মিসিং লিংক কি সত্যিই মিসিং?

পাঠসংখ্যা: 👁️ 93

শুরুতেই যেটা বলে নেয়া সবচেয়ে জরুরি সেটা হচ্ছে, “মিসিং লিংক” কথাটা হচ্ছে ট্রানজিশনাল ফসিল(Transitional Fossil) এর একটা অবৈজ্ঞানিক নাম। তাই আমি এই ছোট্ট লেখাটায় ট্রানজিশনাল ফসিল শব্দটাই ব্যবহার করবো বেশি। মিসিং লিংক কথাটা মূলত এসেছে আরেক অবৈজ্ঞানিক চিত্র দ্যা মার্চ অব প্রগ্রেস থেকে। কিন্তু, বিবর্তন এভাবে সরল রৈখিকভাবে চলে না। বিবর্তন মানেই বৈচিত্র্য। জীবাশ্মবিদ জন হকস এর ভাষ্যে—

“Missing link is an outmoded term in biology, which I have to say most of us think should be forgotten and never used.”

জীবাশ্ম বা ফসিল কী? 

জীবাশ্ম বা ফসিল হলো প্রাচীন জীবদের সংরক্ষিত অবশেষ বা ছাপ।প্রাগৈতিহাসিক যুগের উদ্ভিদ ও প্রাণীর ধ্বংসাবশেষ তথা মৃতদেহের চিহ্ন পাওয়া যায় ভূগর্ভ কিংবা ভূ-পৃষ্ঠের কঠিন স্তরে সংরক্ষিত পাললিক শিলায় অথবা যৌগিক পদার্থে মিশ্রিত ও রূপান্তরিত অবস্থায়। পাললিক শিলার স্তর একেকটা একেক সময় নির্দেশ করে। ফলে, একেকটা স্তরে পেয়ে যাই একেক সময়ের জীবের ফসিল। এমন হাজার হাজার প্রজাতির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যারা শত শত বছর আগেই বিলুপ্ত। ৩৪০ কোটি বছর থেকে দশ হাজার বছর পূর্বেকার তুষার যুগের প্রাণী ও উদ্ভিদদেহের ধ্বংসাবশেষ জীবাশ্মরূপে সংরক্ষিত আছে।

মিসিং লিংক বা ট্রানজিশনাল ফসিল কী?

খুব সহজ করে বললে, ট্রানজিশনাল ফসিল হচ্ছে, কোনো প্রজাতির বর্তমান রূপ ও তার পূর্বপুরুষদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যবর্তী দশা। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের চারপাশের প্রাণিদের পূর্বপুরুষদের হদিস কি মিলেছে? কিংবা তাদের ও পূর্বপুরুষদের মধ্যবর্তী দশার ফসিল মিলেছে কি? হ্যাঁ, পরিচিত প্রায় সব প্রজাতিরই পূর্বপুরুষ পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে তাদের মধ্যবর্তী প্রজাতিদের শত শত ফসিলও। ঠিক যেভাবে বিবর্তন তত্ত্ব ভবিষ্যদ্বাণী করে, মোটামুটি সে রূপেই পাওয়া যায় ফসিলগুলি। চলুন বিস্তারিত আলোচনায় যাই, তাহলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।

বিবর্তন তত্ত্ব বিরোধী কোনো বই খুললে আপনি যে মিথ্যা অভিযোগটা সবচেয়ে বেশি পাবেন, সেটা হচ্ছে, টানজিশনাল ফসিল বা মিসিং লিংক নেই। পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞান যতো এগিয়েই যাক না কেন—জীবাশ্ম রেকর্ড যতো সমৃদ্ধই হোক না কেন, মিসিং লিংক না থাকার এসব মিথ্যা দাবি প্রায় সব শতকেই করে আসছে সৃষ্টিতত্ত্ববাদীরা।

মিসিং লিংক কি সত্যিই ‘মিসিং’?

মজার ব্যাপার কি জানেন? বিবর্তন তত্ত্বের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণের একটা হচ্ছে আমাদের সংগ্রহে থাকা বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপের ফসিল রেকর্ড। শুধু তাই না। একদম শুরু থেকেই রেকর্ডই ছিলো বিবর্তন তত্ত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণের একটা। ফসিলগুলি বিবর্তনের পক্ষে প্রায় সব ধরনের প্রমাণ দেয়। ফসিল রেকর্ড আমাদের বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক যুগে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং প্রজাতির বিবর্তনীয় ইতিহাস সম্পর্কে জানায়।

শিলাস্তরে সংরক্ষিত এসব ফসিলের সাথে আধুনিক জীবদের সমসংস্থ অঙ্গানুর মিল থেকে জীবাশ্মবিদরা প্রজাতির বিবর্তনীয় ইতিহাস সম্পর্কে সম্মক ধারণা অর্জন করতে পারেন। এঁকে ফেলতে পারেন প্রজাতির দীর্ঘ বিবর্তনের রূপরেখা। 

এখন আমরা আণবিক পর্যায়েই বিবর্তনের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রমাণগুলি পেয়ে যাই। কিন্তু, আগে সে উপায়টা ছিলো না। মানুষের বিবর্তনেরও যে ধাপে ধাপে অনেক প্রজাতির নাম শোনা যায়। তাদের প্রত্যেকের ফসিল পাওয়া গেছে বলেই নামগুলি পেয়েছি আমরা। কেউ হুটহাট করে এসব নাম বানায় না। আসলে, কোনো গণ কিংবা প্রজাতির ফসিল পাওয়ার আগে তার নামকরণ করা সম্ভব নয়। যেমন ধরুন, অস্ট্রালোপিথেকাসের ফসিল পাওয়া যায় আফ্রিকার দক্ষিণে। তাই এর নাম দেয়া হয়েছে দক্ষিণী নরবানর (Southern Ape), যেটাকে ল্যাটিনে বলে অস্ট্রালোপিথেকাস (Australopithecus)। 

এমনি ভাবে নাম দেয়া হয়েছে সব ফসিলের। হোমো ইরেক্টাসের নাম দেয়া হয়েছে, কেবল তারা “সোজা” হয়ে দাঁড়াতো পারতো বলে। নিয়ান্ডার উপত্যকায় পাওয়া হোমো গণের মানুষের প্রজাতিটির নাম দেয়া হয়েছে হোমো নিয়ান্ডারথ্যালসিস(নিয়ান্ডার উপত্যকার মানুষ)। দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর-পূর্ব প্রদেশের ছোট্ট শহর Tuang এ অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিক্যানাসের এক শিশুর ফসিল পাওয়া যায় বলে সেটার নামকরণ করা হয় টুয়াং চাইল্ড। ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে পাওয়া ৩ ফুটের বামন মানুষ প্রজাতিটিকে নাম দেয়া হয়েছে হোমো ফ্লোরেসিয়েন্সিস বা ফ্লোরেস দ্বীপের মানুষ। ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসের আগে আমরা কেউ জানতাম না, এই প্রজাতির কোনো মানুষ থাকতে পারে।

Sterkfontein Caves, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের উত্তর-পশ্চিমে পাওয়া এ গুহাগুলিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হোমিনিড ফসিল পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, অস্ট্রালোপিথেসাইন, প্যারানথ্রোপাইন ও হোমো গণের ফসিল। গুহাগুলি বর্তমানে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।

যখন বিভিন্ন গবেষণা, হিসেব নিকেশের পর বলা হলো, টেট্রাপডরা মাছ থেকে এসেছে, তখন বিবর্তন বিরোধীদের আবদার হলো, সেই ‘মিসিং লিংক’ দেখাতে। টেট্রাপড আর মাছের এমন এক মধ্যবর্তী অবস্থা, যা দেখে সত্যিই বোঝা যাবে, টেট্রাপডদের পূর্বপুরুষেরা মাছ ছিলো। পাওয়াও গেলো সেরকম ট্রানজিশনাল ফসিল। ২০০৬ সালে ট্রানজিশনাল ফসিল আবিষ্কার এক যুগান্তকারী মোড় নেয়। অনেক সমস্যা ও দ্বিধার অবসান ঘটায় Tiktaalik এর আবিষ্কার। বিশ্ববিখ্যাত জীবাশ্মবিদ ও ফিলাডেলফিয়ার একাডেমি অব ন্যাচারাল সায়েন্সের এসোসিয়েট কিউরেটর টেড ড্যাসচলার, নীল শুবিন ও তাঁর সহকর্মীরা কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের কঠিন পাললিক শিলার আস্তরে খুঁজে পান মাছ এবং টেট্রাপডদের মধ্যেকার এই ট্রানজিশনাল ফসিলকে। এই ফসিলটি ছিলো তিন ফিট লম্বা, রে-ফিন মাছের মতো পাখাযুক্ত ও এর মাথাটা দেখতে অনেকটা কুমিরের মতো। এই Tiktaalik এর শরীরে বিশেষ ধরণের শক্ত হাড় ছিলো যা দিয়ে সে অগভীর পানিতে পাখাকে(fin) লাঠির মতো অঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করতো। (১)

Tiktaalik এর ফসিল। ছবিসূত্রঃ printerest.

