টিকা বৃত্তান্ত

Variola ভাইরাস
পাঠসংখ্যা: 👁️ 64

In science credit goes to the man who convinces the world, not the man to whom the idea first occurs.

—Francis Galton

এই উদ্ধৃতিটির মাহাত্ন এবং যথার্থতা অনুধাবনের জন্য আপনাকে ফিরে যেতে হবে ১৭০০ শতকের মধ্যভাগে ইংল্যান্ডের বার্কলে শহরে। এই ছোট্ট শহরে বার্কলে ক্যাসেল এবং তাতে রাজা দ্বিতীয় এডোয়ার্ডের খুনের কিংবদন্তি ছাড়া তখন পর্যন্ত আর বলার মত কিছু নেই। তবে ১৭৪৯ সালে এই শহরে জন্ম নেন আরেক এডোয়ার্ড , এডোয়ার্ড জেনার যার মাধ্যমে শহরটি নতুন একটা কিংবদন্তি ধারণ করার সুযোগ পায়। টিকার জনক হিসেবে লোকে তাঁকে চিনে থাকলেও বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ছিল বহুমুখী বিচরণ। 

চলুন এবার জেনে নেই গল্পের এন্টাগনিস্টকে। এর নাম স্মলপক্স, ভেরিওলা ভাইরাসের দ্বারা সৃষ্ট একটি সংক্রামক রোগ যাকে আমরা গুটি বসন্ত বলে চিনি। নামে স্মল থাকলে তার কাজের বাহার দেখে মোটেই ছোট করে দেখার জো নেই। ধারণা করা হয় ক্রাইস্টের জন্মেরও হাজার দশেক বছর আগে আফ্রিকায় এর প্রথম প্রাদুর্ভাব হয়। ফারাও রামজেসের মমি, প্রাচীন  চৈনিক শিল্প, ভারতের সংস্কৃত লেখনীতেও স্মলপক্সের কথা পাওয়া যায়। ইতিহাসে অনেকগুলো মহামারী ঘটিয়ে, যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহৃত হয়ে; এজটেক,  ইনকার মত সভ্যতার পতন ঘটিয়ে, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, হাজার বছর ধরে বিভীষিকা ছড়িয়ে দেয়া গুটি বসন্ত আজ বিলুপ্ত! 

এডোয়ার্ড জেনার

এডোয়ার্ড জেনার ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও বিজ্ঞান নিয়ে কৌতূহলী ছিলেন। তিনি ১৩ বছর বয়সেই একজন ডাক্তার জর্জ হারউইকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তখনকার প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি সমূহে জ্ঞান লাভ করেন। কথিত আছে সেই সময়ে একদিন তার ডাক্তার গুরুর সাথে একটি খামারে যাওয়ার পর শুনতে পান এক গোয়ালিনী বলছে “যেহেতু আমার কাউপক্স হয়ে গেছে, আমি নিশ্চিত যে আমার আর স্মলপক্স হবেনা”। স্মলপক্সেরই আরেকটি মৃদু সংস্করণ কাউ পক্স, যা গরু এবং আশেপাশে থাকা মানুষদের হয়। তবে এটা তেমন মারাত্নক না। 

তো যাই হোক, এরপরে জেনার আরও বড় বড় বিজ্ঞানীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। চিকিৎসা, প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদ বিদ্যা, ভূতত্ব, বেহালা, কবিতা অনেক রকম চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ক্যাপ্টেন জেমস কুক তাঁর প্রথম সমুদ্রযাত্রায় যেসব প্রজাতি সংগ্রহ করেছিলেন সেসবের অনেক গুলো এডোয়ার্ড জেনার শ্রেণীভুক্ত করতে সাহায্য করেন। যদিও সেই ১৩ বছর বয়স থেকেই “কাউ পক্স হলে আর স্মলপক্স হয়না” এই প্রচলিত কথাটি তার আগ্রহের মধ্যে ছিল। তবে আরও ৩২ বছর পরে, ১৭৯৬ সালে তিনি প্রথম পদক্ষেপটি নেন যার ফলশ্রুতিতে ১৯৮০ সালের ৮ মে ওয়ার্ল্ড হেলথ এসেম্বলি পৃথিবীকে স্মলপক্স মুক্ত ঘোষণা করে।      

