মানবদেহ কি অনুজীবের বিচরণভূমি?

আমাদের দেহের গাঠনিক উপাদানের কথা চিন্তা করলে আসবে অস্থি-তরুণাস্থি সমন্বিত শিরা-উপশিরা, লসিকাতন্ত্র, পরিপাক তন্ত্র, রেচনতন্ত্র, নিউরন-পেশী ইত্যাদির সংমিশ্রণে গঠিত এক জটিল গাঠনিক ক্রিয়াকলাপ৷ অর্থাৎ, মানবদেহ আর যাই হোক মোটেও কোন সহজ কাঠামো নয়৷ আর, অণুজীববিজ্ঞানীদের চোখে দেখলে হবে নানা ধরণের অনুজীবের সমাহারে গঠিত মানবদেহ ৷ তবে এটা মোটেও কোন নিছক খেলার বিষয়বস্তু নয়।  বিষয়টা অনেকটা এমন — আপনি যদি কোন রসায়নবিদের কাছে যান তিনি আপনাকে সবকিছুতে ক্রিয়া-বিক্রিয়া দেখাবে, পদার্থবিদের কাছে অণু-পরমাণুর খেলা, গণিতবিদের কাছে লাভ-ক্ষতির হিসাব, দার্শনিকের কাছে গেলে সব কিছুতে দার্শনিক যুক্তি মিলাবে৷

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আপনার দেহের অর্ধেকেরও বেশি মানব অংশ নয়। হ্যা, শুনতে অদ্ভুত হলেও তা সত্যি।  মানব কোষগুলি দেহের মোট কোষ গণনার মাত্র ৪৩ ভাগ। অর্থাৎ, বাকি ৫৭ ভাগই হলো দেহকোষ নয়। বাকি ৫৭% আসলে খালিচোখে দেখতে না পাওয়া অণুবীক্ষণ বসতি। আমাদের এই গোপন বাকি অংশটি বোঝা মানে হলো মাইক্রোবায়োমের (দেহের অণুজীব) ধারণা। ক্ষেত্রটি এমনকি “মানুষ” হওয়ার অর্থ কী তা নিয়েও প্রশ্ন জাগায় এবং ফলস্বরূপ নতুন উদ্ভাবনী চিকিৎসার দিকে পরিচালিত করে।

 ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের মাইক্রোবায়োম বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক প্রফেসর রুথ লে বলেছেন, “আপনার শরীর কেবল আপনি নন। অণুজীব আপনার স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য “

আপনি যতই ভালভাবে ধুয়ে ফেলেন না কেন, আপনার দেহের প্রায় প্রতিটি ফাঁক-ফোকরই অণুবীক্ষণিক প্রাণীগুলিতে ভর্তি থাকে। যার মধ্যে রয়েছে ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক এবং আর্কিয়া (যদিও অণুজীবগুলি শুধু ব্যাকটিরিয়া হিসাবে ভুল বলা হয়)। আর এই অণুবীক্ষণিক জীবনের সর্বাধিক ঘনত্ব হলো আমাদের অক্সিজেন-বঞ্চিত অন্ত্রের অন্ধকার নিস্তেজ গভীরতম অংশ।

ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়েগো বিশ্ববিদ্যালয়ের  প্রফেসর রব নাইট বিবিসিকে বলেছিলেন : “আপনি মানুষের চেয়ে বেশিই অণুজীব।”  