তিমির ব্যাপারটাই দেখুন না। তিমির ডিএনএ থেকে নেয়া প্রমাণ এবং বর্তমানে নিষ্ক্রিয় এমন কিছু, প্রায় নিষ্ক্রিয় বা ভেস্টিজিয়াল অঙ্গ, যেমন, আদি পেলভিস বা শ্রোণিচক্র এবং পেছনের পায়ের উপস্থিতি প্রমাণ করছে তাদের পূর্বপুরুষ অবশ্যই স্থলে বাস করতো। তিমিরা প্রায় নিশ্চিৎভাবে বিবর্তিত হয়েছে এক প্রজাতির আর্টিওডাকটাইল (Artiodactyl) থেকে। আর্টিওডাকটাইল হচ্ছে, স্তন্যপায়ীদের একটি গ্রুপ যাদের জোড় সংখ্যক পায়ের আঙ্গুল আছে। যেমন- উট এবং শূকর।(২)

 কিন্তু, যখন স্থল এবং জলে বসবাস করা মধ্যবর্তী কোনো প্রাণীর ফসিল ছিলো না, তখন বরাবরের মতোই সৃষ্টিতত্ত্ববাদীদের মিসিং লিংক আবদার। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় আওয়াজ তোলেন আমেরিকান সৃষ্টিতত্ত্ববাদী ডুয়ান গিশ। কিন্তু, ১৯৭১ সালে ডুয়ান গিশদের কাঁদিয়ে সর্বপ্রথম দেখা মিললো এমনই এক ট্রানজিশনাল ফসিলের। জীবাশ্মবিদ হ্যান্স থিয়ুইজেন ও তাঁর সহকর্মীরা ভারতের কাশ্মীরে খুঁজে পান ৪৮ মিলিয়ন বছর আগের ইন্ডোহিউসকে। সে ছিলো তিমির পূর্বপুরুষদের নিকটাত্মীয়। এর হাড়ের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি থাকায় এটি জলে ভেসে থাকতে পারতো না। তবে এর দাঁত থেকে পাওয়া আইসোটোপ থেকে জানা যায়, এটি পানি থেকে অক্সিজেন শোষণ করতো। তারপর বর্তমান তিমি ও তার পূর্বপুরুষদের মধ্যবর্তী অনেক ট্রানজিশনাল ফসিলের দেখা মিলতে থাকে। পাকিস্তানেই আমরা পেয়ে যাই অনেকটা তিমি সদৃশ অথচ উভচর প্রাণি পাকিসিটাস(Pakicetus) এর ফসিল। একে একে পাওয়া যেতে থাকে অ্যামবুলোসিটাস (Ambulocetus), রোডোসিটাস (Rodhocetus), ব্যাসিলোসরাস (Basilosaurus), ডরুডন(Dorudon)৷ এবং সর্বশেষ ২০২১ সালের আগস্টে মিসরের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমিতে দেখা মিললো ফিওমিসিটাস অ্যানুবিস (Phiomicetus anubis) এর। এভাবেই ক্রমে ক্রমে তিমির বিবর্তনের রূপরেখাকে স্পষ্ট করেছে আজকের এই সমৃদ্ধ ফসিল ভান্ডার। এ ব্যাপারে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন(NSF) এর ভূ-বিজ্ঞান বিভাগের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এইচ. রিচার্ড লেন এর বক্তব্য—

“The evolution of whales is a tale of the adaptation of a land-based mammal to increasingly aquatic environments.This recent discovery provides us with a new understanding of this near-shore-dwelling, shallow-water ancestor.” (৩)

ফসিল রেকর্ডের ভিত্তিতে সাজানো তিমির বিবর্তনের চিত্র। ছবিটি নেয়া হয়েছে কার্ল জিমারের The Tangled Bank: An Introduction to Evolution বই থেকে।

শুধু কি তিমি? বিভিন্ন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে জানা গেলো পাখিরা এসেছে ডানাওয়ালা মাংসাশী থেরোপড ডাইনোসর থেকে। এখন, পাখি ও ডায়নোসরের মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এমন ফসিল পাওয়া গেছে কি? 

জ্বী, পাওয়া গেছে। ডারউইন বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার আগেই জার্মানিতে পাওয়া গেছে আর্কিওপটেরিক্স। তারপর একে একে পাওয়া গেছে এমন আরও ট্রানজিশনাল ফসিল। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু ফসিল দেখে আসি।

সাইনোসরেপ্টেরিক্স(Sinosauropteryx): সাইনো মানে চীন, সর বলতে বুঝায় সরীসৃপদের। এ হচ্ছে চীন দেশের ডানাওয়ালা সরিসৃপ। তের কোটি বছর আগে চীনের বন জঙ্গলে শিকার করে বেড়াতো তিন ফুটি এই দানব। অণুবীক্ষণযন্ত্রের নিচের এদের জীবাশ্মে উটপাখির মতো পালক পরিষ্কার বোঝা যায়।

কনফুসিয়র্নিস(Confuciusornis): অর্নিস মানে পাখি। এর নামের মানে কনফুসিয়াস পাখি। দার্শনিক কনফুসিয়াসের নামে নামকরণ। এর বাড়িও চীনে। কনফুসিয়র্নিসের কিন্তু অন্যদের মতো দাঁত ছিলো না, পাখিদের মতো ঠোঁট ছিলো। পেছনে লম্বা ঝলমলে একটা লেজ ছিলো। কিন্তু তার পরও ডানার নিচে থাবা ছিলো।

ভেলোসির‍্যাপ্টর (Velociraptor): জুরাসিক ওয়ার্ল্ড/ পার্ক দেখেছেন কে কে? সেখানে ছোট ছোট, বুদ্ধিমান, বেশ হিংস্র কিছু ডাইনোসর ছিলো, মনে পড়ে? সেগুলো ভেলোসির‍্যাপটর। ভেলোসিটি মানে বেগ, র‍্যাপ্টর মানে চোর। এর নামের মানে তাই দ্রুতগামী চোর। কথা হচ্ছে, ভেলোসির‍্যাপ্টরদের চেহারা মোটেও সিনেমার মতো ছিল না, দাঁত ওয়ালা, পাখাওয়ালা, থাবা ওয়ালা একটা চূড়ান্ত ভয়াবহ মাংসাশী ঈগল কল্পনা করলে যা হয়, এরা ছিল সেরকম। সাড়ে ছয় ফিট লম্বা শরীরটা ভর্তি ছিল হিংস্রতা। ছোট প্রাণীদের ধরে ছিঁড়ে ফেলতে পারতো।

থেরিজাইনোসরাস(Therizinosaurus): এবার ভাবুন, ৩৬ ফুট লম্বা, ৩০ ইঞ্চি তলোয়ারের সমান নখ ওয়ালা, পাখা পালক আর দাঁতওয়ালা সুবিশাল দানব। কিন্তু দাঁতগুলো ছোট ছোট, গরুর দাঁতের মতো। এই হাট্টিমাটিম টিম গোছের পালকওয়ালা ডায়নোসর গাছপালা খেতো, আর কেউ আক্রমণ আসলে আড়াই ফুট লম্বা নখ দিয়ে মরণঘাতী পালটা আঘাত করতো। আট কোটি বছর আগে জঙ্গলে এদের দেখা মিলত। থেরিজাইনোসরাস কথাটার অর্থ কাস্তে সরীসৃপ। কাস্তের মতো লম্বা নখের জন্য। (৪) 

ডানদিকের জীবাশ্ম তিনটির মধ্যে উপর থেকে নীচে আছে যথাক্রমে আর্কিওপটেরিক্স, ভেলোসিরেপ্টর, সাইনোসরোপ্টেরিক্স এবং বাঁদিকে যথাক্রমে কনফুসিয়র্নিস ও থেরিজাইনোসোরাস

এবার আসা যাক হোমিনিডদের আলোচনায়। এর আগে বলে নেয়া যাক হোমিনিড বলতে কি বোঝায়। হোমিনিড প্রাইমেটদের একটি গ্রুপকে বোঝায়, যা আধুনিক এবং বিলুপ্তপ্রায় গ্রেট এপসদের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে আধুনিক মানুষ, শিম্পাঞ্জি, গরিলা এবং ওরাংওটাং ও তাদের সমস্ত তাৎক্ষণিক পূর্বপুরুষ। এদের ট্রানজিশনাল ফসিলের মজুদ কেমন?

