ফ্রেনোলজি (Phrenology)

পাঠসংখ্যা: 👁️ 103

বুদ্ধিভিত্তিক চর্চার শুরু থেকে মানুষকে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটা ভাবিয়েছে সেটা সম্ভবত এমন – আমাদের অস্তিত্ব কী? আমাদের রাগ, দুঃখ, ভালোবাসা, দয়া, হিংসা প্রভৃতি গুণাবলি, ব্যক্তিস্বত্তার অস্তিত্ব আসলে কোথায়? আমরা কেনো কোনো কিছু অনুভব করি? এইসব জটিল প্রশ্নের সহজ সমাধান হিসেবে অনেকের চিন্তায় জায়গা করে নিয়েছে একটা বাক্য- “আমরা এসব অনুভব করি তার কারণ আমাদের মন।” মন আসলে কী জিনিস? কোনো অঙ্গ? আত্মা? এই মন/আত্মা যতক্ষণ আমাদের মাঝে আছে ততক্ষণ আমাদের অনুভূতি, অস্তিত্ব আছে। রেনে ডেকার্তের মাইন্ড বডি ডুয়েলিজম কিছুটা সেই কথাই বলে আমাদের। মাইন্ড-বডি ডুয়েলিজম বলতে বোঝায় মন এবং শরীরের সহাবস্থান। আমাদের দেহ কোনো কিছু ভাবতে পারেনা। ভাবনা-চিন্তা-অনুভবের কাজটা আমাদের মনের।[1]

Mind Body Dualism

এর প্রায় দেড় শতক পরে অষ্টাদশ শতাব্দীতে মন-দেহ নিয়ে নতুন এক ভাবনার উৎপত্তি ঘটে। এই ভাবনা পরবর্তীতে বিজ্ঞান জগতে যতটা সুফল বয়ে এনেছে ততটা কুফলও বয়ে এনেছে। ভাবনাটা ছিলো এমন-

১) আমাদের মস্তিষ্ক আসলে মনের একটা অঙ্গ। এই মস্তিষ্ক আবার নির্দিষ্টসংখ্যক অঙ্গে বিভক্ত।

২) মস্তিষ্কের একেকটা অঙ্গ আমাদের চরিত্রের একেকটা বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। চরিত্রের বা মনের এই একেকটি বৈশিষ্ট্যকে বলা হতো ফ্যাকাল্টি।

৩) এই ফ্যাকাল্টি গুলো জন্মগতভাবে প্রাপ্ত।

৪) প্রতিটা ফ্যাকাল্টির অবস্থান মস্তিষ্কের পৃষ্ঠতলের একটা নির্দিষ্ট অংশে।

৫) আমাদের মস্তিষ্ক আসলে পেশির মতো। এক্সারসাইজের ফলে বা অভাবে যেমন পেশি সুগঠিত হয় বা গঠন নষ্ট হয় ঠিক তেমন কোনো নির্দিষ্ট মানসিক শক্তির বেশি বা কম ব্যবহার মস্তিষ্কের পৃষ্ঠের নির্দিষ্ট এলাকাকে সংকুচিত বা প্রসারিত করে।

৬) মাথার খুলির বাইরের পৃষ্ঠতল এবং মস্তিষ্ক পৃষ্ঠের তলদেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। ফলে কেউ মাথার খুলির বিভিন্ন অংশের আকার-আকৃতি দেখে মাথার ভিতরে থাকা বিভিন্ন অঙ্গের (যারা মনের একেকটা ফ্যাকাল্টি নিয়ন্ত্রণ করে) আকার আকৃতি বুঝতে পারবে এবং বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল ট্রেইট নির্ধারণ করতে পারবে।

মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ তথা ফ্যাকাল্টি

এই ভাবনা বা ধারণার নাম দেওয়া হয় ফ্রেনোলজি (Phrenology)।[2][3][4] আর এই ধারণা প্রথম প্রবর্তন করেন ফ্রানজ্ জোসেফ গাল নামে একজন জার্মান ডাক্তার। তিনি নিজের ইচ্ছামতো মাথার খুলির বাইরের পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করে সেটাকে ২৭ টা অঞ্চলে ভাগ করেন।[5] এরপর নিজের বন্ধু-বান্ধবী, রোগী, পরিবার সহ আশেপাশের মানুষের মাথার বিভিন্ন অংশের আকৃতি দেখে তাদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলানো শুরু করেন। এবার ধরেন আমার প্রচন্ড রাগ, আপনারও প্রচন্ড রাগ, আপনার বউয়ের রাগ কম। আপনার আর আমার মাথার পিছনের একটা অংশ বড় যেটা আবার আপনার বউয়ের ক্ষেত্রে ছোটো। গাল ঐ অংশটাকে রাগের জন্য দায়ী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেন। এভাবে বিভিন্ন অংশকে বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির (দয়া, ঈর্ষা, বুদ্ধি, অলসতা, আত্মসন্মান, জেদ প্রভৃতি) পরিচালক হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। এরপর তার রিসার্চ আগায় জেইল এবং অ্যাসাইলামে থাকা আসামীদের কাছে। তাদের মাথার বিভিন্ন অংশ পরিমাপ করে তিনি কোন অংশ কোন অপরাধ প্রবণতার জন্য দায়ী সেটা প্রেডিক্ট করা শুরু করেন। নিঃসন্দেহে এই ডাটা কালেকশন এবং অ্যানালাইসিস ছিলো বায়াসড। যেসব তথ্য গালের ধারণার বিপরীতে যেত তার বেশিরভাগই তিনি নজরআন্দাজ করে যেতেন।[6]

আস্তে আস্তে ফ্রেনোলজি নিয়ে কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। আরও অনেক ডাক্তার, ফিজিশিয়ান, গবেষক ফ্রেনোলজিকে সাপোর্ট করতে থাকেন এবং এ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। একই সাথে তারা ফ্রেনোলজির পক্ষে ক্যাম্পেইনও চালাতেন সাধারণ মানুষকে এদিকে আকৃষ্ট করার জন্য। যত গবেষক ফ্রেনোলজিতে আকৃষ্ট হয় তত এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা যায়। গালের করা ২৭ টা অঞ্চল বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ টা অঞ্চলে। মোটামুটি সব ফ্রেনোলজিস্ট মাথার খুলিকে ২৭-৪০ টা অঞ্চলে বিভক্ত করে সে অনুসারে মানুষের বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল ট্রেইট তারা ব্যাখা করতে থাকেন। এমনকি অনেকে ফ্রেনোলজি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে কে কী করবে, কেমন হবে সেগুলো ব্যাখ করারও চেষ্টা শুরু করেন। মোটামুটি ১৮২০ সালে প্রথম ফ্রেনোলজি প্রচারকারী সংগঠন সৃষ্টির পর ১৮৪০ সালের মধ্যে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, ডাক্তার, ফিজিশিয়ান, গবেষক এর সাথে সম্পৃক্ত হন এবং ফ্রেনোলজিস্টদের অসীম চেষ্টায় ঐসময়ের সমাজে (ভিক্টোরিয়ান সোস্যাইটি) ফ্রেনোলজিকে একটা সন্মানিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে মানা শুরু হয়। কিন্তু কথায় বলে “অতি সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট হওয়া”, সেইটা যেন এক্ষেত্রে খাটে।

ফ্রেনোলজিস্টদের সংখ্যাবৃদ্ধি, তাদের মতবিরোধ, তাদের ধারণার বহু ব্যতিক্রম আস্তে আস্তে ফ্রেনোলজির বিপক্ষে যুক্তি-প্রমাণের পাহাড় গড়ে তুলতে থাকে। আগে যেখানে গালের মতো প্রাথমিক ফ্রেনোলজিস্টরা নিজেদের মতামতের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ তথ্যকে নজর আন্দাজ করে চলে যেতেন, সেটা আর সম্ভব হচ্ছিলো না। আর ফ্রেনোলজির কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা শুরু হয় বাইসেক্টিংয়ের মাধ্যমে ফ্রেনোলজির কঠোর পরীক্ষা নেওয়া শুরুর মাধ্যমে।[7] কবুতরের উপর একটা পরীক্ষায় দেখা যায়, মস্তিষ্কের একটা অংশকে ফ্রেনোলজিস্টরা যে বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী করছেন, ঐ অংশকে সরিয়ে নিলে অন্য বৈশিষ্ট্য প্রভাবিত হচ্ছে। আস্তে আস্তে ফ্রেনোলজিস্টদের কাজ করার মেথড প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং এটাকে অপবিজ্ঞান বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় তথ্যের চেরি পিকিংয়ের জন্য।[8] বর্তমান সময়ে MRI সহ আরও নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে জানা যায় মস্তিষ্কের আসলে কিভাবে কাজ করে, সহজ কথায় ফ্রেনোলজি আসলেই কাজ করে কিনা জানা যায়।[9] তবে ফ্রেনোলজি নিজে অপবিজ্ঞানের কাতারে পড়লেও আধুনিক বিজ্ঞানে এর একটা জোশ ভূমিকা আছে। এর মাধ্যমে মস্তিষ্ক যে বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল ট্রেইট নিয়ন্ত্রণ করে সেটা গবেষকদের নজরে আসে। হোক ফ্রেনোলজির কাজ করার মেথডে সমস্যা, পরবর্তীতে নিউরোসাইন্স, নিউরোসাইকোলজির মতো শাখা সঠিক পদ্ধতি এবং কোনো প্রকার চেরী পিকিং বা ব্যাড সায়েন্টিফিক বিহ্যাভিয়ারের আশ্রয় না নিয়েই আমাদের বিভিন্ন শারীরিক এবং মানসিক বৈশিষ্ট্য এক্সপ্লোর করেছে। আজকের দিনে অনেক পদ্ধতি আছে এটা জানার মস্তিষ্কের কোন অংশ কোন বৈশিষ্ট্য নিরন্ত্রণ করছে। আধুনিক এই পদ্ধতিগুলো ফ্রেনোলজিকে একদম শিকড় থেকে ভূল প্রমাণিত করলেও বিভিন্ন মানসিক রোগ আর বৈশিষ্ট্যের পিছনে যথাযথ ব্যাখা হাজির করেছে। এখনকার গবেষণা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আমাদের আর মাইন্ড-বডি ডুয়েলিজমের প্রয়োজন নেই। যেসব অনুভূতি, বৈশিষ্ট্যের ব্যাখা খুঁজতে আমরা মনের পিছনে ছুটতাম, আসলে সেগুলোর কলকাঠি নাড়ে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র।

