হ্যান্ড ফুট এন্ড মাউথ ডিজিজ : প্রয়োজন সচেতনতা

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

আপনার বাচ্চাটা কদিন থেকে আর স্কুলে যেতে চাইছে না। শরীরটাও বেশ খারাপ, হাল্কা জ্বর সবসময়ই শরীরে থাকছে। জ্বর তো আসতেই পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে জ্বরটা সহজে ছেড়ে যাচ্ছে না। বাচ্চাটা আবার খাওয়া দাওয়াও একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। কিছু মুখের ভেতর গেলেই চিৎকার করে কেঁদে উঠে, মুখ জ্বলে গেল বলে। রাতে ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতে গেলে বেশ অদ্ভুত একটি বিষয় আপনার নজরে এল। ওর শরীরে কিছু অদ্ভুত ধরনের র‍্যাশ দেখা দিয়েছে। সেগুলো আবার অনেকটা জলবসন্তের মত! ভেতরে আবার পানির মত এক ধরনের তরল পদার্থ দেখা যাচ্ছে। বাচ্চার এমন শারীরিক অবস্থায় আপনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছেন।

এটি আসলে কিন্তু জলবসন্ত নয়। এটি হল হ্যান্ড ফুট এন্ড মাউথ ডিজিজ নামের এক ধরনের রোগ। মূলত অতি সংক্রামক এই রোগটি কক্সাকি – ১৬ ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। এছাড়া আরও কিছু এন্টেরো ভাইরাসের মাধ্যমে এই রোগটি হতে পারে। অতিরিক্ত সংক্রামক হবার কারণে খুব সহজেই এটি বিভিন্ন জনবসতিপূর্ণ জায়গা, যেমন স্কুলে খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫৭ সালে সর্বপ্রথম নিউজিল্যান্ডে এই রোগটি শনাক্ত হয়। পরের বছর কানাডাতেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে।

হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজে আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক অবস্থা। এই রোগে মূলত বাচ্চাদের হাত, পা এবং মুখে এমন বিভিন্ন আকৃতির লালচে র‍্যাশ দেখতে পাওয়া যায়

সাধারণত কম বয়সের শিশুরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। সাধারণত ১০ বছরের নিচের বাচ্চারাদের ক্ষেত্রে রোগটা বেশি হয়ে থাকে, তবে অনেক সময় অ্যাডোলেস্টদেরও এই হ্যান্ড ফুট এন্ড মাউথ ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার নজির দেখা গিয়েছে। তবে একটা কথা এখানে পরিষ্কার করা দরকার, পশুদের ক্ষেত্রে যে ফুট এন্ড মাউথ ডিজিজের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, তার সাথে কিন্তু মানুষের এই রোগের কোন সম্পর্ক নেই। দুটো রোগই সম্পূর্ণ আলাদা।  

কেউ যদি আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যায় এবং তার যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে তবে সেও এতে আক্রান্ত হতে পারে। তাছাড়া এই রোগ থেকে বাচ্চাদের টনসিলাইটিস, ফ্যারিনজাইটিস, এনকেফালাইটিস, ওরাল আলসার, ল্যারিনজাইটিস এমনকি মেনিনজাইটিস পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে।

এই রোগ মূলত ফিকো-ওরাল রুট বা মলাশয় এবং মুখের মাধ্যমে বেশি ছড়ায়। তাছাড়া নাকের পানি, থুথু,  ব্লিস্টারের তরল পদার্থ ও কাশির মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। যদি বাচ্চার হাতে ও পায়ে র‍্যাশ হয়, সেখানকার সংস্পর্শেও এলেও এই রোগ ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির জামা কাপড়, গ্লাস, দৈনদিন ব্যবহার্য জিনিস ব্যবহার করলেও এই অতি সংক্রামক ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। বয়স্করা এই রোগে আক্রান্ত হলে অনেক সময় কোন লক্ষণ প্রকাশ না করেই রোগ ছড়াতে পারেন।

