জেমস ওয়েবের তোলা প্রথম এক্সোপ্লানেটের ছবি বিশ্লেষণ

সম্প্রতি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ সৌরজগতের বাইরের গ্রহের ছবি প্রকাশ করেছে যা এক কথায় অতুলনীয়।

সম্প্রতি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ সৌরজগতের বাইরের গ্রহের ছবি প্রকাশ করেছে যা এক কথায় অতুলনীয়।

মূল ছবির কথায় আসার আগে জেমস ওয়েবের ক্যামেরার বেসিক একটু মনে করা যাক।

আমাদের দৃশ্যমান আলোর ঠিক পরেই রয়েছে অবলোহিত বা Infrared আলো। এর মধ্যে আবার একটু কম তরঙ্গদৈঘ্যের গুলো হলো নিকট অবলোহিত বা Near Infrared আর তার চেয়ে বড় গুলো হলো মধ্যম অবলোহিত বা Middle Infrared।

জেমস ওয়েবে NIRCam ও MIRI instrument নামে দুটো যন্ত্র আছে। যেহেতু সবাই মোটামুটি জানে জিনিস গুলো কী আর কী রকমের ছবি তোলে তাও একবার মনে করিয়ে দেই, NIRCam হলো নিকট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে অবলোহিত আলোর ছবি তোলে আর MIRI instrument মধ্যম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত বা infrared আলোর ছবি তোলে। NIRCam এর বিশেষত্ব হলো এ যে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ছবি তোলে তা দিয়ে মহাকাশের ধূলো বা dust এর ভেতরের ছবিও সুন্দর তোলা যায়। আর MIRI দিয়ে ডাস্টগুলোর ভেতরের ছবি তোলা যায়। 

এবার মূল ছবির বিশ্লেষণে আসি:

জেমস ওয়েবের তোলা HIP 65426 গ্রহের ছবি

ছবির বিশ্লেষণের আগে একবার মনোযোগ দিয়ে ছবিটি দেখে নেন তারপর দেখেন পড়ার সময় বিশ্লেষণে লেখা জিনিসগুলো খেয়াল করেছিলেন কিনা। 

প্রথমেই আসি, এক্সোপ্লানেট বা বহির্গ্রহ হলো আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহ। তবে মনে রাখতে হবে, নাসার এক্সোপ্লানেট আর্কাইভের তথ্য মতে আজ পর্যন্ত যত এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার হয়েছে, তার সবই আমাদের মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা গ্যালাক্সির । আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে কোনো এক্সোপ্লানেট এখনো আবিস্কার হয়নি। 

জেমস ওয়েব যে এক্সোপ্ল্যানেটের ছবি তুলেছে, তা হলো HIP 65426 নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা HIP 65426b প্ল্যানেট। 

এই HIP 65426b আসলে কি বুঝায়, তা আগে জেনে নেই। এই HIP মানে হলো হিপ্পারকাস স্টার ক্যাটালগ আর 65426 মানে হলো ঐ ক্যাটালগে থাকা এই সংখ্যাতম নক্ষত্র। আর b বলতে ঐ নক্ষত্রের প্রথম গ্রহকে বুঝায়। এক্সোপ্ল্যানেটের ক্ষেত্রে সবসময় প্রথম গ্রহকে ছোটোহাতের b দাড়াই নামকরণ করা হয়। 

এবার ছবির নিচের দিকের চারটি ভিন্ন রংয়ের ছবিগুলো দেখুন। এখানে বামদিকের প্রথম দুটি হলো NIRCam আর পরের দুটি MIRI দিয়ে তোলা। বামের প্রথম ছবি মানে বেগুনী রংয়ের ছবিটি ৩ মাইক্রোমিটার, পরের নীল ছবিটি ৪.৪৪ মাইক্রোমিটার, আর হলুদ ও লাল রংয়ের ছবি দুটো যথাক্রমে ১১.৪ ও ১৫.৫ মাইক্রোমিটারের তরঙ্গদৈর্ঘ্যে তোলা ভিন্ন ভিন্ন ছবি। প্রথম দুটো ছবিতে গ্রহের পাশে যে কালো বার দেখা যাচ্ছে তা টেলিস্কোপের যন্ত্রের কারণে। 

মনে আসতে পারে এতো দূরের গ্রহের স্পষ্ট ছবি আসলো কেমনে? 

এখানে করোনাগ্রাফ নামের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এটা আসলে একটা মাস্কিং পদ্ধতি, যা তার পাশের নক্ষত্রের আলোকে ব্লক করে দেয়। অনেকটা এমন যে আমরা সূূ্র্যের দিকে তাকালে তার পাশে ঠিকমত দেখা যায় না, কিন্তু হাত দিয়ে সূর্যকে ঢেকে দিলে তার পাশে দেখা যায়। ছবিতে যে স্টার গুলো দেখছেন সাদা সাদা সেগুলো আসলে মূল নক্ষত্র কিন্তু ঢাকা দেয়া হয়েছে।  

গ্রহটি বৃহস্পতির চেয়ে ছয় থেকে ১২ গুণ বড়। এটি তার নক্ষত্র থেকে প্রায় পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের ১০০ গুণ দূরে অবস্থিত। আর এটি তার নক্ষত্র থেকে প্রায় ১০০০০ গুণ কম উজ্জ্বল। তাও এটার ছবি জেমস ওয়েব তুলতে পারলো, এথেকে বোঝা যায় জেমস ওয়েব কতখানি শক্তিশালী। 

এই নক্ষত্র পৃথিবী থেকে ৩৮৫ আলোকবর্ষ দূরে। ইংল্যান্ডের এক্সেটর (University of Exeter) বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও এই প্রকল্পের পরিচালক সাশা হিংকলে (Sasha Hinkley) এই ছবি প্রকাশের মূহুর্তকে শুধু জেমস ওয়েবের জন্য নয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্যেও ধারা রুপান্তরকারী বলেছেন। আশা করা যায় এই ছবি নিয়ে আরো বিস্তারিত গবেষণা পত্র প্রকাশিত হবে। 

তথ্যসূত্র: জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ, নাসা এক্সোপ্লানেট আর্কাইভ

ইংরেজিতে কন্টেন্ট রাইটার হয়ে গড়ে তুলতে পারেন নিজের ফ্রিল্যান্স-ক্যারিয়ার। কীভাবে? দেখুন ফ্রি-মাস্টারক্লাস ভিডিও

অনিক কুমার সাহা
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ। একজন শৌখিন জ্যোতির্বিদ