সেই ১৯৭৬ সালেই আমাদের হাতে হোমিনিডদের ফসিল এসেছিলো প্রায় ৪ হাজারটি(বর্তমানে ৬ হাজার)। ১৯৯৯ সাল আসতে আসতেই আমাদের ফসিল রেকর্ড হয়ে উঠে আরও সমৃদ্ধ। হোমো ইরেক্টাসের ফসিল ততোদিনে দাঁড়ায় দেড়শোর মতো। নিয়ান্ডারথালের ৫০০, অস্ট্রালোপিথেকাস রবাস্টাসের ৯০ টি ও অস্ট্রালোপিথেকাস এফারেন্সিসের ১৫০। এভাবে হিসেব দিতে গেলে অনেক লম্বা হবে লেখা। (৫)

অনেক সৃষ্টিতত্ত্ববাদী অভিযোগ তোলেন, অস্ট্রালোপিথেকাসদের ফসিল নগণ্য। এসব কথারও কোনো ভিত্তি নেই। শয়ে শয়ে ফসিল পাওয়া গেছে। নীচে প্রথম ফসিল আবিষ্কার করার সন সহ কিছু অস্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতির নাম দেয়া হলো: 

Australopithecus anamensis(1965)

Australopithecus afarensis(1973)

Australopithecus africanus(1924)

Australopithecus garhi(1997)

Australopithecus sediba(2008)

Australopithecus aethiopicus(1994–1997)

Australopithecus robustus(1938)

তাছাড়া, গত কয়েক দশকে ফসিল রেকর্ড এতোটাই সমৃদ্ধ হয়েছে যে, এটাকে কারোর অগ্রাহ্য করার কোনো উপায় নেই। এ লিংকে গিয়ে ফসিল সংগ্রহের বিশাল ভান্ডারে চোখ বুলিয়ে আসতে পারেন।

 বিবর্তন নিয়ে টুকটাক পড়াশোনা করেছেন, এমন যে কেউ স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউট এর নাম শুনেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার কথা মাথায় আসতেই যেমন NASA’র নামটা আসে, তেমনি জীববিজ্ঞান গবেষণায় স্মিথসোনিয়ান । ১৭৪ বছরের পুরোনো এই ইনস্টিটিউট হচ্ছে বিবর্তন গবেষণার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের একটা৷ তাদের সাইটে গিয়ে ফসিলের দুনিয়া থেকে ঘুরে আসুন। আজ অবধি পাওয়া অসংখ্য ফসিলের মধ্যে প্রায় ছয় হাজার ট্রাঞ্জিশনাল ফসিলের— কি বললাম? ছয় হাজার ইন্ডিভিজুয়াল ট্রানজিশনাল ফসিলের নামকরণ করা হয়েছে। সেই স্পঞ্জের সময় থেকে, LECA, অস্ট্রালোপিথেকাস, হোমো ইরেক্টাস পেরিয়ে আজকের মানুষ অবধি আসার এই বিশাল যাত্রাপথের প্রায় সব পর্যায়ের ফসিল পাওয়া গেছে। পড়ে আসুন। চিন্তা খুলুক।

স্মিথসোনিয়ান জাদুঘরের ওয়েবসাইটেই পাবেন, তাও নীচে আজকের হোমো স্যাপিয়েন্স ও আমাদের  এনসেস্টর অস্ট্রালোপিথেকাসদের মধ্যবর্তী কিছু ফসিলের নাম আর আবিষ্কার সন দেয়া হলো:

Java Man (Homo erectus) (1891)

Heidelberg Man (Homo heidelbergensis) (1907)

Peking Man (Homo erectus) (1921)

Rhodesian Man (Homo rhodesiensis) (1921)

Taung Child 1 (Australopithecus africanus) (1924)

Galilee Man (Homo heidelbergensis) (1925)

Mojokerto child (Homo erectus) (1936)

Mrs. Ples (Australopithecus africanus) (1947)

Saldanha man (Homo rhodesiensis) (1953)

Nutcracker man (Paranthropus boisei) (1959)

Chellean Man (Homo erectus) (1960)

Tautavel Man (Homo erectus) (1971)

AL 288-1 (Lucy) (Australopithecus afarensis) (1974)

Dali Man (Homo erectus or Homo heidelbergensis or early Homo sapiens) (1978) 

Turkana Boy (Homo ergaster) (1984)

Wushan Man (Homo erectus) (1985)

Altamura Man (Homo neanderthalensis) (1993)

Scladina (Homo neanderthalensis) (1993)

Ardi ( Ardipithecus ramidus ) (1994)

Eurydice (Paranthropus robustus)(1994)

Boxgrove Man (Homo heidelbergensis) (1994)

Ceprano Man (Homo cepranensis /­Homo heidelbergensis)(1994)

Daka (Homo erectus) (1997)

Madam Buya (Homo heidelbergensis or Homo erectus) (1997)

Obi-Rakhmat (Homo neanderthalensis) (2003)

Hobbit (Homo floresiensis) (2003)

দ্বিধার ঘোর এতোকিছুর পরও না কাটলে, টক অরিজিনের এই লিংকটায় গিয়ে দেখে আসুন আমাদের ফসিল ভান্ডার  বিবর্তনের সার্বিক চিত্র কতো নিখুঁতভাবে স্পষ্ট করেছে। 

অতি সম্প্রতি বিশ্ববিখ্যাত ন্যাচার জার্নালে পাবলিশ হওয়া একটা একটা সন্ধানের খবর জানানোর প্রয়োজনবোধ করছি। হোমো ইরেক্টাসের খুব কাছের আত্মীয় প্যারানথ্রোপাস রোবাস্টাসের এক পুরুষ সদস্যের ২০ লক্ষ বছর আগের খুলি পাওয়া গিয়েছে কয়েক মাস আগেই। সাউথ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের যে অঞ্চল থেকে এ ফসিলটি পাওয়া গিয়েছে, সেই একই অঞ্চল থেকে আজ থেকে ৫ বছর আগে আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ, হোমো ইরেক্টাসের এক শিশুর খুলির ফসিলও পাওয়া গিয়েছিলো

এ ব্যাপারে যাবতীয় কৌতূহল মেটাতে ঘুরে আসুন ন্যাচার জার্নালের এই পেইজটা থেকে।

এতো সমৃদ্ধ ফসিল রেকর্ড থাকার পরও মিসিং লিংক না থাকার হাস্যকর অভিযোগ তোলা মানুষগুলিকে কূপমণ্ডূক ছাড়া আর কী-ই বা বলবেন? বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বগুলোর এতো এতো উন্নতি ঘটা সত্ত্বেও এসব মানুষ কোথায় যেন এক অন্ধকূপে পড়ে থাকে। 

 ফসিল রেকর্ড যে বিবর্তন তত্ত্বের ভিত্তি মজবুত করতে আজ অবধি কতোটা শক্তিশালী প্রভাব রেখে যাচ্ছে বা রাখবে, তা নীচের দেয়া লিংকগুলিতে ক্লিক করে আর্টিকেলগুলি পড়ে আসতে পারেন:

▪️Transitional Forms | Berkeley. 

▪️Galapagos Tortoises: Protagonists in the spectacle of life on Earth. Jack Frazier. 

▪️Four Famous Fossils That Supports Evolution. Shaena Montanari | Shaena Montanari.

▪️The Most Important Fossils You’ve Never Heard of. ▪️The Fossil Record. Encylopedia Brirannica.

তথ্যসূত্র:

(১) A Devonian Tetrapod-like Fish and The Evolution of the Tetrapod Body Plan. Edward B. Daeschler, Neil H. Shubin & Farish A. Jenkins Jr. | Nature. volume 440, pages757–763 (2006).

(২)হোয়াই ইভোলিউশন ইজ ট্রু, জেরি কয়েন।

(৩) Missing Link Between Whales and Four-Footed Ancestors Discovered, National Science Foundation

(৪) এ সংক্রান্ত পুরোটা লেখা হুবহু এখান থেকে নেয়া হয়েছে: https://m.facebook.com/groups/bcb.science/permalink/2853769241373393/

(৫)বিস্তারিত— http://talkorigins.org/faqs/homs/specimen.html

আরও দেখতে পারেন এখানে— https://www.handprint.com/LS/ANC/evol.html#chart