সিস্টাইটিস : কীভাবে ব্যাকটেরিয়া মূত্রাশয়ে প্রবেশ করে

Share
   

Scientific American এ এস.ই.গল(S.E.Golds) নামক একজন লেখক সিস্টাইটিস নিয়ে চমৎকার একটি লেখা লিখেছিলেন ২০১২ সালে। প্রতিবেদনটির  এর ভাবার্থ নিচে দেওয়া হলোঃ

গত এক বছরে এটি আরো বেশি স্পষ্ট হয়েছে যে আমি আসলে বার বার সিস্টাইটিসে আক্রান্ত হই। সিস্টাইটিস হলো ম্যট্রিক্সে প্রবেশের মতো,আমি প্রথম আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে জানতাম না এটি কোন রোগ! এটি বই, ছায়াছবি বা শ্রেণিকক্ষ পাঠগুলিতে উপনীত হয় না (বিশেষত আমার স্কুল এ যৌন স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত কোনও পাঠ দেয়নি) এবং কেউ এটিকে অসুস্থতার সম্ভাবনা হিসাবেও পরামর্শ দেয়নি।

তারপরে আমার এটি হয়েছিলো এবং আমি জানতে পেরেছিলাম যে বেশিরভাগ মহিলারা কেবল তাদের জীবনে শুধু একবার ই এটিতে আক্রান্ত হয় এমন নয়। বছরে প্রায় তিনবার এটি পাওয়া দৃশ্যত পুরোপুরি স্বাভাবিক। হঠাৎ পৃথিবীতে এই নতুন এবং অপ্রত্যাশিত পর্যায়ে চলে এসেছিলো।

সিস্টাইটিস হলো ব্যাকটেরিয়ার মূত্রনালী বা মূত্রাশয়ের সংক্রমণ। প্রধান লক্ষণগুলি হলো  প্রস্রাবের সময় প্রস্রাব করার একটি মরিয়া আকাঙ্ক্ষা যা জ্বলন্ত অ্যাসিডের মতো অনুভূত হয়! যা কোনও সুখকর সংমিশ্রণ  নয়। যদি খুব বেশি সময়ের জন্য হয়ে থাকে অবশেষে আপনি রক্ত ​​প্রস্রাব করা শুরু করেন যা প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ আতঙ্কজনক। এই রোগটি তখন হয় যখন বাইরের পরিবেশ থেকে ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীতে প্রবেশ করে (ছোট পাইপে যেখানে প্রস্রাব বের হয়)। মহিলাদের পুরুষদের তুলনায় অনেক ছোট মূত্রনালী থাকে তাই তাদের ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘন ঘন ঘটতে পারে।

আক্রমণে  কী ঘটে বা কেন কেউ অন্যের তুলনায়  বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হয় তা কেউই পুরোপুরি নিশ্চিত না।প্রমাণ হিসেবে যৌন সম্পর্ক ,ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি এবং ( ডিহাইড্রেশনের) পানি শূন্যতার সাথে দৃঢ় সম্পর্ক কারণ হিসেবে অবহিত করা হয়। সিস্টাইটিস নিয়ে প্রচুর পরিমাণে গবেষণা নেই।

এই কারণেই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ফলে ক্র্যানবেরি, ঢিলেঢালা অন্তর্বাস এবং প্রচুর পরিমাণে জল পান করার অসার অসন্তোষেজনক  পরামর্শ দেওয়া ছাড়া তেমন কিছুই ঘটেনা  । (একদিকে যেমন, আমার তৃতীয় আক্রমণ হওয়া পর্যন্ত আমাকে কার্যকর এন্টি-সিস্টাইটিস পরামর্শের এক টুকরো উপদেশ দেওয়া হয়েছিল: সহবাসের পরে প্রস্রাব করার মত )। তাই আমি সবসময় এ বিষয়ে  নতুন গবেষনাপত্রে আগ্রহী। বিশেষত এই মুহুর্তে প্লস প্যাথোজেনসে  একটি আকর্ষণীয় গবেষনাপত্র রয়েছে (নীচে রেফারেন্স) যেটাতে  সিস্টাইটিসজনিত ব্যাকটেরিয়ার জীবনচক্রের বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে ।

Loading...

সিস্টাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ ব্যাকটেরিয়া হল (E. coli) ই কোলাই বা ইশেরেকিয়া কোলাই কারণ এটি শরীরে প্রচুর পরিমাণে থাকে। তাই শরীরে সাধারণত বেশ কার্যকরী সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে যা ব্যাকটেরিয়াকে টিস্যু বা রক্ত ​​প্রবাহের কাছাকাছি কোথাও যেতে দেয় না।

কিন্তু সিস্টাইটিসে কিছু কারণে এই প্রতিক্রিয়াটি কার্যকর হয় না। এটি কোনও মহিলার (জেনেটিক) বা বংশগত কারণ হতে পারে,অন্যের জন্য স্পষ্ট শারীরিক কারণ থাকতে পারে (যেমন অদ্ভুতভাবে মূত্রনালীতে তৈরি হওয়া বা কিডনির সমস্যা) এবং অবশ্যই মূত্রাশয়টি এক প্রকার জলের আধারের মত।যেখানে ব্যাকটেরিয়া জায়গা করে নিতে পারে এবং বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

ব্যাকটেরিয়ার প্রথম চ্যালেঞ্জ মূত্রনালীতে পৌঁছানো! মহিলাদের মূত্রাশয় তুলনামূলক মোটামুটি সংক্ষিপ্ত তবে এটি শ্বেত রক্তকণিকা  এবং এটির মধ্য দিয়ে নিয়মিত জল প্রবাহের দ্বারা সুরক্ষিত থাকে । প্যাথোজেনিক ( রোগ জীবাণু বাহক )  ব্যাকটেরিয়াগুলির বিস্তৃত আঠালো অণু এবং অন্যান্য বাঁধাই এজেন্ট রয়েছে।

যা  যখন কোনও পৃষ্ঠের সাথে আবদ্ধ হয় তখন জীবাণুটি একটি ভাসমান ব্লব থেকে একটি পৃষ্ঠের সাথে হামাগুড়ি  দিতে সক্ষম একটি ফোটাতে পরিণত হয়(ব্লব হচ্ছে পুরু তরল বা সান্দ্র পদার্থ)। সিস্টাইটিসের জন্য দায়ী বিশেষ ই কোলাই এ মূত্রনালীতে টিস্যু বাঁধতে সাহায্য করার জন্য অন্যান্য অনেক অণু রয়েছে।

 এটি এখনও পরিষ্কার নয় কোনগুলি মানুষের মধ্যে সংক্রমণের সাথে সরাসরি যুক্ত (গবেষণাটি মূলত ইঁদুরের উপরেই করা হয়েছে)। ই কোলি প্রস্রাবকে আটকে থাকতে পারে। প্রস্রাবের প্রবাহের ভিড়কে এটি টিস্যুতে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার সংকেত হিসাবে ব্যবহার করে। মূত্রাশয়ে  ই কোলাই প্রবেশ করার পর তাদের  নষ্ট করার জন্য পোষকের-কোষ গুলো তাদেরকে কোষের ভেতরে নিয়ে নেয়। বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়া এভাবে মারা যাবে অন্যরা কোষ গুলোর ভিতরে সামান্য বায়োফিল্ম এর মত গুচ্ছ করতে পারে। (বায়োফিল্ম হল এমন সংশ্লেষের মিশ্রণ যা কিনা একে অপরের সাথে লেগে থাকে) ।

 এই ছোট ব্যাকটেরিয়া শহরটি চারপাশে আমিষ ও শর্করার এক আর্দ্র জগাখিচুড়ি দিয়ে বেষ্টিত থাকে। যা ব্যাক্টেরিয়াকে কোষের হত্যা প্রচেষ্টা থেকে রক্ষা করে।  এখান থেকেই গল্পটি ভৌতিক কল্প -কাহিনীতেতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। মনে রাখবেন এটি টি মানব মূত্রাশয়ের ভিতরে ঘটছে।বায়োফিল্মটি তার যে কোষে বাড়ছে সেখানকার নিউক্লিয়াসকে ঘিরে নিয়ণ্ত্রণ নিতে শুরু করে এবং সাইটোপ্লাজমকে পূরণ করে। এটি এত বড় হয়ে যায় যে কোষটি মূত্রাশয়ের জায়গাতে প্রকৃতপক্ষে ভিতরের দিকে প্রস্ফুটিত হতে শুরু করে। ছোট ব্যাকটেরিয়াল ফিলামেন্ট(তন্তু)গুলি বের করা শুরু করে যা  বাইরের দিকে প্রসারিত হয়!

তারপর তারা চারপাশের কোষগুলির দিকে অগ্রসর হয় এবং সেগুলি সংক্রমণও শুরু করে। জীবাণুগুলি কেবল মূত্রাশয়ের কোষগুলিকে দখল করতে শুরু করে না, তারা সাইটোকাইনস(ছোট প্রতিরোধ ব্যবস্থার সংকেত অণু) এর উৎপাদনকে দমন করে। ই. কোলাই আবার আইডিওর উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় যা দেহকে সংকেত পাঠায় যে শরীরে যথেষ্ট সাইটোকাইন রয়েছে। তাই সাইটোকাইন তৈরির দরকার নেই।

Loading...

