গবেষণাপত্র যেভাবে পড়তে হয়: পর্ব-১

(অনুবাদক: এডাম রুবেন একজন বিজ্ঞানী। পিএইচডি অর্জন করেছেন জীববিজ্ঞানে জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিখ্যাত সায়েন্স ম্যাগাজিনের তিনি এক্সপেরিমেন্টাল ইরর নামের একটি কলাম লিখেন। একই সাথে তিনি একজন স্ট্যান্ডাপ কমেডিয়ানও বটে। ফলে তাঁর লেখাতে মাঝে মধ্যেই কমেডিক পাঞ্চ নিয়ে আসেন। তাঁর লেখা পড়ার সময় তাই পাঠকদের বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। যেমন এই লেখায় পস্ট-ডককে নিকৃষ্ট জীবের সাথে তুলনা করেছেন। হা হা। নীচের লেখাটি তাঁর লেখা How to read a scientific paper এর অনুবাদ। বিজ্ঞান ব্লগের পাঠকদের জানিয়ে রাখতে চাই গবেষণাপত্র যেভাবে পড়তে হয়: পর্ব ২ ও খুব শীঘ্রই আসবে বিজ্ঞান ব্লগে। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন।)

গবেষণাপত্র পড়ার সময় নিজেকে যেরকম বোকা মনে হয় তা অন্য কিছুতে মনে হয় না। গবেষণাপত্র নিয়ে প্রথম অভিজ্ঞতার কথা আমার মনে আছে। কলেজে থাকার সময় আমি একটা সেমিনার কোর্স নিয়েছিলাম যেখানে প্রতি সপ্তাহে আমাকে একটা নতুন গবেষণাপত্র নিয়ে আলোচনা করতে হতো। এই বিষয়টা আমার সাথে যাচ্ছিলো না তখন।

প্রতি সপ্তাহে আমি গবেষণাপত্র নিয়ে বসতাম। প্রতিটি বাক্য ধরে ধরে পড়তাম। কিন্তু পড়া শেষে আমি আবিষ্কার করতাম আমি আসলে কিছুই বুঝি নি। আমি একটা সান্ত্বনা নিয়েই শুধু ক্লাসে যেতাম যে আমি গবেষণাপত্রটি পড়েছি। শিক্ষক আমাকে হয়তো একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন। আমি সেই প্রশ্নের কিছুই বুঝতাম না। তারপর তিনি হয়তো আরও সহজ একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন। আর আমি তিনি কী জিজ্ঞেস করছেন সেটাই ধরতে পারতাম না। কিন্তু আমি গবেষণাপত্রটি পড়েছি।

এই বিষয়টা আমার কিন্ডারগার্ডেনে পড়ার সময়ের একটা বিষয় মনে করিয়ে দেয়। আমি আমার ক্লাসের চেয়ে উপরের ক্লাসের কোন বই পড়ে গর্ব অনুভব করতাম। কিন্তু আপনি যদি বইয়ের বিষয় থেকে সহজ একটা প্রশ্ন করতেন আমি এর উত্তর দিতে পারতাম না।

সেমিনারে কয়েকসপ্তাহ যাওয়ার পর আমি ভাবলাম যথেষ্ট হয়েছে। এখন থেকে কোন গবেষণাপত্র আমি না বুঝে পড়বো না। আমি সেই সপ্তাহের গবেষণাপত্রটি নিয়ে লাইব্রেরীতে গেলাম। যেন তেনো লাইব্রেরী না, ছোটখাট একটা বায়োলজি লাইব্রেরী যেখানে সব থেকে খারাপ জীবরা থাকে আর তারা হলো পোকা-মাকড় এবং পোস্ট-ডক!

আমি গবেষণাপত্রটি বিশাল খালি ডেস্কের উপর রাখলাম। মনোযোগ ব্যহত হতে পারে এমন সবকিছু সরিয়ে রাখলাম। বন্ধুবান্ধবের উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্য আমি এমন একটা কক্ষে বসলাম যেখানে কেউ পা মাড়ায় না। আমি মোবাইল ফোনকে দূরে রাখলাম, আমি নিশ্চিত করলাম যে ১৯৯৯ সাল।

“আমি সেই সপ্তাহের গবেষণাপত্রটি নিয়ে লাইব্রেরীতে গেলাম” Source: Medium

আমি যদি কোন বাক্য না বুঝি তাহলে পরবর্তী লাইনে যাওয়া থেকে বিরত থাকলাম যতক্ষণ না আমি পাঠ্যবই থেকে তার অর্থ উদ্ধার করছি। তারপর ঐ লাইনটি বার বার পড়েছি যতক্ষণ না সেটা পরিষ্কার হচ্ছে। পড়তে পড়তে আমি exogenous শব্দটির মুখোমুখি হই আর ধরে নিই এই শব্দটা বাক্যটার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। যা আসলে ভুল ছিলো।

তিন পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রটি পড়তে আমার দুইঘন্টা লেগেছিলো। কিন্তু এইবার আমি গবেষণাপত্রটি বুঝেছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, আমি গবেষণাপত্রটি বুঝেছি, আসলেই বুঝেছি। তারপর আবার মনে আসলো, ইশ! আমাকে আবার আরেকটা গবেষণাপত্র পড়তে হবে।   

আপনি যদি আপনার বিজ্ঞান গবেষণা ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে থাকেন, আপনিও হয়তো একই সমস্যায় ভুগছেন। গবেষণাপত্র পড়ার দশটি ধাপ জানা থাকলে আপনার হয়তো সুবিধা হবে।

১। আশাবাদী: এই ধাপে আপনি নিজেকে বলেন ‘এটা তেমন কঠিন হবে না’। এভাবে বলা আসলে অনেকটা এরকম দিনে আট কাপ কফি খেলে কিছু হবে না কিংবা প্রফেসরের চাকরির অভাব নেই বাজারে। যত হোক যাই হোক, আপনি বছরের পর বছর শব্দ পড়ছেন। বিজ্ঞান গবেষণাপত্র শব্দ ছাড়া আর কি!

২। ভয়: এই ধাপে আপনি বুঝতে পারেন গবেষণাপত্র শুধু মাত্র শব্দ নয়। ফলে আপনি কিছুটা ধীর হয়ে যান। অক্ষরগুলো শব্দ করে পড়া, কঠিন শব্দ আর বাক্যকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়া, সংক্ষিপ্ত শব্দগুলোর অর্থ বের করা আর এই কাজগুলো কয়েকবার করে করা। অভিনন্দন, এতকিছু পর আপনি গবেষণাপত্রের শিরোনাম পড়া শেষ করেছেন!

৩। অনুশোচনা: এই ধাপে আপনি চিন্তা করেন আপনি কেন আরও সময় নিয়ে আগে থেকে গবেষণাপত্রটি পড়া শুরু করেন নি। আপনি হয়তো ভেবেছিলেন বাসে যেতে যেতেই গবেষণাপত্রটি পড়ে ফেলা যাবে। ইশ! যদি আরও সময় থাকতো। গবেষণাপত্রের যদি একটা সংক্ষিপ্ত রূপ থাকতো! ২৫০ শব্দ বা তার কমে যেটা গবেষণাপত্রের শুরুতে মোটা কালিতে প্রিন্ট করা থাকবে।

৪। শর্ট-কাট: এটা কী? এবস্ট্রাকট? আমার জন্য? ঈশ্বর জার্নালের ইডিটরের মঙ্গল করুক। তারা বুঝতে পেরেছেন গবেষণাপত্র সহজে বুঝা যায় না। তাই গবেষণাপত্রের লেখকদের ইডিটররা একটা ছোট সার সংক্ষেপ লিখতে বলেছেন। ঠিক আছে, তাহলে এটা দিয়েই শুরু করা যাক।

৫। বিভ্রান্তি: এইসব কী? এবস্ট্রাক্ট থেকে কি কিছু বুঝার কথা ছিলো? প্রতিটি বাক্যে কেন গড়ে ৪০টা শব্দ? এত এত শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ কেন? গবেষণাপত্রের লেখক ক্যারাক্টারাইজ শব্দটি এতবার ব্যবহার করেছে কেন?

৬। উল্টোপাল্টা চিন্তা: হাঁসদের জন্য স্মার্টফোন থাকলে কী হতো? ওরা এটা কীভাবে ব্যবহার করতো? কী জন্য ব্যবহার করতো? পল সিমনের গানের লিরিক্সটা যেনো কী ছিলো, ‘ইউ ক্যান কল মি এল’ আপনার মাথায় কী সারাদিন এই গানটাই ঘুড়ছে? রুটি বানানোর একটা মেশিন থাকলে আপনার জীবনটা কীভাবে পাল্টে যেতো? এর জন্য আপনাকে ইস্ট কিনতে হবে। ইস্ট কি দামি? আপনি কয়েকদিন পর পর রুটি বানাতে পারবেন কিন্তু এটা বাসি হয়ে যেতে পারে। এটা দোকান থেকে কেনা রুটির মতো নয়। কখনই নয়। আচ্ছা পল সিমন কি এখনও বেঁচে আছে? আপনার উইকিপিডিয়া চেক করা উচিত। পল সিমনকে অনেক সময় আবার পল ম্যাকার্টনি বা পল শেফারের সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলতে পারেন।

গবেষণাপত্র পড়ার সময় মাথায় আসতে পারে যতো উলটো পাল্টা চিন্তা Source: imgflip

৭। ১৫ মিনিট পার হয়ে গেছে কিন্তু আপনি পরের বাক্যে এখনও যেতে পারেন নি।

৮। লক্ষ্যে অটুট: ঠিক আছে। এই বার শেষ করতেই হবে। করতেই হবে। হ্যাঁ। শব্দ পড়াই আপনার কাজ। চোখের মণির মনোযোগ এখন কাগজের শুকনো কালির উপরে।

৯। ক্ষোভ: কোন মানুষের মস্তিষ্ক এই ধরণের বাক্য কীভাবে তৈরি করতে পারে!

১০। মানবিক বিভাগে পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ: বিজ্ঞানের বাইরে যে গবেষণা পত্র থাকবে ওগুলো পড়া সহজ হবে। তাই না?

একটি লাইন পড়ার পর এর কিছুই হয়তো বুঝা গেলো না; Source: imgflip

গবেষণাপত্র একটা আজব নথি বটে। আমরা একটা গবেষণার উপর মাসের পর মাস এমনকি অনেক সময় বছরের পর বছর কাজ করি। গবেষণাপত্র লেখার সময় আমরা একটি নির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহার করি। আবার এই গবেষণাপত্র পড়তে আমাদের টাকা ব্যয় করতে হয়। অনেক সময় তা হয় অসম্ভব ব্যয়বহুল, যেমন ৩৪.৯৫ ডলার! এই গবেষণাপত্র বুঝতে এতই সমস্যা হয় যে আমরা জার্নাল ক্লাব তৈরি করি এই আশায় যে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ হয়তো এটি বুঝবে আর আমাদের সারাংশটা বুঝিয়ে দিবে।

আপনি কি গবেষণাপত্রের মতো কঠিন ভাষার কোন গণমাধ্যমের লেখা চিন্তা করতে পারেন! কল্পনা করুন বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ নিবন্ধ লিখছেন ৪০ জন লেখক। কিংবা ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনে কোন পণ্য সম্পর্কে লিখলে সেই পণ্য কোন কোন কোম্পানি তৈরি করে আর সেই কোম্পানিগুলো কোথায় অবস্থিত সেটা লেখা যদি বাধ্যতামূলক হয়। অথবা পিপল ম্যাগাজিনে জিমি কিমেলকে নিয়ে লিখলে তা প্রকাশ করার আগে জিমি কিমেলের উপর বিশেষজ্ঞদের দ্বারা কঠিন পিয়ার রিভিউয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

আপনি জানেন যখন এই ম্যাগাজিনগুলোতে যদি এরকম দুর্বোধ্য লেখা থাকে এটাকে আপনি কি বলবেন? খারাপ এবং মানহীন লেখা। কিন্তু যারা গবেষণাপত্র পড়তে চান তাদেরকে স্বাগতম। আমরা গবেষণাপত্র ভালো করে লিখতে চাই। কিন্তু আমাদের গবেষণার বিষয় এতটাই নির্দিষ্ট হয় যে আমাদের অনেক সংক্ষিপ্ত শব্দ লিখতে হয়। মাঝে মাঝে আমরা ভালো বিজ্ঞানীর ভাব ধরতে চাই। তাই যেসব ভালো গবেষণাপত্র পড়েছি তাদের ধাঁচ অনুকরণ করতে চাই। মাঝে মাঝে আমরা আসলেই খারাপ লিখি।

ফিচার ইমেজ: N.HENDRICKSON / ISTOCKPHOTO  

সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ
অজানাকে জানার চেষ্টা সবসময় রোমাঞ্চকর ও আনন্দের। সেই আনন্দ পাবার লোভে বিজ্ঞান নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করার চেষ্টা করি ।অণুজীববিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করেছি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে পিএইচডি করছি ন্যাশনাল চুং শিং ইউনিভার্সিটি, তাইওয়ানে।