সুপারনোভার গল্প

কখনও আমার মন খারাপ হলে বাসার ছাদে গিয়ে বসি। সেখানে প্রিয় একটা জায়গা আছে, ওখানটায় বসলে মৃদু মন্দ বাতাসে মনটা ভাল হয়ে যায়। নির্বাক চেয়ে থাকি রাতের আকাশপানে। কি বিশাল একটা কালো রঙের চাদরে আমার আকাশটা মোড়ানো থাকে! চাদরটার গায়ে আবার ছোট ছোট চকমকে পুতি দিয়ে নকশা করা! ব্যাপারটা আমারই বোঝার ভূল, ওগুলো তো আসলে কোন পুতি নয়। তারা একেকজন বিশাল আকৃতির গ্রহ-নক্ষত্র। আমাদের এই পৃথিবী থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকবার কারণে তাদের এমন ছোট মনে হয়। কিভাবে তাদের জন্ম হয়?সারাজীবন তারা কি একই রকম থাকে? নাকি একটা নির্দিষ্ট সময় পরে তাদেরকেও আমাদের মত বার্ধক্যের পরিনতি বরণ করে নিতে হয়?

আধুনিক সময়ে জ্যোতির্বিদ্যার আর দশটি বিষয়ের মত সুপারনোভা এখন বেশ আলোচিত একটি বিষয়। মহাজাগতিক নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণের ফলে নিউট্রন তারার সৃষ্টি হয়, মূলত তাকেই আমরা সুপারনোভা বলতে পারি।

এভাবে বিস্ফোরণের পর মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে জন্ম নেয় সুপারনোভার।

তাহলে এখন প্রশ্ন হতে পারে বিগ ব্যাং এর তো তেরশ আশি কোটি বছর পার হয়ে গিয়েছে। তাহলে নক্ষত্রের সংখ্যাও কি কমে এসেছে? একেই বলা হয় “এন্ড ইজ দ্য বিগিনিং বা শেষের শুরু”। অর্থাৎ একদিক দিয়ে নক্ষত্রটির মৃত্যু হলে অপরদিক দিয়ে এই মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসস্তুপ, মহাজাগতিক ধুলিকণা আর মেঘ থেকে সৃষ্টি হয় নতুন কোন নক্ষত্রের। এইভাবেই নক্ষত্রদের জীবন চক্র চলতে থাকে, আমাদের আকাশে দেখা দেয় নতুন তারা। 

মহাকাশে রেডিও রেডিয়েশন আবিষ্কৃত হবার কিছুদিন পরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের  প্রচেষ্টায় কিছু কিছু আলাদা ধরনের রেডিও সোর্স আবিষ্কৃত হয়েছিল। এগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় কিছু কিছু সুপারনোভার অবশেষ এখনও তীব্র রেডিও রেডিয়েশন ঘটাতে সক্ষম। ১৯৪৮ সালে বৃষ তারামন্ডলে বিজ্ঞানী বোলটন একটি সুতীব্র মাত্রার রেডিও রেডিয়েশনের উৎস আবিস্কার করেছিলেন। এখন আমরা জানি,সেই উৎসটি ছিল আসলে একটি সুপরিচিত সুপারনোভা, ক্র্যাব নেবুলা বা কর্কট নীহারিকা।

এটিই আমাদের সেই আলোচিত ক্র্যাব নেবুলা বা কর্কট নীহারিকা।

অনেকেই মনে করেন, তারারা তাদের জীবনের একটি পর্যায়ে এসে হয়তো হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়, তাদের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। কথাটি অধিকাংশ তারার ব্যপারে খাটলেও কিছু কিছু তারার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। একশটি তারার মধ্যে অন্তত একটি তারার প্রচন্ড বিস্ফারণের মাধ্যমে জীবনাবসান ঘটে। প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এই বিস্ফোরণ ঘটে চলা তারা প্রায় এক বিলিয়ন সূর্যের থেকেও বেশি শক্তি বিকিরণ করতে পারে। বিস্ফোরণের প্রচন্ড তেজ এবং শক্তির কারণে সেখানে অনুকূল পরিবেশের কারণে লোহার চেয়েও ভারী মৌল তৈরি হতে পারে। 

এই সব ভারী মৌল এবং তারার জীবদ্দশায় তৈরি হালকা মৌলগুলো প্রচন্ড বেগে আন্তনাক্ষত্রিক শুন্যস্থানে চারদিকে ছিটকে পড়ে। এইভাবে ধীরে ধীরে জমে ওঠা মহাশুন্যের বিক্ষিপ্ত যৌগগুলো থেকে কালক্রমে নতুন গ্রহ ও নক্ষত্রের সৃষ্টি হয়।

প্রথমত, বিস্ফোরণের কারণে তারার বাইরের খোলক মূল কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাইরের দিকে ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হতে থাকে। খোলকের এই প্রসারণশীল গ্যাসীয় আবরণকে বহুকাল পর্যন্ত নীহারিকার মত দেখায়।

 তবে একটি কথা মনে রাখা দরকার,এই নীহারিকা গুলো কিন্তু মোটেও নিস্তেজ বা নিস্ক্রিয় নয়। প্রায় একশ থেকে হাজার বছর ধরে এর শক্তিশালী বিকিরণ চলতে পারে। সেই বিকিরণের ব্যাপ্তি হতে পারে এক্স রে প্রান্ত থেকে রেডিও রেডিয়েশন পর্যন্ত। তার মানে বুঝতেই পারছেন, প্রায় সকল ধরনের রেডিয়েশনের ক্ষমতা এদের রয়েছে। 

নানা ধরনের তেজস্ক্রিয় বিকিরণের গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশন।

আবার তারাগুলোর কেন্দ্রস্থলে যে অংশটি থাকে তাকেও কিন্তু কোন কুক্ষণেও নির্জীব ভাবতে পারবেন না! ভয়ানক বিস্ফোরণের কারণে প্রচন্ড চাপে এই কেন্দ্রীয় অংশটি অস্বাভাবিক ভাবে সংকুচিত হয়ে দ্রুত ঘুর্ণয়মান এমন এক তারার সৃষ্টি করবে, যার বিকিরণ ক্ষমতা হাজার সূর্যের থেকেও বেশি!

সুপারনোভার বিস্ফোরণের কারণে পুরনো তারার মৃত্যু হলেও নতুন পরিবেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে তার নতুন জীবনযাত্রা শুরু হয়।

অন্তত চারটি সুপারনোভা বিস্ফোরণের কথা প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুঁথিতে খুঁজে পাওয়া যায়। 

বার্নাড গোল্ডস্টাইন এসব প্রাচীন গ্রন্থের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেছেন, ১০০৬ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে লুপাস তারামন্ডলে বিস্ফোরণটি ঘটেছিল। প্রথমদিকে তারাটি শুক্রগ্রহের মত উজ্জ্বল ছিল এবং প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় রাতের আকাশে একে দেখা গিয়েছিল। বর্ণালীর দৃশ্যমান অংশে সুপারনোভার অবশেষকে অবশ্য শনাক্ত করা বেশ কঠিন।

তবে ১৯৬৫ সালে রেডিও দূরবীনে তার অস্তিত্ব ধরা পড়বার মাধ্যমে প্রমাণিত হল, বিস্ফোরণের এতকাল পরেও সুপারনোভার অবশেষ আজও তেজস্ক্রিয়।

উনিশ শতকের অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দূরবীন দিয়ে যাঁরা নীহারিকাটিকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে লর্ড রোসির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৮৪৪ সালে পর্যবেক্ষণকে হুবহু নকল করে তিনি এর একটি ছবি একেঁছিলেন। ছবিটি দেখে মনে হবে যেন কতগুলো ছারপোকা বিক্ষিপ্ত ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চার বছর পর এক বর্ণনা প্রসঙ্গে লর্ড রোসি একে কাঁকড়ার সাথে তুলনা করেন। তুলনাটি এতটাই মানানসই হয়েছিল যে, সেই থেকে এর নাম হয়ে গেল কর্কট নীহারিকা!