মূলত আমাদের কোষগুলির সংখ্যা অণুজীবের দশ ভাগের এক ভাগ বলেই মনে করা হত। পরবর্তীতে, একে ১:১ এর সাথে খুব কাছাকাছি সংশোধন করা হয়।  যার বর্তমান অনুমান দাড়ায় যদি আপনি সমস্ত কোষ গণনা করেন তবে আপনি প্রায় ৪৩% মানুষ হবেন।  কিন্তু জেনেটিকালি আমরা আরও বেশি ছাপিয়ে গিয়েছি।  মানব জিনোম  অর্থাৎ, মানুষের দেহ পরিচালনার জন্যে জিনগত নির্দেশাবলীর সম্পূর্ণ সেট বলতে প্রায় বিশ হাজারের মত নির্দেশনাকে “মানব জিন” বলা হয়। তবে, মাইক্রোবায়োমের (দেহে বাসকারী অণুজীব) সাথে এই মানবজিনোমকে একসাথে যুক্ত করলে সংখ্যাটি দুই থেকে দুই কোটি মাইক্রোবিয়াল জিনের মধ্যে আসে।

ক্যালটেকের অণুজীব বিশেষজ্ঞ, প্রফেসর সারকিস মাজমানিয়ান যুক্তি দেখান: “আমাদের কেবল এক জিনোম নেই, মাইক্রোবায়োমের জিনগুলি মূলত দ্বিতীয় জিনোম হিসাবে কাজ করে যা, আমাদের নিজস্ব ক্রিয়াকলাপকে আরো বাড়িয়ে তোলে।  আমাদেরকে যা মানুষ করে তোলে তা হল আমাদের নিজস্ব DNA এবং আমাদের অন্ত্রের অণুজীবগুলির DNA-এর সংমিশ্রণ।”  

 DNA সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা সারা শরীরে এবং এর ভিতরেও অসংখ্য মাইক্রোবিয়াল সম্প্রদায় আবিষ্কার করেছেন। এটা সহজভাবে ভাবতে হবে যে, আমরা এতটা মাইক্রোবিয়াল উপাদান বহন করি যা কোন মিথষ্ক্রিয়া বা আমাদের দেহে কোন প্রভাবও ফেলে না৷ এই মাইক্রোবায়োম (অণুজীব) আমাদের  হজম, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ, রোগের বিরুদ্ধে রক্ষা এবং অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন তৈরিতে ভূমিকা পালন করে যা বিজ্ঞান দ্রুত উন্মোচন করছে। 

প্রফেসর নাইট অণুজীবের ব্যাপকতা সম্পর্কে বলেছেন: “আমরা এমন উপায় খুঁজে পাচ্ছি যে এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলি আমাদের স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি এমনভাবে রূপান্তরিত করেছে যা আমরা কখনই কল্পনাও করি নি।” 

আমরা একা নয় বরং বহন করছি অণুজীবের জঙ্গল 

মানবদেহ হল অণুজীবের আধার। শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত মাইক্রোবায়োম (অণুজীব) আমাদের রোগ তৈরীতে কিংবা প্রতিরোধে জটিল ভূমিকা পালন করে৷ বিষয়টা আরেকটু খোলসা করা যাক। 

শুরুতে ত্বকের কথায় আসি যা আমাদের প্রথম বহি:প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলা যায়৷ কেননা এই ত্বক’ই  বাহিরের পরিবেশ থেকে ভেতরের সকল অঙ্গকে রক্ষা করে। ত্বকে যে পরিমাণ প্রয়োজনীয় অণুজীব রয়েছে তা শুধু ক্ষতি থেকেই রক্ষাই করে না বরং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। ত্বকের কিছু অণুজীব বিভিন্ন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পদার্থ তৈরী করে যা অন্যান্য প্রজাতির উপনিবেশ তৈরীতে বাঁধা দান করে । কিছু গবেষণাতে দেখা যায় যে, ত্বকের Staphylococcus epidermis প্রজাতি ত্বক-ক্যান্সার থেকে রক্ষা করতে পারে। 

এরপর মানুষের মুখের কথায় ধরি। মানুষের মুখে প্রচুর পরিমাণে অণুজীব রয়েছে। বলা হয়ে থাকে আমাদের মুখে পায়ুনালী থেকেও অধিক অণুজীব বিদ্যমান। কিছু ভাল, তবে কিছু দাঁত ক্ষয়ের মতো বিষয়গুলি ঘটাতেও পারে। যেমন: Streptococcus mutans, Porphyromonas gingivalis ইত্যাদি।

পূর্বে ফুসফুসকে অণুজীবমুক্ত পরিবেশ হিসাবে ভাবা হলেও, বর্তমানে দেখা গেছে ফুসফুসেরও নিজস্ব মাইক্রোবায়োম রয়েছে। গবেষকরা জানতে পেরেছেন যে, COPD এবং সিস্টিক ফাইব্রোসিসের মতো শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের ফুসফুসে সুস্থ মানুষের তুলনায় অণুজীবের বৈচিত্র্য কম। ফুসফুসে বাস করা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় : Streptococcus, Prevotella, Veillonella ইত্যাদি। 

আসলে অণুজীব থেকে কোনভাবেই লুকানো সম্ভব না। নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত অন্ধকার-আর্দ্র  অঞ্চলেও বিভিন্ন ধরণের অণুজীব রয়েছে। মজার বিষয় হল, নির্দিষ্ট কিছু প্রোবায়োটিক (উপকারী অণুজীব) খাবার ফলেই আবার গোপন অঙ্গের সংক্রমণ থেকে মুক্তি মেলে । যেমন: সুস্থ নারীদের যোনিতে Lactobacillus (L. fermentum, L. rhamnosus, L. gasseri) এর আধিপত্য থাকে, যা pH কমিয়ে দেয় এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। 

চোখ সম্পর্কে আমাদের ধারণা কেমন? অণুজীব মুক্ত? না, অণুজীবের জন্যে মানুষের চোখও একটি আদর্শ আবাসস্থল। চোখে অণুজীবের বসবাসের অনন্য বাস্তুতন্ত্র যে ভূমিকা পালন করে তা চোখের রোগের চিকিৎসাতেও ভূমিকা রাখে। অণুজীবেরা কর্নিয়া এবং কনজেক্টিভাতে (চোখের পাতার ভিতরের টিস্যু) একটি বসত তৈরি করে। যদিও এই মাইক্রোবায়োম তুলনামূলকভাবে ছোট (কেবলমাত্র ৪টি ব্যাকটিরিয়া প্রজাতি), এই বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতা চোখের পানি শুকানো রোগ এবং এন্ডোফথালমিটিসের (চোখের প্রদাহ) মতো রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। 

আমাদের নিঃশ্বাসের জন্যে নাক হলো একমাত্র অবলম্বন৷ কিন্তু, নাকের গহ্বর অন্ধকার, উষ্ণ এবং স্যাঁতসেঁতে হওয়াতে এটি জীবাণুদের জন্যে উপযুক্ত একটি পরিবেশ। নাকে উপস্থিত অণুজীবের বাস্তুতান্ত্রিক অসমতা হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী সিনুসাইটিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং ব্রোঙ্কিওলাইটিসের সাথে সংযুক্ত। আশ্চর্যের বিষয় হল, গবেষকরা সম্প্রতি দেখেছেন এ সমস্যাতে Lactobacillus (প্রোবায়োটিক ব্যাকটিরিয়া) নাকের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে স্বাস্থ্যের উন্নতিতে অবদান রাখে। 

আবার, টনসিলের সাথে মোটামুটি আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। ঠান্ডা লাগলে অনেকেরই এ উপসর্গ ধরা দেয়৷ মুলত মুখ কিংবা নাক দিয়ে প্রবেশকৃত ক্ষতিকর অণুজীব (যেমন:Streptococcus pyogenes) গুলো আটকে যাওয়ার ফলে টনসিলের সৃষ্টি হয়। এরপর অ্যান্টিবডি তৈরী করে সেগুলোকে ধ্বংস করে দেহে প্রবেশে বাঁধা দিয়ে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে এই টনসিল। আর একাজে সাহায্য করতেও অণুজীবের বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্যতা রয়েছে৷ 

মাতৃত্বের ব্যাপারটাতে আসা যাক। শিশুদের জন্যে মায়ের দুধ তার সুস্থতা বিকাশে দারুন অবদান রাখে। কেননা, এতে পুষ্টি উপাদান, রোগ-প্রতিরোধী কোষ এবং প্রিবায়োটিক (উপকারী অণুজীবযুক্ত খাদ্য) থাকে যা কিনা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারে সহায়তা করে। যা শিশুর অন্ত্রের বিকাশে মানে হজমে সহায়ক ভূমিকা পালন করে৷ এমনকি মায়ের ওজনও বুকের দুধে উপস্থিত মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্যতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে৷ একটা গবেষণাতে দেখা যায়, স্বাভাবিক ওজনের মহিলাদের তুলনায় অধিক ওজনের মহিলাদের মাইক্রোবায়োম কম বৈচিত্র্যময়। এমনকি প্রসবের পদ্ধতি এবং হরমোনগত পরিবর্তনও মায়ের বুকের দুধে উপস্থিত ব্যাকটিরিয়া দ্বারা প্রভাবিত৷ 

যদি আপনার নাভিতে কিছুটা পাকা গন্ধ পাওয়া যায় সেটা কি কারণে বলতে পারবেন? এর কারণ হলো এই নাভির মাইক্রোবায়োম। নাভিতে কি পরিমাণ অণুজীব প্রজাতির ভিন্নতা দেখা যায় তার পরীক্ষার জন্যে ৬০টি নাভি থেকে দেখা যায় ২,৩৬৮ টি ভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া! আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এখানে এমন কিছু প্রজাতিও দেখা যায়, যা জাপানের মাটিতে এবং বরফের উপরিভাগে বাস করে এমন অণুজীব ৷ অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ২০১৩ সালে ক্রিস্টিনা আগাপাকিস এবং ঘ্রাণ বিশেষজ্ঞ সিসেল তোলাস নাভির অণুজীব দিয়ে সুগন্ধি পনির তৈরী করেছিল। হয়ত এরকম জানলে আপনি পনিরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন কিন্তু বিষয়টা অবাক করার মত বটে। 

অণুজীবের সাথে অমর প্রেম

চিত্র: দেহের নির্দিষ্ট স্থানে ব্যাকটেরিয়া ও  ভাইরাসের সংক্রামণ 

অণুজীবের মানবদেহে ইতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাবও কিন্তু ফেলে দেবার মত নয়৷ কিন্তু, ইতিবাচক প্রভাবই বেশি বলতে হবে। কেননা, গুটিবসন্ত, যক্ষা, নিউমোনিয়া কিংবা ত্বকের ইনফেকশন নানাবিধ ভয়াবহ রোগ অণুজীবের মাধ্যমে হলেও এর প্রতিরোধের অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভ্যাকসিন নামক অস্ত্র আবার অণুজীব থেকেই তৈরী করা হয়৷ অর্থাৎ, মানবদেহ এবং অণুজীবের সম্পর্ক কোন সাধারণ ব্যাপার নয় বরং প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক থেকেও গভীর৷ প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কে বিচ্ছেদ হতে পারে কিন্তু অণুজীবের সাথে সম্ভব নয়৷

তথ্যসূত্র: 

১. More than half your body is not human

২. how modern life has damaged our internal ecosystems

৩. 11 Crazy Places Where Bacteria Live On And Inside Your Body

৪. We Are Never Alone: Living with the Human Microbiota

৫. https://www.youtube.com/watch?v=4BZME8H7-KU

১ thought on “মানবদেহ কি অনুজীবের বিচরণভূমি?”

  1. সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ

    বুলেট স্পিডে পড়ে ফেললাম। ভালো হয়েছে।

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

গ্রাহক হতে চান?

যখনই বিজ্ঞান ব্লগে নতুন লেখা আসবে, আপনার ই-মেইল ইনবক্সে চলে যাবে তার খবর।