মহাবিশ্বের চতুর্থ মাত্রা

পাঠসংখ্যা: 👁️ 262

আমাদের মহাবিশ্বে কোনো বস্তুর অবস্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য চারটি মাত্রা বা রাশির প্রয়োজন।কোনো বস্তুর অবস্থান বোঝার জন্য অন্তত সেগুলোর মান জানা থাকা দরকার। এই চারটি মাত্রা স্থান ও কালের সমন্বয়ে গঠিত। আমাদের পরিচিত স্থানের রয়েছে তিনটি মাত্রা। যথা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা। স্থানের এই তিনটি মাত্রাকে আমরা স্থানাঙ্কের সাহায্যে চিন্তা করতে পারি।

কোনো বস্তুর স্থানাঙ্ক বলতে সেটির অবস্থানকে বোঝায়। কোনো বস্তুর অবস্থান বোঝার জন্যে আমাদের একটা প্রসঙ্গ কাঠামো দরকার। পরস্পরকে সমকোণে ছেদ করা এমন দুইটি সরলরেখা নিয়ে একটা প্রসঙ্গ কাঠামো ভাবা যেতে পারে। এই কাঠামোতে একটি রেখাকে আনুভূমিক এবং এর সাথে উলম্ব রেখাটিকে উলম্ব অক্ষ ধরা হয়। এখানে আনুভূমিক রেখাটি কোনো বস্তুর দৈর্ঘ্য এবং উলম্ব রেখাটি প্রস্থকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ এটি একটি দ্বিমাত্রিক কাঠামো। এখন এই কাঠামোর লম্ব বরাবর আরেকটি অক্ষ যুক্ত করলেই সেটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো তে পরিণত হবে। নতুন এই অক্ষটি উচ্চতাকে নির্দেশ করবে। কোনো ঘরকে আমরা একটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো ভাবতে পারি কিন্তু ঘরের মেঝেটা হবে একটি দ্বিমাত্রিক কাঠামো। কোনো বস্তুর অবস্থান এই তিনটি মাত্রার সাহায্যে সঠিকভাবে জানা যায়।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক একটি ঘর হতে উত্তর দিকে ৭ মিটার দূরে একটি নারকেল গাছ আছে। গাছটির উচ্চতা ১৫ মিটার। এখন যদি গাছে একটি নারকেলের অবস্থান জানতে চাওয়া হয় তাহলে বলা যায় ঘর হতে উত্তর দিকে ৭ মিটার দূরে ১৫ মিটার উঁচুতে। এখানে দুটি মাত্রা ব্যবহার করে অবস্থান বলা হয়েছে।

অবস্থানটি আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে আরও দুটি মাত্রা আসবে। ধরা যাক গাছটি একটি আইল দিয়ে ঘেরা মাঠে রয়েছে। এখন আইল এর একটা কোনাকে মূলবিন্দু ধরে নিয়ে সেখান থেকে দুপাশে চলে যাওয়া দুটি আইলকে আনুভূমিক এবং উলম্ব অক্ষ ভাবা যাক। এবং সেই কোনা হতে অক্ষ দুটির লম্ব বরাবর উপরের দিকে আরেকটি অক্ষ ভাবা যাক যেটি ভূমি হতে নারকেল গাছের উচ্চতা নির্দেশ করে। নিচের ছবির মতো।

এখন যদি নারকেলটির অবস্থান বলা হয় তাহলে বলা যায় অনুভুমিক হতে ৫ মিটার, উলম্ব হতে ৭ মিটার দূরে এবং ভূমি হতে ১৫ মিটার উঁচুতে নারকেলটি রয়েছে। কিন্তু এই অবস্থান কিন্তু সার্বজনীন নয়। কারণ কিছু সময় পরে নারকেলটি গাছ হতে ঝড়ে পড়লে নারকেলটির অবস্থান কিন্তু পরিবর্তন হবে। তার মানে এই না যে প্রথম অবস্থানটি ভূল ছিল। অর্থাৎ কিছু সময় অতিক্রান্ত হবার পরে এর অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। সুতরাং দেখা গেল কোনো বস্তুর সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে স্থানের তিনটি মাত্রার সাথে সময় নামক আরেকটি বিষয় উল্লেখ করলে সেটি আরো সঠিক হয়। এই সময়ই হলো আমাদের সেই চতুর্থ মাত্রা। স্থান-কালের এই চার মাত্রার ধারণা সর্বপ্রথম দেন হারমান মিনকোভস্কি।