১৮৯২ সালে বিশ ইঞ্চি ব্যাসের প্রতিফলকের সাহায্যে এর প্রথম ছবি তোলেন আইজ্যাক রবার্টস।তখনই দেখা গেল, এটি কাঁকড়ার মত একটি অদ্ভুত বস্তুই শুধু নয়,বরং এর ভেতরে রয়েছে সুতার মত জট পাকানো এক ধরনের বস্তু।

সিগনাস লুপকে বলা যেতে পারে একটি অতি প্রাচীন সুপারনোভার অবশেষ। এর সংশ্লিষ্ট তারাটির বিস্ফোরণ সম্ভবত ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ৬০,০০০ বছর আগে। কর্কট নীহারিকা এবং ক্যাসিওপিয়ার তুলনায় সিগনাস লুপের ব্যাপ্তি অনেক বেশি। বাইরের খোলকটি অন্যান্য সুপারনোভার মতই সম্প্রসারণমান । প্রায় ষাট হাজার বছর ধরে ক্রমাগত সম্প্রাসারণের ফলে এই খোলক অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। কোন কেন্দ্রীয় তারা বা পালসার এখন পর্যন্ত এই সুপারনোভার অবশেষের ভেতর পাওয়া যায় নি।

সিগন্যাস লুপ সুপারনোভা

সুপারনোভার বিস্ফোরণ নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে এবং বিতর্কও যথেষ্ট রয়েছে।আমরা দেখেছি, সাধারণ তারার অভ্যন্তরে মৌলের কেন্দ্রবিন্দুতে নানা ধরনের প্রক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন শক্তি ও তেজের চাপ মহাকর্ষের চাপকে প্রতিহত করে তারার ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্ত তারার কেন্দ্রে প্রক্রিয়াজনিত শক্তি ও তেজের সরবরাহ যদি ক্রমেই ফুরিয়ে যেতে শুরু করে? কি ঘটবে তখন?

তারার বাইরের এবং অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষা ক্রমশই দুরূহ হয়ে পড়বে এবং মহাকর্ষের অন্তর্মুখী চাপ প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করবে। শুরু হবে নক্ষত্রের সংকোচন ও বিপর্যয়। যে সব তারার ভর সূর্যের ভরের কম, সেখানকার নক্ষত্রের সংকোচনের সাথে সাথে অভ্যন্তরের ইলেক্ট্রনেরও সংকোচন ও তদনুযায়ী চাপ বৃদ্ধি ঘটবে। ইলেক্ট্রনের ধর্ম অনুযায়ী একই শক্তির দুটি ইলেক্ট্রন এক জায়গায় থাকতে পারে না, তারা একে অপরকে বিকর্ষণ করে। এই জন্য সংকোচনের একটি নিম্নতম সীমা থাকে যে সীমায় এসে ইলেক্ট্রন অধঃপতিত হবে। এই অবস্থায় ইলেক্ট্রনগুলো অদ্ভুত আচরণ করে।নক্ষত্রটি তখন সাদা বামনে পরিনত হবে।

যে সকল নক্ষত্রের ভর ১.৫ সৌরভরের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি, তাদের ক্ষেত্রে  এভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সেখানে মহাকর্ষের চাপ অনেক বেশি থাকে।কেন্দ্রের জ্বালানী ফুরিয়ে গেলেই মহাকর্ষের চাপে তারাটি সংকুচিত হতে শুরু করবে, তার ঘনত্ব ও তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাবে এবং পরিশেষে প্রচন্ড বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে তারাটি ভেঙে পড়বে। 

বিস্ফোরণের ফলে তারাটির শেষপ্রান্তের গ্যাসের আবরণ বা খোলক তাপমাত্রার কারণে অতি দ্রুত বাইরের দিকে সম্প্রাসারিত হতে থাকবে। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস বাইরে ছিটকে পড়বে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ফলে তারার কেন্দ্রস্থ অংশ চেপে বসে গিয়ে একটি অতিঘন বস্তুর সৃষ্টি হবে। এমন অতিঘন বস্তুর প্রায় সবটুকুই নিউট্রন দিয়ে তৈরি হবে। সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে যে এমন অতিঘন তারার জন্ম হতে পারে, এই বিষয়ে ফ্রিৎজজিকি ১৯৩৮ সালে প্রথম ধারণা দেন।

পুয়ের্টোরিকোতে অবস্থিত অ্যারোসিবো টেলিস্কোপ। 

নিউট্রন তারার আবর্তন বেগ সবসময় সমান থাকতে পারে না। ধীরে ধীরে এর আবর্তন শক্তি কমে গিয়ে একটা সময় পরে এর কৌনিক বেগ মন্থর হয়ে আসবে।

পুয়ের্তরিকোর অ্যারোসিবো আয়োনোস্ফেরিক মানমন্দিরের জ্যোতির্বিদরা ক্র্যাব নেবুলার পালসারের আবর্তন গতির হ্রাস বৃদ্ধি আবিস্কার করেন বছরে ২৪০০ ভাগের এক ভাগ। এই হ্রাসের পরিমাণ এতই সামান্য যে, পালসারের জন্য দায়ী নিউট্রন তারার শক্তিশালী কনিকার স্রোত বহুকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। অর্থাৎ বহুকাল পর্যন্ত নিউট্রন তারা তার কণিকা-স্রোত ঝাঁকে ঝাঁকে পাঠিয়ে দেবে সুপারনোভায়, এবং সেই সাথে তৈরি হতে থাকবে শক্তিশালী রেডিয়েশন। ক্র্যাব নেবুলা বা কর্কট নীহারিকা এবং সাধারণ ভাবে সুপারনোভার অবশেষের দীর্ঘকাল স্থায়ী রেডিয়েশনের সম্ভবত এটিই সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা।

তথ্যসূত্র:

  1. https://spaceplace.nasa.gov/supernova/en/
  2. https://www.nasa.gov/multimedia/imagegallery/image_feature_1604.html
  3. https://www.sciencedirect.com/topics/engineering/radio-wave
  4. https://www.britannica.com/topic/Arecibo-Observatory

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?

এমরান আহমেদ
এমরান আহমেদ,পেশায় একজন চিকিৎসক।জন্ম ১৩ অক্টোবর,১৯৮৮ কুষ্টিয়ায়,নানা বাড়িতে।খুলনা বিদুৎকেন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক,খুলনা নৌবাহিনী কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চমাধ্যমিক শেষে ভর্তি হন খুলনা মেডিকেল কলেজে।পরে একটি স্বনামধন্য মেডিকেল কলেজে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কাজ করেছেন।বর্তমানে বি সি এস এ গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সহকারী সার্জন পদে কুষ্টিয়ায় কাজ করেছেন। মহাকাশবিদ্যা,আর্কিয়োলজি নিয়ে তার প্রচন্ড আগ্রহ।মেডিকেল ছাত্রাবস্থায় তার লেখালেখির শুরু।বর্তমানে বিজ্ঞানচিন্তা,রহস্যপত্রিকা সহ বেশ কিছু স্বনামধন্য পত্রিকায় নিয়মিত লিখছেন। মহাজাগতিক প্রাণের খোঁজে নামে তার একটি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে।তাছাড়া মাইল এইট্টি ওয়ান এবং আইসফল নামে দুটি বই অনুবাদ করেছেন।প্রকাশিত হয়েছে গল্প সংকলন, এনাটমি ডিসেকশন রুম।প্রখ্যাত বিজ্ঞানলেখক ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর সাথে যৌথ ভাবে সম্পাদনা করেছেন, এলিয়েন : কল্পনা ও বাস্তব।