প্রচলিত ধারণাটি সঠিক কিনা তা দেখার জন্য পরে তিনি একটি এক্সপেরিমেন্ট করেন সেই বছর। সারাহ নেল্ম নামের এক গোয়ালিনীকে খুঁজে পান, যার হাতে কাউপক্সের কাঁচা ক্ষত রয়েছে। কাউপক্সের ক্ষত হতে সামান্য পুঁজ নিয়ে জেমস ফিপ নামের এক ৮ বছর বয়সই বালকের শরীরে লাগিয়ে দেন। কিছুদিন পর তার জ্বর হয়, আর বগলে ব্যাথা হতে থাকে। পুঁজ গ্রহণের ৯ দিন পরে তার ঠাণ্ডা লাগে, এবং রুচি কমে যায়। তবের ১০ম দিন থেকে সে সুস্থ হতে থাকে। তার এক মাস পর, জেনার আবার জেমসের দেহে পুঁজ প্রয়োগ করেন, এবার আর কাউ নয়, সেই সময়ের বিভীষিকা স্মলপক্সের! তার দেহে আর স্মলপক্স দেখা দেয়নি। জেনার তার পর্যবেক্ষন একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে পাঠালে সেটা প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর আরও অনেকের উপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে একই রকম ফলাফল পাওয়ার পর নিজেই একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন তার এক্সপেরিমেন্ট আর ফলাফল নিয়ে। এটার শিরোনাম ছিলঃ 

An Inquiry into the Causes and Effects of the Variolae Vaccinae, a disease discovered in some of the western counties of England, particularly Gloucestershire and Known by the Name of Cow Pox

গরুর ল্যাটিন নাম Vacca, কাউপক্সের ল্যাটিন নাম Vaccinia সেকারণেই তিনি তার পদ্ধতির নাম দেন Vaccination।  

এটা ঠিক, তার যুগে Human Subject Protection Committeeর কোন অস্তিত্ব ছিলোনা। তবে যতজনকে তিনি এই টোটকা দিয়েছিলেন, বেশিরভাগই স্মলপক্স প্রতিরোধী হয়ে গিয়েছিলেন। জেনারের এই প্র্যাকটিস এরপর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।   

তবে জেনার যেটা জানতেন না, বা সেই সময়ে জানতে পারেননি তা হল কাউপক্স এবং স্মলপক্স রোগ দুটি কাছাকাছি ধরণের ভাইরাসের কারণে হয়। যেহেতু উভয় ভাইরাসের অনুজীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যে মিল রয়েছে, একটার সংস্পর্সে যে অনাক্রম্যতা দেহে তৈরি হয় সেটা অন্যটার বিরুদ্ধেও কার্যকর। তবে যেহেতু তিনি যেই ঘটনা  পর্যবেক্ষন করছেন তার কার্যকরন জানতেন না, তাই অন্য রোগের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারেননি। 

সময়ের সাথে সাথে অণুজীব বিষয়ে আমাদের বোঝাপড়া বাড়তে থাকে। বিভিন্ন ধরণের ইমিউনাইজেশন সংক্রামক ব্যাধিতে মানুষের মৃত্যুহার কমিয়ে আনে নাটকীয়ভাবে। বিংশ শতকের শুরুতে রবার্ট কচ আমাদের দেখান, ঘোড়ার দেহে কোন জীবাণুর বিরুদ্ধে সৃষ্ট এন্টিসিরাম মানুষের দেহে প্রয়োগ করে করে সেই জীবাণুর সংক্রমণ এড়ানো যায়। এভাবে অন্যের অনাক্রম্যতাকে ধার করে নিয়ে আসাকে Passive Immunization বলে।

প্যাসিভ ইমিউনাইজেশন প্রক্রিয়ার একটি ছোট এবং একটিত বড় সময়সা থাকায় এটাকে ব্যপকভাবে ব্যবহার করা হয়না। ছোট সমস্যা হচ্ছে, যদিও প্রয়োগের পরপরই এন্টিসিরাম বেশ জোড়ালোভাবে কাজ করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পুর্ন সংক্রমণকে দমিয়ে দেয় তবে কিছুদিন পরি এই অনাক্রম্যতা গায়েব হয়ে যায়। কোন দীর্ঘমেয়াদি ইমিউনিটি থাকেনা এবং কোন সুরক্ষা স্মৃতি(Immunological Memory)  তৈরি হয়না এই ধরনের ইমিউনাইজেশনে। 

বড় সমস্যাটি হচ্ছে এই এন্টিসিরাম ঘোড়া থেকে সংগৃহীত হওয়ায় ঘোড়ার প্রোটিনে ভর্তি। বহিরাহগত হবার কারণে এই প্রোটিনগুলোকে গ্রাহকের দেহ নিষ্ক্রিয় করতে সচেষ্ট হয়। প্রথমবার প্রয়োগের সময় এই এন্টিসিরাম যে উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হয় তা সফল হয় কেননা দেহে ঘোড়ার প্রোটিনের বিরুদ্ধে ইমিউন রেসপন্স তৈরি করতে কিছুটা সময় লাগে। ততদিনে সিরামের এন্টিবডি তার লক্ষ্যের বিরুদ্ধে যা করার করে ফেলে। তবে, যদি পরবর্তিতে আবার এই এন্টিসিরাম প্রয়োগের দরকার হয়, তখন আর এটা কাজ করেনা। কারণ প্রথম বার এর সংস্পর্শে আসার পর গ্রাহকের অনাক্রম্য ব্যাবস্থা ঘোড়ার প্রোটিনগুলোকে চিনে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করে রেখেছে। এরাই এখন এন্টিসিরামকে ক্ষতিকর ধরে নিয়ে প্রতিহত করে ফেলবে। 

এতে সুধু রক্ষাকারী এন্টিবডি নিষ্ক্রিয়ই হয়না, বরং প্রচুর পরিমাণ এন্টিবডি-এন্টিজেন কমপ্লেক্সও তৈরি রক্তে। এর ফলে ইমিউন কমপ্লেক্স ডিজিস তৈরি হয়। এর কারণ কি? যেখানে ম্যাক্রোফেজের এই ধরণের কমপ্লেক্স অপসারণ করার কথা, তারাই এত সংখ্যক কমপ্লেক্স দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই অতিরিক্ত কমপ্লেক্স গুলো পরে কিডনি, ফুসফুস, অস্থিসন্ধ্যি যেখানেই জমা হয় সেখানেই নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করে । 

সুতরাং এখন পর্যন্ত অনাক্রম্যতা ধার করা, মাথাপিছু একবারের ব্যপার। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো এটা ব্যবহার হয়- যদি আপনার খুব ব্যপক মাত্রায় ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন হয়ে থাকে, তাহলে প্রথমে এন্টিসিরাম দিয়ে তীব্রতা কমিয়ে তারপর এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়। যদি আপনি সাপের দংশনের শিকার হন, এবং দেহ থেকে বিষ দূর করা প্রয়োজন যত দ্রুত সম্ভব। তবে কথা এটাই, একবার যদি কোন বিশেষ এন্টিসিরাম গ্রহণ করে থাকেন, পরবর্তীতে সেই এন্টিসিরাম গ্রহণ করার মত পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাই ভালো।  

তবে প্যাসিভ ইমিউনিটি শুধু বিজ্ঞানাগার কিংবা চিকিৎসা সঙ্ক্রান্ত বিষয়-ই নয় কেবল, প্রকৃতিতেও ঘটে থাকে। ফিটাল সার্কুলেশনের মাধ্যমে মায়ের দেহ থেকে এন্টিমাইক্রোবিয়াল এন্টিবডি সকল স্তন্যপায়ীতেই প্লাসেন্টায় যায়। মায়ের দুধেও বিভিন্ন সুরক্ষামূলক এন্টিবডি থাকে। নবজাতকের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবার আগ পর্যন্ত এই এন্টিবডিগুলোই সুরক্ষা দিয়ে যায়। 

তবে বাস্তবে প্যাসিভ ইমিউনিটি সক্রিয় ইমিউনাইজেশনের বিকল্প নয়। আমাদের দেহে সংক্রমণ হলে যেভাবে অন্তর্নিহিত এবং অভিযোজিত অনাক্রম্য ব্যবস্থা ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেটা সক্রিয় ইমিউনাইযেশোনের ফল। এর ফলে দেহ থেকে আক্রমণকারী জীবাণু শুধু দুরি হয়না, দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা স্মৃতিও তৈরি হয় যা ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগে।   

যে ঘটনার মাধ্যমে জেনারের প্রক্রিয়া অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব, সেই বোধনের মূলে রয়েছে একটি ভুল। ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ধারণা করা হয় যে লুই পাস্তুরের ল্যাবে এটা ঘটেছিল। কেউ একজন মুরগিতে কলেরা ইনফেকশন নিয়ে কাজ করার সময় ভুলবশত টিউব ভর্তি কলেরা ব্যাকটেরিয়া তার কাজের টেবিলে রেখে চলে যান। সেই সময় আবার চলছিল দাবদাহ। পরে যখন সেই ব্যাকটেরিয়া মুরগির দেহে ঢুকানো হয়, তখন আর সেগুলো কলেরায় আক্রান্ত হয়নি। 

সেই গবেষক বুঝতে পারলেন যে গরমের কারণে ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা গিয়েছে তাই তিনি একই মুরগিতে আরও শক্তিশালী তাজা কলেরা ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করলেন। এবারও তারা দিব্যি সুস্থ, যেটা ছিল আশ্চর্যজনক কেননা সেই একই চালানের ব্যাক্টেরিয়া অন্যান্য মুরগিতে কঠিনভাবে আক্রান্ত করলো। এরকম উল্টা পাল্টা ফলাফল দেখে সেই গবেষক কিন্তু সব ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে পারতেন। সৌভাগ্যক্রমে তা হয়নি। বেঁচে যাওয়া মুরগীর রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেল মৃত কলেরা ব্যাকটেরিয়া গ্রহণ করা মুরগির দেহে সেই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রচুর এন্টিবডি এবং মেমরি কোষ তৈরি হয়েছে। যেই মেমরি  কোষ পরবর্তি সংক্রমণে কলেরা প্রতিরোধে কাজ করেছে। পাস্তুর পরে দেখিয়েছিলেন একই পদ্ধতি এনথ্রাক্স এবং জলাতঙ্কেও কাজ করে। 

সবার অপেক্ষার পালা ফুরোলো। অচিরেই বুঝা গেল মৃত অণুজীব রোগ সৃষ্টি করতে না পারলেও ঠিকই সুরক্ষা প্রতিক্রিয়া(Immune Response)তৈরি করে। জীবিত কিংবা মৃত দুই দশাতেই অণুজীবের পৃষ্ঠে একই প্রোটিন, লিপিডের কাঠামো থাকে যেটা দেখে অনাক্রম্য ব্যবস্থা তাকে ক্ষতিকর হিসেবে শনাক্ত করে সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করে।  

তবে মারাত্নক সব জীবাণু, হোক সে মৃত, তাদের সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করিয়ে ইমিউনিটি প্রদান করার বিষয়টা মানুষকে বুঝানো এত সহজ ছিলোনা। ইমিউনাইজেশনের অনেক বড় বড় প্রচারণা প্রচণ্ড বাঁধার সম্মুখীন হয়। এই যুগে কিন্তু আমরা অনেক রকম জীবাণুকে মৃত অথবা খুবই দূর্বল অবস্থায় ব্যবহার করে বিভিন্ন টিকা তৈরি করি। জীবাণুর সক্রিয়তা নানা ভাবে হ্রাস করা যায়। তাদেরকে এমন পরিবেশে বড় করা হয় যার ফলে মিউটেশন ঘটে ইমিউনোজেনিসিটি বজায় রেখেই রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা কমে যায়। কিছু কিছু জীবাণুর ক্ষেত্রে আবার এমন টিকা তৈরি করা হয় যাতে সম্পুর্ন জীবাণুর পরিবর্তে শুধু সুরক্ষা প্রতিক্রিয়া তৈরির জন্য দরকারি আণবিক কাঠামো(Molecular Structure) থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় ব্যাক্টেরিয়ার টক্সিনও টিকা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।   

