩: লাবণ্যময়ী এক নারীর সাথে প্রশস্ত কোন স্থানে ওয়াল্টয নাচ নাচছিলাম। তাঁকে আমি চিনি না কিন্তু দেখা গেল তিনি আমাকে ভালোভাবেই জানেন। যে রুমে আমরা নাচছিলাম সেটাকে কোনভাবে বড় একটা জলসাঘর (বলরুম) বলে মনে হচ্ছিলো। আবার ঘরটাকে আমার শৈশবে বেড়ে ওঠার জায়গার একটা দোকানের মতো লাগছিলো — যেখানে কমবয়সী আমি প্রায়ই ঘুরতে যেতাম। সেই দোকানটা বাদ্যযন্ত্র বিক্রি করতো — সেখানে বিদেশী অনেক অচেনা যন্ত্রও ছিলো। আমার নৃত্য-সঙ্গীনি চোখ ঠারাচ্ছেন, কিন্তু আমার মনোযোগ বাক্সে রাখা বাদ্যযন্ত্রের দিকে। যন্ত্রগুলো বেশ জটিল, তারা যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অনেকক্ষণ ধরেই আমার মনে হচ্চিলো যন্ত্রগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করি, কিন্তু এটাও টের পাচ্ছি আমার সঙ্গিনী আমার অমনোযোগ বুঝতে পেরে খানিকটা বিরক্ত হয়ে উঠছেন। আমার খামখেয়ালীপনায় তিনি ক্রমেই রেগে ফুঁসে উঠছেন। একসময় তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে গেলেন, তাই আমি তার কাছ থেকে পালানোর জন্য ছোটা শুরু করলাম, আর স্বপ্নে একটি উত্তপ্ত রাস্তায় আমি দৌঁড়াচ্ছি এমন একটি দৃশ্যপটের আবির্ভাব হলো।  
আমি একটা বাইসাইকেলে চড়ে বসলাম, আর দ্রুত প্যাডেল ঠেলতে শুরু করলাম। পেছনে আর নাচের সঙ্গিনীকে দেখা যাচ্ছিলো না। কিন্তু মিনিটখানেক পরেই রাস্তাটি উঁচুনিচু হয়ে উঠলো — আর আমি বুঝতে পারলাম জ্যান্ত সাপ ভর্তি একটা রাস্তা দিয়ে চলছি আমি। প্যাডেল ঘোরানোর সময় পা নিচের দিকে গেলেই সাপেরা ফনা উঠাচ্ছে, তাই আমি পা উপরের দিকে উঠালাম যাতে তাদের কামড় থেকে বাঁচা যায়। বুঝতে পারলাম যে সাইকেলের গতিবেগ ক্রমেই কমে আসছে; কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারসাম্য হারিয়ে কার্পেটের মতো রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা সাপদের মধ্যে পড়ে যাবো।

Psychoanalysis and Dream Interpretation: How to Know Yourself Better –  Youth Time Magazine

