অণুজীবদের কি নৈতিকতা আছে?

মানুষের বিবেক আছে। মানে আমরা কোন কিছু করার আগে ভালো মন্দ চিন্তা করি। তারপর আমাদের মানসিক অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিই। খারাপ মানুষ হয়তো কারো ক্ষতি করার সিদ্ধান্ত নেয় আর ভালো মানুষ অন্যের উপকারের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই হিসেবে আমরা কোন মানুষকে ভালো কিংবা খারাপ মানুষ বলি। তার কাজকেও আমরা ভালো কাজ কিংবা খারাপ কাজ বলতে পারি। যেসব জীব অতি ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক তাদের কি এই বিবেক ও নৈতিকতা আছে। এখানে কথা বলছি অণুজীবদের নিয়ে।

অণুজীব কাকে বলে তা আমরা সবাই জানি। যেসব জীবকে খালি চোখে দেখা যায় না এবং দেখার জন্য অণুবীক্ষণ যন্ত্রের দরকার হয় তাদেরকে আমরা অণুজীব বলতে পারি। যেমন ব্যাকটেরিয়া, প্রটোজোয়া। এরা কি আসলে আসলে আমাদের বন্ধু নাকি শত্রু। আর তারা যা করে সেটা কি ওরা বুঝে করে? একটা সময় ছিলো যখন মানুষ মনে করতো অণুজীব মানেই জীবাণু। তারা আমাদের শত্রু। আমাদের রোগ সৃষ্টির কারণ। আমাদের ফসলের ক্ষতির কারণ। কারণ ঐ সময় অণুজীবের ভালো দিকগুলো তখনও আবিষ্কার হয় নি। তখন প্লেগের মতো মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ মারা যেত। তাই স্বাভাবিকভাবেই মানুষ অণুজীবকে নিজের শত্রু হিসেবে ভেবে নিয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে যতই চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং অণুজীববিজ্ঞান এগোতে থাকলো মানুষ অণুজীবের অনেক উপকারী দিকের কথা জানতে পারলো। সাথে এটাও জানলো যে বেশীরভাগ অণুজীবই আমাদের জন্য উপকারী। অল্পকিছু অণুজীব আমাদের ক্ষতি করে থাকে। তখন মানুষ আবার অণুজীবকে নিজের বন্ধু মনে করা শুরু করলো। কিন্তু অণুজীব কী আসলেই সচেতনভাবে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অণুজীব কী মানুষের বন্ধু নাকি শত্রু। এ বিষয়গুলো বোঝার জন্য আমাদের বোঝা দরকার অণুজীব আসলে কীভাবে কাজ করে।

আমাদের পাকস্থলীতে যেসব অণুজীবের বসবাস তারা আমাদের জন্য উপকারী। এরা হজমে সাহায্য করে। ভিটামিন তৈরি করে দেয়। কিন্তু এই অণুজীবরাই যদি আমাদের রক্তে এসে পড়ে তাহলে তা আমাদের জন্য মরণঘাতি হতে পারে। রক্তে অণুজীবের সংক্রমণকে সেপসিস (sepsis) বলে যা কিনা খুবই সাংঘাতিক। তাহলে দেখা যাচ্ছে একই অণুজীব যে কি না পাকস্থলীতে আমাদের জন্য উপকারী ছিলো তারা পাকস্থলীতে কোন ছিদ্র হওয়ার কারণে যদি আমাদের রক্তে এসে যায় তখন তারা আমাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

আবার আমাদের পাকস্থলীতে থাকে এরকম আরেকটা ব্যাকটেরিয়া হলো হেলিকোবেক্টার পাইলোরি (Helicobacter pylori)। এই ব্যাকটেরিয়ার কারণে আলসার এবং পাকস্থলীর ক্যান্সার হয়। কিন্তু এই ব্যাকটেরিয়াই আবার অনেক ক্ষেত্রে অন্ননালীর ক্যান্সার থেকে আমাদের রক্ষা করে। তাই দেখা যাচ্ছে একই ব্যাকটেরিয়া একই দেহে রোগ সৃষ্টি করছে আবার অন্য রোগ থেকে রক্ষা করছে। এখন আপনি হেলিকোবেক্টার পাইলোরি কে কী বলবেন? ভালো ব্যাকটেরিয়া নাকি খারাপ ব্যাকটেরিয়া।

আমাদের নাকে এমনিতেই স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিমোনিয়া (Streptococcus pneumoniae) থাকে কিন্তু কোন রোগ সৃষ্টি করে না। কিন্তু এই ব্যাকটেরিয়াটি যখন শরীরের অন্য জায়গায় চলে যায় তখন আমাদের রোগ সৃষ্টি করে। যে অণুজীবটি আমাদের নাকে কোন রোগ সৃষ্টি করছে না সেই অণুজীবটিই শরীরের অন্য জায়গায় আমাদের রোগের কারণ হচ্ছে।

আমরা সবাই বিটি বেগুনের কথা জানি। বিটি বেগুন একটি জেনেটিক্যালি মোডিফাইড ফুড (জিএমও)। এতে ব্যাসিলাস থুরিয়েঞ্জেন্সিস নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার একটা জিন দেয়া হয়। এর ফলে ফসল পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পায় কারণ এই ব্যাকটেরিয়াটি বিটি টক্সিন বিষের মাধ্যমে পোকার পাকস্থলীর প্রাচীর ছিদ্র করে ফেলে। কিন্তু পোকার অন্ত্রে এমনিতেই কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে। যেহেতু তারা উপকারী ব্যাকটেরিয়া এদের বিটি টক্সিনকে প্রতিরোধ করার কথা। কিন্তু দেখা যায় এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোই বিটি টক্সিনকে সাহায্য করে। কারণ পাকস্থলীর প্রাচীর ছিদ্র হলে এসব উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোই রক্তে আসতে পারে যা তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। এতে পোকার মৃত্যু হয়। যে অণুজীব পোকার পাকস্থলীতে উপকারী ছিলো তারাই রক্তে এসে তার মৃত্যুর কারণ হয়।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি কোন অণুজীব আসলে উপকারী কিংবা অপকারী কোনটাই নয়। ক্ষতিকর ও উপকারী অণুজীব দুটিই একইভাবে কাজ করে। দুই ধরণের অণুজীবকেই প্রথমে শরীরের নির্দিষ্ট অংশের সাথে সংযুক্ত হতে হয়। তারপর তারা তাদের টিকে থাকার এবং বংশবৃদ্ধি করার কাজ শুরু করে। এখন অণুজীবটি আমাদের জন্য ক্ষতিকর নাকি উপকারী হবে এটা নির্ভর করে অণুজীবটি কোথায় আছে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর। কোন অণুজীব যখন আমাদের শরীরে থাকে তখন সে কোন নৈতিকতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না। ব্যাপারটা কখনই এমন নয় আমি মানুষের উপকার করবো কিংবা অপকার করবো। তারা এভাবে কাজ করে না। অণুজীবরা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো কোন পরিবেশে টিকে থাকা এবং বংশবৃদ্ধি করা। এই দুইটি বিষয় করার জন্য তাদের যা করা লাগে তারা সেটাই করবে। এতে মানুষের উপকার হতে পারে আবার অপকারও হতে পারে। আমরা দেখেছি কোন কোন অণুজীব শরীরের এক জায়গায় উপকারী হলেও সেই একই অণুজীব অন্য জায়গায় ক্ষতিকর হিসেবে দেখা দেয়। এর মূল কারণ নৈতিক নয় বরং এর পেছনে মূল কারণ হলো তাদের জৈবিক অবস্থা। এজন্যই সামুদ্র বিজ্ঞানী ফরেস্ট রহওয়ার বলেছেন, “তারা (অণুজীবরা) আপনার ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। এটা কোন ভালো সম্পর্ক নয়। এটা শুধু মাত্রই জীববিজ্ঞানের কারসাজি”।

আমরা নিয়মিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনপ্রিয়-বিজ্ঞান ও গবেষণা-ভিত্তিক লেখালেখি করি বিজ্ঞান ব্লগে। এছাড়া আমাদের লেখকেরা বিভিন্ন সময় বিজ্ঞান-বিষয়ক বইও প্রকাশ করে থাকেন। ই-মেইলের মাধ্যমে এসব খবরা-খবর পেতে নিচের ফর্মটি ব্যবহার করুন। ।

লিখেছেন সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ

অজানাকে জানার চেষ্টা সবসময় রোমাঞ্চকর ও আনন্দের। সেই আনন্দ পাবার লোভে বিজ্ঞান নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করার চেষ্টা করি ।অণুজীববিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করেছি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছি একই বিষয়ে। https://www.facebook.com/syedmonzur.morshed

সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 22 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.