এটা মেনে নিতে হবে কখনো কখনো হিসেবে ভুল হয়ে যায়। এমনকি এখনো, এত মাত্রায় যাচাই বাছাইয়ের পরও  কারো কারো দেহে টিকা নেয়ার সাথে সাথে হিতে বিপরীত হতে পারে । কিন্তু তবু আমরা নিয়ম করেই নানা ধরনের টিকা নিয়ে থাকি একটাই কারণেঃ টিকা কোন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা হাজার গুন কমিয়ে দেয়। টিকার সুবিধা এটাই যে আপনি টিকা নিয়ে নিজে তো নিরাপদ থাকবেনই, জনসংখ্যার বিশাল অংশে টিকা দেয়া হলে যারা টিকা নেয়নি তারাও উপকৃত হবে।  

সব টিকারই উদ্দেশ্য রোগে আক্রান্ত না করে সংক্রমণের প্রাকৃতিক পরিণতির অনুসরণ ঘটানো। এর ফলে দেহে যেসব B এবং T কোষ উদ্দিষ্ট জীবানুকে চিনতে পারে, তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং এদের কিছু কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি কোষে(Memory Cell) রূপান্তরিত হয়। এই স্মৃতি কোষ পরবর্তি সংক্রমণে এত দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে যে আপনি টেরও পাবেন না যে আপনি আক্রান্ত। 

সক্রিয় ইমিউনাইজেশনের মাধ্যমে স্মলপক্সকে নির্মূল করা গেছে। পোলিওকে অনেকাংশে কমানো গেলে এখনো পৃথিবীর কিছু কিছু অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে হাম নির্মূল হলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এখনো হাজারো শিশুর মৃত্যুর কারণ হাম। 

বৈজ্ঞানিক প্রতিবন্ধকতা বাদ দিলেও কোন একটি আবিষ্কার ল্যাব থেকে বাজার পর্যন্ত নিয়ে আসার ঝক্কি কম না। আর তা চিকিৎসা সংক্রান্ত হলে তো কথাই নেই। তার উপর টিকা হচ্ছে রোগ সৃষ্টিকারী জীবানুর-ই কার্যত নিষ্ক্রিয় অথবা দূর্বল সংস্করণ। নানা রকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পার হয়ে বাজারে নামতে হয়। তার উপর রয়েছে মানুষের সচেতনতার অভাব আর কুসংস্কারাচ্ছন্নটা। যার জন্য ২০০ বছর আগে ইমিউনলজির জনক এডোয়ার্ড জেনারকে যেমন হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়েছে, তেমনি আধুনিক যুগেও বিজ্ঞানী আর টিকা সংশ্লিষ্ট মানুষজনদের হতে হয়। 

এত ঝামেলার পরও কিন্তু অনেক রোগের টিকা নিয়ে কাজ চলছে। আর কিছু কিছু জীবাণুর কার্যকর টিকার জন্য এখনো বিজ্ঞানীদের খাবি খেতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ম্যালেরিয়া, টিউবারকুলোসিস এবং এইচআইভি।  

ম্যালেরিয়ার জীবনচক্র বেশ জটিল। তার উপর ম্যালেরিয়ার জীবাণুতে খুব দ্রুত মিউটেশন হয়। প্রধানত এই দুটি কারণে ম্যালেরিয়ার টিকা তৈরিতে জটিলতা রয়েছে। টিউবারকুলোসিসের টিকা আর ১০০ বছর আগেই তৈরি হয়েছে। কোন অজানা কারণে ইউরোপ আর আমেরিয়ায় সেই টিকা কাজ করলেও, তৃতীয় বিশ্বে কার্যকারীতা খুব কম। আবার শিশুদের দেহে কাজ করলে বয়স্কদের দিয়ে কোন সুফল পাওয়া যায়না। 

তবে নতুন কিছু পদ্ধতিতে এসব রোগের টিকা তৈরির কাজ চলছে। ম্যালেরিয়া, টিউবারকুলোসিস এবং যত রকম ভাইরাস ঘটিত রোগ আছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ধাপ হচ্ছে CD8 টি কোষের প্রতিক্রিয়া। তবে এই কোষ সবচেয়ে বেশি মাত্রায় সক্রিয় হয়, জখন জীবাণুর এন্টিজেনিক প্রোটিন পোষকের দেহের ভেতরেই সংশ্লেষিত হয়। যখন নিষ্ক্রিয়া বা মৃত জীবাণু বা তার প্রোটিন ব্যবহার করে টিকা তৈরি করা হয়, তখন যৎসামান্য CD8 কোষই সক্রিয় হয়। 

তবে ডেন্ড্রাইটিক কোষের সহায়তায় এই সমস্যা উৎরানো সম্ভব। একটি উপায় হচ্ছে, পেপটাইড পালসিং(Peptide Pulsing) । এই প্রক্রিয়ায় ডেন্ড্রাইটক কোষকে উচ্চ ঘনত্বের জীবাণুর পেপটাইড, যা ভালো প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তার সাথে ইনকিউবেট করা হয়। তখন ডেন্ড্রাইটিক কোষ তার পৃষ্ঠে সেই পেপটাইডকে ধারণ করে নেয়। এই ডেন্ড্রাইটিক কোষ যখন দেহে প্রবেশ করানো হলে CD8 কোষ যখন এই ডেন্ড্রাইটিক কোষের সংস্পর্শে আসে, তখন সে এটাকে বহিরাগত ধরে নিলেই কেল্লা ফতে। 

অন্য উপায়টি আর দারুণ, জীবাণুর এন্টিজেনিক পেপটাইডের ডিএনএ কেই চামড়া বা পেশিতে ইনজেক্ট করা হয়। ডেন্ড্রাইটিক কোষ এই ডিএনএ কে গ্রহণ করে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা পৌঁছে যায় ডেনড্রাইটিক কোষের নিউক্লিয়াসে। তখন সে তার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে জীবাণুর প্রোটিন তৈরি করে পৃষ্ঠে মেলে রাখে CD8 কোষের জন্য, সংস্পর্শে এলেই ডেজাভু। এই প্রক্রিয়াকে বলে ডিএনএ ভ্যাক্সিনেশন।      

অন্যান্য চিরাচরিত টিকাসমূহের একটা সমস্যা কি, এটাকে সবসময় হিমাংকের নিচে রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করতে হয়। যার কারণে এটার পরিবহন এবং সংরক্ষণ ব্যয়বহুল। অনেক তৃতীয় বিশ্বের দেশেরই সব প্রান্তে সেরকম অবকাঠামো না থাকায় বহু মানুষ টিকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। বিজ্ঞানীরা এই সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন, ডিএনএ ভ্যাক্সিনে এই সমস্যাটি নেই। ঠিকঠাক ভাবে বানানো হয়ে গেলে এটাকে পকেটে করেও পরিবহন করা যাবে। 

টিকা নিয়ে গবেষণা যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারী বা বেসরকারি অনুদান নিয়ে করে। এর সাথে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে সমাধান করে, চাহিদার সমান পরিমাণে তৈরি করে জনমানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষমতা তাদের থাকেনা। এটা তাদের কাজও না। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এই মাথা ব্যাথা হজম করতে সক্ষম। তবে তারা যাদের জন্য টিকার বাণিজ্যিক উৎপাদন করবে, তাদের যদি সে টিকা কেনার ক্ষমতা না থাকে তখন আবার তাদের এই বিনিয়োগে আগ্রহ না থাকাই স্বাভাবিক। উন্নত দেশের টিকার প্রয়োজন হলে তা যতটা গুরুত্ব পায়, দরিদ্র কোন দেশের জন্য হলে তা অনেক সময়েই পায়না।

তথ্যসূত্রঃ

১। In Defense of self, William R. Clark

২। Edward Jenner and the history of smallpox and vaccination, Stefan Riedel, MD, PhD

৩। https://www.historyofvaccines.org/content/articles/future-immunization

রুহশান আহমেদ
আমি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক কনটেন্ট তৈরির একজন স্বাধীন স্বেচ্ছাসেবক। শাবিপ্রবি থেকে জিন প্রকৌশল ও জৈব প্রযুক্তি বিষয়ে একটি স্নাতক ডিগ্রি বাগানোর চেষ্টায় আছি।