কে জানে একজন সাইকোএনালিস্ট বা মনঃসমীক্ষক এসব স্বপ্নের কি মানে দাঁড় করাবেন (স্বপ্নের সাপ কি আসলেই সাপ, নাকি অন্যকিছুর রূপক?)! এই স্বপ্নগুলো পরস্পর থেকে খুবই আলাদা। কিন্তু তাদের মাঝে দুইটি বৈশিষ্ট্য একই রকম। প্রথমতঃ, সব স্বপ্নে ‘আমি’-ই মূল চরিত্র, আর স্বপ্নের ঘটনাগুলো ‘বর্তমান’ কালে ঘটছে। এটা আসলে সকল স্বপ্নেরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য, সব স্বপ্ন-অভিজ্ঞতা আসলে “বর্তমান কাল, প্রথম পুরুষ” কেন্দ্রীক ঘটনা।  স্বপ্ন ১ হলো ঘুমিয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা স্বপ্নের প্রতিনিধি। এরা বেশ সংক্ষিপ্ত —  আর এসব স্বপ্নে প্রবল ইন্দ্রিয়-অনুভূতি অনুভূত হলেও স্বপ্নের ঘটনা বেশিদূর এগিয়ে কোন গল্প তৈরি করে না। এই স্বপ্নেরা দৃশ্যের কেবল একটি অংশ মাত্র, তেমন কোন বিস্তারিত ছবিও  তৈরি হয় না আর বিশেষ কোন আবেগও থাকে না। এ ধরনের স্বপ্নেরা যৌক্তিক, জাগ্রত অবস্থার অভিজ্ঞতার সাথে সংগতিপূর্ণ, আর এরা কোন হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রম তৈরি করে না। প্রায়ই দেখা যায় ঘুমে-ঢলে পড়ার পর দেখা স্বপ্নেরা পূর্বদিনের অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করে তৈরি। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে করা একটি গবেষণয় রবার্ট স্টিকগোল্ড ও তাঁর সহকর্মীরা স্বেচ্ছাসেবকদের কম্পিউটার ভিডিও গেমডাউনহিল রেসার ২ কয়েক ঘন্টার জন্য খেলতে দেন। ঐ দিন রাতের ঘুমে ৯০ শতাংশের বেশি স্বেচ্ছাসেবক ভিডিও গেমটির বিভিন্ন দৃশ্য স্বপ্নে দেখার কথা জানান। তবে তাদেরকে ঘুমে ঢুলে পড়ার কিছুক্ষন পরেই জাগিয়ে দেয়া হয়েছিলো — রাতের মধ্য বা শেষ ভাগ নয় যখন গভীর নন-রেম ঘুম (৩য় থেকে ৪র্থ ধাপ) ও রেম ঘুম কর্তৃত্ব করে।

স্বপ্ন ২ হলো গভীর নন-রেম ঘুমে দেখা স্বপ্নের প্রতিনিধি। রাতের প্রথম অর্ধেকের ঘুমে এই স্বপ্নেরাই বেশি পাওয়া যাবে। স্বপ্ন ১ এর মতো এরাও কোন কাহিনী তৈরি করে না, তবে এ ধরনের স্বপ্নে ইন্দ্রিয়-অনুভূতি থাকে না বললেই চলে। বলতে গেলে এরা মূলত মোহাবিষ্ট আবেগ দিয়ে ভরা, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ চিন্তায় পূর্ণ, এ চিন্তাটাও যৌক্তিক — যার ভিত্তি প্রোথিত বাস্তব অভিজ্ঞতায়। কিন্তু তা কোন কাহিনী সৃষ্টি করে না।

স্বপ্ন ৩ হলো রেম-ঘুমে দেখা স্বপ্ন – ঘুম ভাঙার আগে আমরা ঘুমচক্রের যেসব রেম-পর্যায় দিয়ে যাই তখন দেখা। এই স্বপ্নরা গল্প বলে, সময়ের সাথে সাথে কাহিনীর বহুরূপী ভাঁজ খুলে ফেলে। এ ধরনের স্বপ্নের বর্ণনা হয় বিস্তারিত। রেম-ঘুমে দেখা স্বপ্নে ভিন্ন ভিন্ন স্থান পরপর যুক্ত হয়। কোন কোন জায়গা থাকে নির্দিষ্ট – যেমন আমার কম বয়সের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র বিক্রির দোকান। আবার কোন কোন জায়গা নির্দিষ্ট নয় – যেমন স্বপ্নের জলসাঘর। এসব স্বপ্নে কল্পনার বিভিন্ন উপাদান যুক্ত হয় — বাস্তবে লেখক কখনোই ওয়াল্টজ নাচতে পারি না। কিন্তু স্বপ্নে তেমন কোন সচেতন প্রচেষ্টা ছাড়াই লেখক বেশ সাবলীলভাবে নাচছিলেন। এ স্বপ্নে ধারাবাহিক গতির একটি অনুভূতি ছিলো — কখনো নাচছেন, দৌড়াচ্ছেন, কখনো বা সাইকেল চালাচ্ছেন।

স্বপ্নের গল্পে দৃশ্যকল্পের খুব দ্রুত পরিবর্তন হয় (জলসা ঘর থেকে রাস্তায়) যার কোন অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবু, স্বপ্নের মধ্যে এসব ঘটনাকে আমরা খুব স্বাভাবিক বলে ধরে নেই। স্বপ্নে মনে হয়, ঘটনা এমনটা না হয়ে অন্যরকম হলেই মনে হয় তা অবিশ্বাস্য হতো। এ স্বপ্নে হ্যালুসিনেশনের বেশ কিছু উপাদান আছে। তবে সেগুলো বেশিরভাগই দৃশ্য-সম্পর্কীয়, শব্দ বা গতি সম্পর্কীয় নয়। আর এ স্বপ্নে ধীরে ধীরে উদ্বেগ ও ভীতি বেড়ে ওঠার বিষয়টি লক্ষ্যনীয় — প্রথমে নাচের সঙ্গীনিকে অসন্তুষ্ট করার সামান্য উৎকন্ঠা থেকে শুরু করে সাপের কামড়ে মৃত্যুর ভয়াবহ আতঙ্ক।

Loading...

অযৌক্তিক ও উদ্ভট দৃশ্যকল্প দিয়ে তৈরি এসব গল্প-বলা আবেগপূর্ণ স্বপ্নগুলোই আমরা সবচেয়ে বেশি মনে রাখি। অদ্ভূতুড়ে বয়ান থাকে বলে এসব স্বপ্ন নিয়েই অন্যদের সাথে গল্প করতে ভালোবাসি আমরা। তবে মনে রাখার আরেকটি কারণ হলো ঘুম-চক্রের শেষ দিকে রেম-ঘুম ঘন ঘন দেখা দেয়। এই চক্রের শেষ দিকে আমরা জেগে উঠি বলে শেষের রেম-ঘুমে দেখা স্বপ্নগুলো মনে করতে পারি সহজে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে মানুষজনকে ঘুমচক্রের শেষ দিকের নন-রেম-ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলে তারা অনেক সময় এ ধরনের গল্প-বলা স্বপ্নের কথা বলতে পারে।

Why Keep a Dream Journal. 4 key benefits of dream journaling and… | by Eric  Sangerma | Publishous | Medium

স্বপ্ন-জার্নাল গবেষণা

অনেকগুলো বড় আকারের স্বপ্ন গবেষণা হয়েছে যেখানে মানুষজন লিখিত কিংবা অডিও স্বপ্ন-জার্নাল রেখেছেন। অন্য কিছু গবেষণায় তুলনামূলক কম সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকরা ঘুম-গবেষণাগার কিংবা বাসায় ইইজি-রেকর্ডিং যন্ত্র পরিয়ে ঘুমচক্রের বিভিন্ন ধাপে জাগিয়ে দিয়ে দেখা স্বপ্ন সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। এইসব গবেষণা থেকে এটা পরিস্কার যে স্বপ্নের বিষয়বস্তুর মধ্যে ভয়, দুশ্চিন্তা, ঝগড়া-বিবাদের মতো নেতিবাচক আবেগের পরিমাণই বেশি — প্রায় সত্তুর শতাংশের মতো। পনের শতাংশের মতো স্বপ্নে বিষয়বস্তু নিশ্চিতভাবে ইতিবাচক আবেগপূর্ণ। এই ফলাফল সব সংস্কৃতিতেই একইরকম। আমাজনের শিকারী-সংগ্রাহক আদিবাসী সমাজ থেকে আধুনিক শহুরে ইউরোপীয় বাসিন্দা হোক, স্বপ্নে কেউ ধাওয়া করছে এই বিষয়টা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