এই রোগে আক্রান্ত বাচ্চাদের আক্রান্ত হবার ৩-৬ দিনের মধ্যে অল্প তাপমাত্রা থেকে ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর আসতে পারে। জ্বর হবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যবর্তী সময়ে তার গলায় প্রচন্ড ব্যথা শুরু হবে। কারণ তখন গলায় ছোট ছোট ক্ষত বা আলসার দেখা দিতে পারে। ফলে তার খাওয়ার রুচি অনেক কমে যাবে। এই রোগের কারণে শরীরে প্রচন্ড ক্লান্তি ভর করে। গলাব্যথার কারণে বাচ্চারা কিছুই খেতে চায় না। পানি না খেতে খেতে তখন শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন হতে পারে। গলাব্যথার পাশাপাশি মুখ গহব্বরের ভেতর ছোট ছোট সাদা আকৃতির ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এছাড়া ঠোঁটের আশেপাশে র‍্যাশও হতে পারে। এগুলো দেখতে অনেকটা লালচে রঙের, তার উপর আবার খয়েরী রঙের স্কেলও থাকতে পারে।

র‍্যাশগুলো কিছুটা যন্ত্রণাদায়ক হয়ে থাকে। এই র‍্যাশ গুলোর কারণে খাবার কিংবা পানি খেতে বাচ্চাদের বেশ কষ্ট হয়। অনেক সময় র‍্যাশগুলোতে চুলকানিও থাকতে পারে। যদি আপনার বাচ্চার একজিমা নামের এক ধরণের চর্মরোগ থেকে থাকে, তাহলে এই হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ নামের ভাইরাস বাহিত রোগটি এই একজিমার কন্ডিশন আরও খারাপ করে ফেলে। তখন ভাইরাসের পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়াও আক্রমণ করে বাচ্চার সেকেন্ডারি ইনফেকশনের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। জ্বরের প্রকোপ বেশি হলে, জ্বর শুরু হবার ২-৩ দিনের মধ্যে হাত ও পায়েও র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। মূলত হাত, পা ও মুখ আক্রান্ত হওয়ার কারণে এই রোগকে হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ বলা হয়। এছাড়া বাহু, পশ্চাতদেশ প্রভৃতি স্থানও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

এই রোগটি ভাইরাসজনিত হবার কারণে দেখা যায় ৭-১০ দিনের মধ্যেই বাচ্চা নিজে থেকে সুস্থ হয়ে গিয়েছে। সে যদি ঠিকমতো খেতে পারে, তবে তেমন একটা চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। এক্ষেত্রে জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল বা এসিটামিনোফেন গ্রুপের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া যদি বাচ্চার চুলকানি থাকে,  সেটি  কমানোর জন্য অ্যান্টি হিস্টামিন দেওয়া যেতে পারে। জ্বর না থেকে শুধু ব্যথা থাকলেও প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবার জন্য অনেক চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে ভিটামিন সি এবং জিংক দিয়ে থাকেন।

হ্যান্ড ফুট এন্ড মাউথ ডিজিজে প্রচন্ড জ্বরের চিকিৎসায় অ্যাসিটামিনোফেন বা প্যারাসিটামল গ্রুপের ওষুধগুলো বেশ ভাল কাজ করে

খেয়াল রাখতে হবে বাচ্চা যেন খাবার থেকে পরিপূর্ণ পুষ্টিগুণ পায়। এই রোগের একটি প্রধান সমস্যাই হল পানিশূন্যতা। তাই লক্ষ্য রাখতে হবে আক্রান্ত বাচ্চাটি কোনোভাবেই যেন পানিশূন্যতায় না পড়ে। পানিশূন্যতা দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে শিরাপথে স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। প্রয়োজনে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে আবার হাসপাতালে রোগটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। খেয়াল রাখতে হবে আক্রান্ত বাচ্চার টুথব্রাশ, পানি পানের কাপ, তোয়ালে, জামা কাপড় যেন এই রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় অন্য কেউ ব্যবহার না করে।

খাবার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়া, বিশুদ্ধ পানি পান করা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে না যাওয়ার মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়৷ তাই একটু সচেতন হলে সহজেই আমরা বাচ্চাদের এই রোগ থেকে দূরে রাখতে পারি। রুখে দিতে পারি এই অতি সংক্রামক ব্যাধির বিস্তারকে।

তথ্যসূত্র-

লেখাটি 78-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 903 other subscribers