Research based on MRI images usually exclude the skull

যাহোক, ফ্রেনোলজির ভালো দিক তো বললাম। এবার একটা জঘন্য দিক তুলে ধরি। ফ্রেনোলজি ব্যবহার করে একসময় রেসিজম এবং সেক্সিজমকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলেছে। সেক্সুয়াল ডাইমর্ফিজমের কারণে নারী পুরুষের অনেক পার্থক্য দেখা যায় শারীরিক গঠন কিংবা মানসিক বৈশিষ্ট্যে। ফ্রেনোলজি ব্যবহার করে পুরুষের প্রভাবশালীতা এবং নারীদের অপেক্ষাকৃত কম অধিকার প্রদান বা তাদের উপর নিষ্পেষণকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে একদল মানুষ। একই ঘটনা রেসিজমের ক্ষেত্রেও। কোনো এক শ্রেণীর মানুষকে তাদের মাথার খুলি নিয়ে ভুজুং ভাজুং বুঝিয়ে তাদের নিজেদের দাস করে রাখার চেষ্টাও চালানো হয়েছে। সায়েন্টিফিক রেসিজমে ফ্রেনোলজি একসময়ে ব্রহ্মাস্ত্রের মতো ব্যবহার করার ঘটনা ঘটেছে।[10]

তো যাহোক, শেষ করার আগে একটা মজার কথা বলি। আর্কেয়িক মানুষদের মাথার খুলির ভিতরের পৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশ পরিমাপ করে তাদের মস্তিষ্কের গঠন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছেন গবেষকরা। তাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে আর্কেয়িক মানুষদের বিভিন্ন বুদ্ধিভিত্তিক এবং কমিউনিকেটিভ দক্ষতা থাকা উচিত। তো গবেষকদের এই কাজ করার পদ্ধতিকে অনেকে মজা করে “প্যালিও-ফ্রেনোলজি” নামে অভিহিত করেন, যদিও এর কাজ করার পদ্ধতি প্রাচীন সেই ফ্রেনোলজি থেকে অনেক উন্নত এবং গ্রহণযোগ্য।[11]

প্রজেশ দত্ত
বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ, ভালোবাসার জন্ম সেই ২০১৪ সালে। অভিজিৎ রায়ের হাত ধরে। তার "ভালোবাসা কারে কয়" বইটা এখনো আমার কাছে বাংলা ভাষায় লিখিত সবথেকে প্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক বই। আমি প্রজেশ দত্ত, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে অধ্যয়নরত রয়েছি। প্রকৌশল নিয়ে পড়াশুনা করলেও আমার সবথেকে প্রিয় বিষয় বিবর্তন, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান। এজন্য ২০১৯ এ লেখালেখিতে পদার্পনের পর যত প্রবন্ধ লিখেছি প্রায় সবগুলো এই ধারার। বর্তমানে বিজ্ঞানব্লগে লেখালেখি ছাড়াও ব্যাঙের ছাতার বিজ্ঞান গ্রুপের মডারেটর হিসেবে অবদান রাখছি।