মজার ব্যাপার হলো স্বপ্নে উদ্বেগ, ভয় ও বিবাদের পরিমাণ স্বপ্ন-জার্নালেই বেশি দেখা যায় যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা আপনা-আপনি ঘুম থেকে উঠে পড়েন। কিন্তু রাত্রের শেষ তৃতীয়ার্ধে স্বেচ্ছাসেবীদের কৃত্রিমভাবে জাগিয়ে দিয়ে স্বপ্নের বিবরণ নিলে সেখানে নেতিবাচক আবেগের পরিমাণ তুলনামূলক কম দেখা যায় (৭০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ)। এই অসমতার একটি ব্যাখ্যা হলো ঘুম থেকে জেগে উঠে স্বপ্নের নেতিবাচক আবেগগুলোই স্বেচ্ছাসেবীদের বেশি মনে থাকবে।

ফ্রয়েডের স্বপ্ন ব্যাখ্যায় যৌন বিষয়গুলো বার বার ঘুরে-ফিরে এলেও সাম্প্রতিক গবেষণা আনুযায়ী ১০ শতাংশের চেয়েও কম স্বপ্নে সুস্পষ্ট যৌন বিষয়বস্তু থাকে। নারী-পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই এ বৈশিষ্ট্যটি অনুরূপ। পূর্বে বলেছিলাম রেম-ঘুমে শারীরিক যৌন উদ্দীপনা ঘটে — এই উদ্দীপনার সাথে স্বপ্নে যৌন বিষয়বস্তুর কোন পারস্পারিক সম্পর্ক দেখা যায় নি।

ঘুমে ঢুলে পড়ার কিছুক্ষণ পরের স্বপ্নে বিশেষ করে গত দিনের কার্যক্রমের মধ্যে শক্তিশালী নড়াচড়ার অনুভূতি ছিলো এমন ঘটনাগুলো প্রায়ই যুক্ত হয়। কিন্তু গল্প-বলা-স্বপ্নে এ ধরনের অনুভূতি থাকে না বললেই চলে। একটা গবেষণায় দেখা গেছে ২ শতাংশের চাইতে কম স্বপ্নে বিগত দিনের আত্মকথনমূলক স্মৃতি চলে আসার ঘটনা ঘটে (যদিও দিনের ব্যাক্তি বা স্থান কেন্দ্রীক অভিজ্ঞতার একটি খন্ডাংশ স্বপ্নে এর চেয়ে বেশি যুক্ত হয়)।  কোন কোন গবেষক অবশ্য দাবী করেন যে স্বপ্নে দিনের অভিজ্ঞতারা কয়েকদিন দেরী করে ফিরে আসে — তিন থেকে সাত রাত্রি পরে অভিজ্ঞতারা স্বপ্নে দেখা যেতে দেখা যায়। দিনের বেলায় খুব আবেগী অভিজ্ঞতা স্বপ্নে তুলনামূলক তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে বলে আমাদের স্বজ্ঞা ধরে নেবে। কিন্তু এ ধরনের আবেগী অভিজ্ঞতা আরো একটু দেরি করে দেখা দেয়।

এখন তাহলে জাগ্রত অবস্থা আর গল্প বলা স্বপ্নের মধ্যকার পার্থক্যের সারাংশ টানা যাক। জেগে থাকার সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে গল্প বলা স্বপ্নে প্রায়ই কিম্ভূতকিমাকার উপাদান অন্তর্ভূক্ত হয়। এসব স্বপ্নে হঠাৎ করেই বিভিন্ন স্থান ও মানুষজন পরস্পর মিশ্রিত হয়, প্রাকৃতিক নিয়মের লঙ্ঘন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে আবির্ভূত হয়। আর এই অযৌক্তিক ঘটনা ও বিভ্রাটগুলো স্বপ্নে কোন-রকম ভাবনাচিন্তা ছাড়াই আমরা মেনে নেই। এ ধরনের স্বপ্ন ‘গতি ‘ মুখ্য অনুভূতি হয়ে ওঠে। অনুভূতিগুলো আবার মূলত চাক্ষুষরূপেই ধরা পড়ে। গল্প বলা স্বপ্নে জাগ্রত অবস্থার তুলনায় বেশি নেতিবাচক উপাদান থাকে — বিশেষত ভয় ও উদ্বেগ। নতুনের চেয়ে পুরাতন স্মৃতিরাই স্বপ্নে বেশি কাঁচামাল সরবরাহ করে। স্বপ্ন দেখার পর ঘুম হতে না জাগলে কি দেখেছি সেটা আমরা ভুলে যাই।

স্বপ্নের ব্যবচ্ছেদ করে আমরা এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা নিলাম। কিন্তু এখনো ঠিক পরিস্কার নয় আমরা স্বপ্ন কেন দেখি। কিংবা আরো গভীর প্রশ্ন হচ্ছে, মস্তিষ্কে কোন প্রক্রিয়াসমূহের কারণে আমরা স্বপ্ন দেখি। এ প্রশ্নের অনুসন্ধান থাকবে আগামী লেখায়।

তথ্যসূত্র:  ডেভিড লিনডেনের ‘The Accidental Mind’
পরবর্তী লেখা: আমরা কেন স্বপ্ন দেখি?

মস্তিষ্ক বিষয়ক এই ধারাবাহিকের আগের লেখা ছিল দেহঘড়ির উপর, পড়ুন দেহ-ঘড়ি টিক টিক ছন্দঃ সার্কাডিয়ান ক্লক

Loading...

আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

You may also like...

৭ Responses

  1. বাংলা একাডেমি থেকে কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় এর স্বপ্ন নামের একটা বই ছিল। বইটা দেখেছিলেন কি? আজিজ মার্কেটে পাওয়া যায়। বিশেষ করে প্রথমাতে।

  2. স্বপ্নের খোয়াবনামা নিয়ে আমার কাছেও একটা বই আছে। “আল্লামা ইবনে সীরিনের স্বপ্নের তাবীর” । পড়তে এত ভাল লাগত যে বলার মত না। ধর্মীয় বইয়ের মাঝে আমার প্রিয় একটা বই। প্রায় দুই বৎসর ধরে এটা খুলেও দেখিনা। আমি জানি এসব অর্থহীন। কিন্তু তারপরেও বইটা আমার প্রিয় রয়ে গেছে। এটাকে অনেকটা গ্রীক মিথোলজির সাথে তুলনা করা যেতে পারে!

    বই প্রিয় হতে হলে অর্থবহ হতে হবে এমন কোনো কথা আছে? হ্যারি পটার, লর্ড অব দ্যা রিংস, ক্রনিকলস অব নারনিয়া এগুলোরও তো কোনো অর্থ নেই। তারপরও তো এগুলো অনেকের কাছে প্রিয়। 🙂

    [আগের মন্তব্যে লিংক কাজ করে না, তাই এই লিংক… http://rokomari.com/book/28313%5D

    • না বই প্রিয় হতে হলে অর্থবহ হতেই হবে এমন কোন কথা নাই। হুমায়ুন আহমেদ অনেকেরই প্রিয় কিন্তু উনার বেশিরভাগ উপন্যাসেই কোন প্লট নেই 🙂
      কিন্তু মিথোলজি, রূপকথা ইত্যাদির কোন মানে নেই তা কিন্তু না। রূপকথার মধ্যে প্রায়ই অনেক গভীর অর্থ থাকে। এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারো, ‘রূপকথা নিয়ে কিছু কথা হতে পারে’ http://www.somewhereinblog.net/blog/kharejiblog/28942714

  3. রেম ঘুম ছাড়া অন্য পর্যায়েও যে স্বপ্ন দেখা যায়… জানতামই না। মনে থাকবে এই লেখাটা।

  4. দিনের অনেক কল্পনা ও রাতের সপ্ন হিসেবে দেখা যায় । ধন্যবাদ ।
    ইংরেজি গ্রামার বাংলায় শেখার মজার ওয়েবসাইট ।

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: