ঘুম নিয়ে দরকারী কথা

লিখেছেন

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

গত শতাব্দিতেও ঘুম নিয়ে মানুষের মনোভাব ছিল নেতিবাচক। থমাস আলভা এডিসন বলেছিলেন, ঘুম হচ্ছে সময়ের অপচয় এবং ঘুম প্রাচীন গুহা জীবনের ঐতিহ্য বহন করে চলছে।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে, টেডটক শুনছিলাম। ঘিলু বিজ্ঞানী ম্যাথু ওয়াকারেরSleep is your superpower” শিরোনামে টেডটক। ২০১৯ সালে পাবলিশ করা ভিডিওটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জানার মতন বিষয় আছে। ম্যাথু সাহেবেরই লেখা ঘুম বিষয়ক একটি চমৎকার বই আছে। নাম ”Why We Sleep”

বই প্রচ্ছদ: Why We Sleep

মানুষের এক জীবনে তিনভাগের একভাগ ঘুমে অপচয় – আগে বিষয়টা ভাবলে কিঞ্চিত হতাশ হতাম। এক তৃতীয়াংশ সময় ঘুমিয়ে কাটালেও ঘুম আয়ুকে দীর্ঘ করে। ম্যাথু বলছেন, ঘুম হচ্ছে আমাদের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম এবং অমরত্বের জন্য প্রকৃতির একটা প্রচেষ্টা। ঘুম কিভাবে জীবন দীর্ঘায়িত করতে পারে সেটিই বলা হচ্ছে।

ঘুমের প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করেন না বটে, তবে যথাযথ গুরুত্ব অনুধাবন করতেও ব্যর্থ। ঘুমের ভালো দিকগুলো জানা এবং ঘুম সম্পর্কিত সর্বশেষ বিজ্ঞান কী সেসবও জেনে রাখা অপরিহার্য।

ঘুমের সাথে আমাদের স্মৃতিশক্তির সম্পর্কটা জানা থাকলে, রাত জেগে পড়াশুনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবো কিনা সংশয় তৈরি হবে। রাত জেগে পড়াশুনা করাকে অনেকেই উৎসাহিত করেন; অথচ পড়াটা মনে রাখার জন্য ঘুম দরকার আগে। আমরা যা পড়াশুনা করি নতুন স্মৃতিগুলো ঘিলুতে জমা হবে কি হবে না তা নির্ধারণ করতে ঘুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আমার মনে হয় বাচ্চাদের ঘুম সম্পর্কিত টেকনিক শিখিয়ে দিলে, কম সময় পড়াশুনা করে বেশি শেখা সম্ভব হতে পারে।
এক হচ্ছে, দৈনিক রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে দেয়া এবং পরিপূর্ণ ঘুম যাতে হয় লক্ষ্য রাখা।
দুই হচ্ছে, দিনের কোন এক ফাঁকে ন্যাপ নিতে দেয়া।

ন্যাপের বাংলা শব্দ ভাতঘুম হলেও সেটা আসলে ভাত খেয়ে যে ঘুম সেটিকে বলা হচ্ছে না। ন্যাপ হচ্ছে একটু ঘুমিয়ে নেয়া, বিশ-ত্রিশ মিনিট ব্যপ্তি হতে পারে। ভাত খেয়েও হতে পারে আবার না খেয়েও হতে পারে। ভাত খেয়ে ঘুমটা পরিহার করা উচিত। পেটের মেদের অন্যতম কারণ খাবার পরপরই ঘুম।

চাইনীজরা দুপুরে নির্দিষ্ট সময়ে এক ঘন্টার মতন বিরতি নেয় ঘুমিয়ে নেবার জন্য। এটা তাদের কর্মবিমুখ করে না বরং সক্রিয়তা বৃদ্ধি করে।

ঘুম পড়াশুনার জমিন তৈরি করে দেয়। বাচ্চাদের সকালে পড়াশুনার অভ্যাস করানো যেতে পারে। রাত জেগে পড়াশুনা, কাজ করা অর্থাৎ ঘুম বাদ দিয়ে যে কোন কিছু করার কার্যকরী প্রভাব খুবই বাজে। যদি এমন হয়, পড়াশুনার চাপ এতই বেশি যে ঘুম বাদ দিয়ে পড়াশুনা করতে হচ্ছে তাহলে, জেনে রাখুন বাচ্চাদের দীর্ঘমেয়াদী বড় ক্ষতি করে চলছেন। ঘুমের জন্য যদি বাচ্চাদের পড়াশুনা কম করতে হয়, সেটিই ঠিক আছে।

দিন শেষে, ভালো ঘুম হচ্ছে নতুন স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সেইভ বাটন। অর্থাৎ অনেক পড়াশুনা করলেও ভালো একটা ঘুম নেয়া হলো না, আপনার স্মৃতি সংরক্ষণ যথাযথ হবে না।

ঘুমের সাথে মানসিক স্বাস্থ্য, হৃদরোগ, ক্যানসার বিবিধ রোগব্যাধীর সম্পর্ক নিয়ে প্রচুর গবেষণা আছে। নতুন নতুন গবেষণা হচ্ছে। ভালো ঘুমের গুরুত্বারোপ সর্বক্ষেত্রে।

কার কতটুকু ঘুম প্রয়োজন এসব নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের দৈনিক পরিশ্রম, খাদ্য গ্রহণ ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় কতটুকু পুষ্টি পাচ্ছে শরীর, মানসিক অবস্থা বিবিধ মানদণ্ডের উপর। ভালো ঘুমের জন্য ঘরের পরিবেশ, মনস্থির, রাতের খাওয়া, ডিজিটাল স্ক্রিন প্রভাব রাখে। রাতের খাওয়ার পরপরই ঘুমিয়ে যেতে নিষেধ করা হয়। খাবার অন্তত দুই-তিন ঘন্টা পর ঘুমিয়ে পড়ার পরামর্শ দেয়া হয়। চা-কফি গ্রহণ সাধারণত বিকেল পাঁচটার পর বারণ করা হয়।

যাদের ঘুম আসে না বলে অভিযোগ করেন, তাদের সমস্যা ও কারণ আমি দুইভাগে ভাগ করে দেখেছি।

এক, প্রকৃতই তাদের ঘুমের সমস্যা। শারীরিক-মানসিক কারণে কিংবা রোগ, ওষুধের প্রার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

দুই, কৃত্রিম ঘুম সমস্যা। কৃত্রিম ঘুমের সমস্যা অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে ডিজিটাল স্ক্রিন, দেরিতে খাবার গ্রহণ, ঘরের ঘুম অনুপযোগী পরিবেশ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং ঘুমের শিডিউল বদলে যাওয়া। দেখা যায় যিনি অভিযোগ করেন, আমার ঘুম হচ্ছে না উনি দিনে বেশ সময় ঘুমিয়ে নিচ্ছেন। রাতে যাদের ঘুমের সমস্যা হয়, দিনে তাদের ঘুমাতে বারণ করা হয় এমনকি সামান্য ঘুমিয়ে নেয়াটাও।

যাদের ঘুমের শিডিউলে সমস্যা নেই, তাদের ঘুমের ডাক আসলেও ডিজিটাল স্ক্রিনে আসক্ত থাকার কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, ঘুমের ডাক নাকচ করে দিলে পরবর্তী দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে আর ঘুম আসে না।

ভালো ঘুমের জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা চাই। আমাদের পরিবেশ যেমন, দৈনিকই গোসল করা দরকার। যাদের ঘুম সমস্যা হয় তারা রাতে ঘুমানোর ঘণ্টা দুই আগে হালকা গরম পানিতে গোসল করলে ভালো ফল পাবেন। ডিজিটাল স্ক্রিণ (মোবাইল, ল্যাপটপ, টেলিভিশন ইত্যাদির ব্রাইট ডিসপ্লে) এর বদলে বই এ মনযোগ দেয়া যেতে পারে।

বই প্রচ্ছদ: মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন

ঘুম সম্পর্কে আরো ভালো জানতে ম্যাথু সাহেবের উল্লেখিত বইটিসহ আরাফাত রহমানের লেখা বই মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন পড়ে দেখা যেতে পারে। এছাড়া বিজ্ঞানব্লগেও ঘুম সম্পর্কে চমৎকার কিছু লেখা রয়েছে। ঘুম কেন হয়, স্মৃতি কিভাবে কাজ করে, মগজে কিভাবে স্মৃতি সংরক্ষণ হয় কিংবা আমরা দেখি কী করে এই সম্পর্কিত চমৎকার তথ্যগুলো নিজে জানতে পারেন এবং আপনার সন্তান, বন্ধুদের সাথে আলোচনা করতে পারেন।

আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য হচ্ছে, বর্তমান বাবা-মা’দের ঘুম সম্পর্কে সচেতন করা। যা জানলাম বিনিময় করা। আমার মনে হয়, সন্তানের ভালোর জন্য লেখাপড়া তথা শিখন প্রক্রিয়া কার্যকরী করে তুলতে ঘুমের গুরুত্ব বুঝতে হবে। মনে রাখবেন, ঘুম কমিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আয়ুও কমিয়ে ফেলা।

লেখাটি 77-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers