ফিউশন পারমাণবিক শক্তি (অণুপোষ্ট)

Share
   
পাঠ সংখ্যা : 305

পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়ে নানারকম ঝক্কি-ঝামেলার কথা আমরা অহরহ শুনতে পাই। কয়েকবছর আগে জাপানের ফুকুশিমার পারমানবিক বিপর্যয় জাপানসহ সারা পৃথিবীতেই দুর্যোগ বয়ে এনেছিলো। তাছাড়া ইতিপূর্বে ইউক্রেইনের চেরোনোবিল বিপর্যয় এবং আরো কিছু বিপর্যয়ের বিষয়েও আমাদের জানা। পারমানবিক বিপর্যয়ের একটি বড় সমস্যা হলো এটি বিপর্যয় ঘটার পরে দীর্ঘ সময় ধরে তার প্রভাবে বিস্তার করে যেতে থাকে। এসব কারণে পৃথিবীর অনেক দেশই নতুন করে প্রচলিত ধারার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ করে দিচ্ছে।

অথচ পারমাণবিক বিদ্যুৎ হতে পারতো শক্তি চাহিদা মেটানোর একটা নির্ভরযোগ্য উৎস। বাংলাদেশের মতো অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ যেখানে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য বিপুল পরিমান বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন সেখানে এই ঘনীভূত শক্তির বিদ্যুৎ বিশেষভাবে উপযোগী হতে পারত। তেজস্ক্রিয় বস্তুগুলোর মাধ্যমে খুব অল্প পরিমান ভর থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা যায় তাই টনকে টন কয়লা পুড়িয়ে, বিপুল পরিমাণ পরিবেশ ধ্বংস করে যে পরিমান শক্তি উৎপাদিত হয় কেজিখানেক ইউরেনিয়াম থেকেই তারচেয়ে বেশী শক্তি পাওয়া যায়। পারমানবিক বর্জব্যবস্থা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রন করা গেলে পারমাণবিক শক্তি পরিবেশবান্ধবও হতে পারে যা জীবাষ্ম জ্বালানীর ক্ষেত্রে দুষ্কর। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও সেই একই সমস্যা, সেই বিপর্যয় ঘটার আশংকা। বাংলাদেশের মত প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়া একটি দেশে এই সমস্যা ও বিপদের ঝুঁকি আরেো প্রকট।

State of Nuclear Fusion: Reactor Could Achieve Fusion in 10 Years


পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রের এই ঝুঁকি এড়ানো যেত যদি নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ার প্রযুক্তি সহজপ্রাপ্য হতো। বর্তমানে শক্তিকেন্দ্রগুলোতে নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করা হয়। এতে অত্যন্ত ভারী কোনো পরমাণু ভেঙ্গে গিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট একাধিক নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং ফলস্বরূপ বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। নিউক্লিয়ার ফিশন অত্যন্ত বিপদজনক প্রক্রিয়া। যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রন করা না গেলে এটি চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটনোর চেষ্টায় থাকে সর্বদা। আবার এই প্রক্রিয়ায় যে কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় তা তেজস্ক্রিয় হওয়ায় সর্বদাই বিপদের ঝুঁকি থেকে যায়।

কিন্তু নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া এই ক্ষেত্রে ব্যতীক্রম। এই প্রক্রিয়া ফিশনের বিপরীত, অর্থাৎ দু’টি হালকা নিউক্লিয়াস একত্রে যুক্ত হয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। এটি চেইন বিক্রিয়া দেয় না তাই বিস্ফোরণের আশঙ্কা নেই। অপরদিকে এর কাঁচামাল হলো হাইড্রোজেন ও ডিউটেরিয়ামের মতো অত্যন্ত হালকা আইসোটোপ। এই আইসোটোপগুলো নিজেরা তেজস্ক্রিয় বিকিরণও দেয় না তাই দীর্ঘদিন সঞ্চয় করে রাখালেও কোনো সমস্যা নেই। উৎপন্ন বর্জের তেজস্ক্রিয়তা, ফিশনের ফলে উৎপন্ন বর্জের চেয়ে দ্রুত নিষ্ক্রিয় হয় তাই ঝুঁকিও কম। তাছাড়া ডিউটেরিয়াম জাতীয় আইসোটোপগুলো সমুদ্রের পানি নিশ্কাশন করে খুব সহজেই সংগ্রহ করা যায়। যদিও পানিতে ডিউটেরিয়ামের পরিমাণ অত্যন্ত নগন্য, কিন্তু খুব অল্প পরিমান জ্বালানী থেকেই যেহেতু বিপুল পরিমান শক্তি উৎপাদন করা যাবে তাই খুব অল্প পরিমান ডিউটেরিয়াম নিষ্কাশন করলেই চলবে। আর ইউরেনিয়ামের মতো এই জ্বালানীর উৎস কখনো নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

Nuclear Fusion

ফিশনের তুলনায় এতোসব সুবিধা সত্ত্বেও নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তি এখনো আলোর মুখ দেখেনি এর কারণ ফিউশন চালু করার জন্য মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াল পর্যায়ের তাপমাত্রা সৃষ্টি করতে হয় যা কোনো বস্তুগত পাত্রের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব নয় যাতে জ্বালানী রেখে সেই ফিউশন ঘটানো হবে। তাই কয়েকবছর আগে গবেষকগণ ভিন্ন পদ্ধতিতে এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেন। তাঁরা অতিপরিবাহী ব্যবহার করে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে জ্বালানীসমূহকে সেই চৌম্বক ক্ষেত্রে শূন্যে ভাসিয়ে নিউক্লিয়ার ফিউশন চালানোর উদ্যোগ নেন। এতো কিছু সমস্যা তৈরি হয়। প্রয়োজনীয় শক্তির চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি এবং তা থেকে সংগ্রহক্ষম শক্তি তৈরির জন্য বিপুল আকারের স্থাপনা নির্মানের প্রয়োজনীতা দেখা যায়। তাছাড়া অতিপরিবাহী কাজ করে অত্যন্ত নিন্মতাপমাত্রায় এবং রিএ্যাক্টরে ব্যবহারের সময় এগুলো সহজে উত্তপ্ত হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘস্থায়ীভাবে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি দুষ্কর হয়ে পড়ে। এর ফলে এই প্রযুক্তি পুরোপুরি বাস্তবসম্মত হয় নি। তবে সম্প্রতি MIT’র একদল গবেষক পুনরায় এই প্রযুক্তিতে আশার আলো সঞ্চার করেছেন। তাঁরা বেরিয়াম কপার অক্সাইড থেকে নতুন ধরনের অতিপরিবাহী তৈরি করেছেন যা আগের কপার অতিপরিবাহীর চেয়ে আলো ভালোভাবে কাজ করে। শুধু তাই নয় এগুলো সহজে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে না এবং তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার করেই এগুলোর প্রয়োজনীয় নিন্মতাপমাত্রা ধরে রাখা যায়। গবেষকগণ আশা করছেন এই নতুন বস্তুটি ব্যবহার করে আগামী পাঁচবছরের মধ্যেই তাঁরা একটি প্রয়োগযোগ্য ফিউশন রিএক্টর চালু করতে পারবেন। এটি দেখতে হবে নিচের ছবির মতো।

ছড়িয়ে দেয়ার লিঙ্ক: https://bigganblog.org/2015/08/ফিউশন-পারমাণবিক-শক্তি-অণ/

bengalensis

পোস্টডক্টরাল গবেষক: Green Nanomaterials Research Center Kyungpook National University Republic of Korea.

অন্যান্য লেখা | অন্তর্জাল ঠিকানা
0 0 ভোট
Article Rating
আলোচনার গ্রাহক হতে চান?
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

2 Comments
পুরানো
নতুন সবচেয়ে বেশি ভোট
লেখার মাঝে মতামত
সকল মন্তব্য