তাছাড়া ইমিউন সিস্টেমের মধ্যে যোগাযোগের চ্যানেলগুলি ভেঙে দিয়ে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারে। মূত্রাশয়ের বাইরের টিস্যু স্তরটির সমস্যাটি হল এটি ক্রমাগত এক্সফোয়েলেশনের (এক্সফোলিয়েশন হল ত্বকের বাইরের পৃষ্ঠের সবচেয়ে প্রাচীন মৃত ত্বকের কোষগুলি অপসারণের সাথে জড়িত)মাধ্যমে প্রবাহিত হয় যা ব্যাকটেরিয়া উপনিবেশের জন্য অনিরাপদ।

দীর্ঘস্থায়ী বেঁচে থাকার জন্য, ব্যাকটেরিয়াগুলি অন্তর্নিহিত বেসল এপিথেলিয়ামে (পিরামিডের মত কোষ) এ ডুবে যেতে পারে । ব্যাকটেরিয়াগুলি অ্যাক্টিন অণু গ্লবুইলার সুরক্ষামূলক নেটওয়ার্কের সাথে নিজেকে ঘিরে রাখতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক আক্রমণ প্রতিরোধী এবং বেশ কয়েক মাস ধরে কেবল সুপ্ত থাকতে পারে। যে পদ্ধতিগুলির মাধ্যমে এটি এভাবে থাকে এর পুনরাবৃত্তি সিস্টাইটিস সূচনা করে তা এখনও একটি রহস্য।

আক্রান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনরাবৃত্তি সিস্টাইটিসের অন্যতম প্রধান সমস্যা হল সংক্রমণের প্রতিটি ধাপে টিস্যুগুলিকে স্ফীত করে দেয়! তখন নিরাময়ের পরেও আবার সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

হাঁপানি, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগ এর উপসর্গগুলির মতো এটিও নিরাময় হয় না। এটি এমন কিছু যা নিয়ে বাঁচতে হবে। ইন্টারনেটে পরামর্শের অনেক উৎস রয়েছে,যার মধ্যে সবগুলিই একই ধরণের জিনিসের তালিকা।

আমার কাছে যে পদ্ধতিগুলি সবচেয়ে কাজের মনে হয়েছে সেগুলি হ’ল: যৌন মিলনের পরে প্রস্রাব করা, দিনে ৪/৫ পিন্ট (তরল পিন্ট হ’ল তরল ঘনত্বের একক যা গ্যালনের এক-অষ্টম, কোয়ার্টের অর্ধেক,বা দুটি কাপ সমান)!

(তরল পিন্টগুলি সংক্ষেপে পিটি হিসাবে চিহ্নিত করা যায় উদাহরণস্বরূপ ১পিন্ট ১ পিটি হিসাবে লেখা যেতে পারে) জল পান করা এবং যদি আমি টনটন্ অনুভব করি তবে সোডা বাইকার্বোনেট গ্রহণ করা। তারা আপনাকে যা বলে তা সত্ত্বেও, ক্র্যানবেরিগুলির জন্য কোনও সত্যতার প্রমাণ নেই।

তথ্য সূত্র: Cystitis: How bacteria get into your bladder

Jorgensen I, Seed PC (2012) How to Make It in the Urinary Tract: A Tutorial by Escherichia coli. PLoS Pathog 8(10): e1002907. doi:10.1371/journal.ppat.100290

ছবিসুত্রঃ North eastern urology, Everyday health, philipine society for nicrobiology and infectious disease

Loading...

Jannatul Fiza

স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছি অণুজীব বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে।লেখালেখি করি শখের বসে।

You may also like...

২ Responses

  1. স্বাস্থ্য ও রোগ সম্পর্কিত বিষয়ে বিজ্ঞান ব্লগে লেখা খুবই কম। আর এমনিতেও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা খুব কম। এই গুরুত্বপূর্ণ লেখার জন্য ধন্যবাদ!

  2. JANNATUL FIZA says:

    স্যার সিস্টাইটিসের জন্যে কালচার সেন্সিটিভিটি টেস্ট জেলা শহরেরও ল্যাবে করেনা। এর ফলে অ্যান্টিবায়েটিক রেজিস্ট্যাণ্স বেড়ে যাচ্ছে। যেসব রোগ নিয়ে মানুষ খুব সচেতন না সেগুলো নিয়ে লিখার ইচ্ছে আছে। সময় সুযোগ থাকলে লিখবো। আপনাকেও ধন্যবাদ অনুপ্রাণিত করার জন্যে

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: