চাইনিজরা কি সত্যি এলিয়েনের সন্ধান পেয়েছে?

ashtray with an alien toy inside
Photo by Michaël Meyer on Pexels.com

গত ১৪ই জুন চায়নিজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের অফিসিয়াল দৈনিক পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় । সেই সংবাদে দাবী করা হয় যে তারা চায়নায় অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেডিও টেলিস্কোপ (FAST) বা চাইনিজ স্কাই আই টেলিস্কোপ দিয়ে এমন কিছু কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সংকেত পেয়েছেন যা হয়তো অন্য কোনো গ্রহে থাকা কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর হতে পারে। চাইনিজ সংবাদ মাধ্যমের এই দাবীর পর বিজ্ঞানীর সমাজে হইচই পরে যায়।

সংবাদটি চায়না বেইজিং নরমাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও চায়না বর্হিগ্রহে সভ্যতার সন্ধানকারী টিমের (China extraterrestial civilization research group)  মূখ্য বিজ্ঞানী জ্যাং তংজি (Zhang Tonjie) এর বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে সংবাদটি প্রকাশ করা হয়। জ্যাং তংজির মতে তার দল চায়নায় থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেডিও টেলিস্কোপ (FAST) এ এমন কিছু সিগনাল পেয়েছেন যা অন্যগ্রহে অবস্থিত কোনো প্রাণীর যন্ত্রাংশ থেকে আশা সংকেত হতে পারে। তার মতে, এ রকম ন্যারো ব্যান্ডের তড়িৎচৌম্বকীয় সংকেত এর আগে ধরা পরা সংকেত হতে আলাদা এবং তারা এটি নিয়ে আরো পরীক্ষা চালানোর ঘোষনা দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন এই রহস্যময় সংকেতটি কোনো যন্ত্রের সংকেত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তারা এটি সামনে আরো পরীক্ষা করার চিন্তা করছেন যা সময়সাপেক্ষ।

চায়নার জিংজু প্রদেশে অবস্থিত FAST বা স্কাই আই টেলিস্কোপ

জ্যাং তংজির মতে জাপানের মহাকাশ গবেষনা সংস্থা JAXA তাদের পাঠানো মহাকাশযান Hyabusa2 যা গ্রহানু Ryugu থেকে যে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিলো তাতে ২০ প্রকারের অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া গিয়েছে। অ্যামিনো অ্যাসিড হলো প্রোটিন উৎপাদনের প্রধান উপাদান গুলোর একটা। তার মানে এই আবিষ্কার এটা প্রমান করে যে আমাদের গ্রহের বাইরেও প্রাণ গঠন হতে পারে।

FAST এর পূর্ণরুপ হলো Five hundred meter aperture spherical telescope. এটা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেডিও টেলিস্কোপ। কেনো এই টেলিস্কোপ অন্যগুলোর চেয়ে আধুনিক? জ্যাং তংজির মতে, ২০১৮ সালে চালু হওয়া এই টেলিস্কোপ খুবই কম তরঙ্গদৈঘ্যের সংকেত ধরতে পারে। তার মতে এতে থাকা যন্ত্র অন্যগ্রহ থেকে আশা তরঙ্গদৈঘ্যে ধরতেও সক্ষম। এই গবেষকের মতে এটি তিনদিক থেকে অন্যদের চেয়ে সেরা প্রথম হলো, এটি আকাশের একটি বিশাল অংশ নিয়ে সার্ভে করতে পারে। দ্বিতীয় হলো এর উচ্চ সংবেদনশীলতা আর এতে থাকা ১৯ বীম যা আকাশের বিভিন্ন অংশের সিগনাল গ্রহণ করতে পারে। তার মতে বাইরের গ্রহের সংকেত এর মাধ্যমেই দেয়া সম্ভব।

চায়না ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বাইরের গ্রহের প্রাণ সন্ধানের অফিসিয়ালি ঘোষনা দেয়। সেই টিম ২০১৯ সালে FAST এর সার্ভে করা তথ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ২ টা এক্সোপ্ল্যানেটের সংকেত পায় এবং ২০২২ সালে এসে ঐ একই জায়গা থেকেই আবারও একই সংকেত পাওয়ায় তাদের ধারনা এটি হয়তো ঐ গ্রহগুলোতে থাকা কোনো যন্ত্রাংশ থেকে আশা সংকেত।

আসলেই কি এটি কোনো এলিয়েনের সংকেত?

এই সংবাদ প্রকাশের পর স্পেস নিউজের সাংবাদিক অ্যান্ড্রু জনস এক টুইটে বলেন, এটা অবশ্যই আকর্ষনীয় খবর কিন্তু এখনই এতো উত্তেজিত হওয়ার কিছু হয়নি।

১৬ই জুন ফিউচারিজম নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের Search For Extraterrestrial Intelligence(SETI) গবেষক ডেন অরথাইমার বলেন, যে সিগনালটা আমরা পেয়েছি সেটা আসলে রেডিও ইন্টাফেয়ারেন্স বা রেডিও ব্যাতিচার। সিগনালটা আসলে অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসেনি এটা এসেছে আমাদের থেকেই। অন্যগ্রহ থেকে আশা দূর্বল তরঙ্গদৈঘ্যের সংকেত ধরার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পৃথিবীর রেডিও দূষণ। সমস্যা হলো যখনই এমন কোনো সংকেত ধরার চেষ্টা করা হয় তখনই নানা রকম তরঙ্গ হতে পারে তা কোনো মোবাইলের বা কোনো স্যাটেলাইটের এসে অনুপ্রবেশ করে। Radio Frequency Interference (RFI) একটি বড় সমস্যা দূর্বল তরঙ্গ ধরার ক্ষেত্রে। যদি আমরা একটি গ্রহকে টার্গেট করি যেমন কেপলার-438 যা অনেকটা পৃথিবীর মতই ।এতে সমস্যা হচ্ছে আপনি যখনই গ্রহটির দিকে টেলিস্কোপ তাক করবেন কিন্তু আপনি তাক করবেন আসলে তার নক্ষত্রের দিকে তাই আপনাকে নক্ষত্রের পাশ থেকে সংকেত সংগ্রহ করতে হবে। ডেন অরথাইমারের মতে, চাইনিজ টেলিস্কোপটি শহর থেকে দূরে হলেও এর আশেপাশে ট্রান্সমিটার রয়েছে আর এ সংকেত আসলে ওটারই ব্যাতিচার।

এরকম ঘটনা এর আগেও হয়েছে ১৯৭৭ সালে পাওয়া যাওয়া wow সিগনাল যা পরবর্তীতে যেটা পালসার প্রমাণিত হয়।এছাড়া ২০১৯ সালে আমাদের পাশের নক্ষত্র আলফা সেন্টোরি থেকে সংকেত পাওয়া যায় আর এটে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো কারণ এর পাশে কয়েকটি গ্রহ অবস্থিত । কিন্তু ২ বছর জানা যায় এটা আসলে মানুষের ভুলের ফলে হওয়া।

এখন দেখার বিষয় চাইনিজরা এটার ব্যাখ্যা কিভাবে দেয় ততক্ষন অপেক্ষা ।

তথ্যসূত্রঃ futurism, earthsky, futurism

অনিক কুমার সাহা
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ। একজন শৌখিন জ্যোতির্বিদ