ক্রিসপার ও জিনোম সম্পাদনা

১.

এমন যদি হতো জীবন্ত-প্রাণকে কম্পিউটার সফটওয়্যাররের মতো সহজে বদলানো যেতো? তাহলে আমরা খামারের পশু থেকে থেকে পেতাম চর্বিহীন মাংশপিন্ড। প্রকৌশলের মাধ্যমে গাছগাছালি থেকে রসালো ফল অথবা তীব্র জলবায়ুতে টিকে থাকার ক্ষমতা চালু করা যেত। চিকিৎসা গবেষণা বদলে যেত। মানব রোগ বোঝার জন্য আমরা মিউট্যান্ট প্রাণী তৈরি করতাম। কিংবা নতুন ঔষুধ-অণুর উৎস হিসেবে উদ্ভিদ-প্রকৌশল করা হতো। ঔষুধ তখন একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির হতো। সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা মাসকুলার ডিসট্রফির মতো বংশগতির-রোগের দূর্ভোগে না ভূগে ডাক্তাররা হয়তো ক্ষতিগ্রস্থ কোষ থেকে এর জন্য দায়ী খুঁত মুছে ফেলতেন। এখানেই বা থামতাম কেন? এ ধরণের দূরারোগ্য-অবস্থা অতীতের গল্পের অংশ হয়ে যেত। গবেষণাগারে নিষিক্ত ভ্রুণে কোন বংশগতীয় ত্রুটি আছে কি না খুঁজে দেখে, ভুল শুধরিয়ে গর্ভে প্রতিস্থাপিত করা হতো।

এরকম দূরকল্পনা আমাদেরকে হয়তো আশাবাদী বা আতঙ্কিত করে তুলতে পারে। সেটা নির্ভর করবে দৃষ্টিভঙ্গির উপর। তবে যদি এগুলো শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো লাগে, তাহলে জিন সম্পাদনার নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কথা বলার সময় চলে এসেছে। ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেল লরিয়েট যেমন সম্প্রতি আমাকে বললেন: ‘জেনেটিক্সে এই মুহূর্তে সত্যিসত্যিই একটি বিপ্লব ঘটছে।’

সত্যিই কি তাই? জৈবপ্রযুক্তির জগতে এখন আসলে কি ঘটছে সে বিষয়ে যদি বিস্ময় বোধ করেন, তাহলে আপনাকে অবশ্য কিছু বলা যায় না। জিএম (জেনেটিকালি মডিফাইড) শস্য, জিন থেরাপী, মর্জিমাফিক চাহিদা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের নবজাতক জন্ম দেয়া এ বিষয়গুলোতে চলমান অনেকগুলো বিতর্ক রয়েছে। জীবন-সংকেতে হস্তক্ষেপ করার প্রমিথিউসতূল্য উদ্যোগ ও প্রযুক্তি কয়েকদশক পুরনো, আর এ নিয়ে বিতর্কও বহু আগের। হুম, বিষয়টা তাই, আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমাদের হাতে টেস্ট টিউবের মধ্যে জিন সিকোয়েন্স বদলানোর প্রযুক্তি সেই ১৯৭০-র দশক থেকেই ছিলো। ১৯৮০-র দশকেই ইঁদুরের মতো জটিল জীবের জিনোম পরিবর্তন করা সম্ভব হয়। জেনেটিক প্রকৌশল নতুন কিছু নয়। তবে জিন সম্পাদনার আধুনিক কলা-কৌশলের সাথে অতীতের পদ্ধতির তুলনা অনেকটা মোটর-গাড়ির সাথে ঘোড়ার গাড়ির তুলনা করার মতো। কিংবা আরো যথার্থভাবে বললে, ছাপাখানার প্রাচীন প্রেসের সাথে আধুনিক ওয়ার্ড-প্রসেসরের সাথে তুলনা করার মতো।

২.

কিন্তু ঠিক কোন জিনিসটা বদলে গেল? এক কথায় বলতে গেলে, আমাদের হাতে এখন জিন সম্পাদনা নামে জেনেটিক প্রকৌশলের সুনির্দিষ্ট একটি রূপ রয়েছে। এটি অত্যন্ত নির্ভুল, দক্ষ, ও ব্যবহারের দিক দিয়ে পূর্ববর্তী পদ্ধতির তুলনায় সহজ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পদ্ধতিটি প্রায় সবধরণের কোষে প্রয়োগ করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে নিষিক্ত ডিম্বাণুও। এর মানে হলো, যে কোন প্রজাতির বংশগতির প্রকৌশলের করে রূপান্তরিত উদ্ভিদ বা প্রাণী তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি মানুষসহ অন্য প্রাপ্তবয়স্ক জীবের কোষেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বর্তমান অবস্থার সাথে পূর্বের রীতির তুলনা করা যাক। বংশগতি সম্পাদনা এক ধরনের ‘আণবিক কাঁচি’ ব্যবহার করে থাক। এটি মূলত একধরণের প্রোটিন যা ডিএনএ-কে দুই ভাগে কেটে ফেলে। এ ধরণের ‘আণবিক কাঁচি’-র প্রাচীন সংস্করণগুলো জিনোমকে একাধিক জায়গাতে কেটে ফেলতো। এর ফলে জীব কোষের মধ্যে ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো। তার পরেও এদেরকে টেস্টটিউবের মধ্যে ডিএনএ কাটার কাজে হয়তো ব্যবহার করা যেত। জেনেটিক প্রকৌশলীরা এর মাধ্যমে প্রয়োজন মতো জিন-কন্সট্রাক্ট১ গড়তে পারতেন। যা পেট্রিডিশে কোন কোষের মধ্যে প্রবেশ করানো যেত। কিংবা ইঁদুরের মতো কোন জ্যান্ত প্রাণীর মধ্যে ‘হয়তো’ ঢোকানো যেত। তবে প্রবেশ করানোর এই প্রক্রিয়াটি বেশ এলোমেলো আর ঝঞ্ঝাটপূর্ণ ছিলো। কর্তিত ডিএনএটি কোষর মধ্যে প্রবেশ করিয়ে গবেষককে দৈবের উপর ভরসা করতে হতো। অপেক্ষা করতে হতো, হয়তো কোষের জিনোমে প্রবেশকৃত ডিএনএটি হয়তো সুবিধামতো জায়গায় সংযুক্ত হয়ে যাবে। ঘটনাটা ছিলো অনেকটা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য কামান-দাগার মতো।

ইঁদুরের কথা উল্লেখের পেছনে একটা কারণ আছে। বিগত দশকগুলোতে জেনেটিক প্রকৌশলের বিভিন্ন প্রজেক্টে ইঁদুরের ব্যাপক ব্যবহারের জন্য বিষয়টি দায়ী। কারণটি হলো: ইঁদুরের ভ্রুণ থেকে স্টেম কোষ সংগ্রহ করে কৃত্রিমভাবে জেনেটিক পরিববর্তন করার মাধ্যমে নতুন ইঁদুর তৈরির কাজে ব্যবহার করা যায়। তারমানে এটা একটি সুযোগ – ইঁদুরের কোন জিনে পরিবর্তন করে দেখ পূর্ণবয়স্ক প্রাণীতে ঐ জিনটি কি কাজ করে (অবশ্য প্রক্রিয়াটি পরোক্ষ)। যে কোন জেনেটিক গবেষণার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরীক্ষা খুব উপযোগী। কিন্তু সমস্যা হলো ইঁদুর ছাড়া অন্য কোন প্রাণী থেকে এধরণের কাজের জন্য মানানসই স্টেম কোষ কেউ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এ ধরণের সুক্ষ্ম জেনেটিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে ইঁদুরের সক্ষমতা অনন্য। অন্যকোন প্রাণীর ব্যবহার ছিলো কঠিন, সমস্যাপূর্ণ। তাই সকলেই ইঁদুর নিয়েই তাদের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে নতুন জিন সম্পাদনার প্রযুক্তি আসার আগ পর্যন্ত।

এই নতুন ধরনের জিন সম্পাদনা এক কথায় বিস্ময়কর। স্টেম কোষ ছাড়াও অন্য যে কোন ধরনের জীবিত কোষে এটি ব্যবহার করা যায় (ফলে আমরা নিমিষেই ইঁদুর-নির্ভরতা থেকে বেড়িয়ে আসলাম)। এসব আণবিক কাঁচি এক ধরণের পথ-প্রদর্শকের সহযোগিতায় জিনোমের সুনির্দিষ্ট স্থানে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে এ পথ-প্রদর্শক হলো নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের আরএনএ। আরএনএহলো ডিএনএ-র রাসায়নিক আত্মীয়। এই পথ-প্রদর্শক আরএনএ-র আকৃতি একে জিনের নির্দিষ্ট জায়গায় আটকাতে সাহায্য করে। এভাবে আরএনএ-টি আকাঙ্ক্ষিত জিনের সুনির্দিষ্ট জায়গায় কাটছাট নিয়ন্ত্রণ করে। আণবিক কাঁচি শুধু একটি পোঁচ দেয়, তারপর আগে থেকে পছন্দ করা একটুকরো ডিএনএ সেখানে বসিয়ে দেয়। আমি আগেই যেমনটা বলেছি, এর সাথে ওয়ার্ড প্রসেসরের তুলনা অনিবার্য: কাটো আর জোড়া দাও, খোঁজো আর বদলে দাও

অণুপ্রাণবিজ্ঞানীদের ব্যবহৃত অনেক প্রক্রিয়ার মতোই জিন সম্পাদনার ভিত্তিমূল প্রকৃতিতে গাঁথা। এর কর্মপদ্ধতি জীবাণুদের মধ্যে পাওয়া যাবে। মেলো এটিকে আক্রমণকারী ভাইরাসের বিরুদ্ধে ব্যাক্টেরিয়ার জিনোম রক্ষা ব্যবস্থা হিসবে বর্ণনা করেছেন। বেশ কিছু ভাইরাস পোষক কোষের জিনোমে নিজেদের ডিএনএ প্রবেশ করাতে পারে। এ ধরনের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য বিভিন্ন জীবে কিছু প্রক্রিয়া বিবর্তিত হয়েছে। কিছু ব্যক্টেরিয়া তাদের কোষে পথ নির্দেশক আরএনএ-র মাধ্যমে কর্তনকারী প্রোটিনকে পরিচালনা করে আগন্তুক-ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজেকে প্রতিরক্ষা করে। আমরা এই প্রক্রিয়াটি ১৯৮০-র দশক থেকেই জানি। কিন্তু এ প্রক্রিয়াটি যে জিন-প্রকৌশলে ভুমিকা রাখতে পারে তা ২০১২ সালে এসে বোঝা যায়। এ আবিষ্কারে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার (বার্কেলি) জেনিফার ডউডনা ও বার্লিনের ম্যাক্সপ্লাঙ্ক ইন্সটিটিউটের ইমমাসুয়েল শার্পেন্টিয়ার প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন।

এই প্রোটিনটি সংগ্রহ ও পরিশোধিত করে কৃত্রিম পথপ্রদর্শক আরএনএ সঙ্গে করে কোন কোষে যদি প্রবেশ করানো যায়, তাহলে যে কোন জিনকে লক্ষ্য করে আমরা এ কর্তনকারী-প্রোটিন ব্যবহার করতে পারবো। এধরনের কাঁচি দিয়ে যে কোন জিন কেটে ফেলা কিংবা সুক্ষ্ম পরিবর্তন করা যাবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্ড্রু ব্যাসেটের মতে, জিন সম্পাদনার ক্ষমতাটা হলো ‘এটি দিয়ে খুব দ্রুত কোন জীবের ডিএনএ-তে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন করা যায়’। এতোদিন পর আমরা জেনেটিক কোড নিয়ে কাজ করার মতো কোন ভাষা-সম্পাদক বা টেক্সট এডিটর খুঁজে পেলাম।

৩.

তাহলে কি এসে যায়? মানব-স্বাস্থ্য ও রোগ-সৃষ্টি-প্রক্রিয়া বোঝার জন্য যেসব রূপান্তরিত-প্রাণী ব্যবহার করা হয়, তাদের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে জিন সম্পাদনা ব্যবহার করা সম্ভব। এ প্রক্রিয়া ঔষুধ শাস্ত্রকে একেবারে রূপান্তরিত করে ফেলতে পারে। আমরা দেখেছি প্রথাগত জেনেটিক প্রকৌশলে ইঁদুর দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য চালিয়ে আসছে। কেন অন্য প্রাণীর ভ্রুণ থেকে স্টেমকোষ আলাদা করা যায় না এটা বিজ্ঞানীরা ভালোভাবে বুঝতে পারেন নি। কিন্তু তাঁরা দেখেছেন অন্য ভ্রুণ থেকে স্টেমকোষ আলাদা করাটা প্রায় অসম্ভব। দুঃখের বিষয়, মানুষের রোগ বোঝার জন্য ইঁদুর সব সময় ভালো মডেল নয়। বিশেষ করে তাদের মস্তিষ্ক আমাদের মস্তিষ্ক থেকে একেবারেই ভিন্ন। ফলে অটিজম বা সাইজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক ব্যাধি বোঝার জন্য এদের উপযোগিতা সামান্য। এ কারণে ম্যাসাচুয়েসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির গুপিং ফেং এখন জিন সম্পাদনা ব্যবহার করে এমন বানর তৈরি করছেন যাদের মানব-মস্তিষ্কে-ব্যাধি-সম্পর্কিত জিনে সমস্যা রয়েছে। যেমন স্নায়ু কোষের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণকারী SHANK3 জিনটিকে দেখা যায় অটিজমের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে।

একদিকে জিন সম্পাদনা যখন রোগ মডেল করার আলোড়ন সৃষ্টিকারী নতুন পদ্ধতি যোগাচ্ছে, অন্যদিকে এর মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ-চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে। এ পদ্ধতিটি মানব কোষে এইচআইভি ভাইরাসকে লক্ষ্য করে সফলতার সাথে ব্যবহৃত হয়েছে (যদিও কৃত্রিমভাবে চাষ করা মানব কোষে, তবুও তো কিছু সফলতা পাওয়া গেছে)। স্যান ডিয়োগোতে সাক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন এ পদ্ধতি ‘মানব জিনোমে লুকিয়ে থাকা ভাইরাস সিকোয়েন্স সহ সকল এইচআইভি সরিয়ে ফেলে’ । এ রকমই বললেন পরীক্ষাটিতে নের্তৃত্ব দেয়া গবেষক জুয়ান কার্লোস ইজপিসুয়া বেলমোন্টে। এইডস রোগীদদের উপর এই প্রক্রিয়ার প্রয়োগে ক্লিনিকাল ট্রায়াল অচিরেই হবে।

বায়োমেডিক্যাল মডেল তৈরির সাথে সাথে খাদ্য সরবরাহের জন্য জিনোম সম্পাদনার মাধ্যমে নতুন প্রাণী ও উদ্ভিদ তৈরি করা সম্ভব। যেমন গৃহপালিত শূকরের এমন জাত তৈরি করা সম্ভব যাদের মধ্যে পছন্দসই বুনোশুকরের জিন রয়েছে। গৃহপালিত শূকর আফ্রিকান সোয়াইন ফিবার নামক প্রাণঘাতী রোগের বিপক্ষে ভীষণ দূর্বল। সম্প্রতি লিথুয়ানিয়া, ইউক্রেইন,  পোল্যান্ড, লাটভিয়াতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এ ব্যাধিটি ইউরোপের গৃহপালিত শুকরের জন্য ভয়াবহ হুমকিস্বরূপ। তবে বুনো শুকর এ রোগ-প্রতিরোধী। এ রোগটির উপর এডিনবার্গে রোজালিন ইন্সটিটিউটে (যেখানে ডলি ভেড়ার ক্লোন করা হয়েছিলো) ব্রুস হোয়াইট’ল ও তার সহকর্মীদের গবেষণার কথা জানা যাক।

হোয়াইট’ল জিনোম সম্পাদনা ব্যবহার করে এমন গৃহপালিত শুকর তৈরি করেছেন যার মধ্যে আফ্রিকার বুনো শুকরের বিশেষ জেনেটিক অংশ রয়েছে। এই গ্রীষ্মে এসব পরিবর্তিত শুকরের উপর পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এ পরীক্ষায় তারা প্রতিরোধশক্তি অর্জন করেছে কি না তা দেখার জন্য এদেরকে ভাইরাসটির সংস্পর্শে আনা হয়েছে। সম্প্রতি এ প্রকল্পের উপর একটি আলোচনায় হোযাইট’ল বলেন, একজন লিথুয়ানিয়ান কৃষকের থেকে প্রথম প্রশ্নটি ছিলো: ‘কখন আমি এই প্রাণীগুলোকে পাবো?’ ভালো প্রশ্ন। যদি ক্লিনিকাল ট্রায়াল সফল হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী ধাপ হবে নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে বাণিজ্যিক অনুমোদনের জন্য আবেদন করা। হোয়াইট’ল ব্যাখ্যা করেন, ‘সীমাবদ্ধতাগুলো আর প্রযুক্তিগত নেই, এরা এখন আইনগত।’

এ তো কেবল শুরু। অন্যান্য বিচক্ষণ জীন-সম্পাদনা হয়তো মাংসে সঠিক গুণ নিয়ে আসবে, অথবা কোন শুকরকে অর্থনৈতিক ভাবে সাশ্রয়ী খাদ্যে বেঁচে থাকার সামর্থ্য প্রদান করবে। ব্লাইট-প্রতিরোধী রূপান্তরিত-আলুর মতো  শক্তসামর্থ খাদ্যশস্যের নকশা আমরা করতে পারবো। ব্লাইট হলো ছত্রাকের সংক্রমণ যা মধ্য উনবিংশ শতাব্দীতে আইরিশ মহাদূর্ভিক্ষের কারণ ছিলো। এ রোগটি এখন নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় ব্যয়বহুল ও ক্ষতিকর ছত্রাক-নাশকের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে। তবে হয়তো আমরা ছত্রাক-নাশক ব্যবহার না করেই রোগটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো।

অন্যান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভিদকে খরা বা তাপদাহ সহ্য করতে সামর্থ্যবান করা যায়। এটি আমাদের প্রতিকূল বিশ্ব-জলবায়ুতে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করবে। অথবা উদ্ভিদকে ফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদনের জন্য প্রকৌশলের আশ্রয় নেয়া যায়। প্রাণীদেরও। এমন গরু বা ভেড়া কেন তৈরি করা হবে না যাদের দুধের সাথে চিকিৎসার জন্য কার্যকর যৌগ উপস্থিত থাকবে, যেমন হেমোফলিয়াকদের মধ্যে অনুপস্থিত রক্ত জমাট বাঁধার যৌগ? আরো দূরে যাওয়া সম্ভব। কিছু কিছু বিজ্ঞানী জিন সম্পাদনা ব্যবহার করে শুকরের জিনোমকে বদলিয়ে তাদের অঙ্গকে ‘মানবিক’ করে তুলছেন। উদ্দেশ্য এদের মানব-অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য উপযোগী করে তোলা। এখন পর্যন্ত এ রকম ‘ভিন্ন-প্রজাতীতে অঙ্গ-প্রতিস্থাপন’ অসম্ভব একটা ঘটনা ছিলো। কারণ মানব দেহ শুকরের হৃৎপিন্ড, যকৃৎ বা অগ্ন্যাশয় প্রত্যাখান করতো। এখন বিজ্ঞানীরা জিন সম্পাদনা ব্যবহার করে এমন শুকর-অঙ্গ তৈরি করছেন যা আমাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে অদৃশ্য। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে আমরা এদের অঙ্গের পৃষ্ঠতলে উপস্থিত প্রোটিন বদলানো নিয়ে কথা বলছি। জেনেটিক পরিবর্তেনর মাধ্যমে কোন অতি-বুদ্ধিমান শুকর তৈরি করা হচ্ছে না। তবে এটা অবাক করা নয় কিছু কিছু ব্যক্তি এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেকটা খুঁতখুঁতে। ম্যানসেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবনীতিশাস্ত্রজ্ঞ সারাহ চান বলেন, ‘এমনকি (এ প্রক্রিয়ার) বৈজ্ঞানিক ও নিরাপত্তার সমস্যাগুলো সমাধান হয়ে গেলেও আমাদের বৃহৎ পরিসরে শুকরের অঙ্গ দিয়ে মানব অঙ্গ-প্রতিস্থাপনের সাম্ভব্য সাংস্কৃতিক উদ্বেগ ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত।’

নিঃসন্দেহে এরকম অগ্রগতির ফলে খামার বলতে আমরা কি বোঝাই এরকম ধ্যান-ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। অবশ্যই, এ পরিবর্তনগুলো অনেক কিছুকেই চ্যালেঞ্জের সামনে নিয়ে আসবে।

৪.

বুনো প্রজাতিতে পাওয়া জেনেটিক বৈচিত্র্য গৃহপালিত জাতে স্থানান্তরের সামর্থ্যের বিষয়টা ধরা যাক। এটি জিএম (জেনেটিক্যালি মডিফাইড) খাবার বলতে আমরা যা বুঝি তাকেই খাটো করে দেয়। কারণ প্রকৃতিতে ইতিমধ্যে উপস্থিত  এমন কিছুকেই স্থানান্তর করা হচ্ছে। বিভিন্ন খাদ্য-কোম্পানি হয়তো এই যুক্তি ব্যবহার করে জিএম লেবেল ব্যবহার করা এড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। ফলে এধরনের খাদ্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যে বিরোধিতা চলে আসছিলো তার বিপক্ষে একধরণের প্রতিরোধ তৈরি হয়। তবে বিষয়টি হয়তো আরো বিতর্কিত হয়ে যাবে।

তাছাড়া মেডিকেল গবেষণাকে রূপান্তরিত করতে জিন সম্পাদনার সুপ্ত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জেনেটিক্যালি বদলানো বিভিন্ন প্রাণীকে রোগের মডেল হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক শুরু হবে। বিশেষ করে শিম্পাঞ্জীর মতো মানুষের নিকটবর্তী প্রজাতীকে কখনো জেনেটিক্যালি বদলানো উচিত কি না, এ বিষয়ে চরম বিতর্ক হবে। এই এপ প্রজাতি যেহেতু মানুষের সবচেয়ে নিকটাত্মীয়, তাই মানসিক সমস্যা নিয়ে গবেষণার জন্য তারা খুব ভালো মডেল হবে। তবে সহজেই যে কেউ ভাবতে পারে যে এভাবে মানসিক সমস্যা নিয়ে কাজ করা শুরু করে একসময় হয়তো মানুষের সচেতনতা, ভাষার জটিল ক্ষমতার মতো বৈশিষ্ট্যের জেনেটিক পার্থক্য নিয়ে গবেষণার জন্যও শিম্পাঞ্জী ব্যবহার শুরু হয়ে যাবে। এ ধরণের গবেষণা আমাদের নিজেদের প্রকৃতি সম্পর্কে খুব গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি লাভে আমাদের সাহায্য করবে। কিন্তু এধরনের গবেষণা হয়তো প্রজাতীগত দূরত্ব কমিয়ে ‘তুলনামূলক বেশি মানুষের মতো’ শিম্পাঞ্জী তৈরির দিকে নিয়ে যাবে যার, নৈতিক অবস্থান হবে আরো উঁচু। গুগলের সিইও থাকা অবস্থা এরিক স্কিমিড বলেছিলেন, ‘গুগলের নীতি হলো অস্বস্তির সীমানা পর্যন্ত যাওয়া কিন্তু তা টপকানো নয়।’ জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রে আমরা হয়তো বহু তর্কসাপেক্ষে কোন ‘অস্বস্তিকর’ সীমানা নির্ধারণ করবো। কিন্তু সে সীমানা টপকানোর জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক, বৌদ্ধিক ও মানবিক প্রলোভন অতীব তীব্র হয়ে পড়বে।

যদি গর্ভাবস্থায় মানব জিনোম বদলানোর জন্য এ প্রযুক্তিটির ব্যবহার শুরু হয় তাহলে তা সবচেয়ে বিচলিত হওয়ার ঘটনা হবে। এটা এখন কোন কল্পনা নয়। চিনের জুয়াঙঝো প্রদেশের সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ে জুনিজু হুয়াং ও তার সহকর্মীরা সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন যে তারা মানব-ভ্রুণে বেটা-থ্যালাসেমিয়া রোগের পেছনে যে জিনের ত্রুটি আছে তা ঠিক করার জন্য সফলতার সাথে জিন সম্পাদনা ব্যবহার করেছেন। এ রোগটি প্রাণঘাতী রক্তের ব্যাধী, আর গবেষকরা এ ত্রুটি সংশোধন করেছেন মান ভ্রুণে। যদিও কিছু কিছু ভ্রুণে এ চিকিৎসাটি পূর্ণ সাফল্যের মুখ দেখেছে, কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হয় নি বা জিনোমের অন্য স্থানে অযাচিত মিউটেশন তৈরি হয়েছে। তবুও মনে হচ্ছে এসব সমস্যা বশীভূত করা সম্ভব। আর গুজব শোনা যাচ্ছে যে চিন ও যুক্তরাষ্ট্রে বেনামী গবেষকরা প্রযুক্তিটির উন্নয়নের জন্য মানব ভ্রুণের ওপর এ রকমের গবেষণা চালাচ্ছেন।

আমরা আপাতত ধরে নিতে পারি যে এসব গবেষণায় পরিবর্তিত ভ্রুণ মানব-জরায়ুতে প্রথিত করার কোন অভিপ্রায় নেই। আমি যেসব বিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলেছি তাদের কেউই মনে করেন না যে এ মুহূর্তে জেনেটিক-রোগ সারানো উদ্দেশ্যে জিন সম্পাদনা ব্যবহার করে মানব ভ্রুণের জিনোম বদলানো ঠিক হবে। তবে অনেকেই মনে করেন সময়ের সাথে সাথে এটা ঘটবে। উতাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডানা ক্যারোল আমাকে যেমনটা বললেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে ভ্রুণের জিন সম্পাদনা যদি চিকিৎসা-কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাহলে আমি অবাক হবো না। তবে তা বহু বছর পরের কথা। আমার মতামত হলো বর্তমানে কারোরই এ প্রচেষ্টা চালানো উচিত নয়। আমাদের অজস্র প্রযুক্তিক, চিকিৎসা ও সামাজিক সমস্যা পড়ে আছে জিন সম্পাদনার ব্যবহার বৈধতা নির্ধারণের আগে।’ ভিন্নভাবে বলতে গেলে, সেতুর সীমানায় পৌঁছালে তা পার হওয়া যাক, তার আগে নয়।

জিন সম্পাদনার মাধ্যমে কি কোন ব্যক্তির জেনেটিক গঠন ‘উন্নয়ন’-এর জন্য কখনো ব্যবহৃত হতে পারে? বলা যায়, ব্যবহার না করার কোন কারণ নেই। প্রতিরোধী-চিকিৎসার একটি রূপ হিসেবে মানব ভ্রুণে জিন সম্পাদনা অনুমোদিত হবে এরকম ভেবে জাপানে হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবনীতিশাস্ত্রজ্ঞ তেৎসুয়া ইশি আশঙ্কিত। তিনি বলেন, ‘যেসব দেশে আইনপ্রয়োগ শিথিল সেখানে ফরমায়েশি বাচ্চা জন্মদানের পিচ্ছিল রাস্তা হতে পারে এটি (মানব ভ্রুণে জিন সম্পাদনা)’। তিনি এও যুক্ত করেন যে তা হয়তো অমানবিক কোন বিশ্বের শুরু করবে। তবে অন্যরা বিষয়টি গোলাপী রঙে দেখেন। ম্যানসেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবনীতিশাস্ত্রজ্ঞ জন হ্যারিস জোড় দেন যে মানব-ভ্রুণে ব্যবহারের আগে জিন সম্পাদনাকে যথেষ্ট নিরাপদ অবস্থায় আসতে হবে। কিন্তু তিনি এও বলেন যে, ‘যদি আমরা রোগ-ব্যাধীর বিরুদ্ধে অধিক প্রতিরোধী হই, জখম সারাতে হই স্থিতিস্থাপক, আমাদের বৌদ্ধিক শক্তি বাড়ে, কিংবা জীবন দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়, তাহলে আমি কোন কারণ দেখি না তা না করার (মানব-ভ্রুণে জিন সম্পাদনা ব্যবহার করার)’

জিন সম্পাদনায় এখন অজস্র খুঁটিনাটি প্রযুক্তিক জটিলতা রয়েছে যাদের পরাস্ত করতে হবে। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, সাইজেফ্রিনিয়ার মতো প্রচলিত ব্যাধির সাথে সাথে বাহ্যিক চেহারা, খেলায় বা সঙ্গীতে সামর্থ্য, মেজাজ ও বুদ্ধিমত্তার মতো মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো ক্রমেই ভীষণ জটিল হয়ে পড়ছে। ব্যক্তি-মানুষকে জিন সম্পাদনার মাধ্যমে উন্নত করা কোন রাতারাতি প্রক্রিয়া হওয়া মোটামুটি অসম্ভব। তবুও মানব জিনোম কিভাবে কাজ করে সে বিষয়ে আমাদের উপলদ্ধি আর কিভাবে তাদের বদলাতে হয় সে সক্ষমতা – এ দুইটিই তীব্রগতিতে বেড়ে চলছে। নিজেরা বুঝে ওঠার আগেই আমরা হয়তো অনেকগুলো সেতু অতিক্রম করে ফেলবো। জন পেরিংটন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মলিকুলার এন্ড  সেলুলার ফার্মাকোলজি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক। তার সাম্প্রতিক বই হলো দ্যা ডিপার জিনোম (২০১৫)। লেখাটি Aeon-এ প্রকাশিত Making the cut-এর ভাষান্তর।


[1]        ডিএনএ-র মধ্যে কৃত্রিম ভাবে অন্য কোন জীবের জিন প্রবেশ করিয়ে জিন কন্সট্রাক্ট তৈরি করা হয়

জন পেরিংটন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মলিকুলার এন্ড  সেলুলার ফার্মাকোলজি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক। তার সাম্প্রতিক বই হলো দ্যা ডিপার জিনোম (২০১৫)। লেখাটি Aeon-এ প্রকাশিত Making the cut-এর ভাষান্তর। অনুবাদটি আমার বই প্রাণের বিজ্ঞান: সাম্প্রতিক জীববিজ্ঞানের ভাবনা ভাষান্তর (২০১৭) থেকে নেয়া।


২ thoughts on “ক্রিসপার ও জিনোম সম্পাদনা”

  1. Pingback: পৃথিবীর সব জিনোম-তথ্য নিয়ে আমরা যা করতে পারি - বিজ্ঞান ব্লগ

  2. Pingback: জীন থেরাপি

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

গ্রাহক হতে চান?

যখনই বিজ্ঞান ব্লগে নতুন লেখা আসবে, আপনার ই-মেইল ইনবক্সে চলে যাবে তার খবর।