হারমান মিনকোভস্কি

তিনি আইনস্টাইনের শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীকালে আইনস্টাইন এই ধারণাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। এর আগে নিউটনীয় গতিবিদ্যায় সময়কে পরম ভাবা হতো। কিন্তু আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতা তত্ত্বে দেখান যে গতিশীল মাধ্যমে সময় ধীরে চলে। অর্থাৎ গতিশীল কাঠামোতে বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করতে সময়ের মাত্রাটি দরকার। এভাবেই স্থান আর কালের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

আলবার্ট আইনস্টাইন

গতিশীল মাধ্যমে যে সময় ধীরে চলে তার একটা বাস্তবিক উদাহরণ হচ্ছে মিওউন কণার গতি। প্রতিদিন মহাকাশ হতে নানা রকমের রশ্মি পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে। সেসব রশ্মি বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে যাবার সময় সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তখন মিওউন কণাদের জন্ম হয়। মিওউন কণারা আলোর বেগের প্রায় কাছাকাছি বেগে (০.৯৯৯৫ গুণ) ছুটে আসে। এদের আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড। এই সময়ে এরা প্রায় ৬৬০ মিটার পথ অতিক্রম করতে পারবে।

আসলে মিওউনের আয়ু তার নিজের কাছে ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড। কিন্তু আমাদের কাছে সেটা ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড মনে হবে। অর্থাৎ ৩০ গুণ বেশি। তাই সে অতিক্রমও করবে ৩০ গুণ বেশি দূরত্ব। এর কারণ মিওউন আর আমাদের কাঠামো পরস্পরের সাপেক্ষে চলমান কাঠামো। আর তাই মিওউন কণার কাল বা সময় দীর্ঘায়ন হয়েছে।

সময় ভ্রমণ কি সম্ভব?

মিওউন কণাদের কিন্তু সময়কে উপলব্ধি করবার ক্ষমতা নেই। কিন্তু মানুষের সেটা আছে। অন্যান্য প্রাণীদের সেটা তুলনামূলক কম। মানুষ সময়কে কেবল উপলব্ধি নয় রীতিমত নিয়ন্ত্রণ করে সময়ের আগে চলবার স্বপ্নও দেখে। যদিও সময় যে একটা মাত্রা সেটা কিছুদিন হলো মানুষ জানতে পেরেছে, কিন্তু সময়কে ভ্রমণ করার একটা আকাঙ্ক্ষা সে অনেক আগে থেকেই মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে।

সেই ৮ম শতকের গোঁড়ার দিকে লেখা জাপানি রূপকথায় একজন জেলে উরাশিমা তারো সময় ভ্রমণ করেছে। বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মগ্রন্থেও সময় ভ্রমণের উল্লেখ আছে। সময় ভ্রমণকে নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক বিজ্ঞান কল্পগল্প। কিন্তু আসলেই সময় ভ্রমণ সম্ভব কিনা সে নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। এ বিষয়টি বিজ্ঞানের এক রহস্যময় প্যারাডক্স।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব হতে ভবিষ্যতে ভ্রমণের একটা সম্ভাবনা বেরিয়ে আসে। কোনো ব্যক্তি যদি আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছুটতে পারে তাহলে সে সময়ের আগে যেতে পারবে। কেউ যদি মহাকাশে এ রকম বেগে ঘুরতে যায় তাহলে ফিরে এসে দেখবে পৃথিবীতে অনেক বছর পার হয়ে গেছে।যারা কিনা তার সমবয়সী ছিল সে এসে দেখবে তারা বৃদ্ধ হয়ে গেছে কিন্তু তার বয়স খুব কম বেড়েছে। বিজ্ঞানে এই বিষয়টি টুইন প্যারাডক্স নামে পরিচিত।

তবে তার জন্য তাকে আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগে ছুটতে হবে। কারো পক্ষে এত গতিতে ছোটা সম্ভব নয় তার কারণ এতে তার ভর অসীম হয়ে যাবে। সেটাও বাস্তবিক নয়, মানে সম্ভব নয়। সেজন্য আইনস্টাইন নিজেই ভবিষ্যৎ ভ্রমণের সম্ভাবনাকে বাতিল করে দিয়েছেন।

কিন্তু তাই বলে সময় ভ্রমণ পিপাসু মানুষেরা এ নিয়ে গবেষণা থামিয়ে রাখেনি। বার্কহার্ড হেইম নামের একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী সময় ভ্রমণ নিয়ে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন তার হাইপারস্পেইসড্রাইভ তত্ত্ব দিয়ে। তিনি বলেন এ জন্যে আমাদের অতিরিক্ত মাত্রা নিয়ে ভাবতে হবে। তার মতে এই মহাবিশ্বকে কেবল স্থান কালের চারমাত্রা দিয়ে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। এ জন্যে আমাদের একীভূত তত্ত্ব  দরকার। এবং তখন আমাদের আলোর আগে ছুটতে পারার সম্ভাবনা সামনে এগিয়ে যাবে। মিগুয়েল অ্যালকিউবার নামে একজন মেক্সিকান পদার্থবিজ্ঞানী আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে একটা সমাধান দাঁড় করিয়ে দেখান যে আমরা যদি যথেষ্ট পরিমাণ ঋণাত্মক শক্তি তৈরি করতে পারি তাহলে আমরা আলোর বেগের চাইতে বেশি বেগে ছোটা মহাকাশযান তৈরি করতে পারব। এরকম আরও অনেক সমাধান আছে যেগুলো কিনা সময় ভ্রমণকে তাত্ত্বিকভাবে সমর্থন করে।

অ্যালকিউবার ড্রাইভের চিত্রায়ণ; ছবি সূত্রঃ wikipedia

এই তো গেল ভবিষ্যৎ ভ্রমণের ক্থা। কিন্তু যত বাঁধ সাধে অতীত ভ্রমণের বিষয়টি। অতীত ভ্রমণ বিজ্ঞান মহলে জন্ম দিয়েছে আরো কিছু প্যারাডক্স। যেগুলো অতীত ভ্রমণের বিষয়টিকে স্ববিরোধী বলে দাঁড় করিয়েছে। সবথেকে পরিচিত প্যারাডক্স হলো গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স। সেটি হচ্ছে, কেউ যদি অতীতে গিয়ে তার দাদা দাদীর বিয়ে  হবার আগেই তার দাদাকে মেরে ফেলে তাহলে তার জন্ম নেওয়াই সম্ভব নয়। তবে তার দাদা কে মেরে ফেলার জন্যে সে ভবিষ্যৎ থেকে এলো কী করে?

সেক্সুয়াল প্যারাডক্সে কোনো ব্যক্তি নিজেই নিজের পিতা হতে পারেন যেটা কোনদিন সম্ভব নয়। বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স বলে কোনো ঘটনা ঘটার জন্যে কারণ দরকার, কিন্তু কেউ ভবিষ্যৎ থেকে অতীত এ ঘুরতে গেলে সেখানে তার জন্য কোনো কারণ থাকবে না। এ রকম আরও অনেক প্যারাডক্সের জন্ম হয় অতীত ভ্রমণের ক্ষেত্রে। যেগুলো অতীত ভ্রমণকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ হিসেবে প্রতীয়মান করে।

তবে এর মাঝে কেউ কেউ বলছেন সময় ভ্রমণ আসলেই সম্ভব কিনা সেটা আসলে একটি কোয়ান্টাম গ্রাভিটি তত্ত্ব দাড় করানোর আগ পর্যন্ত বোঝা যাবে না।

তথ্যসূত্র
১. থিওরি অব রিলেটিভিটি, আবদুল গাফফার রনি
২. টাইম ট্রাভেল, হিমাংশু কর

বিজ্ঞাপন

Sujoy Kumar Das
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগে ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত।